সিটি ভোটে ৬ নারীর বড় চ্যালেঞ্জ

এবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিলর পদে পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমানতালে লড়াইয়ে নেমেছেন ছয় নারী। প্রতীক পেয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারও শুরু করেছেন তারা।  

কাজী নাফিয়া রহমানও মেহেরুন নাহার মেঘলাবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Jan 2020, 05:06 AM
Updated : 15 Jan 2020, 05:14 AM

দুই সিটি করপোরেশনে নির্দলীয় প্রতীকের ১২৯টি সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত লড়াইয়ে রয়েছেন মোট ৫৮৬ জন। এর মধ্যে দক্ষিণে ৩৩৫ জন এবং উত্তরে ২৫১ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ভোট করবেন।

এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে আলেয়া সারোয়ার ডেইজী ও দক্ষিণের ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে হেলেন আক্তার সাধারণ কাউন্সিলর পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী।

অন্যদিকে বিএনপির সমর্থন নিয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন উত্তরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাজেদা আলী হেলেন, দক্ষিণের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে শাহিদা মোর্শেদ, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে মেহেরুন্নেছা।

সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও এই নারীরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। সব বাধা পেরিয়েই এগিয়ে যেতে চান তারা। পাশাপাশি সাধারণ ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আরও বেশি নারী নেতৃত্ব যেন ওঠে আসে, সেই প্রত্যাশাও রেখেছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আলেয়া সারোয়ার ডেইজী ও দক্ষিণের ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের হেলেন আক্তার

 

আওয়ামী লীগের ডেইজী-হেলেন

পাঁচ বছর আগে ঢাকা উত্তরের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর (৩১, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড মিলিয়ে) আলেয়া সরোয়ার ডেইজী এবার সরাসরি নির্বাচনের জন্য ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি লাটিম প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।

ডেইজী মনে করেন, নারী বা পুরুষ নয়, সবারই সব কাজের সক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে। কেউ এর ব্যবহার করে, আবার কেউ করে না।

আত্মবিশ্বাসী এ নারী প্রার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি সবসময় মনে করি, আমি ক্যাপাবল। আমার যথেষ্ট ক্যাপাসিটি আছে। আমার সেল্ফ কনফিডেন্স আছে যে কোনো কাজ করার। নারী-পুরুষ বলে অনেক কাজ আমরা আলাদা করি। কিন্তু আমি মনে করি, আমি সব কাজ করতে পারব।”

পুরুষশাসিত সমাজ হওয়ায় নারীরা সব সময় সব কাজের সুযোগ পায় না বা তাদের করতে দেওয়া হয় না বলে মনে করেন তিনি।

“আমার দলের প্রধান নারী, স্পিকার নারী, শিক্ষামন্ত্রী নারী- তাই আমরা সব কাজ করতে পারি। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর হয়ে আমি যে কাজ করেছি, অনেকেই তা পারেনি। বাধার সম্মুখীন হয়েছি, হব। কিন্তু সেটা মোকাবেলা করার সাহস ও মনোবল অনেক। আমি হাসু আপার কাছ থেকে শিখেছি, মনে সাহস ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সে কখনো দুর্বল হয় না।”

প্রতিপক্ষের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন জানিয়ে ডেইজী বলেন, “বাধা অতিক্রম করে আমি এগিয়ে যাবই। জীবন বাজি রেখেও আমি কাজ করে যেতে চাই। আমি জানি আমার মনের অনেক জোর। আমি প্যানেল মেয়র হিসেবেও কাজ করেছি।”

যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা ডেইজী সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়া নারী প্রার্থীদের সংখ্যা বাড়বে বলে আশাবাদী।

“আগে সংরক্ষিত আসনের বাইরে কেউ নির্বাচন করত না। এখন সাহস ও মনোবল বাড়ছে, নারীরা আসছে। সব জায়গায়ই নারীর অংশগ্রহণ এখন বাড়ছে, কারণ সবাই সচেতন। এই সংখ্যাটা আমরা আরও বাড়াব।”

গত নির্বাচনে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হেলেন আক্তার এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে দক্ষিণের ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদে দাঁড়িয়েছেন। তার প্রতীক ঘুড়ি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমার জন্য এটা একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। সংরক্ষিত আসন ছেড়ে সাধারণ আসনে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছি, কারণ আমি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে জনগণের পাশে থেকেছি। তাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই দলীয় সভানেত্রী এবারের নির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন।”

উপরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাজেদা আলী হেলেন; নিচে  দক্ষিণের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডেন শাহিদা মোর্শেদ ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেহেরুন্নেছা।

 

উত্তরে বিএনপির মিষ্টি-সাজেদা, দক্ষিণে শাহিদা-মেহেরুন্নেছা

উত্তরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাজেদা আলী হোসেন হেলেনের অবশ্য সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়াটা নতুন নয়। এক সময়ের এই সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর ২০১৫ সালের নির্বাচনেও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। এবার তার ওয়ার্ড ৩৬ নম্বর; প্রতীক ঝুড়ি ।

এবার জেতার আশাবাদ ব্যক্ত করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সংরক্ষিত কাউন্সিলর হিসেবে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছিলাম। সাধারণ ওয়ার্ড থেকে জিততে পারলে এলাকার ড্রেনের অব্যবস্থাপনা, সরু রাস্তা, মাদক ও মশার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে আমিই নির্বাচিত হব, কারণ আমার সাথে এলাকাবাসীর সমর্থন রয়েছে।”

সাধারণ ওয়ার্ড থেকে নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন তিনি।

“যদিও নিজেকে নারী হিসেবে নয়, মানুষ এবং সাধারণ একজন প্রার্থী হিসেবেই চিন্তা করি, তবুও দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করাটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জই বটে। সংরক্ষিত কাউন্সিলর থাকাকালীন সাধারণ কাউন্সিলরদের নানা কটূ কথা শুনতে হতো। যেকোনো উন্নয়নমূলক এবং অবকাঠামোগত কাজে অংশ নিলেই শুনতে হতো আমি এসব কাজের কি বুঝব?

“তাই সাধারণ ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হয়ে আমি এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাই।”

সাধারণ ওয়ার্ডে বড় দুই দলের মাত্র ছয়জন নারীর প্রার্থী হওয়াকে কিভাবে দেখছেন- এমন প্রশ্নে সাজেদা আলী হোসেন হেলেন বলেন, “যে কোনো রাজনৈতিক দলেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুরুষ ভাইদের পাশাপাশি নারী বোনেরা নিঃস্বার্থভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করে, স্লোগান দেয়, রাস্তায় আন্দোলনে মার খায়। তাহলে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে এমন বৈষম্য থাকাটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

উত্তরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তৃতীয়বারের মতো সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। এবার তার প্রতীক ঠেলাগাড়ি।

ফেরদৌসী ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী, বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন। ২০০২ সালে স্বামী ‘সন্ত্রাসীদের হামলায়’ নিহত হওয়ার পর উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ফেরদৌসী।

আবার নির্বাচিত হলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কাজ করার আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্যাস লাইনের সমস্যার সমাধান করেছি, অবৈধ দখলে থাকা বাড়িঘর উচ্ছেদ করে শিশুদের জন্য মাঠের ব্যবস্থা করেছি। জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই এসব করেছি।

“গত নির্বাচনে আমরা রাত ১২টায় নির্বাচন বয়কট করার আগে রাত ১০টা পর্যন্ত আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিলাম। নির্বাচন ব্যবস্থার নানা অনিয়ম নিয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করার পরেও কোনো সুরাহা হয়নি। আশা করি এবার তেমন অনিয়ম থাকবে না। আর জনগণের সমর্থন আমার সাথে আছে।”

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী শাহিদা মোর্শেদ এবার লাটিম প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তিনি মনে করেন, নারী বলতেই সংরক্ষিত প্রার্থী- এ মনোভাব দূর করা উচিত।

“নারীরা মনোনয়ন পাচ্ছে না- তা না, নারীরা নিজেরাই হয়তো সংরক্ষিত আসনের বাইরে এসে নির্বাচন করতে চাচ্ছে না। আমি প্রথম থেকেই মূল দল করে এসেছি, মহিলা দলে সম্পৃক্ত ছিলাম না। দলে যারা আছেন, সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমার কোনো সমস্যা হয় না। প্রতিপক্ষ নারী হোক আর পুরুষ হোক, তারা তো বিরোধিতা কিছুটা করবেই। সেটা স্বাভাবিক।”

নারীরাই নিজেদের দুর্বল মনে করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নারীরা হয়ত নিজেদের দুর্বল ভাবে, যে তারা পুরুষের সাথে পারবে না। আমি তো দেখলাম নারীরা খুব বেশি বের হয়ে আসছে না সংরক্ষিত আসনের বাইরে, তারা মনোনয়ন চাচ্ছে না তেমন। যার যার যোগ্যতায় সে আসবে। আমি নিজেকে যোগ্য মনে করেছি, তাই এসেছি। তারা হয়তো মহিলা দলে প্রথম থেকেই ঝুঁকেছে। তাই মূল দলের কথা চিন্তা করেনি। তাই সাধারণ প্রার্থী হয়নি।”

দক্ষিণে ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত আরেক প্রার্থী মেহেরুন্নেসা ইভিএমে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত। তিনি রেডিও প্রতীক নিয়ে লড়ছেন।

গতবারও সরাসরি ভোটে অংশ নেওয়া এই নেত্রী বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে ভোট কারচুপির যে ধারবাহিকতা চলছে, তা এবারও এই নির্বাচনে হবে বলে অনেক আলামত দেখছি। ইভিএম ভোটে স্বচ্ছ নির্বাচন নিয়ে আমি শঙ্কিত।

“মেশিনের ভোট কতটুকু স্বচ্ছ হবে আমি এ নিয়ে সন্দিহান। যেভাবে নিজের হাতে মানুষ ভোট দিয়ে সেই ভোট রক্ষা করতে পারছে না, সেখানে কিভাবে মেশিনে ভোট নিরাপদ ও সঠিক হবে তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।”

নির্বাচন নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে মেহেরুন্নেছা বলেন, “নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমার দাবি একটাই- আমার ভোট আমি যেন নিজের হাতে দিতে পারি, সন্ত্রাসীরা যাতে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসতে বাধা না দেয়- সেই নিশ্চিয়তা ও নিরাপত্তা চাই।”

ভোটে জিতলে এলাকার মানুষের উন্নয়ন, শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই প্রথম অগ্রাধিকার থাকবে বলে জানান তিনি।

‘এ প্রতিনিধিত্ব হতাশাজনক’

প্রায় ছয়শ পুরুষ প্রার্থীর ভিড়ে দুই দলের সমর্থন নিয়ে মাত্র ছয়জন নারীর সাধারণ কাউন্সিলর পদে সরাসরি নির্বাচন করার বিষয়টিকে হতাশার চোখে দেখছেন নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু।

তিনি বলেন, “নারীরা সংসদীয় পর্যায়েও সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কাউন্সিলর পদে সাধারণ আসন থেকে তারা নির্বাচন করতেই পারে। আমরা চাই সব রাজনৈতিক দলই সব নির্বাচনে নিজেদের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেবে।”

তবে সংরক্ষিত আসন নিয়ে আশাবাদী জানিয়ে তিনি বলেন, “সংরক্ষিত আসন তৈরি হয়েছে নারীদের জন্য একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। কেননা নারীদের বহু বছর ধরে রাজনীতি থেকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য তাই সংরক্ষিত আসন প্রয়োজন।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক