অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই কাউকে অন্যায় করার এক্তিয়ার দেয় না

বিভুরঞ্জন সরকারবিভুরঞ্জন সরকার
Published : 3 July 2022, 03:14 AM
Updated : 3 July 2022, 03:14 AM

সম্ভবত ১৯৯৩ সালের ঘটনা। বিএনপি ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও বিস্ময়কর ছিল। কারণ সাংগঠনিক শক্তির বিবেচনায় বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ এগিয়ে ছিল। 

৩০০ আসনে প্রার্থী দিতেই বিএনপিকে হিমসিম খেতে হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনের ফলাফল স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নেননি। তিনি ওই নির্বাচনকে সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচন বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে ওই নির্বাচন সম্পর্কে অপরাপর রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং পাবলিক পারসেপশন ছিল ভালো। মনে করা হচ্ছিল, নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল নির্বাচনের ফলাফলকে স্বাগত না জানানোর ফলে রাজনীতিতে যে অস্বস্তি এবং বিদ্বেষ ও অনৈক্যের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা আর না কমে বরং নানা যুক্তিসঙ্গত কারণে বেড়েছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি এখন এক বড় কষ্ট কল্পনা।

ওই সময় আমি সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে একটি রাজনৈতিক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য ধরে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছিলাম, যা আওয়ামী লীগের উগ্র সমর্থকদের পছন্দ হয়নি। একদিন সন্ধ্যায় কাকারাইলের যায়যায়দিন অফিসে বসে আছি। মুনীরুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম। সম্পাদক শফিক রেহমানও তখন অফিসে ছিলেন। তখন মোবাইল ফোন ছিল না, ল্যান্ড ফোনে একটি টেলিফোন কল এলো। আমি-ই ধরলাম। ও প্রান্ত থেকে আমার পরিচয় জানতে চাওয়া হলে নাম বলতেই ওদিক থেকে অত্যন্ত হেড়ে গলায় চিৎকার করে বলা হলো, "শালা মালাউনের বাচ্চা, বাংলাদেশে থাকতে হলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু লেখা যাবে না।"

প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হলেও দ্রুত সামলে নিয়ে আমার পক্ষে যতটুকু কঠোর হওয়া সম্ভব ততটুকু কঠোর কণ্ঠেই টেলিফোনের ও প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেই। তবে বিষয়টি আমার খারাপ লাগে। আমি আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। নিজের বিবেচনাবোধ থেকেই লেখালেখি করি। তার বেশির ভাগই হয়তো আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়। কারণ ভুলত্রুটি-সীমাবদ্ধতা  থাকলেও আওয়ামী লীগ ছাড়া অনেক ইস্যুতেই সমর্থন করার মতো  দল দেশে আর নেই। আমি আওয়ামী লীগের খারাপ কাজের সমালোচনাও করি দ্বিধাহীনভাবেই। কোনো লেখা আওয়ামী লীগের পক্ষে গেলে বিরোধীরা তেড়েফুড়ে ওঠেন, বিরুদ্ধে গেলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ক্রোধ সম্বরণ করতে পারেন না।

অসহিষ্ণুতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ মনে করেন, এর জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী। আবার কেউ মনে করেন, বিএনপির কারণেই দেশে হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েছে। আমার মনে হয়, বিএনপির দায় বেশি হলেও আওয়ামী লীগ একেবারে দায়মুক্ত নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে বিএনপি যতটা নির্দয়, নিষ্ঠুর- আওয়ামী লীগ ততটা নয়। আওয়ামী লীগ করে খুচরা অপরাধ, বদনাম হয় বেশি। বিএনপির অপরাধ পাইকারি, কিন্তু বদনাম কম।

আওয়ামী লীগ যদি প্রতিহিংসা বা বিরোধী শক্তি নির্মূলের রাজনীতি করতো তাহলে আজ দেশে আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব থাকতো কিনা সন্দেহ।

স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই যদি দেখা যায়, তাহলে কী এটা বলা যায় যে, আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিল? হত্যা-খুনের রাজনীতি বঙ্গবন্ধুর আমলে কি আওয়ামী লীগ বেশি করেছে, না আওয়ামী লীগবিরোধীরা বেশি করছে? ভাবা যায়, তখন বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। অথচ আওয়ামী লীগের এমপি-নেতারা খুন হয়েছেন একের পর এক। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলে কী না হতে পারতো তখন। কিন্তু তিনি উদারতা দেখিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন তাই হত্যার বদলে হত্যা নয়, তিনি অনুসরণ করেছেন মার্জনা করে দেওয়ার উদারতার পথ। সংসদে তখন আওয়ামী লীগের ব্রুট মেজরিটি। অথচ ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একাই বাধাহীনভাবে সংসদ কাঁপিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

কেউ বলবেন, বঙ্গবন্ধুর আমলে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারের কথা। রক্ষীবাহিনী বাড়াবাড়ি করেনি – এটা বলা যাবে না। তবে সদ্য স্বাধীন দেশে যারা স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে, কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, যারা একের পর এক থানা লুট, পাটের গুদামে আগুন দিয়ে দেশে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তাদের দমনে নমনীয়তা দেখানোর সুযোগ ছিল কি? পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশ কী ক্ষমতাসীনরা ফুল ছড়িয়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করে?

বঙ্গবন্ধুর আমলে 'হাজার হাজার' রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করার যে ঢালাও অভিযোগ করা হয় তাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক কলাম লিখেছেন আমার সাংবাদিক বন্ধু মাহবুব কামাল। মাহবুব কামাল একসময় জাসদের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তিনি জেল খেটেছেন বঙ্গবন্ধুর আমলে নয়, জিয়াউর রহমানের আমলে। তার চ্যালেঞ্জ ছিল, মুজিব আমলে হাজার হাজার তো দূরের কথা, এক হাজার নিহত রাজনৈতিক নেতাকর্মীর নাম ঠিকানা কেউ দিতে পারলে তিনি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবেন। কোনো রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, গবেষক তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণে এগিয়ে আসেনি।

তার মানে কী এই যে, বঙ্গবন্ধুর আমলে কোনো অন্যায় এবং বাড়াবাড়ি হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে তখনকার তিনটি বড় অঘটন হলো : 

এক. ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি ভিয়েতনামের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে পুলিশের গুলি বর্ষণের ফলে মতিউল-কাদেরে মৃত্যু এবং অনেকের আহত হওয়ার ঘটনা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীরা কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করে বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। 

দুই. ১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের কয়েকজন প্রার্থীকে বলপ্রয়োগ করে পরাজিত করার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠেছিল। অন্যদিকে কুমিল্লা একটি আসন থেকে খোন্দকার মোশতাক আহমেদকে পরাজিত হতে থাকা সত্ত্বেও তার ব্যালট বাক্স ঢাকা এনে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ভুলের বড় মাশুল আওয়ামী লীগকে দিতে হয়েছে।

তিন. নকশাল নেতা সিরাজ সিকদার পুলিশি হেফাজতে নিহত হওয়ার ঘটনাটিও আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক ইমেজে কালি লেপন করেছে।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে তো কেবল আওয়ামী লীগের মার খাওয়ার ইতিহাস। আবারও বলি, খুচরা কিছু হ্ত্যা বা সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ব্যাপক বদনামের ভাগিদার হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনি কিংবা প্রবল আওয়ামীবিরোধী কোনো ব্যক্তির গায়ে আওয়ামী লীগ কাঁটার আঁচড়ও দিতে পারেনি। খুনি মোশতাকেরও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বিএনপি এবং এরশাদ আমলে আওয়ামী লীগ যতটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে, তার বদলা যদি আওয়ামী নিতে চেষ্টা করতো তাহলে দেশে রক্তের গঙ্গা বয়ে যেতো।

উল্টো দিকে, বিএনপির ইতিহাসটা কেমন?

আওয়ামী লীগ ভক্ত টেলিফোনে আমাকে ঝাড়ি দিয়েছেন। আর বিএনপির এক পাতিনেতা আমার এক লেখার জন্য যায়যায়দিন অফিস থেকে আমাকে তুলে নিতে এসেছিলেন মাইক্রোবাস বোঝাই ক্যাডার নিয়ে। ২০০১ সালের নির্নাচনের আগে-পরে ভয়াবহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে লেখার অপরাধে আমাকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত কি নৃশংস শাসন কায়েম করেছিল, আমরা তা দিব্যি ভুলে বসে আছি।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা  জিয়াউর রহমানের ক্ষমতারোহন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রতিটি ধাপই ছিল রক্তাক্ত। তিনি তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য কত মানুষকে হত্যা করেছেন, সেনাবাহিনীতে কার্যত গণহত্যা চালিয়েছেন, সেসব কথা নিয়ে কোনো আলোচনা তেমন হতে দেখা যায় না। খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগের কতজন জনপ্রিয় নেতা হত্যার শিকার হয়েছেন। দেশে জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে। আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। আইভি রহমানসহ ২৪জনকে জীবন দিতে হয়েছে।ভেবে দেখুন তো, একটু এদিক ওদিক হলে সেদিন কি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতো! তারপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে কী প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়েছে?

হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী বাড়াবাড়ি করেন। ইদানিং বড় বড় দুর্নীতির সঙ্গেও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের নাম জড়িত থাকার খবর প্রকাশ হচ্ছে। এগুলো অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে আওয়ামী লীগকে বিপদে পড়তে হবে। আওয়ামী লীগের সব কর্মকাণ্ড বহু চোখ নজরদারিতে রেখেছে। আওয়ামী লীগেও আছে আওয়ামী লীগের শত্রু। তাই কেউ ফেইসবুকে বা অন্য কোথাও সরকার বা সরকারি দলের কারো  সমালোচনা  করলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে, তাকে দেশছাড়া করার হুমকি না নিয়ে নিজেরা সংশোধনের চেষ্টা করাই ভালো। দেশটাকে কোনো দলই যেন খাস তালুক না ভেবে যদি সব মানুষের নিরাপদ বাসস্থান হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে হয়তো অনেক বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

দুইটি বিষয় সবাইকে মনে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এক রকম দল নয়। দুই দলের ভুলত্রুটিও ভিন্ন রকমের। দুই দলের মধ্যে তুলনা করা যায় না। আবার এটাও ঠিক, রাজনীতি তো তুলনারই বিষয়। কার চেয়ে কে ভালো তা মানুষ বিবেচনা করে থাকে। তবে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, কারো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই কারো অন্যায় করার এক্তিয়ার দেয় না। এটা বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায্য লড়াইকে মূল্যহীন করে দেয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক