তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া অথবা ‘ব্যাটল অব ফাইভ আর্মিজ’

সাইফ তারিক
Published : 5 July 2022, 06:17 PM
Updated : 5 July 2022, 06:17 PM

ইউক্রেইনের রণাঙ্গনে রাশিয়ার সার্বিক অগ্রগতি ভালো। বিশেষ সামরিক অভিযানের তিনমাসে কয়েকজন জেনারেল র‌্যাঙ্কের অফিসার নিহত হয়েছে এবং ব্ল্যাক সি ফ্লিটের ফ্ল্যাগশিপ মস্কোভা দুর্ঘটনায় অথবা 'আয়োজিত' দুর্ঘটনায় নিমজ্জিত হয়েছে বটে, তবু এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ফল রুশ বাহিনীর জন্য ইতিবাচক। রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রণাঙ্গনে অগ্রগতি পরিকল্পনা অনুযায়ীই হচ্ছে।

লুহানস্ক ও তার পার্শ্ববর্তী দোনেৎস্ক মিলেই দনবাস; জুলাইয়ের ৩ তারিখে রাশিয়া লিসিচ্যাংস্ক শহর পুরোপুরি দখলে নেওয়ার পরপরই তাদের দনবাস দখলের লক্ষ্য অর্ধেক পূরণ হয়ে গিয়েছে।

ইউক্রেইনের পূর্বের লুহানস্ক প্রদেশ, বিশেষ করে জমজ শহর সিয়েভিয়ারোদোনেৎস্ক ও লিসিচ্যাংস্কের লড়াইয়ে উভয়পক্ষই বিপুল পরিমাণ সৈন্য হারিয়েছে। রাশিয়ার টানা গোলাবর্ষণের কারণে দুই শহর থেকেই শেষ পর্যন্ত কিইভবাহিনীকে পিছু হটতে হয়।

ইউক্রেইনের সেভেরোদনেৎস্ক মিলিটারি গ্যারিসন ছিল লিসিচ্যাংস্কে। ২০১৪ সালে ইউক্রেইনে সংঘটিত 'ইউরো ময়দান ক্যু'- এর পর লোহান্স্ক ও দনেৎস্ক এলাকা নিজেদের 'পিপলস রিপাবলিক' হিসাবে ঘোষণা করে। সম্প্রতি রাশিয়া তাদের স্বাধীনতা ঘোষণার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ দুটি এলাকায় রাশিয়ার স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন (এসএমও) চলছে। নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়াদির বিশ্লেষক আন্দ্রেই মার্তিয়ানভের মতে 'স্পেশাল কমব্যাট পুলিশ অপারেশন' চলছে ইউক্রেইনে। এখন পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে 'দনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক'-এর ৫০ শতাংশের কিছু বেশি এলাকা মুক্ত হয়েছে। অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায় (ফেইজ) চলছে এখন।

সীমিতসংখ্যক সেনাসদস্য নিয়ে যৌথভাবে এ অভিযান চালাচ্ছে রাশিয়া। মোটামুটি ৭০-৮০ হাজার রুশ সেনা, আর লোহান্স্ক ও দনেৎস্কের পিপলস মিলিশিয়া বাহিনী রয়েছে এ অভিযানে। পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে তারা রণাঙ্গনে নামেনি। এখন পর্যন্ত নামার প্রয়োজন হয়নি। ভবিষ্যতে যে নামবে না সেকথা হলফ করে বলা যায় না। শুধু রাশিয়া তথা রুশ ফেডারেশন নয়, অল্টারনেটিভ মিডিয়ার অধিকাংশই রণাঙ্গনের এ অগ্রগতির কথা বলছে। বহুবিবৃত এবং রুশ পরিমণ্ডলে জননন্দিত এ ভাষ্যের বিপরীতে আছে শুধু বিবিসি, সিএনএন, এমএসএনবিসি, ব্লুমবার্গ, এএফপি, ডয়চে ভেলে, পলিটিকো, দ্য মেইল প্রভৃতি তথাকথিত মেইনস্ট্রিম মিডিয়া- পল ক্রেইগ রবার্টস যাদের 'প্রেস্টিটিউট' বলে থাকেন। তাদের গলাও এখন নিচু হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর্যন্ত তাদের গলা যত চড়া ও চওড়া ছিল, এখন আর তেমন নেই। চোরের মা মারা যায়নি বটে, তবে তার বড় গলাও এখন আর নেই। সম্ভবত তা 'খোদার আশির্বাদ', যাকে বলে গডস্ উইল।

যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে ইউক্রেনের দনবাস এলাকায়; যেখানে স্থানিকভাবে যুদ্ধটা চলছিল ২০১৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র-আয়োজিত ক্যু-এর পর থেকেই। চলমান এ যুদ্ধ ইউক্রেইনের 'ময়দান ক্যু'- এর স্বাভাবিক পরিণতি। যুদ্ধ চলছে ইউক্রেইনের নব্যনাৎসি বিভিন্ন ইউনিট এবং রাশিয়া ও দনেৎস্ক-লোহান্স্ক পিপলস মিলিশিয়া বাহিনীর মধ্যে। লোহানস্ক কব্জায় আসার পরও দনেৎস্কের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা এখনো এএফইউ অর্থাৎ আর্মড ফোর্সেস অব ইউক্রেইন এবং মূলত বিভিন্ন নব্যনাৎসী ইউনিটের দখলে রয়েছে। তবে বেশিদিন থাকবে না। এএফইউ এবং নব্যনাৎসিদের অবস্থা ক্রমশ বিলীয়মান।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবরণ অনুযায়ী ইউক্রেইন যুদ্ধে ১৫ জুন পর্যন্ত ইউক্রেইনের ২০৪টি জঙ্গিবিমান, ১৩১টি হেলিকপ্টার, ১ হাজার ২১৮টি ড্রোন (ইউএভি), ৩৪০টি অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল সিস্টেম, ৩ হাজার ৫৬৯টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান, ৫২৬টি এমএলআরএস (মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম), ১ হাজার ৯৬৮টি ফিল্ড আর্র্টিলারি ও মর্টার ইউনিট এবং ৩ হাজার ৬৪৭টি বিশেষ সামরিক যান ধ্বংস হয়েছে। (সূত্র: সাউথফ্রন্ট)। প্রতিদিনই ২৫০-৩০০ ইউক্রেইনি সেনা নিহত হচ্ছে। ইউক্রেইনে রাশিয়ার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বিশেষ অভিযানের দ্বিতীয় দিনেই কায়েম হয়েছে। এখন ইউক্রেইনের কার্যকর এয়ারডিফেন্স নেই, নেভাল ফোর্স নেই। কেবল রয়েছে অপকর্মে সিদ্ধ হয়ে ওঠা নব্যনাৎসি ইউনিট এবং বাধ্যবাধকতার শিকল পড়ানো কিছু এএফইউ ইউনিট। ব্লগার গন্জালো লিরার মতে, শিগগিরই এএফইউ ইউনিটগুলো ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে চলে যাবে। (সূত্র: গন্জালো লিরার অডিও-ভিজুয়াল পোস্ট, যা নিয়মিত স্যাকার'স ব্লগে প্রচারিত হয়)।

রুশ বাহিনী ইউক্রেইনে বিদেশি ভাড়াটে সেনাদের (মার্সিনারিদের) একটা হিসাবও দিয়েছে। ১৭ জুন ২০২২ রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ৬৪টি দেশের ভাড়াটে সেনা এবং উইপনস অপারেটিং স্পেশালিস্ট (অস্ত্র চালনা বিশেষজ্ঞ) ইউক্রেইনে কাজ করছে। স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন শুরু হওয়ার সময় থেকে মোট ৬৯৫৬ জন ভাড়াটে সেনা ইউক্রেইনে ঢুকেছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৫৬ জন যৌথ বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে, ১ হাজার ৭৭৯ জন পালিয়েছে; ৩ হাজার ৩২১ জন এখনো ইউক্রেইনে রয়েছে। তারা ধরাও পড়েনি, ইউক্রেইনের সীমান্ত অতিক্রম করে চলে গেছে বলেও জানা যায়নি।

বেসামরিক নাগরিকদের জিম্মি করা ইউক্রেইনের সামরিক বাহিনীর, বিশেষ করে নব্যনাৎসি ইউনিটগুলোর রণকৌশলে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধকৌশল থেকেই প্রমাণিত হয় ইউক্রেইন পুরোপুরিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরামর্শে চলছে। বুচার হত্যাকাণ্ড, ক্রামার্তোস্কের রেলস্টেশনে তচ্কা ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালিয়ে ৫০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিককে হত্যার ঘটনা ইউক্রেইনি বাহিনীই ঘটিয়েছে এবং সেসব মার্কিন বাহিনীর পরামর্শেই করা হয়েছে। এর চেয়ে জঘন্য কাজ আর হতে পারে না। ওই সময়ে ক্রামার্তোস্ক কোনোভাবেই সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল না। রুশ বাহিনী এবং লোহান্স্ক ও দনেৎস্কের মিলিশিয়ারা তখন তার ধারেকাছেও পৌঁছায়নি। ইউক্রেইন নিজেই নিজের নাগরিকদের হত্যা করছে।

ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়ে দোষারোপের (ব্লেমগেম) প্রবণতা কিন্তু চলছেই। ইউক্রেইনের পক্ষ থেকেও এবং ন্যাটোর পক্ষ থেকেও। বিশেষ করে ইউক্রেইনের 'ক্লাউন' প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্স্কি লাগাতার মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন। তিনি কি নিজে এ প্রচারণা চালাচ্ছেন নাকি যুক্তরাষ্ট্রের এবং প্রকারান্তরে ন্যাটোর উস্কানিতে এ কাজ করছেন? তিনি যে নিজে এ কাজ করতে সক্ষম নন তা মোটামুটি সবার জানা হয়ে গেছে। হি ইজ জাস্ট প্যারোটিং- তোতার মতো বুলি আউড়ে যাচ্ছেন। আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী যুক্তরাষ্ট্র তথা ন্যাটো (সাথে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য) সেসব অনুমোদন করে যাচ্ছে। একে বলা যায় 'এস্কেপিজম অব ডেমোক্র্যাসিজ'।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো উহান ভাইরাসের গল্প করে আর সুযোগ পেলেই চীনের ওপর দোষ চাপায়। তারা এখন 'পুতিন ট্যাক্স'-এর গল্প করছে আর রাশিয়ার ওপর দোষ চাপাচ্ছে। অথচ তারা নিজের কাজের ব্যর্থতার দিকে একেবারেই তাকাচ্ছে না। দোষারোপ করে যদি পার পাওয়া যায় তাহলে তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দেবে কেন? তারা বর্তমান মূল্যস্ফীতির জন্য সমস্ত দায় পুতিনের ঘাড়ে চাপাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাসী জানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কী পরিমাণে এবং কত রকমের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিজেদের নিষেধাজ্ঞার জেরেই পাশ্চাত্য ঠেলায় পড়েছে; বেসামাল অবস্থায় পড়েছে। এর জন্য তারাই দায়ী, আর কেউ নয়। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদ, অ্যাকাডেমিক, সাংবাদিক বলেছেন এবং বলছেন, পাশ্চাত্য নিজেই নিজের চালে ফেঁসেছে। যে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে তা চলবে ততদিন যতদিন যুদ্ধটা চলবে। পাশ্চাত্য মজাটা টের পাবে; বলা ভালো, তারা ইতোমধ্যে টের পেতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি চল্লিশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যের আমজনতা ফুডস্টোরে গিয়ে জরুরি খাদ্যদ্রব্য কিনতে পারছে না। কারণ তাদের কেনার সামর্থ্য নেই। দাম নাগালের বাইরে। নীতিনির্ধারকরা তা টের পাচ্ছেন না। কারণ তাদের হাঁড়িতে এখনো এর প্রভাব পড়েনি। সাধারণ মানুষ কিন্তু মূল্যস্ফীতির আঁচ অনেক আগেই টের পেতে শুরু করেছে।

পুতিন ট্যাক্স-টা কী জিনিস? ভ্লাদিমির পুতিন ২০০০ সালের অগাস্টে একটা আইন করেছিলেন, সেই আইন কার্যকর হয়েছে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি। তাতে ১৩ শতাংশ ব্যক্তিগত আয়কর (পারসোনাল ইনকাম ট্যাক্স রেট) নির্ধারণ করা হয় এবং বিবিধ সামাজিক অবদানকে (কনট্রিবিউশন) ইউনিফায়েড সোশ্যাল ট্যাক্সের (ইউএসটি) মোড়কে পরিবর্তিত করা হয়। কথা হচ্ছে, এর সাথে পুতিন ট্যাক্সের কী সম্পর্ক? পুতিন কি ইউক্রেইনে রাশিয়ার বিশেষ অভিযান উপলক্ষে রুশবাসীর উপর অনুরূপ কোনো কর-ব্যবস্থা আরোপ করেছেন? যার ফলে রাশিয়াও ভুগছে এবং তার জেরে বিশ্ববাসীও ভুগছে?

হ্যাঁ, যুদ্ধের শুরুতে পাশ্চাত্য রাশিয়ার অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় রুশ সরকার তার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে রুশদের ওপর সর্বোচ্চ উনিশ শতাংশ সুদহার আরোপ করে। কিন্তু মাসখানেকের মধ্যে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার পর প্রথম ধাপে এই করহার ১৬ শতাংশে নামানো হয়। দ্বিতীয় ধাপে আরেক দফা কমিয়ে সেটা ১১ শতাংশে নামানো হয়। অতএব পুতিন ট্যাক্সের কী প্রভাব! সেটা বোঝা খুব দুষ্কর। সত্যিই দুষ্কর। এটা কেবলই দোষারোপের একটা অভ্যাসজনিত চর্চা।

আপনি হয়ত আশা করছেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তথাকথিত গণতান্ত্রিক বিশ্ব তথা পাশ্চাত্য বর্তমান মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় এবং জীবনমানের অবনতি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, যাতে মানুষ একটু স্বস্তি পায়। অথবা তারা ইউক্রেইনকে সমরাস্ত্র জোগানো বন্ধ করবে। হা হতোস্মি। তারা ব্লেমগেম চালাচ্ছেই চালাচ্ছেই; এবং সব দায় রাশিয়ার ওপর চাপাচ্ছে। অতিদ্রুত আগোয়ান সময়ে তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের ঘাড়েও দায় চাপাবে। যেমন করোনার কারণে তারা চীনের ওপর দায় চাপিয়েছে। এটা একটা এস্কেপিস্ট টেন্ডেন্সি। ইউক্রেইন যুদ্ধে হেরে ভূত হয়ে যাচ্ছে তা তাদের নজরে পড়বে না। কিছুতেই পড়বে না। অভিযান শুরুর তিনমাস পর দনবাসে ইউক্রেইনের যে কোনো অর্জন নেই সেকথা কে তাদের বোঝাবে?

অন্য রাষ্ট্রের উপর দোষারোপের চেষ্টা ইঙ্গ-মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মার্কিন প্রেসিডেন্টেরা বরাবরই তা করেছেন। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এ প্রবণতা ব্যাপক বেড়েছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব কিন্তু ২০১৯ সালের আগেই ধরা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু তারা তা স্বীকার করেনি; কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। যখন হুবেই প্রদেশের উহানে করোনা ভাইরাস ছড়ালো তখনই যুক্তরাষ্ট্র জোর গলায় বলতে লাগল, চীনের কারণে এবং চীনের উহান থেকেই এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র করোনাভাইরাসের নাম 'উহান ভাইরাস' রাখার বহু চেষ্টা করেছে, তাদের গণমাধ্যমগুলো তা ঢেরা পিটিয়ে চাউর করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে। যদিও শেষপর্যন্ত তাদের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু উল্টো কথাই বলে, কোভিড-১৯- এ মৃত্যুর হার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে; দশ লাখ চল্লিশ হাজারের কাছাকাছি। করোনায় মৃত্যুর বিশ্বরেকর্ড যুক্তরাষ্ট্রেরই দখলে। কোভিডে তারাই চ্যাম্পিয়ন।

দোষারোপের কূটনীতি ট্রাম্পও করেছেন, বাইডেনও করছেন। তারা উভয়ে চীনকে দোষারোপ করেছেন। এখন বাইডেন দোষারোপ করছেন রাশিয়াকে, বিশেষ করে পুতিনকে। পুতিন ট্যাক্স নাকি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আর ট্রাম্প বলেছিলেন, তার কাছে প্রমাণ আছে যে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে উহান থেকে করোনা ভাইরাস, যার কারণে কোভিড-১৯ মহামারী দেখা দিয়েছে তা ছড়িয়েছে। এ কারণে তিনি চীনের উপর বাণিজ্য অবরোধ চাপাতে চেয়েছিলেন। দুটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্প এবং বাইডেন কাউকে না কাউকে বলির পাঠা বানাতে চেয়েছেন, অথচ তাদের দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যমানের উন্নয়নের জন্য কিছুই করেননি, করছেন না।

(Talking of blaming other governments, Biden's Putin Tax comes out profoundly; he said it casually as if he was expecting every American to accept that the current trend of inflation and worsening living standards is caused by Putin, which is clearly untrue. … the inflationary trend began with Trump's anti-China trade war in august 2019 and accelerated with the mismanagement of Covid-19, which resulted in supply chain issues. Some will ask me "what about Putin's Invasion" to which I will reply "it has nothing to do with the current crises".)

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের কোনো প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পরিবর্তনের ইচ্ছাও তাদের নেই। তাদের 'ভাঁড়ে মা ভবানী' অবস্থা।

ক্যাথলিক বিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মনেতা পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে (ওয়ার্ল্ড ওয়ার থ্রি হ্যাজ বিন ডিক্লেয়ার্ড- পোপ ফ্রান্সিস; আরটি অনলাইন)। ১৪ জুন, ২০২২ আরটি অনলাইন-এর খবরে বলা হয়েছে, "দ্য পন্টিফ হ্যাজ ল্যামেন্টেড মিলিটারি কনফ্লিক্টস অ্যাক্রস দ্য গ্লোব অ্যান্ড সেইড দ্য রাশিয়া-ইউক্রাইন ক্রাইসিস মে হ্যাভ বিন 'প্রভোকড'।" তিনি একথাও বলেছেন, ''ওয়ার্ল্ড ওয়ার থ্রি ইজ অলরেডি ইন প্রগ্রেস অ্যাজ এভিডেন্সড বাই 'ইন্টারউইন্ড এলিমেন্টস' অ্যাট ওয়ার্ক ইন দ্য রাশিয়া-ইউক্রাইন ক্রাইসিস অ্যান্ড আদার কনফ্লিক্টস অ্যাক্রস দ্য গ্লোব'।"

বেশ কয়েক বছর আগেই তার মনে হয়েছে- তা আলঙ্কারিক হোক বা আক্ষরিক হোক- বিশ্ববাসী অন্ন-সংস্থানের জন্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লড়ছে। ১৯ মে ২০২২ জেসুইট মিডিয়ায় দেওয়া এক সাক্ষৎকারে, যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, তিনি বলেন, "আজ মনে হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।" রাশিয়া ও ইউক্রেইনকে এ যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারে ইন্ধন জোগানো হয়েছে। যুদ্ধ উত্তর নাইজেরিয়ায় চলছে, যুদ্ধ মিয়ানমারে চলছে। এ ব্যাপারে কারো কোনো হেলদোল নেই। মানবজাতিকে এক শতাব্দি কালের মধ্যে তিনটি বিশ্বযুদ্ধ দেখতে হচ্ছে। সমরাস্ত্রের বাণিজ্য এর অন্যতম নিয়ামক কারণ। ইউক্রেইনিদের 'বীরত্বের প্রশংসা'-র পাশাপাশি তিনি একথাও বলেন, "বাইরের কোনো পক্ষের স্বার্থে ইউক্রেইন ধ্বংস হতে চলেছে। বৈশ্বিক স্বার্থ, অস্ত্র বিক্রি, কোনো পক্ষের ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা লোটার মানসিকতা একটা জাতিকে (ইউক্রেন) ধ্বংস করে দিচ্ছে।" আলঙ্কারিকভাবে তিনি বলেন-

"We have to get away from the common mindset of Little Red Riding Hood. Little Red Riding Hood was good, and the wolf was the bad guy. Here, there are no metaphysical good guys and bad guys, in the abstract. Something global is emerging, with elements that are closely intertwined with each other."

কারো নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, "একজন বিজ্ঞলোকের সাথে আমার কথা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর বেশকয়েক মাস আগে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ন্যাটোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি অবহিত এবং উদ্বিগ্নও বটে। আমি তাকে বললাম, 'কেন?' বিজ্ঞ লোকটি বললেন- কারণ তারা রাশিয়ার সদর দরজার কাছে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করছে। তারা বুঝতে চাচ্ছে না যে, অতীতে রাশিয়ারও বড় সাম্রাজ্য ছিল; সাম্রাজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাশিয়ার নাগরিকদের আছে। তারা কোনো বিদেশি ও সাম্রাজ্যলোভী শক্তিকে কাছে ঘেঁষতে দেবে না।"

বিজ্ঞ লোকটি কে, পাঠক ভেবে দেখতে পারেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক