জাপানিদের কাছে শিনজো আবে মানে কী?

অনন্য সাধারণ এক শোক প্রকাশের সাক্ষী হল জাপান, আর তা আততায়ীর গুলিতে নিহত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের জন্য।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 July 2022, 06:58 PM
Updated : 13 July 2022, 03:49 AM

গত শুক্রবার জাপানের নারা শহরে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন আবে। জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের সরকার প্রধান ছিলেন তিনি।

সেই আবের মৃত্যু জাপানিদের নাড়া দিয়েছে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সম্রাট হিরোহিতোকে হারানোর মতোই। ১৯৮৯ সালে হিরোহিতোর মৃত্যুর পর এতটা গভীর শোক প্রকাশ করতে দেখা গেছে জাপানিদের।

কী কারণে জাপানিদের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আবে, কি তার মাহাত্ম্য, তা খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে বিবিসি।

তাদের ভাষ্যে, জনগণের কাছে ভালোবাসার চেয়ে সম্মানই যেন বেশি পেয়েছেন শিনজো আবে।

বাস্তবতাও হচ্ছে, জনমত জরিপে বরাবরই দেখা গেছে যে বেশিরভাগ জাপানি তার প্রতি পুরোপুরি অনুরক্ত নয়, কিন্তু ভোটটা তাকেই দিত।

সাবেক জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন শোকার্ত জাপানিরা। ছবি রয়টার্সের

কেন এত শোক?

এক্ষেত্রে বড় একটি কারণ হচ্ছে শিনজো আবের মৃত্যুর ধরন।

একটি নির্বাচনী প্রচারের সমাবেশে বক্তৃতা করার সময় গুলি করা হয় তাকে। জাপানে কাউকে এভাবে হত্যা করা হবে, এটা মেনে নেওয়া দেশটির নাগরিকদের কাছে বেশ কঠিন। সেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের আইন অনেক কঠিন এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নেই বললেই চলে।

তবে তার মৃত্যুতে এই উপলব্ধিও ক্রমেই বেড়ে চলেছে যে তিনি জাপানকে কী দিয়ে গেছেন।

সেক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি আসবে, তা হলে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা।

২০১২ সালে শিনজো আবে পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ আতঙ্কের ভেতর দিয়ে গেছে জাপান। ধ্বংসাত্মক এক ভূমিকম্প, সুনামি ও ফুকোশিমায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয়।

ওই সময়ের ক্ষমতাসীন জোটে চলছিলো বিশৃঙ্খলা। তাছাড়া ১৯৯২ সালে পুঁজিবাজারে ধসের ধাক্কা জাপানের অর্থনীতি তখনও সামলে উঠতে পারেনি। যে কারণে এই দুই দশকে সরকার প্রধানের আসা-যাওয়ার মিছিলে দেশটি দেখেছে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী। তাদের একজনের মেয়াদ ছিল মাত্র ৬৪ দিন।

নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে যেন উদ্যমের এক রেশ বয়ে যায়।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল তার গৃহীত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যা প্রচলিতভাবে ‘আবেনোমিকস’ নামে পরিচিতি পায়।

আবে ঘোষণা করেন- ‘জাপান ফিরে এসেছে’। তিনি নগদ অর্থের একটি ‘বড় বাজুকা’ নিয়ে আর্থিক বাজারে আঘাত করেন এবং পণ্য ও সেবার মূল্য ঊর্ধ্বমুখী করে তোলেন। ব্যাংকে ঋণের সুদের হার শূন্যেরও নিচে নেমে যাওয়ার পরও এই নীতি বজায় রাখেন তিনি।

দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং নগদ অর্থ অন্য কোথাও রাখার জায়গা না পেয়ে জনগণ খরচ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি আসে এবং শ্রমের মজুরি বেড়ে যায়।

ছবি: রয়টার্স

‘আবেনোমিকস’ কি কাজ করেছিল?

পুরোপুরি কাজ করেনি সেটা। কিন্তু পুঁজিবাজারে জোয়ার আসে, কর্মসংস্থান বেড়ে যায় এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে যে ব্যক্তিটি কাজ করেছেন, দেখে মনে হচ্ছিলো তিনি অন্তত জানেন, তিনি কী করছেন।

অর্থনীতি আসলে কখনই শিনজো আবের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল না। জীবনভর তার ঝোঁক ছিলো জাতীয় নিরাপত্তা। আর এখানেই তার সত্যিকারের অবদান লুকিয়ে আছে।

‘সমমনা গণতান্ত্রিক’ দেশগুলোকে নিয়ে আবে একটি জোট গড়তে চেয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো দেশ রয়েছে। এছাড়া ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে ‘কোয়াড’ গঠনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।

তবে জাপানের নিরাপত্তা নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ‘আর্টিকেল ৯’। জাপানে সবাই জানে ‘আর্টিকেল ৯’ বলে আসলে কী বোঝায়?

এটা দেশটির সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ, যা জাপানকে একটি ‘প্যাসিফিস্ট নেশন’ বা ‘শান্তিপ্রিয় জাতি’তে পরিণত করেছে। এই ‘আর্টিকেল ৯’ জাপানের সংবিধানে সংযোজন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী দেশ যুক্তরাষ্ট্র।

জাপানের জাতীয়তাবাদীরা এরপর থেকে এই ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এই ধারা জাপানকে দুর্বল করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিচ্ছে না এবং নিজের মিত্রদের সুরক্ষা দিতেও বাধা সৃষ্টি করছে।

স্নায়ু যুদ্ধ পররর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় চীন ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক উত্থানের পটভূমিতে শিনজো আবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে আর্টিকেল ৯ বাতিল করতে হবে।

সাবেক কূটনীতিক ও আবের বন্ধু কাজুহিকো তোগো বলেন, “সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের মূলভাবটি ছিল যে নিজের নিরাপত্তার জন্য জাপানকে বিশ্বের সুমতির উপর নির্ভর করে থাকতে হবে। এটা অর্থহীন। তাই আবে এই ভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছেন।”

কিন্তু কীভাবে?

জাপানে সংবিধান পরিবর্তন অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। সংবিধান পরিবর্তনের জন্য পার্লামেন্টের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেতে হয় এবং পরিবর্তনের প্রস্তাবের পক্ষে একটি জাতীয় গণভোট আয়োজন করে তাতে সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়।

আবে জানতেন এই পথে আর্টিকেল ৯ বাতিল করা অসম্ভব। তাই, তিনি আরেকটা সমাধান বের করলেন। আর্টিকেল ৯ এর বিষয়টিকে ‘পুনঃব্যাখ্যা’ করে একটি আইন পাস করান তিনি।

কাজুহিকো তোগোর ভাষায়, এটা ছিল একটি ‘জিনিয়াস স্ট্রোক’ বা অসাধারণ পদক্ষেপ।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “তিনি আর্টিকেল ৯ এর ব্যাখ্যা বদলে ফেলেন। ফলে যেটা দাঁড়ায় যে যুক্তরাষ্ট্র যদি জাপানের সীমানায় হামলা পরিচালনা করে, তার অর্থ হচ্ছে জাপানের উপর আক্রমণ করা হয়েছে এবং এটা আমাদেরকে আমাদের আত্মরক্ষার অধিকার সুরক্ষিত করার অনুমোদন দেয়।”

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি একটি যুদ্ধে জড়ায়, ধরা যাক চীনের আগ্রাসন থেকে তাইওয়ানকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, তাহলে ওই যুদ্ধে জাপানও যোগ দিতে পারে।

আবের সমালোচকেরাও স্বীকার করেন যে এই পদক্ষেপের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, কিন্তু একইসঙ্গে তারা এর দুর্বলতাগুলোও দেখতে পান।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক কোইচি নাকানো বিবিসিকে বলেন, “[আর্টিকেল ৯ নিয়ে] শিনজো আবের ব্যাখ্যা আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হত যদি তিনি এই প্রক্রিয়াটি পেছনের দরজা দিয়ে পরিচালিত না করে সামনের দরজা দিয়ে করার সততা ও সাহস দেখাতেন।

“এটা দেখে মনে হয় যে (পার্লামেন্টে) আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না নিয়েই আর্টিকেল ৯ জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।”

এমনকি আবের সমর্থকেরাও স্বীকার করেন যে তিনি ছিলেন একজন ‘অসম্পূর্ণ’ উত্তরাধিকার।

ছবি: রয়টার্স

শিনজো আবের দল এলডিপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে। আর আবের মৃত্যুর দুই দিন পর অনুষ্ঠিত উচ্চকক্ষের নির্বাচনেও এই জোটের আসন বেড়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একটি ডানপন্থি দল ইশিন নো কাই উচ্চকক্ষের এই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয়ী হয়েছে। তারা ক্ষমতাসীন জোটের শরিক না হলেও সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসকে সমর্থন করে এবং এ নিয়ে ভোট হলে এর পক্ষেই তারা ভোট দেবে বলে ধারণা করা যায়।

এই ভোট আবের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে আরও মজবুত করে তুলবে।

কিছু বিষয়ের বিবেচনায় আবে তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর রাশিয়ার ইউক্রেইনে আগ্রাসন ঘটেছে এবং তাইওয়ানের বিষয়ে চীনের মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সেনকাকু দ্বীপের (চীনও যার মালিকানা দাবি করে আসছে) চারপাশে জাপানের নিয়ন্ত্রিত জলসীমায় চীনের ক্রমাগত অনুপ্রবেশ এবং তাইওয়ান ঘিরে চীনের বিমান ও নৌ তৎপরতায় জাপান এখন উদ্বিগ্ন।

জাপানের সর্বদক্ষিণের সমুদ্রসীমা থেকে তাইওয়ানের জলসীমা মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে। তাই জাপানের আশঙ্কা, তাইওয়ান ঘিরে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়বে। আর জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক ঘাঁটি থাকায় তা জাপানকেও সরাসরি প্রভাবিত করবে।

এই সবকিছু একত্রিত হয়ে জাপানের জনমতে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এখন সেদেশে জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ অংশই সামরিক খাতে খরচ বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছেন।

সম্ভবত আর্টিকেল ৯ নিয়ে জাপানে কথা বলার সময় অবশেষে এসে গেছে, এভাবেই প্রতিবেদনের যবনিকা টেনেছে বিবিসি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক