কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি ২৪: কত দামের বাড়ি কিনলে কানাডার পিআর পাওয়া যায়?

কানাডার এডমন্টন শহরে থাকি আমরা। বাংলাদেশের এ সময়টায় বাংলাদেশে যখন দুপুর ১টা তখন আমাদেরে এখানে রাত ১টা। মধ্যরাতেই সেলফোন বেজে উঠলো। একে একে তিনবার। জরুরী মনে করে ফোন ধরলাম।

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Nov 2021, 12:56 PM
Updated : 10 Nov 2021, 12:56 PM

ফোনের ওপারে বসবাসরত আমার প্রাক্তন সহকর্মী মামুন (ছদ্মনাম) সময়ের ব্যবধানটা হয়তো খেয়াল করেননি। দেশ থেকে ফোন করেছেন তিনি।

- 'সালাম মুরুব্বি, কেমন আছেন?' 

এতদিন পরও আমাকে 'মুরুব্বি' সম্বোধন করলেন শুনে ভালো লাগলো। চাকরিতে আমার বছর তিনেকের জুনিয়র মামুন।

- ভালো, তো কী মনে করে এতো রাতে? কেমন আছো?

এখানে গভীর রাত শুনে সে পরে ফোন করতে চাইলেও আমি বললাম, 'ডোন্ট ওরি, চালিয়ে যাও।'

- কানাডায় কি বিদেশিরা বাড়ি কিনতে পারে?

- অবশ্যই! কিনবে নাকি একটা?

- মাঝারিগোছের একটা বাড়ির দাম কত হতে পারে?

- কয় বেডরুম?

- ধরুন, চার বা পাঁচ!

- তাকে একটা আনুমানিক দাম বলতেই সে মন্তব্য করলো, 'ওই দামে তো ঢাকা শহরে একটা প্রশস্ত ফ্ল্যাটও পাওয়া যায় না। আমি তো মনে করেছিলাম দাম আরও অনেক বেশি হবে।

- তাহলে দুটো কিনে নাও!

আমার রসিকতা বুঝে সে হাসলো।

- তো, কানাডায় বাড়ি কিনতে চাইছো কেন? - তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম।

- বস, দেশের যে অবস্থা, বাচ্চাকাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমরা যত ঝক্কিঝামেলা পার করে দিন গুজরান করছি ছেলেটা কি সেভাবে পারবে? সে তো ঘি মাখন খেয়ে মানুষ! তাই, মরার আগে ওকে একটা ঠিকানা করে দিতে চাচ্ছিলাম। চাকরিও অনেকদিন করলাম। ভাবছি অবসর নিয়ে সপরিবারে কানাডা চলে যাবো। আচ্ছা বস, কত দামের বাড়ি কিনলে কানাডা পিআর দেবে?

- না, কানাডায় পিআর হওয়া নিয়ে তোমার ধারণা ঠিক নয়। এভাবে পিআর হয়না। বিষয়টা খুলে বলছি, শোনো। ..

সম্পত্তির মালিক হয়ে কানাডার নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা (পিআর) হওয়া যায় না। কোনওপ্রকার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই যে কোন বিদেশি নাগরিককে সম্পদের মালিক হবার সুযোগ দেয় কানাডা। একজন বিদেশির পক্ষে কানাডায় সম্পত্তির মালিক হওয়ার জন্য কেবল বিক্রয় কর বা জমি স্থানান্তর কর এর মতো প্রয়োজনীয় ট্যাক্স দিতে হয়। বাকি প্রক্রিয়া কানাডিয়রা যেভাবে সম্পত্তি কেনেন, মোটামুটি তেমনই।

আপনি যদি ওয়ার্ক পারমিট বা স্টাডি পারমিট না পাওয়া অবস্থায় কানাডায় সম্পত্তির মালিক হন, তাহলে আপনাকে ভিজিটর ভিসা নিয়ে কানাডায় প্রবেশ করতে হবে। কানাডায় সম্পত্তির মালিকানা কোন বিদেশি নাগরিককে কানাডায় প্রবেশের অবারিত সুযোগ দেয়না। এমনকি একজন বিদেশি নাগরিক কানাডায় সম্পত্তি কেনার পর তা ভোগ করারও নিরঙ্কুশ অধিকার পান না। কেননা, কানাডিয় নাগরিক (সিটিজেন) নন কিন্তু স্থায়ী বাসিন্দা (পিআর), এমন যে কোন ব্যক্তির কানাডায় প্রবেশ করা একটি বিশেষ প্রাধিকার (privilege) কেবল, অধিকার (right) নয়। কানাডায় সম্পত্তির মালিক হলেও এর অন্যথা নেই।

কানাডা ভ্রমণের (ভিজিট) অনুমতি দেওয়ার সময় একজন আবেদনকারী inadmissible বা, অপ্রবেশযোগ্য কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়। একজন মানুষ বিভিন্ন কারণে কানাডায় অপ্রবেশযোগ্য হতে পারেন, যেমন, দুর্নীতি বা অন্য কোন কারণে কোন দেশে অভিযুক্ত হওয়া, কোন সন্ত্রাসী সংগঠন- এর সাথে সম্পৃক্ততা, সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া, যুদ্ধাপরাধী বা যুদ্ধাপরাধীর পরিবারের সদস্য হওয়া, ইত্যাদি।

কোনওভাবে আপনি যদি কানাডায় অপ্রবেশযোগ্য সাব্যস্ত হন, তাহলে আপনাকে কানাডায় ঢুকতে দেওয়া হবে না;  এমনকি আপনার মালিকানাধীন সম্পত্তিতেও যেতে দেওয়া হবে না। এ অবস্থায় আপনার অপ্রবেশযোগ্যতা কাটিয়ে কানাডায় প্রবেশের জন্য আপনাকে হয় একটি অস্থায়ী আবাসিক অনুমতি (টিআরপি) বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পুনর্বাসনের (রিহ্যাবিলিটেশন) জন্য আবেদন করতে হবে। একজন দক্ষ কানাডিয় অভিবাসন পরামর্শক এ বিষয়ে আপনাকে যথাযথ পরামর্শ দিতে পারেন। এ লেখায় সে আলোচনা আমি করবো না।

আপনি যদি একজন ভিজিটর বা ট্যুরিস্ট হিসেবে কানাডায় প্রবেশ করেন, তবে আপনি কতদিন কানাডায় থাকতে পারবেন তা কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ) নির্ধারণ করে দেয়। কানাডার পোর্ট অব এন্ট্রিতে (পিওই) পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রায় সব ভিজিটরকে কানাডায় থাকার জন্য প্রাথমিকভাবে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়। যদি সিবিএসএ চায় আপনি প্রবেশের ছয় মাসের আগেই কানাডা ছেড়ে চলে যান, তবে তারা আপনাকে মৌখিকভাবে তা জানাবে, এবং একইসাথে, আপনার পাসপোর্টেও বিষয়টি উল্লেখ করবে।

পরবর্তীতে আপনি কানাডার অভ্যন্তর থেকে ভিজিটর হিসেবে আপনার অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করতে পারেন। প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত মেয়াদকালের মধ্যে আবেদন করতে হবে, এবং সেক্ষেত্রে, আপনার আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কানাডায় আপনার উপস্থিতি বৈধ গণ্য হবে। তবে, আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপনাকে অবিলম্বে কানাডা ছেড়ে যেতে হবে। এটাই নিয়ম।

আপনার কানাডার ভিজিটর এক্সটেনশনের আবেদন প্রত্যাখ্যান হবার পর আপনি যদি দেরি না করে কানাডা ত্যাগ করেন, তাহলে কোন সমস্যা ছাড়াই ভবিষ্যতে কানাডায় পুনর্প্রবেশ করতে পারবেন। পরেরবার বাধাহীনভাবে কানাডিয়ান সীমান্ত অতিক্রম করতে কানাডায় বৈধ ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস বজায় রাখা অতীব জরুরী। 

কানাডায় সম্পত্তির মালিকানা সেদেশে স্থায়ী বসবাসের (পিআর স্ট্যাটাস) অনুমতির আবেদনের ক্ষেত্রে কোনও বাড়তি সুবিধা দেয় না। অর্থনৈতিক (economic) অভিবাসনের অনুমোদন আবেদনকারীর বয়স, কাজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, ইত্যাদির উপর নির্ভর করে, কানাডায় সম্পত্তির মালিকানার ওপর নয়। কানাডায় সম্পত্তি থাকুক বা না থাকুক, কানাডার পিআর স্ট্যাটাস অর্জনের অন্যসব যোগ্যতা আপনার থাকতেই হবে। সময়ে সময়ে কানাডা সেদেশের অর্থনৈতিক চাহিদার ভিত্তিতে যোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে থাকে।

যুগযুগ ধরে কানাডা পৃথিবীর নানা প্রান্তের অভিবাসীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় লক্ষ্যস্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। কানাডার প্রতি মানুষের অনুরাগ নতুন কিছু নয়। কানাডার অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, মানবাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, ইত্যাদি কানাডাকে তাবৎ পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বপ্নের দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। একারণেই মানুষ নানাভাবে সেদেশে স্থায়ী বসবাসের উপায় অনুসন্ধান করতে থাকে। কানাডায় সম্পত্তি ক্রয়ের চেষ্টাও অনেকের কাছে কানাডায় স্থায়ী বসবাসের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত, যদিও বাস্তবতা ঠিক তা নয়।

কানাডা সরকার সচরাচর কোন বিদেশি বিনিয়োগকে না বলে না। তবে, কানাডা অর্থ পাচারের বিষয়েও সংবেদনশীল। ফলে, একজন বিদেশির পক্ষে কানাডায় সম্পত্তি কেনার উৎস অবশ্যই পরিচ্ছন্ন হতে হবে। সম্পত্তি ক্রয় করার জন্য আপনার অবশ্যই পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থান থাকতে হবে, বা পর্যাপ্ত তহবিল সুরক্ষিত করতে হবে। কানাডায় একজন বিদেশি সম্পত্তি কিনতে গেলে তাকে অতিরিক্ত কিছু ট্যাক্স প্রদান করতে হয়; যেমন, এনআরএসটি বা, অনাবাসিক স্পেকুলেশন ট্যাক্স। এছাড়া, সম্পত্তি কিনে সেখানে বসবাস না করলেও আপনাকে অতিরিক্ত ট্যাক্স গুণতে হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে, সম্পত্তি কেনার সময় একজন বিদেশিকে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত ডাউন পেমেন্টও দিতে হতে পারে। স্বল্প কথায়, কানাডায় সম্পত্তি ক্রয় করা একজন বিদেশির জন্য বেশ ব্যয়সাধ্য ব্যাপার।

কানাডায় সম্পত্তি কিনে সরাসরি কানাডা ইমিগ্রেশনের সুবিধা না পেলেও কানাডায় সম্পদের মালিকানা সে দেশের প্রতি একজন বিদেশির সংযুক্তি বা কানেকশনের প্রতিফলন। তবে, কানেকশনের সুবিধা পাওয়া যায় সম্পত্তি কিনে সেখানে নিয়মিত বসবাস করলে।

কানাডার কিছু কিছু প্রদেশ সেখানে কোন বিদেশির সম্পত্তি থাকলে এবং সে বিদেশি সেখানে নিয়মিত বসবাস করলে ধরে নেয় যে কানাডার সাথে সে বিদেশির একটি যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, যা ওই বিদেশির পিআর স্ট্যাটাস অর্জনের ক্ষেত্রে খানিক হলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে, কেউ যদি এইচঅ্যান্ডসি, বা হিউম্যানিটারিয়ান গ্রাউন্ডে কানাডায় ইমিগ্রেশনের আবেদন করে থাকেন সেক্ষেত্রে কানাডিয়ান সম্পত্তির মালিক হওয়া একটি ইতিবাচক বিষয় বলে গণ্য হয়ে থাকে। যাই হোক, আপনার ইমিগ্রেশনের নথি পর্যালোচনাকারী অফিসার আপনার পক্ষে রায় দেওয়ার আগে অভিবাসন বিষয়ক অন্যান্য বিষয়াদিও যথাযথ বিবেচনায় আনবেন।

স্বল্প কথায় বলা চলে, কানাডায় পিআর স্ট্যাটাস অর্জন ত্বরান্বিত বা সহজতর হবে বিবেচনায় কেউ সেদেশে সম্পত্তি কিনে থাকলে তা যৌক্তিক হবে না, যদিও সম্পত্তির মালিকানার কারণে কানাডার সাথে ক্রেতার একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়। তবে, এ বন্ধন দুর্বল প্রকৃতির। কারণ, কোনও কারণে সিবিএসএ-র অফিসার সম্পত্তি ক্রেতাকে কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য সাব্যস্ত করলে কানাডায় সম্পত্তি থাকলে তাতে প্রবেশাধিকার হারাবেন ওই ক্রেতা। তারপরও, কানাডায় সম্পত্তির মালিক হতে চাইলে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য একজন পেশাদারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। আমাদের কোম্পনি, এমএলজি ইমিগ্রেশন, কানাডায় সম্পত্তি বেচাকেনার কাজ করে না। একজন কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট (আরসিআইসি) হিসেবে লেখায় আমি সম্পত্তি কেনার সাথে কানাডার ইমিগ্রেশনের সংযোগচিত্র ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস করেছি কেবল, এর অধিক কিছু নয়।

যাক, এ লেখা আর দীর্ঘ না করি। কানাডায় পড়াশোনা, বা ইমিগ্রেশন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে এই ইমেইলে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে।

তবে, বর্তমান পর্বসহ এ সিরিজের অন্য পর্বগুলোতে কানাডা ইমিগ্রেশন বিষয়ে যে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে তা যেন কোনভাবেই লিগ্যাল অ্যাডভাইজ হিসেবে বিবেচনা করা না হয়। কারণ, সুনির্দিষ্ট আইনি পরামর্শ দেওয়া হয় ব্যক্তিগত সাক্ষাতে, সাধারণ আলোচনায় নয়। মনে রাখা দরকার, প্রত্যেকের ইমিগ্রেশন কেইসই কোন না কোনভাবে আলাদা। তাই, একই ধরনের সমাধান সবক্ষেত্রে সুফল নাও বয়ে আনতে পারে।

এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার নতুন নতুন লেখা পড়তে। ভবিষ্যতে আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের প্রত্যাশা নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।
 

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com; / ফেইসবুক: ML Gani

এ সিরিজের বাকি লেখা:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক