যেভাবে বিদায় হতে পারে জনসনের

যুক্তরাজ্যে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের পদত্যাগ বরিস জনসনের জন্য ধাক্কা হয়ে এলেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসা নতুন অর্থমন্ত্রীসহ পদত্যাগীদের জায়গা নতুনদের দিয়ে মাঝ সাগরে খাবি খাওয়া নৌকাকে আপাতত স্থিতিশীল করা গেছে এমনটা দেখাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 July 2022, 08:28 AM
Updated : 7 July 2022, 08:28 AM

বৃহস্পতিবার সকালেও আরও অন্তত ছয় মন্ত্রীর পদত্যাগের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রভাবশালী সদস্য এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বা অনাস্থার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, মাত্রই কিছুদিন আগে দলে নেতৃত্বের পরীক্ষায় টিকে যাওয়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্য এখন সুতোয় ঝুলছে।

তবে তার মিত্ররা আশাবাদী; বুধবারও তারা বলেছেন, অনেকে জল ঘোলা করার চেষ্টা করলেও প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত এই ঝড় মোকাবেলা করতে সক্ষম হবেন। জনসন নিজেও তার পদত্যাগের দাবি সপাটে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

৫৮ বছর বয়সী ক্ষ্যাপাটে রাজনীতিবিদ জনসনের প্রধানমন্ত্রীত্ব এরপরও কীভাবে যেতে পারে তার কিছু সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছে বিবিসি।

আরও পদত্যাগ

প্রথম যা হতে পারে, তা হল সরকারের আরও আরও দায়িত্বশীল সদস্যদের পদত্যাগ।

মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দিয়ে ঝড়ের শুরু। সাজিদ জাভিদ আর  ঋষি সুনাকের দেখাদেখি দায়িত্ব ছেড়ে দেন শিক্ষামন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ আরও অনেক মন্ত্রী।

বুধবার সকাল পর্যন্ত পদত্যাগের এই জোয়ারে সামিল হন অনেক জুনিয়র মন্ত্রী এবং জনসনের সহযোগীরাও। এদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত কিছু নামও আছে, যারা জনসনের ব্যাপক অনুগত বলেই মনে করা হচ্ছিল। তাদের এই পদত্যাগ প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ আরও বাড়াবে।

অবশ্য ডাউনিং স্ট্রিট জোর দিয়ে বলছে, পদত্যাগের সংখ্যা আরও বাড়লেও তা সরকারের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হবে বলে মনে করছে না তারা।

পদত্যাগীদের শূন্যপদ পূরণে বেশ বেগ পেতে হবে ডাউনিং স্ট্রিটকে, এদিকে যারা এখনও মন্ত্রীপদে আছেন, তারে সবাই যে জনসনের প্রতি অনুগত এমনটাও নয়।

প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানানো এমন অনেক মন্ত্রী আছেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে সরে যেতে অনুরোধ করতে পারেন বলে জানতে পেরেছে বিবিসি।

কিন্তু এরপরও যদি জনসন পদ আঁকড়ে থাকেন, তাহলে পদত্যাগকারীদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সেসময় পরিস্থিতি তার হাতছাড়া হয়েও যেতে পারে।

জনসনের জন্য আরেকটা দুশ্চিন্তার কারণ হচ্ছে, দলে তার অনুগত অনেকেই এখন পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন দৌড়ে এগিয়ে থাকার লক্ষ্যে ডাউনিং স্ট্রিটের সঙ্গে খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখাকেই নিরাপদ মনে করতে পারেন।

জনসনের পর পরবর্তী নেতা হিসেবে নাদিম জাহাউইয়ের নাম জোরেশোরেই আলোচনায় ছিল; কিন্তু চলতি সপ্তাহেই তিনি চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ পেয়েছেন, যা অনেকেই ভালো চোখে দেখছে না।

এক মন্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন, জনসনের মন্ত্রিসভার সদস্য হয়ে নাদিম নিজেই ‘নিজেকে কলুষিত’ করেছেন।

আরেকটি আস্থাভোট

ধরা যাক, পদত্যাগের পর পদত্যাগও জনসনকে টলাতে পারল না। সেক্ষেত্রে আগামী সপ্তাহে হতে যাওয়া কনজারভেটিভ পার্লামেন্টারি গ্রুপ ১৯২২ কমিটির ব্যাকবেঞ্চের নির্বাচনের দিকে সবার চোখ থাকবে।

নেতৃত্ব ঠিক করার নিয়ম পরিবর্তনে আগ্রহী এমপিরা যদি ওই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যান, তাহলেই বিপাকে পড়বেন জনসন।

কনজারভেটিভ দলের এখনকার নিয়ম অনুযায়ী, শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আস্থা ভোট হওয়ার তাতে তিনি টিকে গেলে পরবর্তী ১২ মাস তার বিরুদ্ধে নতুন অনাস্থা আনা যায় না।

এ নিয়ম বদলাতেই জনসনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে থাকারা ১৯২২ কমিটির ওই ভোটে জিতে আসার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তবে তারা জিতে নিয়ম পরিবর্তন করলেও জনসনের বিরুদ্ধে আরেকটি আস্থা ভোট হতে হতে শরৎকাল (যুক্তরাজ্যে সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাস শরৎকাল) চলে আসতে পারে। এর আগেই প্রিভিলেজেস কমিটিকে প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে পার্লামেন্টকে বিভ্রান্ত করেছিলেন কিনা, তা জানাতে হবে।

এখন অবশ্য আলোচনা চলছে, নিয়ম পরিবর্তনের একদিন বা বড়জোর কয়েকদিনের মধ্যে যেন আস্থা ভোট আয়োজন করা যায়, তার ব্যবস্থা করতে।

আর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যদি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে চলে যায়, সেক্ষেত্রে এখনকার ১৯২২ নির্বাহী কমিটি চাইলে এই সপ্তাহের মধ্যেই নেতৃত্ব সংক্রান্ত নিয়ম বদলে ফেলতে পারে।

জনসন যদি আস্থাভোটে হারেন, তাহলে দলের নতুন নেতা হতে আগ্রহীদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে যাবে; সেক্ষেত্রে এমপিরা হয়তো অগাস্ট শেষ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত লড়াই কোন দুইজনের মধ্যে হবে তা ঠিক করে ফেলতে পারবেন।

বিবিসি লিখেছে, নতুন কোনো আস্থাভোট হলে তাতে জনসনের উৎরে যাওয়ার যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

টোরি এমপিদের যে অংশ সর্বশেষ আস্থা ভোটেও জনসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তাদের একটি অংশ যে তার বিপক্ষে চলে যাবে, তার ইঙ্গিত পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিবিসি। 

ব্রেক্সিটের এক সমর্থক, যিনি এই কিছুকাল আগেও কট্টর বরিস সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনি বলেছেন, “এক উপায়েই (জনসনের বিদায়) এটি শেষ হতে পারে। আমি চাই না এটি শরৎ পর্যন্ত চলুক।”

আগাম নির্বাচন

আরও একটি সম্ভাবনা আছে।

১৯২২ কমিটির চেয়ারম্যান গ্রাহাম ব্র্যাডি রূপক অর্থে হলেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একগাদা অনাস্থার চিঠি বগলদাবা করে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে জনসনকে বলতে পারেন, নেতৃত্বের নিয়ম বদলাচ্ছে, নতুন আস্থাভোটে তার পরাজয়ও সুনিশ্চিত। তাই, অন্যরা তাকে বাধ্য করার আগে তারই উচিত পদ ছেড়ে দেওয়া।

এ কথা শোনার পর জনসন বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন চাইতে পারেন।

ডাউনিং স্ট্রিটের কোনো কর্মকর্তাই এই সম্ভাবনার কথা মুখ ফুটে না বললেও আশপাশে কানাঘুষা একেবারে কমও হচ্ছে না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক