এই বৃদ্ধ বাবা-মাদের ঈদ কাটবে শান্তিনিবাসে

“ছেলেমেয়ের জন্য কী না করেছি; তাদের কত আবদার পূরণ করেছি। এক সময় ছেলেকে নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছি, কতকিছু কিনে দিয়েছি। আজ আমাকে ছুড়ে ফেলে দিল ওরা। খুব মনে পড়ে, ঈদের দিন খুব বেশি মনে পড়ে। আজ আমি ওদের কাছে বোঝা হয়ে গেছি।”

শেখ মফিজুর রহমান শিপন ফরিদপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 May 2022, 03:35 AM
Updated : 3 May 2022, 03:35 AM

কথাগুলো বলছিলেন ফরিদপুরের বৃদ্ধাশ্রম ‘শান্তিনিবাসের’ বাসিন্দা ফারুক মিয়া (৭৫)। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার এই বৃদ্ধ এখানে রয়েছেন চার বছর ধরে। তিনি ৪ মেয়ে ও ২ ছেলের জনক।

শান্তিনিবাসে ঈদের আগের দিন সোমবার ফারুক মিয়ার সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধির।

তিনি বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে স্ত্রী ও ছেলে, মেয়েরা চক্রান্ত করে সকল সম্পত্তি তাদের নামে করে নেয়। এরপর তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এরপর নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন স্থানে দিন কাটছিল। পরে ঠাঁই হয় শান্তিনিবাসে।

“আমি অসুস্থ, পরিবারের সবার কথা খুব মনে পড়ে; কিন্তু কেউই আমার খোঁজ নেয় না। এখন এই শান্তিনিবাসে আছি। এরা খুব ভালোবাসে।”

সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় অবস্থিত শান্তিনিবাসে রয়েছেন ১১ জন নারী ও চার জন পুরুষ।

এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এক সময় স্বপ্নময় দুরন্ত শৈশব ছিল; রঙিন কৈশোর ছিলো। যৌবনে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কত আনন্দই না করেছেন। সন্তানের চাওয়া পূরণ করেছেন, সন্তানের যাতে কষ্ট না হয়, তার খেয়াল রেখেছেন। ঈদ উৎসবে তাদের বায়না মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আজ তাদের ঠাঁই হয়েছে শান্তিনিবাসে। পরিবারের সেসব সদস্যরা আজ তাদের খোঁজ-খবর নেয় না।  

ফরিদপুর সদরের সাদিপুর এলাকার আয়শা বেগমের বয়স আনুমানিক ৭৫ বছর। ছোট বেলায় মা-বাবা দুজনেই মারা যান। এরপর চাচারা সব সম্পত্তি নিয়ে নেন এবং বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেন। জন্ম থেকেই তার একটি পা অচল। বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর এবাড়ি ওবাড়ি কেটেছে মানুষের সাহায্য-সহায়তায়। অসুস্থ হওয়ায় বিয়েও হয়নি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় শান্তিনিবাসে ঠাঁই হয় তার। প্রায় ১৫ বছর এখানে রয়েছেন তিনি।

আয়শা বেগম বলেন, “দীর্ঘদিন রয়েছি এখানে। খুব ভালো আছি। অন্যের বাড়িতে থাকার সময় গালমন্দ সহ্য করে থাকতে হতো। এখানে সবাই খুব ভালোবাসে, ভালো আছি। যাওয়ার কোথাও কোনো জায়গা নেই, তাই ঈদের দিনটি এখানে যারা আছে তাদের সাথেই কাটাই, ভালো লাগে।”

আয়শা বেগমের পাশে মুখে হাত দিয়ে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন আরেক মা হাসিনা বেগম। ষাটোর্ধ্ব এই নারীকে দেখে মনে হলো নিজের ফেলে আসা সুখ-দুঃখের স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। কথা হয় তার সঙ্গেও।

হাসিনা বেগম বলেন, তার বাড়ি গোপালগঞ্জের মোকছেদপুর উপজেলায়। এখানে রয়েছেন প্রায় ১০ বছর। স্বামী আব্দুল জব্বার বিশ্বাস মারা গেছেন দীর্ঘদিন আগে। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জননী। এক ছেলে ও এক মেয়ে মারা গেছে। আর এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এরপর মেয়ে তার থাকার শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিয়ে তাকে রাস্তায় বের করে দেয়। বিভিন্ন স্থান ঘুরে এক সময় আশ্রয় হয় শান্তিনিবাস।

হাসিনা বেগম বলেন, “কতদিন আপনজনের সাথে ঈদ করি না। শান্তিনিবাসের সকলের সাথে ঈদ করি। ভালোই আছি। তবে মাঝে মধ্যে মনে পড়ে মেয়ের কথা। আমার মনে পড়লেও মেয়ে আমার কোনো খোঁজও নেয় না।”

শান্তিনিবাসে দায়িত্বরত কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মোহাম্মাদ নূরুল হুদা জানান, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৩ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই শান্তি নিবাস উদ্বোধন করেন। এখানে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও রয়েছে শিশু পরিবার, সেফ হোমস, জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শান্তিনিবাসে ১১ জন নারীর জন্য রয়েছে ১১টি আলাদা থাকার ব্যবস্থা। পুরুষদের জন্যও আলাদা থাকার ব্যবস্থা আছে। খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসাসহ সকল ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা। রয়েছে চিকিৎসার ব্যবস্থা। এর মধ্যে তিনি জন নারী খুবই অসুস্থ, তাদের দেখভাল করার জন্য আয়া রয়েছেন।  

এখানকার আরেক নিবাসী লিমা আক্তারের (৫০) স্বামী মারা গেছেন ২৫ বছর আগে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তারা এখন স্বামীর বাড়িতে। লিমা আক্তারের স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়ে ও দেবর লিমার স্বামীর সম্পত্তি লিখে নিয়েছে। তাকে কিছুদিন বাড়িতে রাখার পর বের করে দেওয়া হয়। এরপর এবাড়ি ওবাড়ি করে ঠিকানা হয় শান্তিনিবাস। এখানে আছেন চার বছর।

গত চার বছর ধরে তার ঈদ কাটে এখানেই। আপনজন থেকেও নেই।

কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন লিমা আক্তার। ঈদের সময়ের স্মৃতিগুলো মনে করে এই নারী বার বার মুখে কাপড় দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছিলেন।

তিনি বলেন, “ঈদের দিন সকালে সেমাই রান্না করতাম; সবাই মিলে কী যে আনন্দ করতাম। এখন সেই মেয়েরা আমার খবরও রাখে না। ঈদের দিন এলে আমার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে, খুব কষ্ট হয়। এখন এখানে যারা আছেন তাদের সাথে মিলেমিশে ঈদের দিনটি কাটাই।”

৬৫ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেন এখানে রয়েছেন তিন বছর। চাকরি করতেন। স্ত্রী, ছেলে রয়েছে। চাকরি থেকে অবসরের পর স্ত্রী, ছেলের সঙ্গে মান অভিমানে চলে এসেছেন শান্তিনিবাসে। কেউ খোঁজ নেয় না তার।

সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “বাড়ি, সম্পত্তি সবকিছু পরিবারের সদস্যদের দিয়ে দিয়েছি। এখন আমি বাস করছি শান্তিনিবাসে। ভালো আছি। এখানকার সবাইকে আপন করে নিয়েছি। ঈদের আনন্দ এখানকার সবার সাথে ভাগাভাগি করে নেই।”

রোকেয়া বেগমের (৬৫) বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা সদরে। তিনি এখন খুবই অসুস্থ। কথা বলতে পারেন না ঠিকমত। বিছানার উপরই খাওয়া-দাওয়া, প্রাকৃকি কাজ। ভাঙা-ভাঙা গলায় কথা বলেন।

রোকেয়া বেগম বলেন, “আমার কেউ নেই। স্থানীয়রা তিন বছর আগে আমাকে এখানে রেখে যায়। এরপর এখানেই আছি। এটাই আমার শেষ ঠিকানা।”

সমাজসেবা পরিচালিত শান্তিনিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তাহসিনা জামান বলেন, শান্তিনিবাসে ১১ জন নারী ও চার জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে তিন জন নারী খুবই অসুস্থ, তাদের সুস্থ করতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যারা রয়েছেন তাদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসাসহ সব ব্যবস্থা এখান থেকেই করা হয়।

তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে সব নিবাসীকে নতুন কাপড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদের দিন সকালে রুটি-সেমাই, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুপুরে ও রাতে পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।

“চাকরির পেশাগত দায়িত্ব পালনই নয়, এসকল মা-বাবাদের সেবা করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক