কুমিল্লার ভোটে বিএনপি ‘নেই’, দলের প্রার্থী আছেন দেড় ডজন

দলের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ায় দুই বিএনপি নেতাকে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হলেও কাউন্সিলর পদে ভোটের ময়দানে থাকা নেতাকর্মীরা সমর্থকদের নিয়ে জোরেসোরে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

কুমিল্লা প্রতিনিধিআবদুর রহমানবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 May 2022, 10:41 AM
Updated : 30 May 2022, 10:41 AM

আগামী ১৫ জুনের নির্বাচনে ১৪টি ওয়ার্ডে বিএনপির অন্তত ১৬ নেতাকর্মী ভোট করছেন; যাদের মধ্যে ছয়জন সদ্য সাবেক কাউন্সিলর। আর ২০১২ সালের নির্বাচনে জয় পাওয়া তিনজন কাউন্সিলরও আছেন।   

এর বাইরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তিনজন নেতাও ভোটের ময়দানে আছেন, যাদের সবাই সদ্য সাবেক কাউন্সিলর।

বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, তারা জয়ের লক্ষ্যে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। আগেও মানুষের রায় পেয়েছেন, এবারও রায় পাবেন বলে আশাবাদী তারা।

কুমিল্লা নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে ১২০ জন সাধারণ কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর এখন ভোটের মাঠে আছেন ১০৬ জন প্রার্থী।

এর মধ্যে নগরীর ৫ নম্বর ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের দুই নেতা একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা এরই মধ্যে বিনা ভোটে কাউন্সিলর পদে জয়ের পথে রয়েছেন।

তৃতীয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সদ্য সাবেক মেয়র মো. মনিরুল হক সাক্কু এবং নাজিম উদ্দিন কায়সার। দুজনই বিএনপি নেতা। সাক্কু কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কায়সার মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক ছিলেন।

বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ না নিলেও দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে লড়ছেন এবং জয়ও পাচ্ছেন।

যদিও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থীরাই শুধু দলীয় মনোনয়ন পান। কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে দল সমর্থন জানাতে পারে; কিন্তু তাদের লড়তে হয় স্বতন্ত্রভাবেই।

সাক্কু ও কায়সার দল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচনের ঘোষণা দিলে ১৯ মে দলই তাদের চিরতরে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এর দুদিন পর ২১ মে নেতাকর্মীদেরও এ দুজনের নির্বাচনের প্রচারকাজে অংশ নিতে মানা করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় দলটি।

তবে যারা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবেন তাদের সম্পর্কে ওই বিজ্ঞপ্তিতে কিছু বলা না হলেও বিএনপি নেতারা এখন বলছেন, তালিকা হচ্ছে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও এ নিয়ে ভাবছেন না ভোটের মাঠে থাকা নেতাকর্মীরা।

নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন এনামুল হক। তিনি ওই ওয়ার্ড শাখা বিএনপির সভাপতি। একই ওয়ার্ডে আছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল মোমেন।

এ ছাড়া ১৩ নম্বর ওয়ার্ডেও লড়ছেন বিএনপির দুই নেতা। এরা হলেন- সদ্য সাবেক কাউন্সিলর শাখাওয়াত উল্লা শিপন ও রাজিউর রহমান।

৯ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন বিএনপির কর্মী মিজানুর রহমান মিলন, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কর্মী সৈয়দ মহসিন আলী।

১৪ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন শহর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সদ্য সাবেক কাউন্সিলর সেলিম খান।

১৭ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন কুমিল্লা মহানগর মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাস, ২০ নম্বর ওয়ার্ডে সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদ্য সাবেক কাউন্সিলর হারুনুর রশিদ, ২২ নম্বর ওয়ার্ডে জেলা বিএনপির সদস্য ও সদ্য সাবেক কাউন্সিলর শাহ আলম মজুমদার।

২১ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন জেলা যুবদল নেতা ও সদ্য সাবেক কাউন্সিলর কাজী মাহাবুবুর রহমান, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর খলিলুর রহমান মজুমদার, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর কামাল হোসেন এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।

এ ছাড়া ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর সাইফুল বিন জলিল শহর ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি। তিনি গত বছর আওয়ামী লীগের যোগ দেন। তবে দলে তার কোনো পদ নেই। ভোটারদের কাছে তিনি এখনও ‘বিএনপি নেতা’ হিসেবেই পরিচিত।

২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী ছিলেন সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন। তবে তার মনোনয়ন বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। আপিল করেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি তিনি।

দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন করার বিষয়ে জানতে চাইলে নগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সদস্য শাহ আলম মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এখনও দল থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমি গত পাঁচ বছর কাউন্সিলর হিসেবে মানুষের পাশে থেকেছি। মানুষ আমাকে আবারও তাদের পাশে চায়। তাই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি।”

কুমিল্লা শহর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর সেলিম খান বলেন, “আমি এখন বিএনপির কোনো পদ-পদবীতে নেই। শুধুমাত্র বিএনপির সমর্থক বলতে পারেন। আমার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি রয়েছে। যত কিছুর বিনিময়ে হোক শেষ পর্যন্ত মাঠে আছি।”

বিএনপির আরও দুজন কাউন্সিলর প্রার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে তাদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।  

একজন বলেন, “এসব বহিষ্কারের বিষয় নিয়ে ভাবছি না। বিএনপির সঙ্গে আছি, বিএনপির সঙ্গে থাকব।“

আরেকজন বলেন, “ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাধীনভাবে নির্বাচন করতে দেওয়া উচিৎ। কারণ এখানে নিজের এলাকার অনেক বিষয় থাকে। আওয়ামী লীগের কেউ কাউন্সিলর হলে দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন অনেক বেড়ে যায়।”

২০১১ সালে কুমিল্লা পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন উন্নীত করা হলেও এখনও মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়নি। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারাই মহানগরের সব বিষয় দেখভাল করছেন।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সম্পাদক হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, “বিএনপি এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না। এমপি পদ থেকে তৃণমূলের মেম্বার-কাউন্সিলর পদ পর্যন্ত একই নিয়ম।”

“বিএনপি বা অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতাকর্মী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এরই মধ্যে কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় সাক্কু ও কায়সারকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের পক্ষে যেন কেউ কাজ না করে এজন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

হাজী ইয়াছিন আরও বলেন, “দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে যারা কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা তাদের তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করছি।“

এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর মহানগরের তিন নেতাকর্মীও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। তারা তিনজনই আগেরবার কাউন্সিলর ছিলেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়া কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের সদস্য, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেনও একই কমিটির সদস্য।

এ ছাড়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কাউন্সিলর একরাম হোসেন বাবু এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর কর্মী হিসেবেই পরিচিত।

আরও পড়ুন:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক