প্রযুক্তিখাতে এমবিএ-দের আদ্যপান্ত

বর্তমানে ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট শিক্ষার্থী সংখ্যার এক-পঞ্চমাংশই প্রযুক্তিক্ষেত্রের দিকে ঝুঁকছে। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক কিছু সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইফতেখার আহমেদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 March 2016, 08:48 PM
Updated : 22 March 2016, 08:48 PM

সম্প্রতি পেপাল-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল এমবিএ ডিগ্রিধারীদের ‘গৎবাঁধা চিন্তাধারা ও আচরণের’ অধিকারী বলে অভিহিত করেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী ফেইসবুকের চিফ অপারেটিং অফিসার শেরিল স্যান্ডবার্গ মন্তব্য করেন, তার অভিজ্ঞতা তাকে ব্যাপক সহায়তা দিলেও তিনি প্রযুক্তিক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নেতাদের জন্য এখনই এ ডিগ্রীকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে রাজি নন। তিনি বলেন, “ফেইসবুকের জন্য এমবিএ-এর প্রয়োজন নেই, এবং আমি মনে করি না প্রযুক্তিক্ষেত্রে কাজ করতে এর গুরুত্ব রয়েছে।”

সিলিকন ভ্যালির কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্যে এমবিএ ডিগ্রীধারীদের যতই তাচ্ছিল্য করা হোক না কেন, বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমবিএ ডিগ্রিধারীদের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। ব্লুমবার্গের বিজনেসউইক ম্যাগাজিন পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, এমবিএ নিয়োগের ক্ষেত্রে ফিন্যান্স এবং কনসাল্টিংয়ের পর প্রযুক্তিক্ষেত্র তৃতীয় অবস্থানে আছে।

৯০০০ এরও বেশি এমবিএ ডিগ্রিধারীর ওপর বিজনেসউইক-এর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমবিএ ডিগ্রীধারীদের পেছনে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর চাইতেও বেশি ব্যয় করে। একই বছরে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’র হ্যাস স্কুল অফ বিজনেস-এর ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীরই প্রযুক্তিক্ষেত্রে ঠাঁই হয়। প্রতিষ্ঠানটির ডিন রিচ লিয়ন্স বলেন, “এই দক্ষতা যদি গুরুত্বপূর্ণ না হতো, তবে আমাদের এমবিএ ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিতে প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার ফিরে আসতো না।”

বিজনেসউইক-এ ১০৩টি ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্যাবলী নিয়ে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এমবিএ নিয়োগকারী প্রথম ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, গুগল এবং আইবিএম-এর মতো নেতৃস্থানীয় টেক জায়ান্টগুলো। এতেই প্রমাণিত হয়, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যতোই নিজেদের 'বিপ্লবী' হিসেবে দেখুক না কেন, নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা এমবিএ ডিগ্রিধারী নিয়োগের উর্ধ্বে নয়। প্রযুক্তিক্ষেত্রে এমবিএ ডিগ্রিধারীদের এ চাহিদা একসময় ওয়াল স্ট্রিট-কে ও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন বোদ্ধারা।

এ ছাড়াও এসঅ্যান্ডপি ফাইভ হান্ড্রেড-এর তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪টিই এমবিএ বা সমপর্যায়ের ডিগ্রিধারীদের দ্বারা পরিচালিত। এদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাপলের সিইও টিম কুক (ডিউক'স ফুকুয়া স্কুল অফ বিজনেস) এবং মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা (শিকাগো'স বুথ স্কুল অফ বিজনেস)।

পেপাল-এর প্রথমদিককার একজন কর্মকর্তা এবং রিয়েল এস্টেট ওপেনডোর-এর প্রতিষ্ঠাতা কিথ র‌্যাবাইস কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এমবিএ ডিগ্রিধারীদের উপস্থিতিকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক পরিপূর্ণতার লক্ষণ হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানটি সফলভাবে দাঁড়ানোর পরই তারা নিয়োগ পায় এবং তা অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।"

এ ছাড়াও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে এমবিএ ডিগ্রিধারীদের কোনো জায়গা নেই, এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে সিলিকন ভ্যালিতে। ইউসিএলএ থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী অ্যাপলের প্রাক্তন কর্মকর্তা গাই কাওয়াসাকি তার নবপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে প্রতি প্রকৌশলীর জন্য ৫,০০,০০০ ডলার যোগ এবং প্রতি এমবিএ-এর জন্য ২,৫০,০০০ ডলার ছাঁটাই করেন।

এ প্রসংগে মিনাসোটার কার্লসন স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট-এর ডিন শ্রি যাহির বলেন, “উদ্যোক্তাদের এমবিএ-এর প্রয়োজন নেই, এ যুক্তি আমি মানতে রাজি নই। যদি তাদের ব্যবসায় লাভের ব্যাপারে আরেকটু বেশি ধারণা থাকতো, তবে আমাদের প্রতি বছর এতসব টেক বাবল আর উন্মাদনা দেখতে হতোনা।"

অন্যদিকে, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল-এর শিক্ষার্থী ডেভিড ফেয়ারব্যাংক পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ইউনিকর্ন নামে পরিচিত শতকোটি বা তার বেশি মূল্যের ১৫৭টি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪ শতাংশই এমবিএ ডিগ্রিধারীদের প্রতিষ্ঠিত।

এমবিএ ডিগ্রিধারীদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য সম্ভাব্য আবেদনকারীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে আশংকা করছে ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই মধ্যে এই ডিগ্রি আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। ২৬৫টি ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এএসিএসবি ইন্টারন্যাশনাল-এর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর হার ১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মানসিকতার এ পরিবর্তন সম্পর্কে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ডাব্লিউ পি ক্যারি স্কুল অফ বিজনেস-এর ডিন অ্যামি হিলম্যান বলেন, “একসময় প্রথমসারির ব্যবসায়ী নেতার কথা ভাবা হলে আসতো জ্যাক ওয়েলচ-এর নাম। আর তার জায়গা নিয়ে নিয়েছে জাকারবার্গ, আর স্নাতকোত্তর ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা বাস্তবিকপক্ষে ভিন্ন।"

বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা একটি ভালো উদ্যোগকে সফল ব্যবসায় পরিণত করতে সক্ষম এমন দক্ষতার সন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে তিনি জানান। এর ফলশ্রুতিতে এমবিএ ডিগ্রিধারীরা প্রযুক্তিক্ষেত্রে আরও অনেক সুযোগের সম্মুখীন হবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, "বর্তমানে একদল অত্যন্ত জটিল বিনিয়োগকারী রয়েছেন যার অত্যন্ত জটিল ব্যবসায়িক পরিকল্পনা খুঁজছেন।"