সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট নিয়ে ধোঁয়াশা

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নতুন ইসলামিক জোটের ঘোষণাকে পশ্চিমারা স্বাগত জানালেও এর ভূমিকা কী হবে এবং যাদের নিয়ে জোট ঘোষণা হয়েছে তারা কি আসলে এতে থাকছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Dec 2015, 07:37 PM
Updated : 16 Dec 2015, 07:45 PM

বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জঙ্গি দমনে আন্তরিকতা নিয়ে রিয়াদ যে সমালোচনার মুখে পড়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই জোটের ঘোষণা কাজ দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টারের কথায় এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট।

“এই জোট নিয়ে সৌদি আরবের মনে আসলে কী আছে তা আমরা বুঝতে চাইছি,” মঙ্গলবার বলেন তিনি।

জোটে যেসব দেশের নাম ঘোষণা করা হয়েছে তাদের বেশ কয়েকটি থেকে ভিন্ন বক্তব্য এসেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মেদ বিন সালমান মধ্যরাতে আকস্মিক সংবাদ সম্মেলনে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দেওয়ার সময় একে ‘ইসলামিক সামরিক জোট’ বলেছিলেন, যাতে অংশীদার অনেক দেশ বিস্মিত হয়েছে।

সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও এই জোটকে বলা হয়েছে ‘ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেরোরিজম’, যার ‘যৌথ অপারেশন সেন্টার’ হবে রিয়াদে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং কৌশল প্রণয়নের কাজ ওই অপারেশন সেন্টার থেকেই হবে। জাতিসংঘ সনদ, ওআইসি সনদ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সনদ ও চুক্তি অনুসরণ করেই পরিচালিত হবে এর কার্যক্রম।   

“নিরপরাধ মানুষকে সন্ত্রস্ত করার এবং বিশ্বে মৃত্যু ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা যারাই করবে, তাদের নাম বা মতবাদ যাই হোক না কেন, সেই অশুভ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ রক্ষায় নিয়োজিত থাকবে এই জোট।”  

৩৪ দেশের ওই জোটে সৌদি আরবের পাশাপাশি বাংলাদেশ, বাহরাইন, বেনিন, শাদ, কোমোরোস, আইভরি কোস্ট, জিবুতি, মিশর, গ্যাবন, গায়না, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মালি, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, নাইজার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, কাতার, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, সুদান, টোগো, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, আরব আমিরাত ও ইয়েমেনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে পাকিস্তানের সিনেটর শেহার কামরান বলেছেন, জোটের ঘোষণার খবরটি রয়টার্সের ফোন পেয়ে প্রথম শোনেন তিনি। পাকিস্তান সিনেট ডিফেন্স কমিটির এই সদস্য কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন।

“আমি এখনও এ বিষয়ক সংবাদও দেখিনি।”

সিনেট বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি রয়টার্সকে বলেন, “না, এখনও হয়নি।”

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আইজাজ চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, জোটে ইসলামাবাদের থাকার কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন এবং রিয়াদের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইছেন।

অন্যদিকে সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরমানাথা নাসির বলেছেন, গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দফায় তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে ‘চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমন্বয়ের জন্য একটি কেন্দ্রে’ যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন।

এই গ্রুপে জাকার্তা যোগ দেবে কি না সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “সৌদি আরব যার ঘোষণা দিয়েছে তা সামরিক জোট,.... এটাকে সমর্থনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইন্দোনেশিয়ার জন্য এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাটা গুরুত্বপূর্ণ।”

পরে ইন্দোনেশিয়ার চিফ সিকিউরিটি মিনিস্টার লুহুত পান্দাইজান বলেন, “আমরা কোনো সামরিক জোটে যোগ দিতে চাই না।”

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম ও রাজনীতিক অভিযোগ করেছেন, সামরিকভাবে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের ধ্বংসে বা এই জঙ্গিদের আদর্শ নির্মূলে সৌদি আরবের কার্যকর পদক্ষেপ দেখছেন না তারা।

জঙ্গিবাদের উত্থানের পিছনে সৌদি আরবের ওয়াহাবি মতবাদকে দায়ী করার পাশাপাশি তারা বলছেন, জঙ্গি দমনে আরও সামরিক শক্তি মোতায়েনের বদলে ইয়েমেনে তাদের যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, জঙ্গিবাদের হুমকিকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।

তবে আইএসস  সমর্থকদের কারাগারে পাঠানো, জিহাদিদের বিরুদ্ধে শীর্ষ ধর্মীয় নেতাদের কাজে লাগানো, সিরিয়ায় আইএসবিরোধী বিমান হামলায় অংশগ্রহণ এবং জঙ্গিদের অর্থায়নের চ্যানেলগুলো বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজের বিষয় তুলে ধরে এই অভিযোগ নাকচ করে আসছে সৌদি আরব।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল বিন আহমেদ আল-জুবাইর মঙ্গলবার বলেছেন, “চরমপন্থা ও দায়েশ (আইএস) নিয়ে সৌদি আরব ইউরোপ এবং বিশেষ করে ফ্রান্সে সমালোচিত হচ্ছে। আমি মনে করি প্রকৃত ঘটনা না জানায় এটা করা হচ্ছে।”

তবে রিয়াদে বিদেশি কূটনীতিকরা বলছেন, সিরিয়ার চেয়ে ইয়েমেনে সৌদি আরবের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পিছনে প্রতিবেশী দেশটিতে চলমান গৃহযুদ্ধ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি ইসলামিক স্টেট দমনে যে কৌশল নেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে তাদের মতভিন্নতাও কাজ করছে।