দেশের ক্রীড়াঙ্গন: সম্ভাবনার বছরে ভাইরাসের হানা

একের পর এক ইভেন্ট, ম্যাচ, টুর্নামেন্ট, বছর জুড়ে ব্যস্ততা, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক রোমাঞ্চের ডালি সাজানো ছিল এই বছর। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রকোপে মিলিয়ে গেছে সব। ঠাসা সূচির বছরেই ছিল টানা স্থবিরতা। সম্ভাব্য তুমুল ব্যস্ততার বছরে দেশের সব খেলাতেই পড়েছে লম্বা বিরতি। বছরের শুরু আর শেষে খেলা যেটুকু হয়েছে, তাতে ছিল সাফল্য-ব্যর্থতার মিশেল।

আরিফুল ইসলাম রনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 Dec 2020, 02:32 AM
Updated : 22 Dec 2020, 04:11 AM

ক্রিকেট

টেস্ট ম্যাচ বেশি খেলতে না পারা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের হাহাকার বরাবরের। সেদিক থেকে এবছরের সূচি ছিল আশীর্বাদের মতো। ১০টি টেস্ট খেলার কথা ছিল এবার। এক বছরে এত টেস্ট কখনোই খেলেনি বাংলাদেশ। কিন্তু বছর শেষে প্রাপ্তি মোটে ২ টেস্ট!

পাকিস্তান সফরে একটি, শ্রীলঙ্কা সফরে তিনটি, দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি করে টেস্ট ম্যাচ পিছিয়ে গেছে। পিছিয়ে যাওয়া বলতে বাস্তবে আসলে ভেস্তে যাওয়াই। এই ৮ টেস্টের মধ্যে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুটি বা তিনটি টেস্ট হয়তো ভবিষ্যতে আয়োজন করার কিছু সম্ভাবনা আছে। বাকিগুলোর আশা আর নেই বললেই চলে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা বা তিন টেস্টের সিরিজ খেলার সুযোগ খুব একটা হয় না বাংলাদেশের। সেদিক থেকে এই ক্ষতি প্রায় অপূরণীয়।

যে দুটি টেস্ট খেলতে পেরেছে বাংলাদেশ, প্রাপ্তি ছিল দুই রকম। পাকিস্তানে গিয়ে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে দল। দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ধরা দিয়েছে ইনিংস ব্যবধানে প্রত্যাশিত জয়।

সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও এ বছর ছিল খেলার মেলা। পাকিস্তান সফর ছিল, যুক্তরাজ্য সফরে আয়ার‍ল্যান্ডের বিপক্ষে ছিল তিনটি ওয়ানডে ও চারটি টি-টোয়েন্টি। এছাড়াও এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পিছিয়ে গেছে। পাকিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচগুলির ভবিষ্যত আপাতত কিছু নেই। এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ হবে আগামী বছর।

ওয়ানডে মাত্র তিনটি খেলতে পেরেছে বাংলাদেশ, ১৯৯৫ সালের পর এত কম ওয়ানডে খেলা হয়নি আর কোনো বছর। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিলেটে ওই তিন ম্যাচে প্রত্যাশিত জয়ও মেলে।

ওই সিরিজ দিয়ে শেষ হয় দেশের ক্রিকেটের গৌরবময় এক অধ্যায়ের। ওয়ানডের নেতৃত্বকে বিদায় জানান মাশরাফি বিন মুর্তজা। শেষ ম্যাচটি জিতে বাংলাদেশের সফলতম ওয়ানডে অধিনায়ক পূর্ণ করেন নেতৃত্বে ম্যাচ জয়ের ফিফটি। বিদায় বেলায় প্রেরণাদায়ী অধিনায়ককে কাঁধে তুলে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন সতীর্থরা।

ওই সিরিজে ছিল রেকর্ডের ছড়াছড়ি। দেশের হয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোরের নিজের রেকর্ড ভেঙে নতুন করে গড়েন তামিম ইকবাল। পরের ম্যাচেই সেই রেকর্ড নিজের করে নেন লিটন কুমার দাস। দুজনে গড়েন জুটির রেকর্ডও।

টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিল দুটি হার, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুটি জয়।

দেশের ক্রিকেটে আরেকটি বড় ইভেন্ট খেয়ে নিয়েছে কোভিড-১৯। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ব একাদশ ও অবশিষ্ট এশিয়া একাদশের দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল মার্চে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে। বিশ্ব ক্রিকেটে অনেক বড় তারকার খেলা নিশ্চিত হয়েছিল। সেটি আর আলোর মুখ দেখবে বলে মনে হয় না।

ঘরোয়া ক্রিকেটে মার্চে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কেবল এক রাউন্ড হয়েই স্থগিত হয়ে যায়। সেই আসর শুরু করা যায়নি এখনও। অনিশ্চিত প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগের মতো লিগগুলো।

মার্চের পর প্রতিযাগিতামূলক ক্রিকেট আবার মাঠে গড়ায় অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট’স কাপ দিয়ে। বিপিএল আয়োজন সম্ভব নয় বলে এরপর নভেম্বর-ডিসেম্বরে হয়ে গেল পাঁচ দল নিয়ে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ।

কিন্তু জাতীয় দল ও বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে অংশ নেওয়া ক্রিকেটারদের বাইরেও ক্রিকেটারদের অনেক বড় একটা অংশ এখনও ফিরতে পারেনি মাঠে। তাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে ঢাকার লিগ ক্রিকেট ও দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় খ্যাপ খেলে। তাদের জন্য এই বছর ছিল অভিশাপের মতো। সেই শাপ থেকে এখনও মুক্তি মেলেনি পুরোপুরি।

সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে দেশের ক্রিকেট মৌসুম পুরো দমে শুরু হয়ে যায়। জাতীয় লিগ, বিসিএলের মতো টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করা হয়। এবার এসব হয়নি কিছুই।

এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ দিয়ে আবার ক্রিকেটে ফেরেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন সাকিব আল হাসান।

বছরের নানা সময়ে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, মাহমুদউল্লাহ, মুমিনুল হক, আবু জায়েদ চৌধুরি, সাইফ হাসান, নাজমুল ইসলাম অপু, মাহমুদুল হাসান জয়সহ আরও কয়েকজন ক্রিকেটার।

বছরের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বড় এক অর্জন নিয়ে ফেরেন যুবারা। টানটান উত্তেজনার ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে দেশকে এনে দেন প্রথম অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শিরোপা।

নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ভালো কাটেনি বাংলাদেশের। গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ হেরে শূন্য হাতে বিদায় নেয় সালমা খাতুনের দল। নিউ জিল্যান্ডকে ৯১ রানে থামিয়ে আশা জাগিয়েছিল জয়ের কিন্তু ব্যাটিং ব্যর্থতায় ১৭ রানে হেরে যায় তারা।

টানা দ্বিতীয়বার ভারতের উইমেন্স টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জে খেলেন জাহানারা আলম। প্রথমবারের মতো অংশ নেন সালমা। অভিজ্ঞ এই অলরাউন্ডার ট্রেইলব্লেজার্সের শিরোপা জয়ে রাখেন দারুণ অবদান। ফাইনালে অসাধারণ বোলিংয়ে ১৮ রানে ৩ উইকেট নেন বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। টুর্নামেন্ট ভালো কাটে পেসার জাহানারারও।

গত জুনে ৭৯ বছর বয়সে পরপারে পাড়ি জমান দেশের ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনের অগ্রপথিক, কিংবদন্তি ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব রামচাঁদ গোয়ালা।

ফুটবল

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মিলিয়ে তিনটি প্রতিযোগিতা পুরোপুরি শেষ হতে পেরেছে এ বছর। জানুয়ারিতে হওয়া বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে সেমি-ফাইনাল থেকে ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ দল। ক্লাব পর্যায়ে হয়েছিল ফেডারেশন কাপ; সেখানে চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস। এরপর মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ হয়ে যায় খেলা।

১৫ মার্চ থেকে স্থগিত হয়ে যায় প্রিমিয়ার লিগ। পরে মে মাসে পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ২০১৯-২০ মৌসুমে ছেলেদের খেলাগুলো বাতিলই করে দেয়। শুধু মেয়েদের লিগ হয়েছে। শিরোপা জিতে নেয় বসুন্ধরা কিংস।

ক্লাব ফুটবলে টিসি স্পোর্টসকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে এএফসি কাপে দারুণ শুরু করেছিল বসুন্ধরা কিংসের ছেলেরা। কিন্তু পরে বন্ধ হয়ে যায় আসরটি।

মার্চ থেকে স্থগিত থাকা বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের বাছাই পরে ২০২০ সালে আর না আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা ও এএফসি। তবে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে গত ৪ ডিসেম্বর কাতারের মাঠে ফিরতি লেগের ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। ফল ছিল ভীষণ হতাশাজনক। ৫-০ গোলে হেরে ফিরতে হয় দলকে।

 বছরই হওয়ার কথা ছিল আফগানিস্তান, ভারত ও ওমানের বিপক্ষে ম্যাচ। সেগুলো পিছিয়ে চলে গেছে আগামী বছরে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা ছিল সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। কোভিডের কারণে এটিও মাঠে গড়াতে পারেনি।

কাতার ম্যাচের আগে নেপালের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেরে দেশে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচে ২-০ গোলে জয় পায় বাংলাদেশ, ড্র হয় পরের ম্যাচ। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতেও মাঠে দর্শক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় এই দুই ম্যাচে। ৮ হাজার দর্শক প্রবেশের কথা থাকলেও গ্যালারিতে দেখা যায় দ্বিগুনের মতো দর্শক। এটা নিয়ে সমালোচনা হয় তুমুল।

মেয়েদের ফুটবলের অবস্থা করুণ। ২০১৯ সালের মার্চে নেপালের সাফ ফুটবল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার পর থেকে মেলেনি আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ। লম্বা সময় খেলার বাইরে থাকার প্রভাব পড়েছে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া সর্বশেষ র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৪২ দলের মধ্যে ঠাঁই-ই মেলেনি সাবিনা-কৃষ্ণাদের।

দেশের ফুটবলে বড় আরেকটি ঘটনা ছিল এ বছর মাঠের বাইরে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনে জিতে টানা চতুর্থবারের মতো সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন হাজী সালাউদ্দিন। নানা কাণ্ডে ও মন্তব্যে বিভিন্ন সময়ে তার ব্যাপাক সমালোচনা ও নির্বাচনের আগে ‘সালাউদ্দিন হটাও’ ডাক উঠলেও নির্বাচনে তিনি বাজিমাত করেন ৯৪ ভোট পেয়ে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাদল রায় পান ৪০ ভোট।

নভেম্বরে সেই বাদল রায় চলে যান সবকিছুর উর্ধ্বে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সাবেক এই তারকা ফুটবলার।

বছরের শেষ নাগাদ কোভিডে আক্রান্ত হন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূইয়া।

অন্যান্য খেলা

করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বাকি খেলাগুলোতেও। হকিতে জুনে হওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধু এএইচএফ অনূর্ধ্ব-২১ ওয়ার্ল্ড কোয়ালিফাইং। তা পিছিয়ে গেছে আগামী বছরে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ২৫ দেশের সাইক্লিস্টদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিস্টাইল স্টান্ট সাইক্লিং শুরুর কথা ছিল। লোগো উন্মোচনও হয়েছিল এই আসরের। কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায় তা।

শুটিং ও দাবার কিছু ইভেন্ট অনলাইনে আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আর্চারি, সুইমিং, শুটিং, ভলিবলে উল্লেখযোগ্য কোনো ইভেন্টই ২০২০ সালে দেখেনি আলোর মুখ। 

সব মিলিয়ে ২০২০ ছিল ক্রীড়াঙ্গনের হতাশার এক বছর। করোনাভাইরাস যেখানে কেড়ে নিয়েছে দেশের হাজার হাজার মানুষকে, সেখানে খেলাধুলা বন্ধ থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় অবশ্যই। তবে ক্রীড়ার সার্বিক দিক থেকে বছরটি ভুলে যাওয়ার মতোই।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক