ভারতে মোদীর সমালোচক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার

চার বছর আগের একটি টুইটের জের ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কট্টর সমালোচক এক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যিনি দেশটির ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট ‘অল্টনিউজ’ এর সহপ্রতিষ্ঠাতা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 June 2022, 02:03 PM
Updated : 28 June 2022, 02:03 PM

বিবিসি জানায়, মোহাম্মদ জুবাইর ২০১৮ সালে টুইটারে নিজের একাউন্টে একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। যেটি হিন্দুদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে’ বলে সম্প্রতি এক টুইটার ব্যবহারকারীর দাবির ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ সোমবার তাকে গ্রেপ্তার করে।

জুবাইরকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেছেন ভারতের বিরোধীদলগুলোর নেতা এবং সমাজকর্মীরা। তারা বলেন, সমাজে বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের মুখোশ যারা খুলে দিচ্ছেন ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার তাদের কঠোর হাতে দমন করতে চায়। এ ঘটনা তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

সম্প্রতি ভারতে একটি টেলিভিশন বিতর্কে নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা নূপুর শর্মা।

টুইটারে নূপুরের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন জুবাইর। তার টুইট ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়। নূপুর কাণ্ডের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে কয়েকটি মুসলিম দেশ। যার জেরে বিজেপি নূপুরকে দলীয় মুখপাত্রের পদ থেকে বরখাস্ত করে।

নূপুর কাণ্ডের পর হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা জুবাইরের অতীতের টুইট সামনে নিয়ে আসে এবং দাবি করে, ওইসব টুইট তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। এজন্য তারা জুবাইরের বিচার দাবি করেছেন।

কে এই জুবাইর ?

ভারতের সুপরিচিত সাংবাদিক মোহাম্মদ জুবাইর ২০১৭ সালে সাবেক প্রকৌশলী প্রতীক সিনহার সঙ্গে মিলে ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট ‘অল্টনিউজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ভারতে ভুয়া খবর এবং ভুল তথ্যের খবরের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে কাজ করে দ্রুতই সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অল্টনিউজ।

টুইটারে জুবাইরের পাঁচ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। তাই অল্টনিউজের কোনও খবর জুবাইর তার টুইটার একাউন্টে শেয়ার করলে দ্রুতই তা ভাইরাল হয়ে পড়ত।

বিদ্বেষ জড়ানো বক্তব্যের উপর বাজপাখির মত নজর রাখার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। তার টুইটে বিজেপি সমর্থকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মন্তব্য করত।

যে কারণে গ্রেপ্তার হন জুবাইর:

দিল্লি পুলিশের বরাত দিয়ে এএনআই ‍জানায়, একজন টুইটার ব্যবহারকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে জুবাইরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ওই টুইটার ব্যবহারকারীর অভিযোগ, হিন্দুদের দেবতা হনুমানের নামে একটি হোটেলের নাম রাখার কথা বলে ২০১৮ সালে একটি টুইট করেন জুবাইর। যার মাধ্যমে তিনি হিন্দুদের অপমান করেছেন।

পুলিশ বলেছে, তাদের তদন্তে জুবাইরের ‘সন্দেহজনক’ আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে কারণে তাকে ‘পুলিশের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ’ করা হবে।

জুবাইরকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায় তখন প্রতীক সিনহাও তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বিবিসি-কে বলেন, যখন জুবাইরকে গ্রেপ্তার করা হয় তখন তিনি ‍বা জুবাইর কারো আইনজীবীকেই পুলিশ অভিযোগপত্রের কোনও কপি দেয়নি।

এমনকী আটকের পর তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে প্রাথমিকভাবে সেটাও জানানো হয়নি। পরে সোমবার রাতে জুবাইরকে দিল্লির স্থানীয় একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

আদালত তাকে একদিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে। এরপর তাকে তার আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হবে। অনেক সাংবাদিক এবং সমাজকর্মী অবিলম্বে জুবাইরের মুক্তি দাবি করেছেন।

সাংবাদিক রানা আইয়ুব বলেন, ‘‘জুবাইর নিয়মিত ভুয়া খবর ফাঁস করে দিতেন। ভারতে বিদ্বেষ ছড়ানো চক্রের মুখোশ খুলে দিতেন তিনি। এ জন্যই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশের অধঃপতন নিয়ে যারা লিখছেন ও তথ্য সংগ্রহ করছেন, তাদের শাস্তি দিচ্ছে সরকার।”

বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধী এক টুইটে বলেছেন, “যারাই বিজেপির বিদ্বেষ, ধর্মান্ধতা ও মিথ্যা নিয়ে বলছে,  তারাই তাদের কাছে হুমকি হয়ে উঠছে। একজন সত্যবাদীকে গ্রেপ্তার কেবল হাজারো সত্যবাদীর জন্ম দেবে।”

জুবাইরের টুইটে কী ছিল ?

পুলিশ জানায়, ২০১৮ সালে সাংবাদিক জুবাইর একটি হোটেলের সাইনবোর্ডের ছবি শেয়ার করেন। সাইনবোর্ডে হোটেলের নাম ‘হানিমুন হোটেল’ পরিবর্তন করে ‘হনুমান হোটেল’ দেখানো হয়।

ছবিটি মূলত ১৯৮৩ সালে বলিউডে মুক্তি পাওয়া একটি কমেডি সিনেমা থেকে নেওয়া ছবি। যেটির পরিচালক ছিলেন ঋষিকেশ মুখার্জি।

কিন্তু হুনমান ভক্ত নামে একটি টুইটার একাউন্ট থেকে সম্প্রতি চার বছরের পুরাতন ওই টুইটটি শেয়ার করে বলা হয় এটা হিন্দুদের ‘সরাসরি অপমান করা’।

ওই একাউন্ট থেকে দিল্লি পুলিশকে ট্যাগ করে দ্রুত জুবাইরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানও জানানো হয়।

অজ্ঞাত ওই একাউন্টটি গত বছর অক্টোবরে খোলা। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত যে একাউন্টের অনুসারী ছিলেন মাত্র একজন। জুবাইরের খবর প্রকাশের পর অনুসারির সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে একদিনের দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক