আবুল মাল আবদুল মুহিতের জীবনাবসান

তার কাছে জীবন ছিল ‘মহাতৃপ্তির, মহাপ্রাপ্তির’, ৮৮ বছরের সেই কর্মময় জীবনের যবনিকা টেনে চিরবিদায় নিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 April 2022, 07:42 PM
Updated : 1 May 2022, 03:50 AM

শুক্রবার রাত ১২টা ৫৬মিনিটে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মুহিতের মৃত্যু হয়। তার ছোট ভাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এ মোমেনের বরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বার্তায় এ খবর জানায়।

গতবছর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এই বর্ষীয়ান সদস্য। বার্ধক্যের নানা সমস্যাও পেয়ে বসেছিল।

শারীরিক দুর্বলতার কারণে সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলে মার্চের প্রথম সপ্তাহে। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের জেলা সিলেটে।

১৬ মার্চ সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দেওয়া সম্মাননা গ্রহণ করে মুহিত বলেছিলেন, “আমি আমার জীবনকে নিয়ে গর্বিত।… অনেকে হয়ত একে আত্মগরিমা বলবেন। কিন্তু এটা অন্যায় নয়। বরং এর জন্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয়।"

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভার দিয়েছিলেন মুহিতের ওপর। সেই দায়িত্ব তিনি পালন করে গেছেন টানা দশটি বছর। 

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সরকারপ্রধান। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানিয়েছেন সমবেদনা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্তায় জানানো হয়েছে, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় গুলশান আজাদ মসজিদে জানাজা হবে মুহিতের। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ২টায় তার কফিন নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান থেকে দাফনের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হবে জন্মভূমি সিলেটে।

২০১৮ সালের ৭ জুন নিজের শেষ বাজেটটি সংসদে উপস্থাপন করেন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশিবাজ বাজেট দেওয়া মুহিত।

কর্মময় ছয় দশক

সংসদে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট দেওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন সিলেট-১ আসনের সাংসদ। ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে তার জন্ম।

বাবা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের নেতা। মা সৈয়দ সাহার বানু চৌধুরী ছিলেন সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের সহ-সভানেত্রী।

পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর করে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন মুহিত।

শৈশবে ‘মুকুল ফৌজ’ করে আসা মুহিত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সক্রিয় ছিলেন ভাষা আন্দোলনেও।

১৯৫৬ সালে মুহিত যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। প্রায় তের বছর পূর্বপাকিস্তান এবং কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের চাকরি করে ১৯৬৯ সালে তিনি ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে ইকনোমিক মিনিস্টারের দায়িত্ব পান।

একাত্তরের জুন মাসে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক-রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা সচিবের দায়িত্ব পান মুহিত। ১৯৭৭ সালে তাকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব করা হয়।

২৫ বছরের সরকারি চাকরিজীবনে বিভিন্ন ভূমিকায় দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান মুহিত। এরপর ‘অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে’ কাজ শুরু করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও আইএফএডি-তে।

১৯৮২-৮৩ সালে তখনকার এইচ এম এরশাদ সরকারের সময়ে প্রথমবারের মত অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন মুহিত। পরে আবার বিদেশে চলে যান।

দীর্ঘদিন বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে উড্রো উইলসন স্কুলে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন।

এ শতকের শুরুতে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন মুহিত। পরে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সিলেট ১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ‘দিন বদলের’ সরকারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাল ধরেন মুহিত।

দশ বছর সেই দায়িত্ব সামলে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজের শেষ কর্মদিবসে এক বিদায়ী অনুষ্ঠানে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “এটি আমার খুব আনন্দের বিষয়, আমাকে বিদায়-টিদায় করতে হয়নি, আমি নিজে নিজেই বিদায়টা নিয়ে নিয়েছি।”

মুহিত সেদিন বলেছিলেন, তার সংগ্রহের ৫০ হাজার বইয়ের সবগুলো পড়া হয়নি, সেগুলো তিনি পড়তে চান। তখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনীতি নিয়ে ৩৪টি বই তিনি লিখেছেন, আরও লিখতে চান।

২০১৬ সালে চারুকলার বকুলতলায় নবান্ন উৎসবে আবুল মাল আবদুল মুহিত।

২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘স্মৃতিময় কর্মজীবন’ নামে মুহিতের ষাট বছরের বিচিত্র কর্মজীবনের স্মৃতিকথা। বইটি উৎসর্গ করেছিলেন স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিতকে।

এই দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে মেয়ে সামিয়া মুহিত একজন ব্যাংকার। বড় ছেলে শাহেদ মুহিত একজন আর্কিটেক্ট, আর ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষকতায় ‍যুক্ত।

সাহিত্য পড়ে আসা মুহিত অর্থনীতির জটিল জগতে জড়িয়ে গিয়েও জীবনের অন্য রঙগুলো থেকে খুব বেশি দূরে সরে যাননি কখনো।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলন বাপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মন্ত্রিত্বের শেষ সময়েরও শত ব্যস্ততার মাঝে তাকে কখনও দেখা গেছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের আয়োজনে, কখনও আবার চারুকলার বকুলতলায় নবান্ন উৎসবে।

মন্ত্রিত্ব থেকে অবসরে যাওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটিতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য ২০১৬ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে অনেকটা নিভৃতে পরিবারের সঙ্গেই কাটছিল মুহিতের সময়। তবে ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের কারণে মাঝে মাঝে হাসপাতালে যেতে হচ্ছিল। ১৬ মার্চ সিলেটে ‘গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা’ অনুষ্ঠানই ছিল তার শেষ কোনো অনুষ্ঠানে মঞ্চে আরোহণ। 

নিজের জেলার মানুষের সম্মাননায় সিক্ত হয়ে আবেগ আপ্লুত মুহিত সেদিন বলেছিলেন, "আমি একান্তভাবে সিলেটের মানুষ। আমার জন্মভূমি আমার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছে এটার চেয়ে বড় প্রাপ্তি তো আর কিছু হতে পারে না।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক