সুইডেনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ঘিরে কিছু গল্প

শৈশবে বাবার হাত ধরে গ্রামের বাজারে যেতাম। ছোট বড় সবাই তাকে 'স্যার' সম্বোধন করতো। বাবার প্রতি সবার স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান দেখে মনে হতো আমরা যেন অন্য জগতের কেউ।

রাবেয়া মীর, সুইডেন থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Dec 2021, 11:01 AM
Updated : 2 Dec 2021, 11:01 AM

তখন থেকেই শিক্ষকতার প্রতি আমার আকর্ষণ। পড়াশোনা শেষে নিজেও শিক্ষক হলাম, প্রথমে নিজ দেশে, তারপর সুইডেনে। বাংলাদেশে সরকারি কলেজে পড়ানো শুরু করি। এখন সুইডেনের একটি কলেজে পড়াই। এ লেখায় সুইডেনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে কিছু গল্প বলতে চাই।

ঘরোয়া রসনাবেলা

এখানে একটা বিষয় বলে নিই, এদেশে কলেজকেও স্কুল বলে উপস্থাপন করা হয়। স্কুল বা কলেজ প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ক্যান্টিন আছে। সেখানে ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করা হয়। একটা নির্দিষ্ট সময়ে সবাই একসঙ্গে ক্যান্টিনে যায় এবং প্রত্যেক খাবার টেবিলে ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকরা পাশাপাশি বসে খাবার খায়। টেবিলে ছাত্র ছাত্রে, ছাত্র শিক্ষকে অনেক ধরনের গল্প হয়, যেন বাড়ির খাবার টেবিলে বসে সবাই খাবার খাচ্ছে।

শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক

আগে পরে বোঝাপড়ার প্রসঙ্গ

ছাত্রজীবনের একটা স্মৃতি আজ পীড়া দেয়। তা হলো, আমাদের সময় শ্রেণিকক্ষে যখন পরীক্ষার কোন ফল দেওয়া হতো তখন সবার সামনে নাম ডেকে কে কত নম্বর পেলো শিক্ষক তা বলতেন। তাতে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে যেত। সুইডেনে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের ফলাফলকে যার যার ব্যক্তিগত বিষয় বলে মনে করা হয়। তাই শিক্ষক প্রত্যেক ছাত্রকে তার কাছে ডেকে পরীক্ষার ফলটা দেখায় এবং খুব আস্তে করে ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে, যেন এক নিবিড় সম্পর্কে শিক্ষক তার ছাত্রদের গোপনীয়তা রক্ষা করছে। ছাত্রটি নিজে না বললে অন্য কেউ জানতে পারে না, অন্য ছাত্ররা জানতে চায়ও না।

এখানে নেতিবাচক কোনো কিছু ঘটে না, তা নয়। একবার আমার ছেলের স্কুল থেকে পর পর বেশ কয়েকদিন ওর শিক্ষক ফোন করে নালিশ দিতে থাকলো। অভিযোগের ধরনগুলো এরকম: 'ও ক্লাসে কথা বলে ওঠে, বা এমন কিছু করে যা অন্যদের মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটায়’।

আমরা বাবা-মা শিক্ষককে আশ্বস্ত করি যে আমরা আমাদের সন্তানের সঙ্গে কথা বলবো। আমরা আমাদের ছেলেটিকে বুঝাই, তুমি অযথা কথা বলো না ক্লাস চলাকালে, মনোযোগ দাও শ্রেণিকক্ষে। কিছুদিন পর থেকে দেখা গেলো ও স্কুলে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন স্কুল ভালো লাগছে না তোমার? ও বললো,  শিক্ষক ওর কথায় গুরুত্ব দিচ্ছে না।

আমরা বুঝতে পারলাম এটা একটা শিশুর জন্য নেতিবাচক। আমরা ওকে বললাম, তুমি তোমার মতো আচরণ করো শ্রেণিকক্ষে। এ নিয়ে চিন্তা করো না। দু’একদিন পর যখন ওর শিক্ষক আবার ফোন করলো, আমরা বললাম, তোমরা বারবার নালিশ করে আমাদের সন্তানের মানসিক সমস্যা তৈরি করছো। আমাদেরকে বারবার নালিশ না করে, নিজেরা এ ব্যাপারটি সহজভাবে নিয়ে মিটাও, ওর উপর যেন মানসিক চাপ না পড়ে। আমরা আরও বললাম, ও স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে, যা ঠিক হচ্ছে না। তারপর থেকে ওর প্রতি ওর শিক্ষক আচরণ পরিবর্তন করেছে। স্কুলে আর সমস্যা হয়নি।

শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতাসূচক কথা

সবকিছুর শুরু যেখানে

এখানে একটা বাক্য স্কুল-কলেজে ঝুলতে দেখা যায়, “সবকিছু শুরু হয় একজন ভালো শিক্ষক থেকে”। এ লাইনটি ধরে একটা ঘটনা বলি। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আসা এক ছাত্র সুইডেনে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছে। কাগজপত্রের বিভিন্ন জটিলতার কারণে ছেলেটির থাকা খাওয়ার অসুবিধা দেখা দিচ্ছে। আমার এক সহকর্মী, এ ছাত্রেরই শিক্ষক, ছেলেটিকে বলেছেন- ‘তুমি আমার বাসায় থাকতে থাকো, যতদিন না তোমার কাগজপত্র হয়’। ছেলেটি প্রায় তিন বছর ধরে আমার সহকর্মীর বাসায় থাকছে। আমার সহকর্মী এখন শিক্ষক থেকে অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন। শিক্ষকটি যখন আমাদের বলেন, তার চার সন্তান, তখন বুঝতে পারি, তিনি তার তিন সন্তানের মতো ছাত্রটিকেও সন্তান হিসেবে দেখে থাকেন। শিক্ষক-ছাত্র এখন মা-ছেলের জায়গায়।

সৌহার্দ্যভরা অঙ্গনে

এখানকার স্কুল ব্যবস্থাপনা অনেক সৌহার্দ্যপূর্ণ। প্রতিটি স্কুলে সাধারণত একজন করে নার্স ও একজন বিশেষ শিক্ষক থাকেন। নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষ শিক্ষক মনোবিজ্ঞান বিষয়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে থাকেন। যাদের কাছে ছাত্ররা সময় করে যায় এবং পরামর্শ নেয় বিভিন্ন বিষয়ে। নার্সের কক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য ওষুধ, ছাত্রদের জন্য কনডম, মেয়েদের জন্য স্যানিটারি প্যাড ইত্যাদি থাকে। নার্স স্কুলে না থাকলে, প্রায়ই ছাত্রীরা আমাদের শিক্ষকদের বলে থাকেন, ‘আমার শারীরিক ঋতুচক্র শুরু হয়ে গেছে...স্যানিটারি প্যাড লাগবে’। প্রাকৃতিক বিষয়গুলোকে এমন করেই সহজভাবে দেখা হয় এখানে।

আরেকটি ঘটনা মনে আসলো। একদিন আমার এক ছাত্রী আমাকে বললো, তোমার সঙ্গে কথা আছে। তোমার কি সময় হবে? আমি বললাম, হবে। ছাত্রীটি বললো, ‘আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। বুঝতে পারছি না, কী করবো। আমি প্রেমে পড়েছি, কলেজেরই একটি ছাত্রের। পড়াশোনায়  মনোযোগ দিতে পারছি না। বুঝতেও পারছি না ছাত্রটাও আমার প্রেমে পড়লো কিনা!’

ছাত্রীটি আমার কাছে জানতে চাইলো, ওর কী করা উচিত। আমি বললাম, এ বয়সে এটা খুব স্বাভাবিক। এটা আনন্দের তুমি প্রেমে পড়েছো। বিষয়টা নিয়ে ছাত্রীর সঙ্গে আন্তরিকভাবে আলাপ করলাম। ও স্বস্তি পেলো।

অবলীলায় এদেশের স্কুলগুলোতে ছাত্ররা তাদের সমস্যার কথা শিক্ষককে জানাচ্ছে। শিক্ষক ব্যাপারটি নিজের মধ্যে রেখে ছাত্রকে মানসিক দিক থেকে সহযোগিতা করছে।

ছাত্র-শিক্ষক আলিঙ্গন

প্রাণোচ্ছল এক একটি দিন

স্কুল যেন ছাত্র-শিক্ষক পরস্পরকে জয় করার জায়গা। কিছুদিন আগে ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসে’ ছাত্ররা ভোরবেলায় স্কুলে আসে। সেদিন ওরা রঙ-বেরঙের কাগজে শিক্ষকদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের কৃতজ্ঞতাসূচক কথা লিখে স্কুলের সম্মুখ দেয়ালে টানিয়ে রাখছিল। ছাত্ররা অনবরত লিখছিল আর দেয়ালে টানাচ্ছিলো। ওখানে ওরা ওদের নাম লিখেনি, কে লিখেছে, তবে কোনো কোনো কাগজে শিক্ষকের নাম লিখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, উৎসাহমূলক কথা লিখেছে। সারা স্কুলের ছাত্ররা শিক্ষকদের উদ্দেশে লেখা উক্তিগুলো পড়ছিলো, আর আমরা শিক্ষকরাও পড়ছিলাম। শ্রেণিকক্ষে ঢুকতেই ছাত্ররা শিক্ষকদের মৌখিক শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এভাবে প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষগুলো যেন এক উচ্ছল প্রাণসঞ্চালনের জায়গা।

বহু বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন

কিছু ছেলেমেয়ে শ্রেণিতে হয়তো বেশিক্ষণ মনোযোগ দিতে পারে না, জানালা দিয়ে আকাশ দেখে, একটু বেশি নড়াচড়া করে। এ আচরণগুলো কোনো না কোনো বিশেষ লক্ষণ যা একজন মানুষের থাকতে পারে। শিক্ষকতা করতে এসে ব্যাপারটা আমি মনোযোগের সঙ্গে খেয়াল করছি। এ ধরনের ছাত্রদের জন্য আলাদা ফাইল করা থাকে এখানকার স্কুলে। ওদের কীভাবে পড়ালে সুবিধা হবে, একটানা ক্লাস নেওয়া যাবে না, বক্তৃতার মাঝখানে বিরতি দেওয়া বা ওই বিশেষ ছাত্রটি প্রায়ই উঠে বাইরে যাবে আবার আসবে- এ বিষয়টা আগে থেকেই জানা থাকা, লিখতে না পারলে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা। একজন মা যেমন তার বিভিন্ন আচরণ আর ভিন্ন মাত্রার বুদ্ধিসম্পন্ন সন্তানদের প্রতি বিবিধ কায়দায় দেখাশোনা করেন, ঠিক সেভাবে শিক্ষকরাও এখানে ছাত্রদেরকে নিয়ে কাজ করে থাকেন।

স্বাধীনচেতা তারুণ্য

শ্রেণিকক্ষে সব ছাত্ররা কথা শুনে, তা নয়। কখনো কখনো তারা শ্রেণিকক্ষে কথা বলা, পড়াশোনার বাইরে শ্রেণিতে মোবাইল ব্যবহার ইত্যাদি করে থাকে। তবে বেশিরভাগ স্কুলেই ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা শিক্ষকরা নির্বাচন করে থাকেন, কে কোথায় বসবে, যাতে করে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলাটা কম হয়। যদি কোনো ছাত্র শিক্ষকের নির্বাচিত জায়গাটায় বসতে আপত্তি জানায়, তবে শিক্ষক ছাত্রের সঙ্গে আলোচনা করে একটি উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করে থাকেন।

শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক

ছাত্রদের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় না। কোনো কোনো শিক্ষক তাদের মতামত চাপালে ছাত্ররা তা মানতে চায় না। ওরা সঙ্গে সঙ্গে তর্ক করে ওঠে। অধিকার সচেতনতাকে অনেক সময় বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়। একটা ঘটনা মনে পড়ে। একবার বাসে উঠলাম একটা স্কুলের সামনে থেকে। এদেশে আমার শিক্ষকতার প্রথমদিকে ওই স্কুলে শিক্ষানবীশ শিক্ষক ছিলাম। বাসচালক ভিনদেশীয়। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কোথা থেকে এসেছো, এখানে কী করো ইত্যাদি। আমি বললাম, আমি শিক্ষক হওয়ার পথে। বাসচালক আমাকে বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছিলো, তুমি এদেশে শিক্ষকতা করবে? এখানকার ছাত্ররাতো শিক্ষকদের মানতে চায় না।

সুন্দর স্বাভাবিক মুহূর্তগুলো

ছাত্ররা বেড়ে ওঠার বড় একটা সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটায়। শিক্ষক যেন অনেকটা বন্ধুর মতো। এখানে ছাত্ররা শিক্ষকদের নাম ধরে সম্বোধন করে থাকে। কিছুদিন আগে এক ছাত্রী আমাকে বললো, আমি কি তোমাকে আলিঙ্গন করতে পারি? আমি একটু হোঁচট খেলাম। সাধারণত আলিঙ্গন খুব একটা দেখা যায় না। কখনো কখনো দেখা যায় ছাত্র বা শিক্ষক যে কোনো এক পক্ষ থেকে কাঁধে হাত দিয়ে কথা বলছে। আমি আলিঙ্গন করলাম। ছাত্রীটি ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো। আশপাশে বহু ছাত্র। বিষয়টা এখানে সবার কাছে সুন্দর স্বাভাবিক।

লেখক পরিচিতি: পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দ্রেসদেন বিশ্ববিদ্যালয়, উপসালা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পোস্ট ডক্টরেট সম্পন্ন করেছেন জার্মানির দ্রেসদেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্টকহোমে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক