সাহাপাড়ার আগুনে অন্য ‘খেলা’ দেখছেন মাশরাফি

ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে লোহাগড়া উপজেলায় হিন্দু বাড়ি ও মন্দিরে হামলা-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ‘উল্টো খেলা’ দেখতে পাচ্ছেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা।

নড়াইল প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 July 2022, 05:05 AM
Updated : 18 July 2022, 10:12 AM

তার ধারণা, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিপদে ফেলার’, পাশাপাশি তাকেও ‘বিপদে ঠেলে দেওয়ার খেলা’য় মেতেছে একটি পক্ষ।

শুক্রবার রাতে দিঘলিয়ার সাহাপাড়ার ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা আগেও সক্রিয় ছিল এবং ‘পেছন থেকে আঘাত করছে’ বলে স্থানীয় এই এমপির ভাষ্য। 

ক্রিকেট মাঠ থেকে রাজনীতিতে আসা জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক ওই পক্ষটিকে ‘মানুষের ক্ষতি না করে’ তার সঙ্গে সামনাসামনি লড়াইয়ে আসার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। 

রোববার এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “যাক, আপনারা সব তো করলেন। এবার আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ, পেছন থেকে আঘাত করতে করতে আপনারা ক্লান্ত হয়ে যাবেন। তো আসুন, সামনে থেকে আঘাত করুন। আমার সঙ্গে সরাসরি লড়াই করুন। আমি সাধুবাদ জানাব।

“কিন্তু আমাকে ভোগানোর জন্য দয়া করে সাধারণ ও অসহায় মানুষদের আর ক্ষতি করবেন না। মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিন, লড়াই আমার সঙ্গে করুন।”

কাদের কথা বলছেন- জানতে চাইলে সোমবার সকালে তরুণ সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেন, “আমি বিষয়টি নিয়ে ওভারঅল বলেছি।”  

এক তরুণের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নড়াইলের মির্জাপুরে এক অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর খবরে বেশ কিছু দিন ধরে আলোচনার মধ্যে শুক্রবার রাতে সাহাপাড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, আকাশ সাহা নামে এক কলেজ ছাত্রের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দীঘলিয়ায় শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তার গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে তাদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন।

বিকালে উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং সন্ধ্যায় তারা সাহাপাড়ার কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করে। পরে টিনের কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পরদিন শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সংসদ সদস্য মাশরাফি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও মন্দিরের পুরোহিতদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সব ধরনের নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। তিনি এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও রাখেন।

এরপর রোববার রাতে ফেইসবুকে ওই পোস্টে মাশরাফি পুরনো একটি ঘটনার প্রসঙ্গ ধরে ইঙ্গিত করেন, তার নির্বাচনী এলাকায় এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাকে ‘বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া’।

নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় পুলিশের উপস্থিতিতে জুতার মালা পরানোর ঘটনাও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।

মাশরাফি লিখেছেন, “এমনকি, কিছুদিন আগে মির্জাপুরে সম্মানিত একজন শিক্ষককে অপমানের ঘটনায়ও আমাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, অথচ ওটা আমার নির্বাচনী আসনের ভেতরই নয়।”

নড়াইলের এই সংসদ সদস্য সরাসরি কারো নাম বলেননি। তার ভাষায়, তিনি ‘বোঝার চেষ্টা করছেন’ আর কতদিক থেকে ‘আক্রমণ হতে পারে’।    

“তারা প্রথম ঝামেলা করল মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে। তাকে যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞা দিল, ঠিক সেই সময় তাকে ওয়াজ করার জন্য নড়াইলে আমন্ত্রণ জানানো হল।

“নিয়ম অনুযায়ী, যখন ওয়াজ মাহফিল হয়, সেটার পারমিশন দিয়ে থাকে জেলা প্রশাসন, নিরাপত্তার ব্যাপার দেখেন পুলিশ প্রশাসন। অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়া অথবা নিরাপত্তার বিষয়ে সংসদ সদস্যের এখানে কোনো দায়িত্ব নাই।”

মাশরাফি লিখেছেন, জেলা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসন বা আয়োজকদের পক্ষ থেকে থেকে তাকে না জানিয়ে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হয় নোয়াগ্রামে, সেখানে তার শ্বশুরবাড়ি। বক্তাকে বলা হয়েছিল, ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি নেওয়া আছে, তিনি যেন চলে আসেন।

“অথচ কালনা ঘাট পর্যন্ত আনার পর তবেই কেবল জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে জানানো হলো। ঘাট থেকে যখন উনাকে বলা হলো যে, 'আপনার চিঠি কোথায়?' তিনি দিতে পারলেন না।

“মাহফিল কর্তৃপক্ষ তখন আমাকে ফোন করে বলল, 'আপনি এই সমস্যা ঠিক করেন।'  কথা হল, তখন এই সমস্যার সমাধান করা কিভাবে সম্ভব? এটা তো পুরোটাই একটা প্রক্রিয়া, যা আরও সাত দিন আগে থেকে করতে হয়!”

মাশরাফি লিখেছেন, “তখন ওই লোকগুলো বলা শুরু করে দিল, আমি নাকি ওয়াজ মাহফিল হতে দিচ্ছি না। পুরো খেলাটা খেলেছে এমনভাবে, তাকে আমার নির্বাচনী এলাকায়- আমার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় এনে সরকারের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, আমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মানছি না।”

“আর যদি না আসতে পারে, তাহলে প্রচার করা হবে যে, মাশরাফি ওয়াজ করতে দেয় না। দুই দিক থেকেই তাদের জয়। আর দুই পক্ষের কাছেই আমাকে খারাপ বানাবে।”

ওই ঘটনার পর সেই মহল দিঘলিয়ার সাহাপাড়ায় ‘এবার উল্টো খেলা খেলল’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়ক।

এর আগে গত ১৭ জুন এ জেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের এক ছাত্রের ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার বিতর্কিত এক বক্তব্য নিয়ে ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার পর ওই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়।

এ নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদের মধ্যে এ ঘটনায় সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যেই লোহাগড়ার সাহাপাড়ায় অগ্নিসংযোগে ঘটনা ঘটল, যা নিয়েও প্রতিবাদ চলছে।

আরও পড়ুন:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক