সুনামগঞ্জের বানভাসিদের ঠাঁই খুপড়ি ঘরে, দুর্ভোগ চরমে

সুনামগঞ্জের বানভাসি অনেক মানুষ এখনও খুপড়ি ঘরে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকেরই বাড়ি ফেরার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও বন্যার ভয়াবহতা তাড়িয়ে ফিরছে তাদের।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 June 2022, 05:05 AM
Updated : 28 June 2022, 05:41 AM

নিম্ন আয়ের হতদরিদ্র অসহায় এই মানুষদের ঘরবাড়ি বন্যায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে; বানের স্রোতে ভেসে গেছে ঘরের বেড়া। ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে চালা। তাই সড়কের অস্থায়ী ঘরে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা অনিরাপদ অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ত্রাণবাহী ট্রাক ও গাড়ি থেকে শুকনো খাবার ও ত্রাণের প্যাকেট ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো দিয়েই জীবন চালাচ্ছেন পুরুষ ও শিশুরা। তবে বন্যার ভয়াবহতা ও ক্ষতির কারণে বাকরুদ্ধ তাদের অনেকেই।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “বন্যার ভয়াবহতা ব্যাপক। বহু মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে বাড়ি ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে অনেকে এখনও আশ্রয় কেন্দ্র বা সড়কের ধারে রয়ে গেছেন।”

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের ফলে সুরমার পানি ১১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুদ্দোহা জানান।

সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের সুনামগঞ্জ শহর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত সড়কের উঁচু অংশে বানভাসি মানুষরা খুপড়ি ঘরে অবস্থান করছেন।

সোমবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের মদনপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কের দুই পাশে পাঁচটি পরিবার ত্রিপাল টাঙ্গিয়ে খুপড়ি ঘরে অবস্থান করছে। এখানে আশি ঊর্ধ্ব আইরুন নেসা তার মেয়ের নাতির সংসারে থাকেন।

আইরুন বলেন, গত ১৭ জুন রাতে দেখার হাওর উপচে সিলেট সুনামগঞ্জ সড়ক ডুবিয়ে তাদের বাড়িতে স্রোতের মতো পানি ঢুকতে থাকে। পরে দুইজন ধরে ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যেই তাকে সড়কের উচু অংশে তুলে আনেন। এরপর বানভাসি আরও অনেক শিশু ও নারীদের এনে রাখা হয়। বন্যার পর থেকেই সড়কে ত্রিপাল দিয়ে বেস্টনি করে বসবাস করছেন তারা।

খাইরুন বিবি বলেন, “আমার বয়স প্রায় ৮০ বছর। আমি আমার বাবা ও দাদাকে দেখেছি। তারা বিভিন্ন দুর্যোগের গল্প করেছেন। কিন্তু এমন ভয়াবহ দুর্যোগের গল্প তাদের মুখ থেকে শুনিনি। আমি এই দীর্ঘ জীবনে বড় বড় বন্যা দেখেছি, কিন্তু স্রোতের মতো এসে প্রতিটি ঘর ডুবিয়ে দিয়েছে এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি।”

তিনি এই বন্যাকে সর্বনাশা আখ্যায়িত করে আরও বলেন, “বানের স্রোতে আমার নাতির ঘর ছিন্ন ভিন্ন করে গেছে। বেড়া ভেঙেছে, টিন উড়িয়ে নিয়েছে। এখন আর বাড়ি বসবাসের উপযোগী নেই। তাই সড়কেই আছি।”

তার পাশেই খুপড়ি ঘরে বসে ছিলেন দিলু বিবি। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “নাতি নাতনিসহ আমার পরিবারের নয়জন মানুষ গত দশ দিন ধরে সড়কে বানানো খুপড়ি ঘরে আছি। শুক্রবার মধ্যরাতে অনেক কষ্টে বুকপানি ভেঙ্গে সড়কে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখনও এক কাপড়ে আছি। বন্যায় সব ভাসাইয়া নিছে। বাড়িটি আর থাকার উপযুক্ত রইছেনা। ফলে সড়কের খুপড়ি ঘর ছেড়েও যেতে পারছি না।”

শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের খাইক্কারপাড় গ্রামটির প্রধান সড়ক এখনও পানিতে ডুবে আছে। এই গ্রামের বাসিন্দা আট সন্তানের জননী সিতারা বেগম (৬৫) মুজিবর্ষের উপহারের ঘর পেয়ে সুখেই বসবাস করছিলেন। পানিতে তার ঘরের মেঝে দেবে গেছে। এখনও ঘরে পানি। তাই শহিদ তালেব সেতুর পাশে সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কেই খুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে।

একই গ্রামের আয়াতুন নেসাও তার পাশে খুপড়ি বেঁধে বসবাস করছেন। তাদের সবার বাড়িঘর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফিরতে পারছেন না তারা। ঘর মেরামতে সরকারি সহায়তা দাবি করেছেন এই দুই নারী।

ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, “যাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে গৃহ নির্মাণ সহায়তা চেয়েছি। বরাদ্দ সাপেক্ষে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদেরই সহায়তা দেওয়া হবে। তবে এখন আমরা বানভাসি ও ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকেই ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছি।”

সুনামগঞ্জ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ১ হাজার ৩৬৫ টন জিআরের চাল এবং ২ কোটি ৩৫ লাখ নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তাছাড়া বেসরকারিভাবে আরও ২ লাখ প্যাকেট ত্রাণ, ২৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

ত্রাণের কোন সঙ্কট নেই জানিয়ে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন সব জায়গায় সুষ্ঠভাবে ত্রাণ বিতরণ করছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক