হজে গিয়ে গ্রেপ্তার: ‘বোমায় হাত হারিয়ে ডাকাতি ছেড়ে আন্তর্জাতিক ভিক্ষুক’

এক সময় ছিলেন ‘দুর্ধর্ষ ডাকাত’, ‘বোমায়’ দুই হাত হারানোর পর মেহেরপুরের মতিয়ার রহমান মন্টু বনে যান ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষুক’; যাকে এবার হজের সময় ভিক্ষাবৃত্তির দায়ে মদিনায় গ্রেপ্তার করে সে দেশের পুলিশ।

মেহেরপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 June 2022, 07:30 PM
Updated : 27 June 2022, 07:30 PM

গাংনি উপজেলার সিন্দুরকোটা গ্রামের মানুষ জানে, ৫৮ বছর বয়সী মন্টু ভিক্ষা করতে বহুবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ভারতে গেছেন। আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, গ্রামে কিছু না করলেও বিঘা-বিঘা সম্পত্তির মালিক তিনি।  

মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে ভাটাপাড়ায় মন্টুর সংসার। স্ত্রী স্বীকার করেছেন, তার স্বামী একাধিকবার ভারত ও সৌদি আরবে গেছেন। করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর তিনি যেতে পারেননি। তবে সৌদি আরব গিয়ে তার স্বামী কী করেন তা বলতে পারেননি তিনি।  

উপজেলার মটমুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বছর বিশেক আগেও মন্টু ডাকাতি করতেন। বোমার আঘাতে তার দুই হাতের কব্জি উড়ে যায়।”

এই জনপ্রতিনিধি বলছেন, “গ্রামে মন্টু কিছুই করেন না। অথচ প্রতিবছর পাঁচ-সাত লাখ টাকা ব্যয় করে হজ ভিসায় সৌদি আরবে যান। সেখানে ভিক্ষা করে অনেক টাকা আয় করেন।

“হাত হারানোর পর তিনি বিদেশে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রতিবার গ্রামে ফিরে প্রথমে জমি কেনেন। এভাবে ৩৫-৪০ বিঘা জমি তিনি কিনেছেন।”

ভিক্ষাবৃত্তির দায়ে ২২ জুন মদিনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাংলাদেশ হজ মিশনের কর্মীরা থানায় মুচলেকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন।

মতিয়ার সৌদি আরবে যান ধানসিঁড়ি ট্র্যাভেল এয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। গত ২৫ জুন ওই এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়েরর উপসচিব আবুল কাশেম মুহাম্মদ শাহীন স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি স্থানীয় উপজেলার প্রশাসনকেও পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের মাধ্যমে সেই চিঠি গেছে ইউনিয়ন পরিষদের কাছে।

উপসচিব আবুল কাশেম মুহাম্মদ শাহীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এরই মধ্যে এ ব্যাপারে ইমিগ্রেশনে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দেশে ফিরলেই তাকে যেন গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে যে এজেন্সি পাঠিয়েছে তাদের নিবন্ধনও বাতিল করা হবে।”

ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল আহমেদ বলেন, “ইউএনওর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়ে পুরো বিষয়টি আমি জানতে পারি। হজের নামে মদিনা শরীফে ভিক্ষার ঘটনা দেশের জন্য এবং আমাদের জন্য খুবই লজ্জার। তার পাসপোর্ট অনুসন্ধান করলে প্রমাণিত হবে তিনি আন্তজার্তিক ভিক্ষুক। তিনি আইনপ্রযোগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে ভিক্ষা করতে বিভিন্ন মুসলিম দেশে ঘুরে বেড়ান।”

গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী খানমও মনে করেন, মতিয়ার রহমান মন্টু দেশের ‘ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন’। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সরকারকে বিব্রত হতে হয়েছে।

“মন্টু সম্পর্কে তদন্ত শুরু করেছি। যেহেতু হজ ভিসায় গেছে, তাই হজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব না। তবে দেশে এলে তার বিরুদ্ধে আইনগত সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।“

সিন্দুরকোটা গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে নানা রকম তথ্য পাওয়া গেল মতিউর রহমান সম্পর্কে। কেউ কেউ তাকে বললেন ‘বোমা মন্টু’। কয়েকজন মন্টুর গবাদিপশুর ব্যবসা থাকার কথা জানালেন।  

মটমুড়ার ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন বলেন, “মন্টু অনেকবার হজ ভিসায় সৌদি আরব গেছে। তবে গ্রামে কখনও তাকে নামাজ পড়তে দেখিনি।”

গ্রামের চা দোকানদার হোসেন খন্দকারের দাবি, মন্টু হজে গেছেন ‘১২/১৪ বার’। তিনিও বললেন, সৌদিতে ভিক্ষা করে ‘বিপুল অর্থ এনে সম্পদ গড়েছেন’ ওই ব্যক্তি। 

দুই হাত না থাকলেও মন্টু নিজের সব কাজ নিজেই করতে পারেন বলে জানালেন তার স্ত্রী মমতাজ পারভীন। সর্বশেষ ২১ জুন স্বামীর সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছে তার।

“তখন তিনি বলেছেন, ‘ভালো আছি, হজ শেষে চলে আসব’। ওইদিনের পর থেকে উনার মোবাইল বন্ধ। আর যোগাযোগ করা যায়নি।“

মমতাজ বলেন, “ভারতে উনি প্রায়ই যান। অনেকবার সৌদি আরবে গেছেন হজে। বিদেশে গিয়ে উনি কী করেন তা আমি জানি না।“

মেহেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রসুল জেলা হাজি সমিতিরও সভাপতি। তিনি বলেন, “হজের নামে সেখানে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করা হাজিদের জন্য খুবই লজ্জার ও নিন্দার। এমন দু-একজনের অপকর্মের কারণে ভবিষ্যতে হজ ভিসা প্রাপ্তি জটিল হয়ে গেলে সেটাও দুঃখজনক হবে। তাই হাবকে এই বিষয়ে আরও সর্তক হতে হবে।”

আরও পড়ুন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক