কোথাও আটকে গেলে বাহার ভাইয়ের পরামর্শ নেব, সাবেক মেয়রকেও আমন্ত্রণ জানাব: রিফাত

হাড্ডাহাড্ডি ভোটের শেষে রোমাঞ্চকর জয়ে প্রথমবার নির্বাচনে নেমেই বাজিমাত করা কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আরফানুল হক রিফাত নগরভবন থেকে দুর্নীতি দূর করে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন আবারও।

কুমিল্লা প্রতিনিধিআবদুর রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 June 2022, 09:19 AM
Updated : 18 June 2022, 09:20 AM

গণনায় ‘উত্তাপ’ ছড়ানো ফলাফলে জয়ী হওয়ার পরদিন বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি কুমিল্লা নগরবাসীর নাগরিক সুবিধার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচানোর প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন। সবার দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে জোর দিয়েছেন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর।

মানুষের জন্য এসব কাজ করতে গিয়ে ‘কোথাও আটকে গেলে’ তার নেতা কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের পরামর্শ নেবেন বলে জানিয়েছেন নবনির্বাচিত এই মেয়র। বাহারের পরামর্শে আধুনিক নগরী গড়ার কথা বলেছেন তিনি।

নৌকার প্রার্থীর বিজয়ের মাধ্যমে কুমিল্লা সিটিতে সাক্কু যুগের অবসান হতে যাচ্ছে; সেই মনিরুল হক সাক্কুরও সহায়তা নেবেন রিফাত, প্রয়োজনে ‘আমন্ত্রণ’ জানাবেন তাকে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নগরীর রামঘাট এলাকায় কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন নবনির্বাচিত মেয়র রিফাত।

সংসদ সদস্য বাহারের ঘনিষ্ঠ নৌকার প্রার্থী রিফাতের হাত ধরে প্রথমবারের মত কুমিল্লা নগরীতে মেয়র পেল সরকারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

মেয়র নির্বাচনে প্রথমবার দলের মনোনয়ন পাওয়া রিফাত কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন, আগে থেকেই সক্রিয় ছিলেন সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে।

স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসা রিফাত বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে সাজা মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থেকেছেন। ফিরে এসে ছাত্রলীগ, এরপর যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। ২০১৭ সালে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান তিনি।

প্রশ্ন: নির্বাচনের পরিস্থিতি কেমন দেখলেন?

আরফানুল হক রিফাত: একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। কুমিল্লার মানুষ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছে। শুধু আমি না, কোন প্রার্থীরই নির্বাচন নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না।

প্রশ্ন: আপনি প্রচারণার সময় বলেছেন, নৌকা বিপুল ভোটে পাস করবে; কিন্তু বিজয়ী হয়েছেন ৩৪৩ ভোটে। তাহলে কী বলবেন- আওয়ামী লীগের অন্য ১৩ মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং দলের অন্য গ্রুপের নেতাকর্মীরা আপনাকে ভোট দেয়নি?

আরফানুল হক রিফাত: না, আমি এমনটা মনে করি না। কারণ কুমিল্লায় ব্যক্তির বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু নৌকার প্রশ্নে সবাই আপোসহীন। আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীরা দিনরাত এক করে আমার জন্য কাজ করেছেন। আর ভোটগ্রহণ চলাকালে বৃষ্টি এবং ইভিএমের ধীরগতির কারণে অনেকে ভোট দিতে পারেননি বা অনেকে ভোট না দিয়েই চলেন গেছেন। যার কারণে ভোটের ব্যবধান কমেছে। এখানে আওয়ামী লীগের কারও কোন দোষ নেই।

প্রশ্ন: কুমিল্লা সিটিতে নৌকার প্রথম বিজয়কে কিভাবে দেখছেন?

আরফানুল হক রিফাত: কুমিল্লা সিটি করপোরেশন তো হয়েছে ১১ বছর আগে। এর আগে আরও ২০ বছর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের কেউ নির্বাচিত হয়নি। সর্বশেষ ৩১ বছর আগে আওয়ামী লীগ পৌর চেয়ারম্যান পেয়েছিল; নির্বাচিত হয়েছিলেন আমার নেতা এমপি বাহার।

দীর্ঘদিন ধরেই কুমিল্লা সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়রের অভাব অনুভব করছিলেন আমাদের নেতাকর্মীরা। এবার তাদের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। মানুষ উন্নয়নের প্রতীক নৌকাকে বেছে নিয়েছে। আমি নেত্রীকে কুমিল্লা সিটিতে নৌকার বিজয় উপহার দিতে পেরেছি। এটাই আমার বড় সফলতা।

প্রশ্ন: কুমিল্লার মানুষ কেন এবার নৌকাকে বেছে নিয়েছে বলে মনে করেন?

আরফানুল হক রিফাত: কুমিল্লার মানুষ এবার দুর্নীতিবাজকে বয়কট করেছে। নৌকার এ বিজয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিজয়। নৌকার এ বিজয় শতকোটি টাকা লুটপাটের বিরুদ্ধে বিজয়। কুমিল্লার মানুষ মনে করেছে তাদের সঠিক নাগরিক সুবিধা পেতে হলে নৌকার কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্ন: আপনি নির্বাচিত হলে সাক্কুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা বলেছেন। সেটা কবে করবেন?

আরফানুল হক রিফাত: আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময়ই স্বোচ্চার। এবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছি। আমি কুমিল্লার মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব তার দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করে কুমিল্লার মানুষের কাছে পৌঁছে দেব। আমি তার দুর্নীতির কিছু কাগজপত্র পেয়েছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর আশা করছি বাকি সব হাতে পাব।

প্রশ্ন: বিএনপিপন্থী দুই হেভিওয়েট প্রার্থী এবার নির্বাচনে লড়েছেন। অনেকে বলেন বিএনপির দুই প্রার্থী থাকায় আপনি বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন। আপনি কী এমনটাই মনে করেন?

আরফানুল হক রিফাত: না, আমি এটাকে কোনো বাড়তি সুবিধা মনে করছি না। আমার কাছে সবাই সমান। আমি কাউকেই ছোট করে দেখিনি নির্বাচনে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। বৃষ্টি ও ইভিএমের ধীরগতি না থাকলে ভোটের ব্যবধান আরও বাড়তো।

প্রশ্ন: আপনি সাবেক মেয়র সাক্কুকে সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ বলেছেন। আপনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন- প্রথমেই নগরীর মানুষের জন্য কোন কাজটি করতে চান।

আরফানুল হক রিফাত: কুমিল্লার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা ও যানজট। আমি এক বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতা ও যানজটের সমস্যার সমাধান করতে চাই। এজন্য আমি নগর পরিকল্পনাবিদদের এ সমস্যা সমাধানের কাজে যুক্ত করব। সুন্দর পরিকল্পনা নিয়ে কুমিল্লা নগরীকে এগিয়ে নেব। অতীতের মেয়রের মত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে সমস্যা সমাধান করতে যাব না। প্রয়োজনে দেশের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদদের পরামর্শ নিয়ে কুমিল্লা নগরীর জলাবদ্ধতা ও যানজট সমস্যার সমাধান করব।

প্রশ্ন: আপনি প্রচারণার সময় ১১ দফায় বলেছেন- সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং ও মাদকমুক্ত শান্তির কুমিল্লা গড়তে স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের সহযোগিতা নেবেন। নগর পরিচালনায় কী এমপি বাহারের সহযোগিতা নেবেন?

আরফানুল হক রিফাত: অবশ্যই। এমপি বাহার কুমিল্লার মানুষের অভিভাবক। আমি তার একজন কর্মী। তার পরে আর কেউ কুমিল্লা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেনি। আমি এমপি বাহার হতে পারব না, তবে তার কর্মী হিসেবে সততার সঙ্গে মেয়রের দায়িত্ব পালন করব। কোথাও আটকে গেলে বাহার ভাইয়ের পারামর্শ নেব। তার পরামর্শ কুমিল্লা নগরীকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলব।

প্রশ্ন: আপনি দায়িত্বগ্রহণের পর কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে কী কী পরিবর্তন আনবেন?

আরফানুল হক রিফাত: আমি প্রথমেই সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতি মুক্ত করব। আগে নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনে ঘুষ ছাড়া কাজ হত না। সরকারি ফি এর বাইরে আমাকে এক টাকাও ঘুষ দিতে হবে না। বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে ‘আগের মেয়রের মত’ আমাকে বিনামূল্যে কোনো ফ্ল্যাট দিতে হবে না। ঠিকাদারেরা কার্যাদেশ নিতে এখন থেকে আমাকে পারসেনটেজ হিসেবে ঘুষ দিতে হবে না। আর সাবেক মেয়রের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন সিটি করপোরেশনকে দলীয় কার্যালয় বানাবেন না। এতে আপনি কতটুকু সফল হবেন?

আরফানুল হক রিফাত: আমাদের নেতাকর্মীদের জন্য অনেক সুন্দর ও মনোরম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় রয়েছে। প্রয়োজনে হলে এমপি বাহার ভাইকে বলে আমি এখানেও মেয়রের জন্য একটি কক্ষ নেব। এরপরও সাবেক মেয়রের মত সিটি করপোরেশনকে দলীয় কার্যালয় বানাব না। করপোরেশনের মেয়রের দরজা নগরীর মানুষের জন্য সব সময় খোলা থাকবে। করপোরেশেন হবে গণমানুষের প্রতিষ্ঠান।

প্রশ্ন: নগর পরিচালনায় সাবেক মেয়রের পরামর্শ নেবেন আপনি?

আরফানুল হক রিফাত: আমি কুমিল্লাকে দেশের আধুনিক নগরী হিসেবে গড়তে চাই। এজন্য সবার সহযোগিতা দরকার। আমি চাইব সাবেক মেয়রও এক্ষেত্রে আমাকে যেন সহযোগিতা করে। এজন্য আমি তাকে আমন্ত্রণ জানাব।

প্রশ্ন: নগরবাসীর উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

আরফানুল হক রিফাত: আমি কুমিল্লার মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে হতাশ করেননি। নগরীর মানুষ আমার উপর যেই আস্থা ও বিশ্বাস করেছেন- আমি তাদের সেই মর্যাদা রক্ষা করব।

প্রশ্ন: এত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আরফানুল হক রিফাত: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক