পাবনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কৃষি জমি দখলের অভিযোগ

পাবনায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বহু কৃষকের জমি ‘জোরপূর্বক’ দখলের অভিযোগ উঠেছে।

সৈকত আফরোজ আসাদ পাবনা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 March 2022, 04:44 AM
Updated : 24 March 2022, 04:44 AM

বিষয়টি সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভবনীপুরের কৃষকেরা।

এর প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করতে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

এ ছাড়া বিষয়টি ‘সমাধানের’ জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে একটি কমিটি করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স।

তবে অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠান ‘প্যারামাউন্ট গ্রুপ’-এর আইনি পরামর্শক অ্যাডভোকেট হরিপদ দেব কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, ২০১৭ সালে পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর মৌজায় ৭২ একর জমি কেনে ‘ডায়ানামিক সান এনার্জি’ নামের ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠান। পরে তা হস্তান্তর করে ‘প্যারামাউন্ট হোল্ডিংস’-এর কাছে।

কৃষকদের অভিযোগ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেনসহ স্থানীয় আরও কয়েকজনের সহায়তায় ফসলি জমি ‘অকৃষি’ দেখিয়ে জোরপূর্বক দখলে নিতে শুরু করে একটি চক্র। কেবল তাই নয়, জাল দলিল তৈরি করে শতাধিক কৃষকের জমি ‘ভুয়া’ মালিকেরা বিক্রি করেছে বলেও কৃষকদের অভিযোগ।

চরভবানীপুর গ্রামের পল্লি চিকিৎসক মোশারফ বিশ্বাস বলেন, “প্যারামাউন্ট হোল্ডিংস-এর ঘিরে নেওয়া জমির মধ্যে আমার ১১ বিঘা কৃষি জমি জোরপূর্বক ঘিরে নেওয়া হয়েছে। এসব সম্পত্তি আমার বাবা ও আমার নামে রেকর্ডকৃত। অথচ তারা আমার ফসলের জমিতে খুঁটি পুঁতে কাঁটা তারে ঘিরেছে। আমাদের জমিতে যাবার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

কৃষক আরমান আলী বলেন, “ভবানীপুর মৌজায় আমাদের তিন ভাইয়ের প্রায় পাঁচ বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে আমরা কলা, ইরি ধান, মশুর আবাদ করে খাই। হঠাৎ করেই কোম্পানির লোকেরা এসে বলে আমার জমি তারা আমার চাচাতো ভাই মকসেদ ব্যাপারীর নিকট থেকে কিনেছে। জোর করেই তারা জমিগুলো কাঁটাতারে ঘিরে নিয়েছে। অথচ, মকসেদ ব্যাপারী ২৮ বছর আগে মারা গেছে। তার মৃত্যু সনদ দেখানোর পরেও তারা আমার জমি ছাড়েনি।”

একই গ্রামের কৃষক মো. আসলাম হোসেন বলেন, “উপজেলা চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেনসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মাস্তান বাহিনী আমাদের জমি জোর করে দখল করেছে। আমরা জমি বিক্রি করব না জানালে তারা বলেছে, তারা যে দাম দেবে সে দামেই জমি বিক্রি করতে হবে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আমাদের জমি জোর করেই তারা নিয়ে নেবে। আমরা নিরক্ষর মানুষ, কৃষি কাজ ছাড়া আমাদের কোনো কাজ জানা নেই। এই জমি চলে গেলে আমরা কী করে খাব?”

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আসলাম হোসেন।

এদিকে, বিষয়টি জানিয়ে জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভবনীপুরের কৃষকেরা।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স বলেন, “প্যারামাউন্ট গ্রুপের জমি কেনা নিয়ে এলাকায় অস্থিরতার খবর পেয়ে আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আমি জানতাম না কৃষি জমিতে তারা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। কৃষকদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। স্থানীয় চাষিরা তাদের জমি ছাড়তে চান না। জমি কেনা নিয়ে বড় ধরনের ঘাপলাও হয়েছে। আমার মনে হয়, প্যারামাউন্ট কর্তৃপক্ষকেও স্থানীয় কোনো চক্র বিভ্রান্ত করেছে। আমি আশা করব তারা কৃষি জমি নষ্ট না করে চরের পতিত জমিতে তাদের প্লান্ট স্থাপন করবেন।” 

তিনি আরও বলেন, “জমি বিক্রি নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ সমাধানের জন্য আমরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছি। তারা ব্যর্থ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্যারামাউন্ট গ্রুপের আইনি পরামর্শক অ্যাডভোকেট হরিপদ দেব বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে চরভবানীপুরে ৩০০ একর জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে প্যারমাউন্ট গ্রুপের। এর মধ্যে ৭২ একর জমি ডায়ানামিক সান কোম্পানি আমাদের নিকট হস্থান্তর করেছে। আমরা আরও ৭১ একর জমি কিনেছি। আইনগত প্রক্রিয়া মেনেই জমি কেনা হয়েছে। কাউকে জোর করে জমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ সত্য নয়। এগুলো কৃষি জমিও নয়, দাম বাড়ানোর জন্য স্থানীয় কৃষকরা সেখানে ফসল বুনেছে।”

শিল্প স্থাপনে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জমি কেনার পর প্রকল্প স্থাপনের অনুমোদন পেলে জেলা প্রশাসনকে জানানো হবে।”

পাবনা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, “এলাকার উন্নয়ন ও স্থানীয় জনগণের কর্ম সংস্থানের স্বার্থে প্যারামাউন্ট গ্রুপকে জমি কিনতে আমরা সহযোগিতা করেছিলাম। এখানে কাউকে জোর জবরদস্তি করা হয়নি। তিন বছর ধরে যারা স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করেছে তাদের জমিই নেওয়া হয়েছে। জমি রেজিস্ট্রিতেও অনিয়ম হয়নি। এরপরও সংসদ সদস্য মহোদয় যেহেতু কমিটি করে দিয়েছেন আমরা বিষয়টি দেখব।”

পাবনা জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন বলেন, কৃষি জমিতে কোনো কিছু করতে হলে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। প্যারামাউন্ট গ্রুপ জমি কেনার বিষয়ে প্রশাসনকে অবহিত করেনি।

এ ব্যপারে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) তদন্ত করতে বলা হয়েছে। অনিয়ম হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক