কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি ২৮: 'এক্সপ্রেস এন্ট্রি' মানে কি বর্ধিত ফি'তে এক্সপ্রেস সার্ভিস?

সুদূর অস্ট্রেলিয়া হতে আটাশ বছর বয়সী বাংলাদেশি যুবক জাকির (ছদ্মনাম) ফোন দিয়ে জানতে চাইলেন কানাডা ইমিগ্রেশনে এক্সপ্রেস এন্ট্রি মানে কী? সঙ্গত কারণেই আমি জানতে চাইলাম- এ তথ্য তার কেন দরকার? 

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 June 2022, 05:26 PM
Updated : 26 June 2022, 05:26 PM

জানা গেল, তিনি প্রায় দুই বছর আগে কানাডার ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট পরিচয়ধারী খালেক (ছদ্মনাম) নামের একজনকে তিন হাজার ডলার দিয়েছিলেন কানাডায় পিআর (পারম্যানেন্ট রেসিডেন্ট)- এর আবেদন দাখিল করতে।

পরে আরও তিন হাজার ডলার দিয়েছিলেন এ কাজে। কিন্তু, দুই বছর চলে গেলেও ভালোমন্দ কোন ফল না পাওয়ায় হতাশ হয়ে খালেক সাহেবের কাছে জানতে চান তার আবেদনে সিদ্ধান্ত হতে এতো দেরি কেন হচ্ছে?

প্রত্যুত্তরে খালেক সাহেব তাকে জানিয়েছেন, এক্সপ্রেস এন্ট্রি, অর্থাৎ, দ্রুত কাজ করাতে চাইলে আরও দুই হাজার ডলার লাগবে। 

জাকির তখন জিজ্ঞাসা করেন, “এই এক্সপ্রেস সার্ভিসের কথা আমাকে আগে জানালেন না কেন?”

খালেক উত্তর দেন, “আপনার খরচ বাঁচাতে চেয়েছিলাম; তাই, তখন বলিনি। তাছাড়া, আপনি যে এক্সপ্রেস সার্ভিস চাচ্ছেন এটা তো আমাকে বলেননি।”

যাক, দুই দফায় ছয় হাজার ডলার দেবার পর দুই বছর অপেক্ষা করেও ভালোমন্দ ফল না পাওয়ায় তাকে নতুন করে টাকা দিতে জাকির আগ্রহ হারিয়েছেন। 

ইতোমধ্যে, পত্রিকায় আমার কানাডা অভিবাসন বিষয়ে লেখা পড়ে বিষয়টার বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করলেন তিনি। 

প্রসঙ্গত বলা দরকার, এই খালেক সাহেবের নাম আমি এর আগেও শুনেছি। তিনি মাঝে মাঝে ঢাকায় গিয়ে সভা-সেমিনার করে নিজেকে কানাডার ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট দাবি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে কানাডায় কয়েকমাস আত্মগোপন করে থাকেন। 

কানাডায় এবং দেশে বসবাসরত একটা শিক্ষিত প্রতারক চক্র তাকে এ বিষয়ে সাহায্য সহযোগিতা দেন। তিনি থার্ড পার্টি বা তৃতীয় পক্ষ ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের কাজটি করেন বলে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনাও সহজ নয়। 

এই খালেক সাহেবের খপ্পরে পড়েছেন সহজ সরল জাকির। আলাপে জানলাম, জাকিরের বাবা-মা দুইজনই ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক এবং তিনি তাদের একমাত্র ছেলে। 

যাক, প্রশ্ন হলো কানাডা ইমিগ্রেশনের এক্সপ্রেস এন্ট্রি সিস্টেম কি আসলে 'এক্সপ্রেস সার্ভিস' এর মতো কিছু? বা, বাড়তি ফি দিয়ে কি এক্সপ্রেস এন্ট্রি সিস্টেম' এর সুবিধা নেওয়া যায়? 

আপনারা জানেন, বাড়তি ফি দিয়ে ত্বরিৎ সেবা নেওয়ার একটি ব্যবস্থা বিভিন্ন সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চালু আছে। যেমন ধরুন, বাড়তি ফি দাখিল করে দ্রুত প্রসেসিং সুবিধা পেতে পাসপোর্ট করার আবেদন জমা দেয়া যায় এবং অনেকে সে সুবিধা নেনও। এটা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু, কানাডার এক্সপ্রেস এন্ট্রিতে ফাইল প্রসেসিং আদৌ তেমন কিছু নয়। এক্সপ্রেস এন্ট্রি তাহলে কী?

সত্য হলো, এটা বিশেষ ধরনের ইমিগ্রেশন আবেদনের জন্য একটি বিশেষ ফাইল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের বেশি কিছু নয়। 

কানাডার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে কানাডাকে বহির্বিশ্ব হতে বাধ্য হয়ে ওয়ার্কার বা কর্মী ইমিগ্রেশন এর মাধ্যমে নিয়ে আসতে হয়। কানাডার স্বার্থেই এটা দরকার। 

এসব অতি দরকারি মানুষকে কানাডা নিয়ে আসার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এক বিশেষ সিস্টেম বা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যার নাম ‘এক্সপ্রেস এন্ট্রি সিস্টেম’। এই ফাইল প্রসেসিং সিস্টেম এর আওতায় শতকরা আশিভাগ আবেদন অনধিক ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়। এখানে বাড়তি ফি এর কোন বিষয় নেই। অর্থাৎ, খালেক সাহেব আরো দুই হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়ার জন্য এক্সপ্রেস এন্ট্রি সিস্টেমকে ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘এক্সপ্রেস সার্ভিস’ বলে ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন জাকিরের কাছে। 

কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এক্সপ্রেস এন্ট্রি সিস্টেম এর আওতায় কোন বিশেষ আবেদন বা ফাইল বিবেচনা করা হবে- তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে দিয়েছে। এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী আবেদনকারী যেমন আছেন, ঠিক তেমনি অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত টেকনিক্যাল কাজ জানা মানুষের সুযোগও রয়েছে। 

প্রথম ধাঁচের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আইইএলটিএস এ কমপক্ষে ছয় পেতে হয়, আর অন্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা কম হলেও চলে। ভাষায় দক্ষতার এ তারতম্যের কারণ হলো, উঁচু পর্যায়ের প্রফেশনাল কাজ, যেমন, ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, প্রফেসর, ইত্যাদিতে কাজ করতে যে মাত্রায় ভাষা ব্যবহার করতে হয় অন্যকাজে ভাষার ব্যবহার সে পর্যায়ে প্রয়োজন পড়ে না। 

এক্সপ্রেস এন্ট্রি সম্পর্কে আরেকটু গভীরে যাওয়া এ লেখায় অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

তিন ধরনের ইমিগ্রেশন প্রোগ্রাম এক্সপ্রেস এন্ট্রি সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়: ১. কানাডিয়ান এক্সপেরিয়ান্স ক্লাস, ২. ফেডারেল স্কিল্ড ওয়ার্কার প্রোগ্রাম, এবং ৩. ফেডারেল স্কিল্ড ট্রেইডস প্রোগ্রাম।

নিচের ওয়েব লিংক (https://onlineservices-servicesenligne.cic.gc.ca/c2c/eapp.do 

ব্যবহার করে ঘরে বসেই যাচাই করে নিতে পারেন আপনি এক্সপ্রেস এন্ট্রিতে আবেদনের যোগ্য কিনা:

এবার শুনুন এক্সপ্রেস এন্ট্রিতে (ইই) প্রোফাইল খুললে কী হয় তা নিয়ে।

কানাডার ইকোনোমিক ইমিগ্রেশন সাধারণভাবে পয়েন্টভিত্তিক। আপনার বয়স, শিক্ষা, কাজের ধরন ও অভিজ্ঞতা, ভাষায় দক্ষতা, ইত্যাদি বিবেচনায় এনে পয়েন্ট হিসেবে করা হয়।

এক্সপ্রেস এন্ট্রি প্রোফাইল খুলে তা সাবমিট করার পর পয়েন্টের র‌্যাংকিংয়ে উপরের দিকে থাকলে কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আপনাকে পিআর আবেদন দাখিলে আহ্বান জানাতে পারে। এভাবে, এক্সপ্রেস এন্ট্রি খোলার অর্থ আপনি নিজেকে কানাডায় অভিবাসনের একটা সম্ভাবনা-বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করলেন।

এক্সপ্রেস এন্ট্রিতে প্রোফাইল খোলার সময় কোনপ্রকার অনুমানভিত্তিক বা ভুল তথ্য দেবেন না। যেমন ধরুন, আপনার হাতে এখনও কোন আইইএলটিএস স্কোর নাই, কিন্তু আপনি নিশ্চিত যে পরীক্ষা দিলে আপনি সাত বা তার উপরেই পাবেন। এ ধারণায় আপনি প্রতি ব্যান্ডে সাত অনুমান করে প্রোফাইল খুললেন, এবং ভাগ্যক্রমে কানাডার ইমিগ্রেশন অফিস হতে পিআর এর আবেদন দাখিলের ডাকও পেলেন। এ অবস্থায় আপনি কি পিআর আবেদন দাখিল করতে পারেন? সহজ উত্তর, 'না।' 

তাহলে এক্সপ্রেস এন্ট্রি প্রোফাইল খুলে কোনও কাজ হলো কী! প্রোফাইলে অন্যসব তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি খাটে। 

যাক, এ লেখা আর দীর্ঘ না করি। কানাডায় পড়াশোনা, বা অভিবাসন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে।

তবে, বর্তমান পর্বসহ এ সিরিজের অন্য পর্বগুলোতে কানাডা ইমিগ্রেশন বিষয়ে যে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে, তা যেন কোনওভাবেই আইনি পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করা না হয়। কারণ, সুনির্দিষ্ট আইনি পরামর্শ দেওয়া হয় ব্যক্তিগত সাক্ষাতে, সাধারণ আলোচনায় নয়। মনে রাখবেন, প্রত্যেকের ইমিগ্রেশন কেইসই কোনও না কোনওভাবে আলাদা। তাই, একই ধরনের সমাধান সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম- এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার নতুন নতুন লেখা পড়তে। ভবিষ্যতে আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের প্রত্যাশা নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com; / ফেইসবুক: ML Gani

এ সিরিজের বাকি লেখা:

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক