আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেক ‘প্রথম’ এর বছর

বলতে গেলে একটি থেকে আরেকটি জৈব সুরক্ষা বলয়ে ঘুরেছেন ক্রিকেটাররা। মহামারীকালে ক্রিকেট সচল রাখতে তাদের দিতে হয়েছে কঠিন পরীক্ষা। কিছু ম‍্যাচ যে স্থগিত বা বাতিল হয়নি তা নয়। তবে সূচির বেশিরভাগ খেলাই হয়েছে। তাতে ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছে দলীয় ও ব‍্যক্তিগত অনেক রেকর্ড। অনেকের ফুরিয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, কারো আবার সঙ্গী হয়েছে হতাশা।

আবু হোসেন পরাগবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Dec 2021, 02:25 AM
Updated : 29 Dec 2021, 07:26 AM

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশ ব্যস্ত সময় পার করেছে ২০২১ সাল। মাঠে গড়িয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরের ফাইনাল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিস্তারের শঙ্কা থাকলেও এই বছর অনেক সিরিজ কিংবা টুর্নামেন্টেই মাঠে ফিরেছে দর্শক। যা মাঠের লড়াইয়ে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা।

ব্রিজবেন দুর্গ জয় করে ভারতের ইতিহাস

সেই ১৯৮৮ সালে ব্রিজবেনে অ্যালান বোর্ডারের অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল ভিভ রিচার্ডসের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর থেকে এই ভেন্যু অস্ট্রেলিয়ার জন্য হয়ে উঠেছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। সেই দুর্গের পতন হয় গত জানুয়ারিতে, ভারতের জয়ে। ৩২ বছর আর ৩১ ম্যাচ পর এই মাঠে টেস্টে হারে অস্ট্রেলিয়া।

সিরিজের চতুর্থ ওই টেস্টে ৩২৮ রান তাড়ায় উত্তেজনাপূর্ণ শেষ দিনের শেষ ঘণ্টায় অস্ট্রেলিয়াকে ৩ উইকেটে হারায় ভারত। বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি ধরে রাখে তারা ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে।

সেই ভারত, সিরিজের প্রথম টেস্টে যারা গুটিয়ে গিয়েছিল ৩৬ রানে, নিজেদের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ইনিংস। প্রথম টেস্টের পর অধিনায়ক বিরাট কোহলি চলে গিয়েছিলেন ছুটিতে। একের পর এক ক্রিকেটার ছিটকে পড়েন চোটে। শেষ টেস্টে দল গড়া হয় অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে। সেই দলই ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক অজিঙ্কা রাহানের নেতৃত্বে চমক জাগানিয়া পারফরম্যান্সে হারিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়াকে।

শেষ দিনে ভারতের প্রয়োজন ছিল ৩২৪ রান। ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা শুবমান গিলের ৯১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস ভারতকে দেখায় জয়ের পথে ছোটার শক্তি। আস্থার প্রতিমূর্তি হয়ে, হাতে-গায়ে বলের আঘাত সয়ে সোয়া ৫ ঘণ্টা এক পাশ আগলে রেখে দলকে ভরসা জোগান চেতেশ্বর পুজারা। আর অস্ট্রেলিয়ান বোলিং গুঁড়িয়ে দলকে জয়ের ঠিকানায় নিয়ে যান রিশাভ পান্ত। ৮৯ রানের অপরাজিত ম্যাচ জেতানো ইনিংসে এই টেস্টের সেরা ভারতের কিপার-ব্যাটসম্যানই।

ব্রিজবেনে রান তাড়ায় জয়ের আগের রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার ২৩৬, সেটিও সেই ১৯৫১ সালে। শেষ দিনে এখানে তিনশর বেশি রান তাড়া করে জয় ছিল অকল্পনীয়। সেটিই করে দেখায় ভারত।

প্রথমবার টেস্টের এক নম্বর নিউ জিল্যান্ড

গত জানুয়ারিতে প্রথমবার আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর হওয়ার স্বাদ পায় নিউ জিল্যান্ড। দেশের মাটিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে কিউইরা নিশ্চিত করে শীর্ষে ওঠা। দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ১৭৬ রানে জেতে স্বাগতিকরা।

দনাঞ্জয়ার হ্যাটট্রিক, ওভারে ছয় ছক্কা পোলার্ডের

অ্যান্টিগায় গত মার্চে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রীলঙ্কা টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচে অম্লমধুর এক দিন কাটান আকিলা দনাঞ্জয়া। দ্বিতীয় ইনিংসের চতুর্থ ওভারে হ্যাটট্রিক করেন শ্রীলঙ্কার এই স্পিনার। পরপর তিন বলে ফিরিয়ে দেন তিন বাঁহাতি এভিন লুইস, ক্রিস গেইল ও নিকোলাস পুরানকে।

হ্যাটট্রিক আনন্দে ভাসার পরের ওভারেই ছয় ছক্কা হজমের বিষাদে ডুবে যেতে হয় দনাঞ্জয়াকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ওভারে ছয় ছক্কার কীর্তি গড়েন কাইরন পোলার্ড।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই কীর্তি আগে ছিল কেবল টি-টোয়েন্টিতে যুবরাজ সিং ও ওয়ানডেতে হার্শেল গিবসের। ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংলিশ পেসার স্টুয়ার্ট ব্রডের ওভারে ৬ ছক্কা মেরেছিলেন ভারতের যুবরাজ। ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মারেন দক্ষিণ আফ্রিকার গিবস।

৪১ রানের ইনিংস খেলে আউট হয়ে ফিরছেন বাবর আজম। ছবি: জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট।

পাকিস্তানের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের প্রথম

গত এপ্রিলে হারারেতে সিরিজের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক জয় পায় জিম্বাবুয়ে। এই সংস্করণে দেশটির বিপক্ষে ১৬ বারের চেষ্টায় প্রথম জয়ের স্বাদ পায় তারা।

মন্থর উইকেটে ১১৮ রান তাড়ায় ২১ রানে শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে ৯৯ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। স্বাগতিকদের ১৯ রানে জয়ের নায়ক লুক জঙ্গুয়ে। ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ১৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন এই পেসার।

মহারাজের হ্যাটট্রিক হাসি

গত জুনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট লুসিয়া টেস্টে হ্যাটট্রিক করেন কেশভ মহারাজ।  ম্যাচের চতুর্থ দিন এই কীর্তির উচ্ছ্বাসে ভাসেন দক্ষিণ আফ্রিকান স্পিনার। পরপর তিন বলে তার শিকার কাইরন পাওয়েল, জেসন হোল্ডার ও জশুয়া দা সিলভা।

দক্ষিণ আফ্রিকার সুদীর্ঘ টেস্ট ইতিহাসে হ্যাটট্রিকের স্বাদ আগে পেয়েছিলেন কেবল একজনই। সেই ১৯৬০ সালে লর্ডস টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যেটি করেছিলেন জেফ গ্রিফিন। এই পেসারের তিন শিকার ছিলেন মাইক স্মিথ, পিটার ওয়াকার ও ফ্রেড ট্রুম্যান।

এরপর দেশটির হয়ে টেস্টে হ্যাটট্রিকের দেখা পাচ্ছিলেন না আর কেউ। দীর্ঘ ৬১ বছরের সেই খরা কাটে মহারাজের হাত ধরে।

বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনে মহারাজের আগে টেস্ট হ্যাটট্রিক করতে পারেন কেবল আর দুই জন। ১৮৯২ সালে করেছিলেন ইংল্যান্ডের জনি ব্রিগস, ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কার রঙ্গনা হেরাথ।

টেস্টের ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ নিউ জিল্যান্ড

দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর পেরিয়ে গত জুনে অবশেষে নিউ জিল্যান্ডের হাতে ধরা দেয় বহু কাঙ্ক্ষিত আইসিসি শিরোপা। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় কিউইরা।

সাউথ্যাম্পটনের ফাইনালে ১৩৯ রান তাড়ায় শেষ দিনের শেষ সেশনের শেষ ঘণ্টায় ভারতকে ৮ উইকেটে হারিয়ে নিউ জিল্যান্ড পায় শিরোপার অনির্বচনীয় স্বাদ।

টেস্টের দুই দিন বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর যৌথ শিরোপার সম্ভাব্য ছবিই ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট। তবে আবহাওয়ার কথা ভেবেই আগে থেকে ঠিক করে রাখা বাড়তি দিনে ( ষষ্ঠ দিন, ‘রিজার্ভ ডে’) কিউইরা লেখে দারুণ জয়ের কাব্য।

শেষ দিনে কিউই পেসারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে গুটিয়ে যায় ১৭০ রানে। নিউ জিল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৩৯। স্নায়ুক্ষয়ী রান তাড়ায় দুই ওপেনারের দ্রুত বিদায়ে আভাস জাগে নাটকীয়তার। তবে দারুণ এক জুটিতে নিউ জিল্যান্ডকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যান কেন উইলিয়ামসন ও রস টেইলর।

কিউই অধিনায়ক অপরাজিত থাকেন ৫২ রানে। জয়সূচক বাউন্ডারিতে টেইলর অপরাজিত ৪৭ রানে। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আসে ৯৬ রান।

সেই ২০০০ সালে নকআউট বিশ্বকাপ (এখনকার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি) জিতেছিল নিউ জিল্যান্ড। এরপর আর কোনো আইসিসি ট্রফি ছিল না। বিশ্বকাপ তো বরাবরই অধরা। সবশেষ দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে হতাশার হার, দুই বছর আগে ইংল্যান্ডেই লর্ডসের ফাইনালে সব সমীকরণে সমান্তরালে থেকে বাউন্ডারি সংখ্যায় শিরোপা না পাওয়ার বিষাদ হয় সঙ্গী। সেই ইংল্যান্ডেই ফুরায় তাদের দীর্ঘ অপেক্ষা। ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদার সংস্করণের প্রথম বৈশ্বিক আসরের ট্রফিই ঘরে তোলে কিউইরা।

ভারত-ইংল্যান্ড ম্যানচেস্টার টেস্ট বাতিল

গত সেপ্টেম্বরে ম্যানচেস্টারে ম্যাচ শুরুর ঘন্টা দুয়েক আগে বাতিল হয়ে যায় ইংল্যান্ড ও ভারতের পঞ্চম টেস্ট। কারণ হিসেবে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) এক বিবৃতিতে জানায়, ক্যাম্পের ভেতরে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কায় ভারত দুঃখজনকভাবে দল মাঠে নামাতে পারছে না।

ওভালে চতুর্থ টেস্ট জিতে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ভারত। শেষ টেস্ট বাতিল হওয়ায় সিরিজের চূড়ান্ত ফল কী হবে, সেটি তৈরি হয় ধোঁয়াশা। নানা বাঁক পেরিয়ে দুই বোর্ডের আলোচনার পর গত অক্টোবরে ইসিবি জানায়, আগামী বছরের ১ জুলাই ম্যাচটি হবে এজবাস্টনে। স্থগিত সিরিজের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে ম্যাচটি।

অস্ট্রেলিয়ার অপেক্ষার অবসান

ওয়ানডে বিশ্বকাপের রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন তারা। কিন্তু টি-টোয়েন্টির ট্রফি রয়ে গিয়েছিল অধরাই। অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষ হয় এই বছর। দ্বিতীয়বারের মতো ২০ ওভারের বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে প্রথমবার শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় দলটি।

নভেম্বরে দুবাইয়ের ফাইনালে আগে ব্যাটিং করে কেন উইলিয়ামসনের ৮৫ রানের সৌজন্যে নিউ জিল্যান্ড ৪ উইকেটে তোলে ১৭২ রান। ৭ বল বাকি থাকতে ৮ উইকেটের দারুণ জয় পায় অস্ট্রেলিয়া।

রান তাড়ায় অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ তৃতীয় ওভারে আউট হলেও দলকে সেই ধাক্কা বুঝতেই দেননি মিচেল মার্শ। ৫০ বলে ৭৭ রানের অপরাজিত ইনিংসে দলের জয় নিয়ে ফেরেন তিনি। ৬ চার ও ৪ ছক্কায় ম্যান অব দা ফাইনালের পুরস্কার ওঠে তার হাতেই। ৫৮ রানের ইনিংস খেলেন ডেভিড ওয়ার্নার। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল অপরাজিত থাকেন ১৮ বলে ২৮ রানে। মার্শের সঙ্গে তার অবিচ্ছিন্ন জুটির রান ৬.৩ ওভারে ৬৬।

পাকিস্তানের বহু কাঙ্ক্ষিত প্রথম

এই আসরেই একটি ‘প্রথম’ এর স্বাদ পায় পাকিস্তানও, বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে জয়! ওয়ানডে হোক বা টি-টোয়েন্টি, বিশ্বকাপে ১৩ বারের চেষ্টায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারাতে পারে পাকিস্তান।

দুবাইয়ে শুরুতেই দারুণ দুই ডেলিভারিতে ভারতের দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে সুর বেঁধে দেন পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদি। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ভারত করতে পারে ১৫১ রান। বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের উদ্বোধনী জুটিতেই তা পেরিয়ে যায় পাকিস্তান, ১৩ বল বাকি রেখে জয় ১০ উইকেটে!

এক আসরে তিন হ্যাটট্রিক

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ছয় আসর মিলিয়ে হ্যাটট্রিক ছিল স্রেফ একটি। ২০০৭ সালে প্রথম আসরে বাংলাদেশের বিপক্ষে এই স্বাদ পেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গতিময় পেসার ব্রেট লি। এবার এক আসরেই এমন কীর্তির দেখা মেলে তিনবার!

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন আয়ারল্যান্ডের কার্টিস ক্যাম্পার। তিনি অবশ্য এগিয়ে যান আরেক ধাপ। টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে করেন ‘ডাবল হ্যাটট্রিক’, টানা চার বলে নেন চার উইকেট।

এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই ওভার মিলিয়ে হ্যাটট্রিক করেন ভানিদু হাসারাঙ্গা। শ্রীলঙ্কার প্রথম বোলার হিসেবে এই সংস্করণের বিশ্বকাপে কীর্তিটি গড়েন এই লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার।

আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরপর তিন বলে তিন উইকেট নেন কাগিসো রাবাদা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়েন এই পেসার।

মেন্ডিসকে ছাড়িয়ে হাসারাঙ্গার রেকর্ড

আসরে নিজের শেষ বলে ডোয়াইন ব্রাভোকে আউট করে রেকর্ড বুকে নাম লেখান ভানিদু হাসারাঙ্গা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এক আসরে সবচেয়ে বেশি উইকেটের রেকর্ড গড়েন তিনি। ভেঙে দেন শ্রীলঙ্কারই সাবেক রহস্য স্পিনার অজান্তা মেন্ডিসের রেকর্ড।

শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ২০১২ সালের আসরে ৬ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়ে রেকর্ডটি গড়েছিলেন মেন্ডিস। গত আসরে আট ম্যাচে হাসারাঙ্গার উইকেট ১৬টি, ওভারপ্রতি মাত্র ৫.২০ রান দিয়ে।

মোহাম্মদ রিজওয়ান। ছবি: পিসিবি।

রিজওয়ানের অনন্য কীর্তি

প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এক পঞ্জিকাবর্ষে এক হাজার রান করার কীর্তি গড়েন মোহাম্মদ রিজওয়ান। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমি-ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার অ্যাডাম জ্যাম্পার বল স্লগ সুইপে ছক্কা মেরে মাইলফলক স্পর্শ করেন পাকিস্তানের এই কিপার-ব্যাটসম্যান।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এক পঞ্জিকাবর্ষে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটি তিনি গড়েন আগেই। ২০১৯ সালে আয়ারল্যান্ডের পল স্টার্লিংয়ের ৭৪৮ রান ছিল আগের রেকর্ড।

বিশ্বকাপে সুপার টুয়েলভের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে রিজওয়ান গড়েন আরেকটি রেকর্ড। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে এক পঞ্জিকাবর্ষে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডে ছাড়িয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের মহাতারকা ক্রিস গেইলকে। ২০১৫ সালে ৩৬ ইনিংসে ১ হাজার ৬৬৫ রান করে রেকর্ডটা গড়েন গেইল। তাকে ছাড়িয়ে যেতে রিজওয়ানের লাগে ৩৮ ইনিংস।

শাস্ত্রীর বিদায়, দ্রাবিড় অধ্যায় শুরু

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরই শেষ হয় ভারতের প্রধান কোচ হিসেবে রবি শাস্ত্রীর চুক্তির মেয়াদ। টুর্নামেন্ট চলার সময়েই তার জায়গায় রাহুল দ্রাবিড়কে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড-বিসিসিআই।

এর আগে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে বিবেচিত দ্রাবিড়। সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৯ দল ও ‘এ’ দলের কোচের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

ভারতীয় ক্রিকেটে দ্রাবিড়ের নতুন অধ্যায়ের শুরুটা হয় আলো ঝলমলে। দেশের মাটিতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর টেস্ট সিরিজও জেতে নেয় ভারত।

এজাজের ‘পারফেক্ট টেন’

ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিন ‘পারফেক্ট টেন’ নিয়ে ইতিহাসে নাম লেখান নিউ জিল্যান্ডের বাঁহাতি স্পিনার এজাজ প্যাটেল। টেস্ট ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় বোলার হিসেবে ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই স্পিনার নিজের জন্মশহর মুম্বাইয়েই ৪৭.৫ ওভার বোলিংয়ে ১১৯ রানে নেন ১০ উইকেট। ১৪৪ বছরের টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় সেরা বোলিং এটি, নিউ জিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা বোলিং।

এবারের আগে একাই কোনো বোলারের ১০ উইকেট টেস্ট ক্রিকেট দেখেছিল ১৯৯৯ সালে। সেটিও ছিল ভারতে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে ৭৪ রানে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন ভারতীয় লেগ স্পিনার কুম্বলে।

১০ উইকেটের চোখধাঁধানো কীর্তি টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দেখিয়েছিলেন জিম লেকার। ১৯৫৬ অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৫৩ রানে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন ইংলিশ অফ স্পিনার।

প্রথম দুই জন নিজেদের অমন কীর্তির ম্যাচ জয়ের রঙে রাঙালেও এজাজের হয় উল্টো অভিজ্ঞতা। প্রথম ইনিংসে স্রেফ ৬২ রানে গুটিয়ে যাওয়া নিউ জিল্যান্ড ম্যাচ হারে ৩৭২ রানের রেকর্ড ব্যবধানে। 

কোহলির নেতৃত্বের ব্যাটন রোহিতের হাতে

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর এই সংস্করণে ভারতের নেতৃত্ব ছাড়েন বিরাট কোহলি। তার জায়গায় রোহিত শর্মার অধিনায়কত্ব পাওয়া একরকম নিশ্চিতই ছিল। বিশ্বকাপের পর দেশের মাটিতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ভারতকে নেতৃত্ব দেন এই ওপেনার।

তখন অবশ্য তাকে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিসিসিআই পরিষ্কার করেনি। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দল ঘোষণার দিন সীমিত ওভারের দুই সংস্করণেই অধিনায়ক করা হয় রোহিতকে। ওয়ানডের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় কোহলিকে।

অজিঙ্কা রাহানের জায়গায় টেস্টের সহ-অধিনায়কও করা হয় রোহিতকে। লাল বলের ক্রিকেটে দেশের নেতৃত্ব চালিয়ে যাবেন কোহলি।

‘সেক্সটিং স্ক্যান্ডালে’ ক্রিকেট থেকে দূরে পেইন

অ্যাশেজ সিরিজ শুরুর সপ্তাহ তিনেক আগে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দেয় টিম পেইনের অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা। চার বছর আগের বিতর্কিত এক ঘটনা আচমকা সামনে চলে আসায় অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্ব ছেড়ে দেন এই কিপার-ব্যাটসম্যান।

২০১৭ সালে এক নারী সহকর্মীকে পেইনের অশ্লীল বার্তা ও ছবি পাঠানোর ঘটনা হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সংবাদমাধ্যমে এই বিতর্ক নাম পেয়ে গেছে ‘সেক্সটিং স্ক্যান্ডাল’। তারই জেরে গত ১৯ নভেম্বর নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন পেইন। ওই সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহ পর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দিতে ক্রিকেট থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরতিতে যান তিনি।

এবং অবসরে তারা

এই বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান বেশ কয়েক জন ক্রিকেটার। গত মে মাসে হুট করেই অবসরের ঘোষণা দেন শ্রীলঙ্কার অলরাউন্ডার থিসারা পেরেরা।

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট তখন বিবৃতিতে জানায়, তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ করে দিতে অবসর নিয়েছেন থিসারা। তবে ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো জানায়, লঙ্কান বোর্ড নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে থিসারাসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে ওই মাসের বাংলাদেশ সফরে ওয়ানডে সিরিজের দলে না রাখার কথা জানায়। এরপরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতি টানেন ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী এই অলরাউন্ডার।

২০০৯ সালে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পথচলা শুরু হয় থিসারার। এই সংস্করণে ১৬৬ ম্যাচ খেলে উইকেট নেন ১৭৫টি। এক সেঞ্চুরি ও ১০ ফিফটিতে রান করেন দুই হাজার ৩৩৮। ওয়ানডেতে ৮৪ ম্যাচে তার উইকেট ৫১টি। ৩ ফিফটিতে রান করেন এক হাজারের ওপরে। টেস্ট খেলেন তিনি স্রেফ ৬টি।

বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হেরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমি-ফাইনালে ওঠার আশা ভেস্তে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ডোয়াইন ব্রাভো।

২০০৪ সালে দেশের হয়ে অভিষেক হওয়া ব্রাভো ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রথমবার বিদায় বলে দেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে। পরের বছরের নভেম্বরে জানান টি-টোয়েন্টি দলে ফিরতে চাওয়ার কথা। তার সেই নতুন অধ্যায় শুরু হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দিয়ে। যার শেষটা হয় বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে।

অভিষেকের বছরই আইসিসির চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের স্বাদ পান ব্রাভো। ২০০৪ আসরের শিরোপাজয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৬৪ ওয়ানডে খেলে দুই সেঞ্চুরিতে ২ হাজার ৯৬৮ রানের পাশাপাশি তার উইকেট ১৯৯টি।

৪০ টেস্টে ৩ সেঞ্চুরিতে রান ২ হাজার ২০০ রান। ডানহাতি পেস বোলিংয়ে উইকেট ৮৬টি। আর ৯১ টি-টোয়েন্টিতে রান এক হাজার ২৫৫। উইকেট ৭৮টি। দেশের হয়ে তিনি জেতেন দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা।

টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই পেশাদার ক্রিকেটকে বিদায় জানান নেদারল্যান্ডসের ৪১ বছর বয়সী অলরাউন্ডার রায়ান টেন ডেসকাটে। টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডে খেলা নেদারল্যান্ডস উঠতে পারেনি সুপার টুয়েলভে। তিন ম্যাচের সবগুলোতেই হেরে বিদায় নেয় তারা। দলের মতো বিশ্বকাপ ভালো কাটেনি ডেসকাটেরও। প্রথম ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে পান গোল্ডেন ডাকের তেতো স্বাদ। নামিবিয়ার বিপক্ষে দলে থাকলেও পাননি ব্যাটিং। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জায়গা পাননি একাদশে।

শেষটা রাঙাতে না পারলেও নেদারল্যান্ডসের হয়ে স্মরণীয় সব পারফরম্যান্স আছে তার। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা এই ক্রিকেটার ৩৩ ওয়ানডে খেলে ৫ সেঞ্চুরিতে রান করেন ১ হাজার ৫৪১, ব্যাটিং গড় ৬৭। মিডিয়াম পেস বোলিংয়ে উইকেট ৫৫টি, চারটি করে উইকেট তিন ম্যাচে। টি-টোয়েন্টিতে ২৪ ম্যাচে ৫৩৩ রান ৪১.০০ গড় ও ১৩২.৯১ স্ট্রাইক রেটে। উইকেট ১৩টি। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটেও তার ক্যারিয়ার দারুণ সমৃদ্ধ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক