মেসির স্বপ্ন পূরণ ও ইতালির সিংহাসনে ফেরা, রাডুকানু বিস্ময়

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ছোবলে উল্টেপাল্টে যাওয়া ক্রীড়াঙ্গনে যা কিছু হওয়ার কথা ছিল আগের বছর, ঠাসা সূচিতে সবই হলো এবার। তাতে তুমুল ব্যস্ততাময় ১২ মাস পার করল ক্রীড়া বিশ্ব। বিশেষ করে ফুটবলে যেন হাফ ছাড়ার সময়টাও ছিল না খেলোয়াড়দের। সঙ্গে কোয়ারেন্টিন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। এত এত সমস্যার ভীড়েও খেলার মাঠ ছিল চেনা রূপে, লম্বা বিরতির পর গ্যালারিতেও ফেরে প্রাণ। সব মিলিয়ে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন অনেকটাই ছিল তার আপন মহিমায়।

আব্দুল মোমিনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 Dec 2021, 03:23 AM
Updated : 28 Dec 2021, 04:11 AM

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০২১ বেশ কিছু সাড়া জাগানো নতুনের জন্ম দিয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়টা হলো আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির অধরা শিরোপা জয়। ফুটবল বিশ্বে হঠাৎ করেই পিছিয়ে পড়া ইতালির উঠে আসা এবং ইউরোপের সিংহাসনে ফেরার গল্পটাও কম রোমাঞ্চকর ছিল না।

কেবল ফুটবলই বা কেন, অন্যান্য ক্রীড়াঙ্গনেও বছরটা ছিল ভীষণ ব্যস্তময়। করোনাভাইরাসের থাবায় আগের বছরের ভেস্তে যাওয়া সব বড় টুর্নামেন্টই যে একে একে মাঠে গড়ায় এবার। স্বাভাবিকভাবেই তাই জন্ম হয়েছে নতুন নতুন অনেক গল্পের, রেকর্ড ও পরিসংখ্যানের পাতায় যোগ হয়েছে নতুন অনেক নাম ও সংখ্যা।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে স্মৃতির ভেলায় ভেসে এক নজরে দেখা নেওয়া যাক ২০২১ এর আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন।

 

ফুটবল

মেসির স্বপ্ন পূরণ

ক্লাব ফুটবলে ভুরিভুরি রেকর্ড গড়া ও সব শিরোপা একাধিকবার জেতা মেসি কিছুতেই জাতীয় দলের হয়ে পাচ্ছিলেন না শিরোপার দেখা। তিনটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেও ব্যর্থতাকে সঙ্গী করার হতাশা ছিল। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপা খরা তো দিনে দিনে আরও লম্বাই হচ্ছিল। এদিকে, সময়টাও ফুরিয়ে আসছিল মেসির।

সব ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে আরাধ্য পালকের একটা যোগ করতে গত জুন-জুলাইয়ে নতুন করে অভিযানে নামেন মেসি। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আহামরি না হলেও প্রায় দুই বছর ধরে অপরাজিত থাকার আত্মবিশ্বাস সঙ্গী ছিল তাদের।

টুর্নামেন্ট জুড়েই মেসি ছিলেন দুর্দান্ত। গোল করে ও করিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন দলকে, তুলে আনেন ফাইনালে। শিরোপা লড়াইয়ে সামনে প্রতিপক্ষ ব্রাজিল, খেলাটাও আবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মাটিতে। তবে এই আর্জেন্টিনা কোনো কিছুতেই ভড়কে না যাওয়া এক দল। শিরোপা লড়াইয়ে তারই প্রতিচ্ছবি মেলে; প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে আনহেল দি মারিয়ার একমাত্র গোলে ২৮ বছর পর শিরোপা উৎসবে মাতে আর্জেন্টিনা। আর মেসি ভাসেন জাতীয় দলের হয়ে প্রথম শিরোপা জয়ের আনন্দে।

ইতালির ইউরোপ জয়

চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তারা। অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি। সেই তারাই কিনা ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।

২০১৭ সালের নভেম্বরে বাছাইপর্বের প্লে-অফে সু্ইডেনের বিপক্ষে হেরেছিল ইতালি। অনেকের চোখে, সেটি ইতালিয়ান ফুটবলের অন্ধকারতম অধ্যায়। পরের বছর দলটির দায়িত্ব নেন কোচ রবের্তো মানচিনি। তার হাত ধরে সত্যিকার অর্থেই যেন অজেয় হয়ে ওঠে ইতালি।

দলটিতে ছিল না কোনো মহাতারকা, এমনকি বড় কোনো তারকাও নয়। তাদের মূল শক্তি ছিল দলগত ফুটবল। সেই শক্তিতে ভর করেই নকআউট পর্বে একে একে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও ইতালিকে হারিয়ে ওঠে ফাইনালে। আর শিরোপা লড়াইয়ে তারা হারিয়ে দেয় টুর্নামেন্টের আরেক ফেভারিট ইংল্যান্ডকে।

দ্বিতীয়বারের মতো ইউরো জয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসে ইতালিয়ানরা।

বিশ্বকাপ বাছাই

আসছে বছরের শেষ দিকে বসবে ফুটবলের মহারণ, কাতার বিশ্বকাপ। চলছে তারই জোর প্রস্তুতি। ইউরোপের বাছাইপর্বের মূল ধাপ শেষ হয়ে গেছে, ১০ গ্রুপের সেরা হয়ে টিকেট নিশ্চিত করেছে ১০ দল।

তবে জুলাইয়ের ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালি বাছাইপর্বে এসে আবারও যেন পথ হারাতে বসেছে। সরাসরি বিশ্বকাপে ওঠার জোর সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ দুই ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে আবারও বিশ্বকাপ খেলতে না পারার শঙ্কায় পড়ে গেছে তারা।

ইউরোপ থেকে প্লে-অফ পেরিয়ে আরও তিনটি দল সুযোগ পাবে কাতার বিশ্বকাপে। তবে এই অঞ্চলের বাছাইয়ে নতুন ধারার প্লে-অফে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে ইতালি ও পর্তুগাল। দল দুটি একই গ্রুপে পড়ায় তাদের মধ্যে একটি দলই সুযোগ পাবে কাতারে পা রাখার।

কে পাবে কাতারের টিকেট, জানা যাবে আগামী বছরের মার্চে।

৭ বছর পর আবার আতলেতিকোর জয়গান

লা লিগার ইতিহাসে আতলেতিকো মাদ্রিদ সবসময়ই অন্যতম বড় দলের তকমা পেয়ে আসছে, তবে কখনই তারা পরাশক্তি হতে পারেনি। ২০১১ সালে আর্জেন্টাইন কোচ দিয়েগো সিমেওনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে বটে, কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার সঙ্গে সেভাবে পেরে ওঠে না।  

তবে মাঝে মধ্যে দেখা যায় ঝলক। এই যেমন এবার গত এক দশকে দ্বিতীয়বারের মতো চমক দেখিয়ে স্পেনের শীর্ষ লিগ জিতে নেয় দলটি। মৌসুমের প্রথমভাগে রিয়াল ও বার্সেলোনার ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিপরীতে নিজেরা জয়রথে চেপে অনেকটা এগিয়ে যায় আতলেতিকো।

একটা সময় তো মনে হচ্ছিল, কয়েক রাউন্ড হাতে রেখেই শিরোপা উৎসব সারবে তারা। তবে শেষ ধাপে তাদের পথ হারানোয় লড়াই জমিয়ে রিয়াল ও বার্সেলোনা। একেবারে শেষ দিকে কাতালান ক্লাবটি আবারও ব্যর্থতায় গা ভাসালে শেষ রাউন্ড পর্যন্ত শিরোপা লড়াইটা ছিল মাদ্রিদের দুই দলের মধ্যে। শেষ তিন ম্যাচে টানা জিতে মুকুট পরে সিমেওনের শিষ্যরা।

সিটির শিরোপা পুনরুদ্ধার

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে গত দশকের সবচেয়ে সফল দল ম্যানচেস্টার সিটি ২০১৯-২০ মৌসুমে লিভারপুলের দোর্দন্ড প্রতাপের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তবে গত মৌসুমে আবারও লিগ শিরোপা পুনরুদ্ধার করে সিটি।

আসর জুড়ে দারুণ ধারাবাহিক সিটিকে বাস্তবিক অর্থে কোনো দলই তেমন চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেনি। রানার্সআপ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চেয়ে ১২ পয়েন্টে এগিয়ে লিগ শেষ করে পেপ গুয়ার্দিওলার দল।

গোলমেশিন লেভার কাঁধে বায়ার্নের টানা নবম

বুন্ডেসলিগায় টানা নবম শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে দারুণ শুরুর ধারাবাহিকতা মৌসুম জুড়ে ধরে রাখে বায়ার্ন মিউনিখ। দলকে কক্ষপথে রাখতে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় গোল করতে থাকে রবের্ত লেভানদোভস্কি।

আসরে দলের ৩৪ ম্যাচের মধ্যে ২৯টি খেলেই ৪১ গোল করে ভেঙে দেন এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড; ভেঙে দেন জার্ড মুলারের ৪৯ বছরের পুরনো রেকর্ড। জিতে নেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু।

গোলমেশিন পোলিশ তারকার নৈপুণ্যে মৌসুম শেষের আগেই শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলে বায়ার্ন। রানার্সআপ লাইপজিগের চেয়ে ১২ পয়েন্ট বেশি নিয়ে আসর শেষ করে তারা।

টানা দশমের লক্ষ্যেও একই ছন্দে এগিয়ে চলেছে বায়ার্ন এবং তাদেরকে সামনে থেকে পথ দেখাচ্ছেন লেভানদোভস্কি। ২০২১-২২ আসরে এখন পর্যন্ত ১৬ ম্যাচ খেলে ১৮ গোল করে ফেলেছেন এই পোলিশ তারকা। 

ইউভেন্তুসের পথ হারানো

দলে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো মহাতারকা ছিলেন। তার সঙ্গে আক্রমণভাগে আরও ছিলেন পাওলো দিবালা, কার্যকরী ফেদেরিকো বের্নারদেস্কি। রক্ষণে লিওনাদোর্ বোনুচ্চি ও জর্জো কিয়েল্লিনির মতো অভিজ্ঞ সেনানী। সব মিলিয়ে টানা দশম শিরোপা সেরি আ জয়ের সব রসদই ছিল।

কিন্তু মৌসুমের শুরু থেকেই যে পথ হারানোর শুরু, সেখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা। একের পর এক হোঁচটে তো শীর্ষ চারে থেকে লিগ শেষ করতে পারা নিয়েই শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিল দলটি। শেষ তিন রাউন্ড জিতে কোনোমতে চতুর্থ হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা নিশ্চিত করে তুরিনের ক্লাবটি।

ইতালির শীর্ষ লিগে দলগতভাবে মৌসুমটা ভালো না কাটলেও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে উজ্জ্বল ছিলেন রোনালদো। ৩৩ ম্যাচে ২৯ বার জালে বল পাঠিয়ে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন পর্তুগিজ তারকা। গড়েন প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ও সেরি আয় আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড।

পিএসজির শিরোপা হাতছাড়া

ইউভেন্তুসের মতো অতটা ছন্দপতন না হলেও ঘরোয়া লিগে পিএসজিরও মৌসুমটা কাটে হতাশায়। দলে তারকার উপস্থিতি ও কাগজে-কলমে শক্তির বিচারে তাদের ধারে কাছে ছিল না ফরাসি লিগটির কোনো ক্লাব। কিন্তু ড্রেসিং রুমের শক্তি মাঠে তো মেলে ধরতে হবে। সেই কাজটিই ধারাবাহিকভাবে করতে পারেনি তারা্।

তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে থাকে লিল। শেষভাগে গিয়ে নিয়ন্ত্রণই চলে যায় তাদের হাতে। শেষ রাউন্ডে গড়ানো শিরোপা লড়াইয়ে জিতে উৎসব করে দলটি। হতাশায় ভেঙে পড়ে প্যারিসের ক্লাবটি।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসির বিস্ময়

বছরের শুরুতেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা লড়াইয়ে চেলসির পক্ষে বাজি ধরার লোক ছিল না তেমন। ঘরোয়া লিগেই যে ধুঁকছিল তারা। তবে টমাস টুখেলের হাত ধরে আমূল বদলে যায় দলটি।

দারুণ পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় শেষ ষোলোয় আতলেতিকো মাদ্রিদকে, কোয়ার্টার-ফাইনালে পোর্তোকে ও সেমি-ফাইনালে রেকর্ড ১৩ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় চেলসি।

ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ম্যানচেস্টার সিটি, সেখানেও ফেভারিটের তকমাটা ছিল পেপ গুয়ার্দিওলার দলের গায়েই। তবে তাদেরকেও পেছনে ফেলে শিরোপা উঁচিয়ে ধরে টুখেলের চেলসি।  

আলোচিত দলবদল

ইউরোপীয় ফুটবলে গ্রীষ্মের দলবদল মানেই যেন অর্থের ঝংকার আর খেলোয়াড়দের নিয়ে কাড়াকাড়ি। তবে এবারের গল্পটা একটু ভিন্ন। করোনাবাইরাস মহামারীতে অনেক ক্লাবেরই অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তাই গ্রীষ্মের ‘ফুটবল বাজারে’ তেমন কোনো চমক দেখা যাবে না বলেই ধারণা ছিল অনেকের।

তবে বাস্তবে যা হলো তা বুঝি কল্পনাতেও ছিল না কারো। মহামারীর ধাক্কায় সবচেয়ে বড় মাশুল যেন দিতে হয় বার্সেলোনাকে। অবশ্য আগের কয়েক মৌসুমের বেহিসেবী খরচও তাদের পতনে প্রভাব ফেলে। আর্থিক দৈনতা ও লা লিগার ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লের বাধায় লিওনেল মেসির সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে ব্যর্থ হয় ক্লাবটি।

ফলে একসময় যা ছিল অবিশ্বাস্য, সেটাই হয়ে যায় সত‍্যি। বার্সেলোনার সঙ্গে দীর্ঘ ২১ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন হয় মেসির আর সুযোগ বুঝে বাজিমাত করে পিএসজি। ফ্রি ট্রান্সফারে এই মহাতারকা প‍্যারিসে নিয়ে আসে তারা।

কেবল মেসি নয়, আগে থেকেই তারকাসমৃদ্ধ পিএসজি ফ্রি ট্রান্সফারে দলে সের্হিও রামোসকে, ইউরোর সেরা গোলরক্ষক জানলুইজি দোন্নারুম্মা, মিডফিল্ডার জর্জিনিয়ো ভেইনালডামকে। সব মিলিয়ে পিএসজি এখন যেন সত্যিই এক তারার মেলা!

এবারের দলবদলের নাটকীয়তা অবশ্য ওখানেই শেষ নয়। শেষ দিকে গিয়ে আরেক চমক হয়ে আসে রোনালদোর ঠিকানা বদল। আসল ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকে শোনা যাচ্ছিল ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন তিনি। তবে একরকম হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে হাজির হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ইউভেন্তুস ছেড়ে পাঁচবারের বর্ষসেরা ফুটবলার ফেরেন পুরনো ক্লাবে।

রোনালদোর রেকর্ড রাঙা বছর

প্রিমিয়ার লিগে বৃহস্পতিবার আর্সেনালের বিপক্ষে জোড়া গোলের পথে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে ৮০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। ছবি: রয়টার্স

বছরের শুরুতেই নতুন এক চূড়ায় উঠে বসেন রোনালদো। গত ১১ জানুয়ারি সেরি আয় সাস্সুয়োলোর জালে বল পাঠিয়ে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৭৫৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি। উঠে বসেন ইয়োসেপ বিকানের পাশে।

যদিও রেকর্ডটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে যথেষ্ট। আনঅফিসিয়াল পরিসংখ্যানবিদদের সংগঠন ‘আরএসএসএসএফ’-এর হিসাব অনুযায়ী, সাবেক অস্ট্রিয়া ও তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার স্ট্রাইকার ইয়োসেফ বিকান কমপক্ষে ৮০৫ গোল নিয়ে আছেন তালিকায় সবার ওপরে। তবে এই সংখ্যাকে বিবেচনায় নিলেও সেটাকে ছাপিয়ে যাওয়ার খুব কাছে পৌঁছে গেছেন তিনি। এখন তার ক্যারিয়ার গোল ৮০২টি।

ইউরোর গত আসরেও বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। যৌথভাবে আসরের সর্বোচ্চ পাঁচ গোল করার পথে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইরানের কিংবদন্তি আলি দাইয়ের ১০৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন তিনি। দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ফিরে রেকর্ডটাকে নিজের করে নেন পর্তুগাল অধিনায়ক।

ওই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ আরও কয়েকটি কীর্তি গড়েন তিনি। প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৪) হওয়ার পাশাপাশি ও ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে সর্বোচ্চ (২১) গোলের রেকর্ডও এখন তার দখলে।

ব্যালন ডি’অরে সপ্তম স্বর্গে মেসি

ব্রাজিলকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে বর্ষসেরা ফুটবলার হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে যান মেসি। মৌসুম জুড়ে দুর্দান্ত সময় কাটানো রবের্ত লেভানদোভস্কির সম্ভাবনাও ছিল বেশ।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য মেসির সঙ্গে পেরে ওঠেননি পোলিশ তারকা। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্যারিসে এক জমকালো অনুষ্ঠানে ২০২১ ব্যালন ডি’অর জয়ী হিসেবে আর্জেন্টাইন তারকার নাম ঘোষণা করা হয়। বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারটি বেশিবার জয়ের রেকর্ডটি আগে থেকেই মেসির দখলে, সেটা আরও বেড়ে হলো ৭।

টোকিও অলিম্পিক

বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে পূর্ব নির্ধারিত ২০২০ সালে সম্ভব হয়নি আয়োজন। এক বছর পিছিয়ে যাওয়ার পরও আসরটি পড়তে বসেছিল করোনাভাইরাসের কবলে। কঠোর নিয়মনীতির পরও অলিম্পিক ভিলেজে ছড়িযে পড়ে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি।

জাপানের জনগণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও টোকিও অলিম্পিকস আরেক দফা স্থগিতের পক্ষে আওয়াজ উঠতে থাকে। তবে ‘বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি’ শঙ্কায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্টটি আয়েজনে বদ্ধপরিকর ছিল আয়োজকরা। ফলে ঠিক সময়েই মাঠে নামে অ্যাথলেটরা।

অবশ্য মাঠের লড়াই শুরুর পর উড়ে যায় সব শঙ্কা, যোগ হয় ক্রীড়া উন্মাদনা।

প্রায় পুরোটা সময় পর্যন্ত সোনার পদক জয়ে চীন এগিয়ে থাকলেও শেষে গিয়ে পাল্টে যায় হিসেব। শেষ দিনে তিন সোনা জিতে পদক তালিকায় শীর্ষে থেকেই আসর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। ৩৯ সোনা, ৪১ রুপা ও ৩৩টি ব্রোঞ্জসহ মোট ১১৩টি পদক জেতে দেশটি।

চীনের সোনা ৩৮টি। সঙ্গে ৩২টি রুপা ও ১৮টি ব্রোঞ্জসহ তাদের প্রাপ্তি মোট ৮৮টি পদক।

অলিম্পিকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট ১০০ মিটার স্প্রিন্টে বিস্ময়ের জন্ম দেন মার্সেল জেকবস। ৯ দশমিক ৮০ সেকেন্ড সময় নিয়ে সেরা হন এই ইতালিয়ান। ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিকসের গ্রেট ব্রিটেনের লিনফোর্ড ক্রিস্টির পর দ্বিতীয় ইউরোপিয়ান হিসেবে এবং প্রথম ইতালিয়ান হিসেবে এই কীর্তি গড়েন জেকবস।

আর দ্রততম মানবীর মুকুট পরেন এলেইন টম্পসন। মেয়েদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ১০ দশমিক ৬১ সেকেন্ড সময় নিয়ে সেরা হন এই জ্যামাইকান।

টেনিস

আশা জাগিয়েও হতাশায় শেষ জোকোভিচের

বছরের শুরুতে নোভাক জোকোভিচের অর্জনের থলিতে ছিল ১৭টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা। তার চেয়ে তিনটি বেশি জিতে যৌথভাবে রেকর্ডের মালিক ছিলেন রজার ফেদেরার ও নোভাক জোকোভিচ। জুলাইয়ে তাদের পাশে নাম লেখান জোকোভিচ।

বছরের শুরুতে রেকর্ড নবমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের পর জুনে তিনি উঁচিয়ে ধরেন ফরাসি ওপেন। এর পরের মাসেই উইম্বলডন জেতেন তিনি।

সম্ভাবনা জাগে ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের। গত সেপ্টেম্বরে ইউএস ওপেনের ফাইনালেও ওঠেন সার্বিয়ান তারকা। তবে তাকে সরাসরি সেটে উড়িয়ে ক্যারিয়ারে প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন দানিল মেদভেদেভ।

নারী এককে ৪ নতুন চ্যাম্পিয়ন ও রাডুকানু বিস্ময়

নারী এককে বছরের চার গ্র্যান্ড স্ল্যামই দেখে আলাদা চার চ্যাম্পিয়ন। এর মধ্যে দুজনই পান ক্যারিয়ারে প্রথম মেজর জয়ের স্বাদ।

অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের জেনিফার ব্র্যাডিকে সরাসরি সেটে উড়িয়ে দেন নাওমি ওসাকা। প্রতিযোগিতাটিতে এই জাপানিজ তারকার এটি দ্বিতীয় ও ক্যারিয়ারে চতুর্থ গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা।

ফরাসি ওপেনের ফাইনালে ওঠেন ক্যারিয়ারে প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের লক্ষ্যে থাকা বারবোরা ক্রেইচিকোভা ও আনাস্তাসিয়া পাভলিউচেনকোভা। সেখানে রুশ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে বাজিমাত করেন চেক রিপাবলিকের ক্রেইচিকোভা।

ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো উইম্বলডনের ফাইনালে উঠেছিলেন কারোলিনা প্লিসকোভা ও অ্যাশলি বার্টি। তিন সেটের লড়াইয়ে জিতে ৪১ বছরে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান নারী হিসেবে উইম্বলডন এককে চ্যাম্পিয়ন হন বার্টি।

নারী টেনিসের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চটা যেন তোলা ছিল ইউএস ওপেনের জন্য। বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যামটি শুরুর আগে যাকে বলতে গেলে কেউই জানতো না, চিনতো না, এমা রাডুকানু নামের ওই তরুনীই ইতিহাস গড়েন। প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্টটি খেলতে এসেই শিরোপা উঁচিয়ে ধরেন এই ব্রিটিশ।

বাছাইপর্বের তিনটিসহ ১৭ দিনের মধ্যে মোট ১০ ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হন রাডুকানু। গ্র্যান্ড স্ল্যামের ইতিহাসে বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে শিরোপা জয়ের ইতিহাস গড়েন তিনি। ১৯৭৭ সালে উইম্বলডনে ভার্জিনিয়া ওয়েডের পর কোনো মেজরের নারী এককে ট্রফিজয়ী পায় ব্রিটেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক