বানেভাসা সুনামগঞ্জ: সব হারিয়ে শাহিদা, আয়েশাদের সড়কের দিনরাত্রি

রাস্তার কোথাও হাঁটুজল, কোথাও ঢেউ থই থই কোমর পর্যন্ত; বানের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ির অংশ, গবাদি পশু আর গৃহিণীর প্রিয় হাঁস-মুরগী।

মাসুম বিল্লাহ সুনামগঞ্জ থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 July 2022, 07:36 PM
Updated : 1 July 2022, 08:10 PM

এমন দুর্যোগের দিনে এসব দেখতে দেখতেই বন্যার স্রোতের মধ্যে দুই শিশুকে দুই কাঁধে নিয়ে পড়িমড়ি করে ছুটেছেন শাহিদা বেগম; তার গন্তব্য প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি উঁচু ভবন।

তিনদিন পর বানের জল নেমে যাওয়ায় নিজেদের ঘরে ফিরতে চাইলেন শাহিদারা; কিন্তু ঘরে পানি না থাকলেও পুরো ভিটে যেন হয়ে ছিল কাদামাটির ঢিবি।

বাসের আলোয় এভাবেই হঠাৎ আলোকিত হয়ে ওঠে সুনামগঞ্জ শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরের জানিগাঁও এলাকায় মহাসড়কে বানভাসিদের আশ্রয়স্থল। সেখানে বাঁশ-প্লাস্টিকের তৈরি তাবুর মত ৩০টি অস্থায়ী নিবাসে দিবারাত্রি পার করছে প্রায় ৪০টি পরিবার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি।

যে কারণে তাদের আশ্রয় হল ঘরের পাশেই সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার সড়ক। শুক্রবার পর্যন্ত সেখানে বাঁশ আর প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি অস্থায়ী নিবাসে দিবারাত্রি পার করছিলেন তারা।

পরিবারের মোট ১০ জন সদস্য নিয়ে তারা সেখানে থাকছেন; পাশের আরেকটি পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে টিনের চুলোয় রান্নাবান্না চলছে।

ঘরে চাল আর হাঁস-মুরগী যা ছিল, তা ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। দুয়েকবার ত্রাণ পেলেও অধিকাংশ সময়ে শাহিদার বড় ভাই কাইয়ুম কষ্টেশিষ্টে পরিবারের আহার জুটাচ্ছেন।

বানের তোড়ের মধ্যে পড়িমড়ি করে নিরাপদ আশ্রয়ের পথে ছুটে যাওয়ার বর্ণনা যেমন দিচ্ছিলেন, তেমনি খেয়ে না খেয়ে সড়কের মধ্যেই পানি কবে কমবে সেই প্রহর গোনার কথা বলছিলেন শাহিদা।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরের জানিগাঁও এলাকায় মহাসড়কে বানভাসিদের আশ্রয়স্থল। সেখানে বাঁশ-প্লাস্টিকের তৈরি তাবুর মত ৩০টি অস্থায়ী নিবাসে দিবারাত্রি পার করছে প্রায় ৪০টি পরিবার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ব্যস্ত সড়কে সারাদিন গাড়ির আওয়াজের মধ্যে চলছে তাদের থাকা-খাওয়া। বৃষ্টি এলে প্লাস্টিকের ফাঁক গলে নামে জলধারা।

”কিন্তু ঘরের মধ্যে যে প্যাক, বেড়া ভাইংগা গেছে-এ কারণে বাধ্য হয়ে রাস্তার উপরে আছি আমরা। উপায় তো নাই।”

দোয়ারাবাজারের মান্নারগাঁও ইউনিয়নের আমবাড়ি এলাকায় অস্থায়ী নিবাসের ঠিক পাশেই শাহিদাদের মাটি, বেড়া আর টিনের বেড়ার ঘর।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরের জানিগাঁও এলাকায় মহাসড়কে বানভাসিদের আশ্রয়স্থল। সেখানে বাঁশ-প্লাস্টিকের তৈরি তাবুর মত ৩০টি অস্থায়ী নিবাসে দিবারাত্রি পার করছে প্রায় ৪০টি পরিবার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি।

শুক্রবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, তার ভাই কাইয়ুম কাদার মধ্যেই ঘরে বেড়া আর ভিটে ঠিক করতে; আপন নিবাসে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় শাহিদাদের মত বহু মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়ে সড়কে। ঘরে ফেরার প্রহর গুণলেও কখন ফেরা হবে, তা অজানা তাদের কাছে।

শুধু ভেতরের বড় সড়কে নয়, সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জায়গায় জায়গায় অস্থায়ী আবাস গড়েছেন বানভাসী মানুষ।

আগের দু’দফা বন্যার পর তৃতীয় দফায় আর রেহাই পাননি তারা। মানুষের পাশাপাশি অনেকের গবাদিপশুর অস্থায়ী আবাসও হয়েছে সড়ক-মহাসড়ক। সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাও করতে হচ্ছে সেখানকার মানুষদের।

শুক্রবার সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, এ জেলায় বন্যায় এবার ৪৫ হাজার ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে।

তাছাড়া এখনও ক্ষতিগ্রস্ত বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি পরিসংখ্যানের বাইরে রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও এক মাস সময় লাগবে বলে প্রশাসনের ভাষ্য।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরের জানিগাঁও এলাকায় মহাসড়কে বানভাসিদের আশ্রয়স্থল। সেখানে বাঁশ-প্লাস্টিকের তৈরি তাবুর মত ৩০টি অস্থায়ী নিবাসে দিবারাত্রি পার করছে প্রায় ৪০টি পরিবার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি।

জেলা প্রশাসক বলেন, প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বন্যায় এ জেলায় এবার বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে চার হাজার ৭৪৫টি পরিবারের বাড়িঘর। আর ৪০ হাজার ৫৪১টি পরিবারের ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত।

শাহিদাদের ঠিক পাশেই বাঁশ-প্লাস্টিকের অস্থায়ী ঘরে আবাস নিয়েছেন আয়েশা বেগমের পরিবার। টিনের চুলায় একজনের রান্না যখন শেষ হয়, তখনই শুরু হয় অন্যদের খাওয়ার আয়োজন।

অস্থায়ী ঘর থেকে কয়েকশ’ গজ দূরে আয়েশাদের ভিটেমাটি। বানের তোড়ে ঘর ভেঙেছে, পানি নেমে যাওয়ার ১১-১২ দিন পার হলেও ঘর এখনও কাদামাটিতে ভরা।

শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে যখন তার সঙ্গে কথা হয় নাতিকে কোলে নিয়ে আনমনে তাকিয়েছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী। কোলে ছিল তিন বছরের নাতনী আর কপালে চিন্তার ভাঁজ-কখন ফিরবেন আপন ঘরে?

সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অগুনিত মানুষকে আশ্রয় নিতে হয় সড়কে। দোয়ারাবাজারের মান্নারগাঁও ইউনিয়নের আমবাড়ি এলাকার তৈরি অস্থায়ী নিবাসে তার প্রহর গুনছে নিজের বাড়িতে ফেরার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, যা ছিল সবতো গেছে বন্যায়। ঘরের কিছুটা ভেঙে গেছে আর এখন প্রচুর কাদা ভিটার উপর। বাধ্য হয়ে এখান থাকছি। জানি না কবে ঘরে যেতে পারব।

দুয়েক সময় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে ত্রাণ পেলেও সব কিছু হারিয়ে খাবারের বন্দোবস্ত করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরের জানিগাঁও এলাকার মহাসড়কের উপর তাবুর আকারে তৈরি করা হয়েছে বাঁশ-প্লাস্টিকের ৩০টির মতো অস্থায়ী নিবাস। ওই এলাকায় সার বেঁধে দিবারাত্রি পার করছে প্রায় ৪০টি পরিবার।

শুক্রবার সন্ধ্যার পর সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ক্ষণে ক্ষণে বিকট হর্ন বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে বড় বড় বাস। তার পাশেই শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে সময় পার করছেন বানভাসি মানুষেরা।

ওই সময়ে দুয়েকটি ত্রাণ বিতরণের গাড়িও ঘুরে যেতে দেখা গেছে সেখানে। ওইসব গাড়ি দেখে ব্যস্ত ওই মহাসড়কে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন বিভিন্ন বয়সি মানুষ।

সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অগুনিত মানুষকে আশ্রয় নিতে হয় সড়কে। দোয়ারাবাজারের মান্নারগাঁও ইউনিয়নের আমবাড়ি এলাকার তৈরি অস্থায়ী নিবাসে তার প্রহর গুনছে নিজের বাড়িতে ফেরার। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

সেখানে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব নারী দিলবী বেগম আর তার ছেলে মাইক্রোবাস চালক আইনুল হকের সঙ্গে। বানের জলে তাদের ৪০ মণের মতো ধান নষ্ট হয়েছে। সাঁতরে স্রোতের তোড় থেকে তারা বাঁচাতে পেরেছিলেন কয়েকটি গরু।

বন্যার প্রথম কয়েকদিন বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে স্থানীয় একজনের পাকাবাড়িতে উঠেছিলেন তারা। এরপর অস্থায়ী নিবাস গেড়ে জানিগাঁও এলাকায় অবস্থান নিয়েছে দিলবী বেগমের পরিবার।

দিলবী বেগম বলেন, মহাসড়কের উপরে থাকায় ত্রাণ ’ভালো’ পেলেও ঘরবাড়ি এখনও বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠেনি। কারণ ঘর ভেঙেছে আর ভিটে কাদায় ভরপুর।

সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার সড়কের জালালপুর এলাকায় বাঁশ-প্লাস্টিকের অস্থায়ী ঘরে একপাশে থাকছে মুনফর আলীর পরিবার আর আরেক পাশে রাখা হয়েছে তাদের গবাদিপশু।

মুনফর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঘরে ফেরার জো নাই। গরুর পাশেই থাকি আমরা। বৃষ্টি-বাদল হলে বেশ অসুবিধা হচ্ছে এখানে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক