কিশোরগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে পানি, মূল হাওর এখনও ‘অক্ষত’

ভারতের উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কিশোরগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের বাইরের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে; এসব আধাপাকা ধান কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 April 2022, 07:49 AM
Updated : 5 April 2022, 07:50 AM

রোববার ও সোমবার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও মঙ্গলবার থেকে তা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে পানি নামতে শুরু করবে বলে আশা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ছাইফুল আলম মঙ্গলবার বলেন, “আসাম ও মেঘালয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ইটনা উপজেলার ধনু, বৌলাই ও কালনী নদীর পানি বেড়েছে। এর ফলে চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকায় লাগানো আধাপাকা বোরো ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। তবে এখনও মূল হাওরে পানি প্রবেশ করেনি।”

পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের বাইরের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার বোরো ক্ষেত গেছে তলিয়ে।

কিশোরগঞ্জে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আলাদা কোনো কার্যালয় নেই; মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কার্যালয় থেকে এ সম্পর্কিত তথ্য দেওয়া হয়।

ছাইফুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুপুরে আমার সঙ্গে পাউবো কর্মকর্তাদের কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, নদীর পানি আজ স্থিতিশীল রয়েছে। সন্ধ্যার পর হয়তো পানি কমতে শুরু করবে।”

পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের বাইরের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার বোরো ক্ষেত গেছে তলিয়ে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, “যেখানে আমাদের বাঁধ নেই, প্রকল্প এলাকার বাইরের নদী ও খালের তীরবর্তী নিচু এলাকায় পানি ঢুকেছে। মূল হাওরে এখনও পানি ঢোকেনি এবং আমাদের বাঁধ অক্ষুণ্ন আছে। পানির স্তর এখনও স্বাভাবিক রয়েছে।”

দেশের খাদ্যশস্যের একটি বড় জোগান আসে হাওর থেকে। বিশাল হাওর বিস্তৃত সাত জেলা নিয়ে। এ জমির পুরোটাই এক ফসলি। হাওরের বোরো ধান রক্ষায় রয়েছে ফসল রক্ষা বাঁধ। এ বাঁধ তলিয়ে গেলে মানুষের দুর্দশার সীমা-পরিসীমা থাকে না। তাই বাঁধ নিয়ে শঙ্কা বোরো ফসল না তোলা পর্যন্ত কাটে না কৃষকের।

সোমবার দিনভর সরেজমিনে দেখা গেছে, ইটনা উপজেলার বাদলা হাওর, এরশাদনগর, আলালের বন, ধনপুর, বেতেগাসহ কয়েকটি নিচু এলাকায় আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ফসল তলিয়ে আছে। কৃষকরা দিনমজুর না পেয়ে পরিবারের লোকজন নিয়েই আধাপাকা ধান কেটে তোলার চেষ্টা করছেন।

কৃষকরা বলছেন, কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত চারটি উপজেলার কৃষকদের সারা বছরে একমাত্র আয়ের উৎস বোরো ধান। এ ধান বিক্রির অর্থ দিয়ে সংসার চালান তারা। হাওরের পানিতে বোরো তলিয়ে যাওয়ায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বোরো ধান কেটে ঘরে তোলা যাবে কিনা, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলায় এক লাখ ৬৪ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইটনা উপজেলায় বোরো ধান আবাদ হয়েছে ২৫ হাজার ৮৩০ হেক্টর। ধানকাটা শুরু হতে এখনও ১৫ থেকে ২০ দিন বাকি।

স্থানীয় কৃষক মোহন মিয়া বলেন, “আমার চরের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ধান কাটার কোনো পরিস্থিতি নেই। ঋণ করে চাষাবাদ করেছি। এখন কিভাবে দিন কাটবে, কিভাবে খাব ও ঋণ পরিশোধ করব এ চিন্তায় দিশেহারা।”

হঠাৎ করে জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পরিবারের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে পানির নিচ থেকে আধাপাকা ধান কেটে আনছেন বলে জানালেন কৃষক মইজ উদ্দিন।

কৃষক ফজর আলী বলেন, “কিছুটা পাকলে হয়ত এসব ধান আমাদের কাজে লাগত। এখন গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হবে।”

কৃষক মোতালেব মিয়া বলেন, “পানি আরও বাড়তে থাকলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে। কারণ আমরা অনেকেই বর্গা নিয়ে এবং ঋণ করে ধান চাষ করেছি।”

পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের বাইরের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় জমির আধাপাকা বোরো ধান কেটে ফেলছেন কৃষকরা।

এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ফসল তলিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ছাইফুল বলেন, “এ ক্ষেত্রে আশি ভাগ পাকলেই ধান কেটে ফেলার জন্য কৃষকদেরকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যা মোকাবেলায় নির্মিত বাঁধ যেন অক্ষত থাকে সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ কৃষকদেরকে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”

পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের বাইরের চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় জমির আধাপাকা বোরো ধান কেটে ফেলছেন কৃষকরা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, উজানের ঢলে হাওরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মূলত ধনু নদী পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় পাহাড়ি ঢলের পানি নিম্নাঞ্চলসহ নদীর মোহনায় ছড়িয়ে পড়ছে। নদী ড্রেজিং ছাড়া অকাল বন্যা রোধ সম্ভব নয়। তাই নদীর গভীরতা ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক