কর্মীদের কল্যাণের যে মন্ত্র অ্যাপলের পাঁচশ কোটি ডলারের অফিসে

স্টিভ জবস ‘অ্যাপল পার্ক’-এর নকশা করেছিলেন কোম্পানির সদর দপ্তরকে উদ্ভাবনী শক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। পাঁচশ কোটি ডলার খরচ করে নির্মিত অফিসের চোখ ধাঁধানো উপস্থিতির বাইরেও আছে বেশ কিছু ছোট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট যা অফিস নিয়ে কর্মীদের পরিতৃপ্তি, সুস্বাস্থ্য আর সার্বিক সুখ বাড়ায় না, অফিসের বাইরেও কর্মীদের জীবনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 June 2022, 01:03 PM
Updated : 27 June 2022, 01:03 PM

অ্যাপল পার্কে জবসের সবচেয়ে পছন্দের জায়গাগুলোর একটি ছিল ১০ হাজার বর্গফুটের ফিটনেস সেন্টার। তবে এর গুরুত্ব এর জাঁকজমক বা ব্যয়বহুল ডিজাইনে নয়, কর্মীদের জীবন কতোটা সহজ করে দেয় সে প্রশ্নে।

আর এর অনুকরণে নিজস্ব ফিটনেস বানাতে ব্যাপক খরচ করতে হবে, বিষয়টি এমনও নয়। একেবারেই খরচ না করে একই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট ইনকর্পোরেটেড ডটকমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয়।

অফিসেই পুরোদস্তুর জিম থাকার বিষয়টি আকর্ষণীয় শোনালেও, বাস্তবতা হচ্ছে সারা দিনের কাজের শেষে অফিসেই শরীর চর্চা অথবা সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহ থাকে না অনেকেরই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা কর্মীদের আরও ভালো রাখার চেষ্টা বন্ধ করে দেবেন।

সহকর্মীদের সঙ্গে বড় জিমে শরীরচর্চার বদলে অফিসেই আলাদা করে ছোট একটু জায়গায় নিজের মতো ব্যায়াম করার সুযোগ পেলে তাতেই বেশি খুশি হবেন কর্মীরা। আর অ্যাপল পার্কের নকশা করার সময় এই বিষয়টাই মাথার রেখেছিলেন স্টিভ জবস। 

আর নয় ৯টা-৫টা!

ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গা বসে কাজ করা যে শরীরের জন্য ভালো কিছু নয়– সে বিষয়ে আর বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও হালের দুনিয়ায় দিনের বেশিরভাগ সময় বসেই কেটে যায় বেশিরভাগ মানুষের। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বসে থাকেন ১০ ঘণ্টা। আর বাংলাদেশে? ঢাকা শহরে যারা কাজ করেন, তারা পথের জ্যামে বসে থাকার সময়টিও যোগ করে নিতে পারেন এর সংগে।

দীর্ঘ সময় বসে থাকা যে বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি, তা এখন বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত। আর এর সমাধান- সারা দিনের কাজের সময়টাকে কয়েক অংশে ভাগ করে ফেলা।

শরীরচর্চা মানব মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যও ভালো রাখে, একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে এটি। শরীরচর্চায় উদ্দীপ্ত মস্তিষ্ক দেহে এনড্রোফিন, সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো হরমোন ছড়িয়ে দেয়। মানুষের সুখের অনুভূতিও হয় ওই হরমোনগুলোর কারণে।

কেবল শরীরচর্চা করেই নয়, মেডিটেশন বা ধ্যানে স্থির বসে থাকার ফলেও মস্তিষ্ক দেহে এনড্রোফিন ছড়িয়ে দেয়– এটাও প্রমাণিত।

কর্মস্থলের জন্য তাই শরীরচর্চার নতুন কৌশল

কর্মস্থলের জন্য তাই এখন ‘মাইক্রো-ওয়ার্কআউট’-এর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। টানা কয়েক ঘণ্টা ব্যায়ামের বদলে কাজের ফাঁকে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য শরীরচর্চা করে নেওয়ার কৌশলই ‘মাইক্রো-ওয়ার্কআউট’। একুশ শতকে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করার পর উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আর যথেষ্ট নয়, চাই উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শারীরিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার সক্ষমতা।

স্বাস্থ্য ও ফিটনেস বিষয়ক ওয়েবসাইট লিভস্ট্রংয়ের প্রতিবেদন বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যায়াম আর কাজের ফাঁকে ‘মাইক্রো-ওয়ার্কআউট’-এর ফলাফল প্রায় একই। বিশেষ করে দিনে আট ঘণ্টা একই চেয়ারে বসে থাকার কথা বিবেচনায় নিলে– নির্দিষ্ট সময় পরপর কাজ থেকে উঠে ব্যায়াম বিরতিতে কেবল নিজের আয়ুই বাড়ে না, মানসিক প্রশান্তি আসে কর্মীর মনে; পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যম খুঁজে পান কর্মী।

ছোট জায়গার বড় প্রভাব

অফিসে একটিা পুরোদস্তুর ফিটনেস সেন্টার বানানো বেশ ব্যয়বহুল বিষয়। নিজের অফিসে পুরো জিম থাকার ভাবনাটি বেশ ভালো লাগলেও বাস্তবতা হচ্ছে, তাতে পা পড়বে না সিংহভাগ কর্মীর।

নিজের অফিসেই জিম থাকলেও তাতে আগ্রহ দেখান না কর্মীদের বেশিরভাগ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবার চেয়ে আলাদা হয়ে নিজের মতো ব্যায়াম করে নেওয়ার জন্য ছোট একটা জায়গা পেলেই তাতেই মানুষের আগ্রহ বেশি। এক্ষেত্রে ব্যায়াম করার জন্য জায়গার চেয়ে আসলে ব্যক্তিগত গোপনতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সহকর্মীদের থেকে আলাদা হয়ে কিছুক্ষণের জন্য ইয়োগা করা, বা থেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু সহজ ব্যায়াম অথবা ইউটিউব ভিডিও দেখে ব্যায়াম করার মতো কাজগুলো আলাদা হয়ে করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশিরভাগ মানুষ।

সহকর্মীদের সামনে আত্মসচেতন বোধ করার বদলে নতুন উদ্যম নিয়ে কাজে মনোযোগ দিতে গোপনে নিজের মতো কিছু সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করেন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীরা।

কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন

দিন শেষে বিষয়টি যতোটা না ব্যয়বহুল ও বড় অফিসের, তার চেয়ে বেশি কর্মীদের প্রতি সহানুভূমিশীল হওয়ার, তাদের দেখভাল করার। এ ক্ষেত্রে কর্মীদের অফিসে ভালো থাকার বিষয়টি আরও উন্নত করার ব্যাপারে ভাবতে হবে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরই।

অফিসে বাড়তি জায়গা নাই থাকতে পারে, হয়তো সবাই অফিসের বাইরে দূরে কোথাও বসে কাজ করছেন; এমন পরিস্থিতিতে কাজের ফাঁকে কর্মীদের কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে বলাও বড় ধরনের ইতাবচক প্রভাব ফেলতে পারে কর্মীদের স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থার ওপর।

অফিসে শরীরচর্চার জায়গা দেওয়া অথবা অফিসে বাইরে থাকা কর্মীকে কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নিতে বলার মতো বিষয়গুলোই প্রতিষ্ঠান ও কর্মী দুই পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করে চোখ ধাঁধানো কিছু নির্মাণ করা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সহকর্মীকে আর বাকি সবার মতোই একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের সার্বিক ভালো মন্দ মাথায় রেখে কাজ করা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক