চার দিনে ১৮ টুইটে লেবেল, স্ব-চরিত্রেই ডনাল্ড ট্রাম্প

নভেম্বরের তিন তারিখ মার্কিন নির্বাচনে রায় দিয়েছেন দেশটির ভোটাররা। ডনাল্ড ট্রাম্পের বদলে জো বাইডেনের দিকেই ঝুঁকেছে দেশটির ইলেকটোরাল কলেজের কাঁটা। ফলে সাবেক এই ভাইস প্রেসিডেন্টের কাঁধেই চার বছর থাকছে দেশটির নেতৃত্ব।

আজরাফ আল মূতীবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Nov 2020, 09:48 AM
Updated : 9 Nov 2020, 09:48 AM

একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচনে আসা ফলাফল মানতে নারাজ ট্রাম্প। কেবল গণমাধ্যম নয়, ডনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে সচল যে 'কণ্ঠ' সেই টুইটার ব্যবহার করেও ক্রমাগত ঝাল ঝাড়ছেন গত চার বছরে প্রায় ১৮ হাজার মিথ্যা বলা দেশটির ৪৫তম প্রেসিডেন্ট। তার হিসেবে, "নির্বাচনটি চুরি হয়ে গিয়েছে", ভোট তিনি-ই বেশি পেয়েছেন, এবং আইনি লড়াইয়েই মিলবে এ সমস্যার সমাধান।

গায়ের জোরে বিভিন্ন দাবি চালিয়ে যাওয়া ট্রাম্প টুইটারেও বজায় রেখেছেন স্ব-চরিত্র। আর এতেই ঘটছে বিপত্তি। ট্রাম্পের শেষ ৫০টি টুইট ঘাঁটলেই দেখা যাচ্ছে, একের পর এক ফক্স নিউজের ভিডিও প্রতিবেদন ও অনির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবর টুইট/রিটুইট করে যাচ্ছেন তিনি। এমনকি নিজের লেখা অধিকাংশ টুইটেও ভুল তথ্য দিচ্ছেন দেশটির ৪৫তম  প্রেসিডেন্ট।

ডনাল্ড ট্রাম্পের অনেক টুইটে এরই মধ্যে লেবেল জুড়ে দিয়েছে টুইটার। সবমিলিয়ে টুইটার এতো বেশি লেবেল জুড়েছে যে তা অতীতের যে কোনো সময়কেই হার মানায়।

সময়ের হিসাবে মাত্র চার দিনের ব্যবধানেই টুইটারে অন্তত ১৮টি লেবেল 'অর্জন' করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে, এখনও প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তাকে “সংবাদযোগ্য ব্যক্তিত্ব” হিসেবে গণ্য করছে সামাজিক মাধ্যমটি, না হলে পদক্ষেপ হয়তো অন্যরকম হতো।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ট্রাম্পের শেষ ৫০টি টুইটের মধ্যে (রিটুইট বাদে) ব্রেইটবার্টের প্রতিবেদন রয়েছে ৩টি, ফক্স নিউজের ভিডিও প্রতিবেদন রয়েছে ১১টি। আর বাদবাকি ৩৬টি টুইট মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজের লেখা।

ট্রাম্পের নিজের লেখা ওই ৩৬টি টুইটের মধ্যে টুইটার লেবেল জুড়েছে ১৮টিতে। অন্যদিকে, তার সম্প্রতি শেয়ার করা ১১টি ফক্স নিউজ প্রতিবেদনের চারটিতে টুইটার সতর্কতা জুড়েছে। ভুল তথ্য এবং উস্কানিমূলক সংবাদ পরিবেশন করার কারণে আগে থেকেই ব্রেইটবার্ট সমালোচিত একটি সাইট।

সাইটটিকে ‘শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের প্ল্যাটফর্ম’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ব্রেইটবার্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ব্যানন নিজেই। ২০১৮ সালে ব্রেইটবার্টসহ মোট তিনটি সাইটকে ‘অনির্ভরযোগ্য সূত্র’ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল ‘মুক্ত বিশ্বকোষ’ উইকিপিডিয়া। কালো তালিকাভুক্তি হওয়া বাকি দুটি সাইট হল, ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘ডেইলি মেইল’ ও বামপন্থীদের সাইট ‘অকুপাই ডেমোক্রেটস।’

ট্রাম্পের টুইটার ফিডে মূলত তিন ধরনের লেবেল জুড়েছে টুইটার। এর একটি ধরনে শুধু সতর্কতা লেবেল, এতে লেখা-- “নির্বাচন জালিয়াতির এই দাবি বিতর্কিত”। ট্রাম্পের টুইটার ফিডে এ সতর্কতা লেবেলটি  ফক্স নিউজ প্রতিবেদনের বেলায় জুড়েছে টুইটার।

আরেক শ্রেণির সতর্কতা লেবেলে লেখা, “মেইল ইন ব্যালট কতটা নির্ভরযোগ্য তা জানুন” এবং “টুইট পোস্টের সময় পর্যন্ত নির্বাচন কর্মকর্তারা রায় দেননি।” এ সতর্কতা লেবেল দুটি ট্রাম্পের নিজেকে বিজয়ী দাবি ও মেইল-ইন-ব্যালট বা ডাকযোগের ভোট নিয়ে তোলা প্রশ্নের বেলায় জুড়েছে টুইটার।

তৃতীয় শ্রেণির লেবেলে লেখা, “এই টুইটে শেয়ার করা কিছু বা সব কনটেন্ট বিতর্কিত, যা নির্বাচন বা অন্য কোনো নাগরিক প্রক্রিয়াকে ভুল পথে পরিচালিত করছে।” এই ধাঁচের লেবেল সরাসরি ট্রাম্পের লেখা ১৮টি টুইটে জুড়ে দিয়েছে টুইটার।

লেবেল থাকা এই টুইটগুলো চোখের আড়ালও করে দিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি। টুইট দেখার জন্য লেবেলে ক্লিক করতে হচ্ছে। তখন টুইট দেখালেও উপরে এ লেবেল এবং নিচে সতর্কতা বার্তা দেখানো অব্যাহত রাখছে টুইটার।

এমন যে ঘটতে চলেছে সে অনুমান ছিল আগে থেকেই। আইন প্রণেতা ও মানবাধিকার দলগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের টুইটার অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। বৃহস্পতিবার ‘ল’ইয়ারস কমিটি ফর সিভিল রাইটস আন্ডার ল’ এবং তদারক দল ‘কমন ক'জ’ য়ৌথভাবে টুইটার প্রধান জ্যাক ডরসির উদ্দেশ্যে চিঠি লিখেছিলেন।

ওই চিঠিতে তারা বলেন, “আমাদের ভয় টুইটার এভাবে ব্যবস্থা না নিলে অনেকের সামনেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার  অখণ্ডতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন প্রেসিডেন্ট। এরকম মানুষের মধ্যে শুধু টুইটার ব্যবহারকারীরাই নন, অন্যান্য ভোটার ও জনগণ রয়েছেন, যারা ভোটদান ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বপন করে যাবেন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে সহিসংতায় সম্ভাব্য ইন্ধন যোগাবেন।”

অন্যদিকে, টুইটারের এক মুখপাত্রের ভাষ্য, “আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু টুইটে সতর্কতা ও লেবেল জুড়তে পারি, এনগেজমেন্ট কমিয়ে দিতে পারি। এই নীতি কাঠামো বর্তমান বিশ্ব নেতা ও প্রার্থীদের জন্য প্রযোজ্য, সাধারণ নাগরিক ও তারা যখন পদে থাকেন না, সে সময়ের জন্য প্রযোজ্য নয়।”

কয়েক দিন আগে এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানও মন্তব্য করেছে,  ট্রাম্প যেভাবে টুইটারের নিয়ম ভাঙেন, তা অব্যাহত থাকলে আগামীতে তার অ্যাকাউন্ট স্থগিত হয়ে যাবে।

ট্রাম্পের ‘ভেরিফাইড’ টুইটার অ্যাকাউন্ট (@realDonaldTrump) জানুয়ারির ২০ তারিখের আগ পর্যন্ত টুইটারের ‘সংবাদযোগ্য ব্যক্তিত্ব’ নীতি দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে। হিসেবে ওই দিন নতুন নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিতে হবে ট্রাম্পের।

মার্কিন রেওয়াজ অনুসারে, বিজয়ী প্রেসিডেন্টকে ফোনে অভিনন্দন জানিয়ে থাকেন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট।

সর্বশেষ সংবাদ বলছে, প্রথাগতভাবে বাইডেনকে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া, বা বাইডেনের সঙ্গে কথা বলারও কোনো সম্ভাবনা নেই ট্রাম্পের। সেরকম তথ্যই গণমাধ্যমকে দিয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনরা।

জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের প্রচার শিবিরের উপ-ব্যবস্থাপক কেট বেনিংফিল্ড শনিবার রাতেই বলেছেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাইডেনের সঙ্গে ট্রাম্পের কোনও কথা কিংবা যোগাযোগ হয়নি। এমনকি দুইপক্ষের প্রচার শিবিরের প্রতিনিধিদের মধ্যেও কোনো কথাবার্তা হয়নি।

এমন অবস্থায় আশঙ্কা রয়েছে, ট্রাম্প ওভাল অফিস আঁকড়ে বসে থাকলে তাকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারে সিক্রেট সার্ভিস। অন্তত সাম্প্রতিক এক সিএনএন প্রতিবেদন সে কথাই বলছে। সিক্রেট সার্ভিস অবশ্য তেমন কোনো পরিকল্পনার খবর এখনও জানায়নি।

এ বছরের ১৪ এপ্রিল মার্কিন দৈনিক ওংয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন জানিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোট ১১৭০ দিনে প্রায় ১৮ হাজার বার  মিথ্যাচার করেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প।

এতোদিন টুইটারে নিজের মতো করে পোস্ট দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু এ বছরেই সে হিসেব ঘুরে যায় মে মাস থেকে। তার টুইটে ‘সত্যতা যাচাই লেবেল’ জুড়ে দেওয়া শুরু করে টুইটার। সে লড়াই এখন এসে আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব মহলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এক অর্থে তার স্বাক্ষ্যই যেন দিচ্ছে ট্রাম্পের টুইটার ফিডের শেষ ৫০টি টুইট।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক