৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সেতু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

বছর সাতেক আগের কথা। একদিনের ছুটি নিয়েছি। জরুরি কাজে যাচ্ছি বাসা থেকে শতাধিক কিলোমিটার দূরের শহরে। রওনা দিয়েছি অফিস সময় শুরু হওয়ার বেশ অনেক পরে। এই সময়টা মহাসড়ক ফাঁকা থাকে। গন্তব্যের কাছাকাছি আসতে হঠাৎ দেখি পুলিশের রাস্তা অবরোধ ।

এ বি এম কামরুল হাসান, ব্রুনাই থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 July 2022, 03:59 AM
Updated : 3 July 2022, 09:16 AM

লম্বা লাইন। পুলিশ নম্বর প্লেট দেখে দেখে গাড়ি পাশের ফাঁকা জায়গায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। এবার আমার পালা। আমাকেও পাশের ফাঁকা জায়গাটা দেখিয়ে দিলো।

আমি সেখানে পার্কিং করে চলে এলাম তাঁবুর কাছে। অস্থায়ী এই তাঁবুতে তিনটি টেবিল নিয়ে বসে আছে তিন তরুণী। মাঝের তরুণীর সামনের চেয়ারে বসে পড়লাম। জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনার গাড়ির প্লেট নম্বর কত?” জানালাম।

এবার বললো, “আপনি ১২৮ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আপনার জরিমানা ৫০ ডলার।”

তখন প্রতি ব্রুনেই ডলারে প্রায় ৬০ বাংলাদেশি টাকা পাওয়া যেত। আমার গাড়ির স্পিড কিভাবে জানলেন প্রশ্ন করায় তরুণীটি জানালেন, “দূরে কোন একটি গোপন স্থানে স্পিড রাডার ক্যামেরা বসানো রয়েছে। সেখান থেকে আমরা এ তথ্য পেয়েছি।”

কত গতি উঠলে জরিমানার পরিমাণ- কী সে প্রশ্ন করায় তরুণী জানালেন, ১১০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার ৫০ ডলার, ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার ১০০ ডলার। ১৪০ এর উর্ধ্বে দেড়শ ডলার।

তরুনীটি বললো, “আপনি চাইলে এখন পরিশোধ করতে পারেন। আবার পরেও করতে পারেন।

আমি বললাম, “আমার ১০০ ডলার লাভ হয়েছে। এই আনন্দে আমি এখুনি পরিশোধ করতে চাই।”

তরুণী কৌতুহল নিয়ে বললো, “কিভাবে?”

বললাম, “মাঝে কোথাও আমি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি স্পিডে ছিলাম। সেখানে তোমাদের গোপন ক্যামেরা বসালে আজ আমার জরিমানা হত দেড়শ ডলার।”

এবার তিন তরুণীই শব্দ করে হেসে দিলেন।

তেরো বছরের প্রবাস জীবনের এই একবারই উচ্চগতির জন্য জরিমানা দিয়েছি। এরপর থেকে মনের মধ্যে একটা ভয় ঢুকে গেছে। সব সময় মনে হয় এই বুঝি কোথাও গোপন রাডার ক্যামেরা লুকানো রয়েছে। তাছাড়া হরহামেশাই রাডার ক্যামেরা গোপনে বসিয়ে পুলিশের রাস্তা ব্লক চলে এদেশে, মাসে অন্তত দুই-তিনবার।

কোভিড এর শুরুতে ব্রুনেইতে সমুদ্রের উপর নির্মিত ৩০ কিলোমিটার লম্বা একটি সেতু চালু হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে বে অব ব্রুনেই এর একটি অংশ দেশের একটি জেলার মূল ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।

সেতু চালু হবার আগে বিচ্ছিন্ন জেলার জনগণ সড়ক পথে মালয়েশিয়ার সারাওয়াক প্রদেশের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতো। যাওয়া-আসা মিলে আট বার ইমিগ্রেশন পার হতে হতো। বিকল্প যাতায়াত ছিল নদীতে। সেটাও ছিল সময়সাপেক্ষ। বিরূপ আবহাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ।

কোভিড এর শুরুতে  সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। বিপত্তিতে পড়েন টেম্বুরং নামের সেই বিচ্ছিন্ন জেলার  জনগণ। তখন নির্ধারিত সময়ের বেশ কয়েক মাস আগে বিশ্বের ১৯তম দীর্ঘ এই সেতুটি খুলে দেয়া হয়। তবে সেটা সীমিত সময়ের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি।  কারণ কাজ তখনো অসম্পূর্ণ।

সিসিটিভি ও বৈদ্যুতিক সংযোগ তখনো শেষ হয়নি।  মাস দুয়েকের মধ্যে সিসিটিভি সংযোগ লেগে গেলো।  সেতুর দুই পাশে প্রতি ষষ্ঠ বৈদ্যুতিক খুঁটিতে একটি করে বেশ বড় মাপের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। তার মানে, প্রতি তিন নম্বর খুঁটির দূরত্ব অন্তর অন্তর হয় এপাশে নতুবা অন্যপাশে একটি করে ক্যামেরা আছে ।

কিছুদিন পর স্থানীয় সংবাদপত্রে একটি খবর দেখলাম। সাথে ছবি। ছবিগুলো সেতুর সিসিটিভি ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করে নেয়া। একজন ব্যক্তি সেতুর উপরে গাড়ি থামালেন। গাড়ির পেছনের অংশ খুললেন। তারপর একটি ময়লার ব্যাগ বের করে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেললেন। তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে সেটা ওই সংবাদের উপজীব্য।

এমনিতে এদেশের জনগণ আইনের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। সেতুটি খুলে দেয়ার পর আমি গত দুই বছরে প্রায় দুই ডজন বার আসা যাওয়া করেছি। নাট বল্টু খোলা বা প্রাকৃতিক কর্ম করা দূরের কথা, সেলফি তোলা দূরের কথা, কাউকে সেতুতে গাড়ি থামাতে দেখিনি। সার্বক্ষণিক ক্যামেরাগুলো মনিটরিং চলছে। যদি কেউ সেতুতে থেমেছে, অমনি সেতুর ওপর প্রান্ত আর অতিক্রম করা লাগবে না। সেতুতে প্রবেশ ও বেরোনোর মুখে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে। সেতুতে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার।  এই সেতুর ক্যামেরাগুলোর দিকে তাকালেই আমার ৫০ ডলার জরিমানা দেয়ার কথা মনে পড়ে। তাই ভুলেও সেটা অতিক্রম করি না।

দেশের পত্র-পত্রিকায় দেখলাম, আমাদের পদ্মা সেতুতে প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হবে। খুবি আশান্বিত হলাম। সাথে স্পিড গান ক্যামেরা থাকছে। অনেকে এটিকে স্পিড রাডার ক্যামেরাও বলে। কোনো যানবাহন নির্ধারিত গতির বেশি গতিতে চললে রাডার ক্যামেরা থেকে লেজার রশ্মি বের হয়। দ্রুতযানের গতি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে যায়। তারপর জরিমানা আদায় ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পদ্মা সেতুতে যত দ্রুত সিসিটিভি ক্যামেরা ও স্পিড রাডার ক্যামেরা স্থাপন করা যায়, ততই মঙ্গল।

লেখক: ব্রুনেই প্রবাসী চিকিৎসক এবং কলামনিস্ট।

ইমেইল: drkamrul@gmail.com

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক