যৌন সহিংসতা: প্রশ্ন নাকি বিশ্বাস?

নাবিলা চৌধুরী
Published : 10 August 2020, 02:57 PM
Updated : 10 August 2020, 02:57 PM

[সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক অঞ্চলে দক্ষিণ এশিয়ান তরুণীরাও প্রতিবাদমুখর হয়েছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণকারী অথবা নির্যাতনকারী বা অসভ্য আচরণকারিদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। সে আলোকে জনমত সৃষ্টির অভিপ্রায়ে দক্ষিণ-এশিয়ান আমেরিকানদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'দেশিজ রাইজিং আপ অ্যান্ড মুভিং' তথা ড্রাম এর পক্ষে এ লেখাটি তৈরিতে মূল লেখক নাবিলার সাথে সহায়তা করেছেন রিজওয়ানা, নূসরাত জেবা, আলীশা আহমেদ এবং রওশনআরা।  তারা সবাই যৌন সহিংসতা নিয়ে ভিকটিমদের পক্ষে কাজ করছেন।]

আপনি কি আপনার শিশু অথবা  ছোট ভাইবোনকে  আপনার আত্মীয় পরিজনের সাথে কোলাকুলি করতে  বলেন ?  আপনার ছোট শিশুটি  ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছে কিন্তু তারপরও আপনি বারবার একই কথা বলেন? আপনার বাসায় পুরুষ অতিথি আসলে আপনি কি আপনার কন্যাকে ভালোভাবে শরীর ঢেকে তাদের সামনে আসতে বলেন? এই একই কাজ কি আপনি আপনার ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে করেন?  আপনি এসব করেন কারণ  আপনার মনে হয় মেয়েরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে ? 

কেন এই সময়ে লিখছি? 

গত কয়েকমাস  ধরে আমাদের কমিউনিটির (যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাসরত এশিয়ান অভিবাসীদের) ১০০ জনেরও বেশি মেয়ে যারা স্কুল বা কলেজে পড়ে তারা যৌন হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ বিষয়ে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং এমনকি নির্যাতনকারীর নামও প্রকাশ করেছে। হতাশার কথা হচ্ছে এ হয়রানকারী বা নির্যাতনকারীরা আমাদের  নিজেদের কমিউনিটির পুরুষ! এদের অনেকেই অনেক বেশি ক্ষমতাধর এবং প্রভাবশালী। কমিউনিটিতে নানা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকেও কেউ কেউ এমন জঘন্য অপকর্ম করেছে। বেশিরভাগ সময়ই এরা ধারাবাহিকভাবেই এই কাজগুলো করছে। 

এটা কি নতুন কিছু? 

আমাদের কমিউনিটির নারীরা দীর্ঘদিন ধরেই নীরবে সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। 

নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৪ জন নারী কোনও না কোনও ধরনের যৌন হয়রানির  শিকার হন (সূত্র: একসাথে)।  নির্যাতনকারীকে কমিউনিটিতে  কোন রকম শাস্তির সম্মুখীন হতে হয় না বা জবাবদিহিতা করতে হয়না। এর ফলে সে অনায়াসে তার নির্যাতন চালিয়ে যায়। কমিউনিটি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব  হচ্ছে  একে  নিরাপদ রাখা এবং নিজেদের মানুষ অন্যায়  করলে তার বিরুদ্ধেও রুখে  দাঁড়ানো; অন্যথায় বড় বিপর্যয় বয়ে আনবে। যদি আমরা আমাদের পরিবারে, কমিউনিটিতে এ অন্যায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করি, কথা না বলি- তাহলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই সহিংসতা চলতেই থাকবে। এই সহিংসতা একটি অস্বাস্থ্যকর এবং অন্যায় সমাজ গড়ে তুলেছে। আর একারণেই আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে রুখে দাঁড়িয়েছি যাতে সব ধরনের অন্যায় সহিংসতা বিশেষ করে নারীর প্রতি সংঘটিত সহিংসতা বন্ধ হয় এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা পায়। 

আমরা কিভাবেই বা জানবো এবং কাকেই বা বিশ্বাস করবো?

আমাদের সমাজে মেয়েদের পক্ষে এসব বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলা বা এসব ঘটনা প্রকাশ করা খুবই কঠিন। এটা ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে। ড্রামের কিছু সদস্য এবং আমাদের জানাশোনা কিছু মেয়ে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা প্রকাশ করায় তারা যে অবস্থায় পড়েছিল তা হচ্ছে:

ক. বাধ্যতামূলক বিয়ে ( দেশে নিয়ে অথবা আমেরিকায়)

খ. বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া

গ. পরিবার এবং আত্মীয়দের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া 

ঘ.  নির্যাতনকারী এবং তাদের পরিবার দ্বারা আরো বেশি মাত্রায় সহিংসতার শিকার হওয়া 

ঙ. হত্যার শিকার হওয়া  ।

মেয়েরা যখন তাদের নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করে তখন সে নির্যাতনকারীর পক্ষ হতে আরো বেশী দুর্দশায় পতিত হয়। নির্যাতনকারী বেশিরভাগ সময়ই ক্ষমতাবান হয় এবং তারা জানে তাদের ক্ষমতা দিয়ে এ ধরনের অন্যায় থেকে খুব সহজেই পার পেয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নামেও যৌন নিপীড়ণের অভিযোগ রয়েছে এবং একই সাথে তিনি আমেরিকার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। 

যদি  নির্যাতিতার অভিযোগ সম্পর্কে  আপনার কোনও সন্দেহ থাকে তাহলে আপনি নির্যাতকের পক্ষ নেওয়ার চেয়ে নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান সেটা বরং অনেক ভালো। আমাদের কমিউনিটি থেকে এই ধরনের সহিংসতা তখনই দূর হবে যখন নির্যাতক কমিউনিটিতে ভয়াবহ পরিণামের সম্মুখীন হবে। আর এটা তখনই সম্ভব যখন আমাদের কমিউনিটি নির্যাতিতার পাশে দাঁড়াবে এবং তাকে বিশ্বাস করবে।  

প্রমাণ কী? 

আমাদের কমিউনিটিতে এটা একটা খুব সাধারণ এবং চর্চিত কথা হচ্ছে, তুমি যে অভিযোগ করছো তার প্রমাণ কী?  আমাদের জানা একটা ঘটনার কথা আপনাদের বলছি- একজন টিউটরকে  তার বস নিজের গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দেবেন বলে  গাড়িতে উঠতে বললেন। মেয়েটি তার চাকরি রক্ষার্থে বসকে না বলতে পারলো না। এখন মাঝ রাস্তায় ওই বস তার কর্মচারীর শরীর স্পর্শ করলেন এবং হেনস্থা করলেন। এখানে কি প্রমাণ থাকা সম্ভব? এরকম আরও অসংখ্য ঘটনা আছে যেখানে প্রমাণ থাকা অসম্ভব। একটা কথা সবাইকে ভাবতে হবে যে, এধরনের নির্যাতন কখনই প্রমাণ রেখে কেউ করেনা, সবার সামনেও করেনা। এসব ঘটনা সবসময় একান্ত গোপনীয়ভাবেই ঘটানো হয়। 

আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে, অনেক মেয়েই অভিযোগ করে যে, তাদের সাথে যেসব ছেলেদের সম্পর্ক আছে সেই সব ছেলেরা যৌন সম্পর্ক করতে চাপ দেয় এবং বাধ্য করে। এ ধরনের সহিংসতা স্বামী-স্ত্রীর মাঝেও ঘটে থাকে এখানে আপনি কী ধরনের প্রমাণ জোগাড় করতে পারেন? 

এ ধরনের অভিযোগ করার জন্য যথেষ্ঠ সাহস দরকার হয় কারণ, সে জানে এর জন্য তাকে এবং পরিবারকে চরম মূল্য দিতে হবে। আবার আমাদের কমিউনিটি বিয়ের আগে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটাও একটা কারণ যে তারা তাদের সহিংসতার কথা প্রকাশ করে না। যত যাই হোক আমাদের সকলের উচিৎ কোনও ধরনের প্রমাণের জন্য জিজ্ঞেস না করে নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো এবং তার কথা বিশ্বাস করা।  

তারা কেন পুলিশের কাছে যায়না?

আমাদের ড্রাম সদস্য এবং তাদের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন সময়ে পুলিশের দ্বারা হেনস্থার শিকার হয়েছে এমনকি ধর্ষণেরও শিকার হয়েছে। বেশিরভাগ সময়ে পুলিশের কাছে যাবার কথা মনে হলেই তারা আরও   বেশি মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়ে।

পুলিশের কাছে অভিযোগ করার পরে দেখা গেছে খুব কম সংখ্যক আসামী  যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের মামলায় কোর্টে বিচারাধীন মামলায় গ্রেপ্তার হয় বা জেলে থাকে  (সেকারনে নির্যাতিতের এবং তার পরিবাররের  জন্য কমিউনিটিতে তা আরো বিপদজনক  অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে )।

এই ধরনের ঘটনায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াও একটা বড় মানসিক ট্রমা। এর মাধ্যমে নির্যাতিতের এবং তার পরিবারকে সমাজে আরো বেশি বিপদে ফেলা হয়। (সমাজে এটার চর্চা এমন হয় যে পরিবার আরো বেশি খারাপ  অবস্থায় পড়ে।) 

অনেক সময় পুলিশ নির্যাতিতের কাছে নানা ধরনের অসংলগ্ন প্রশ্ন করে- "আপনি কি পোশাক পড়েছিলেন? আপনি কি মাতাল ছিলেন?"  

২০১৯ সালের নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক তথ্যমতে, দুই লাখ ধর্ষণ ঘটনার যন্ত্র অপরীক্ষিত। 

এছাড়াও  আপনি  যদি কাগজপত্রহীন হন তাহলে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার অর্থ হচ্ছে আপনি বহিস্কার হবেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সুত্র মতে-  আইসের ডিটেনশন ক্যাম্পেও যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে। এছাড়া আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে, এত কষ্ট করে এই দেশে আসার পরে ডিটেনশনের শিকার হয়ে আবার ফেরত যান!  এসব বিষয়গুলোও পুলিশের কাছে যেতে নিরুৎসাহিত করে। 

কেনই বা এতদিন পরে? 

আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের কমিউনিটি কখনই এধরনের ঘটনায় কী করতে হবে বা কী করা উচিৎ এসব বিষয়ে শিক্ষা দেয়না ।যখন কেউ এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয় তখন সে দীর্ঘ সময় এক সাংঘাতিক ধরনের মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যায় ফলে কী ঘটেছিল বা কিভাবে হয়েছিল এসব বিষয়ের স্পষ্টতা আনতেই তার দীর্ঘ সময় লেগে যায়। যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করা কোনও সহজ কাজ নয়। আমরা যদি এদের সহযোগিতা না করি, তাহলে অপরাধী কোনদিনই  শাস্তি পাবেনা  বরং আরো বেশি সাহস পেয়ে যাবে এবং এই সমাজ থেকে যৌন হয়রানি কখনই দূর হবেনা।   

আমরা বেশিরভাগই আমাদের মা-দেরকে নির্যাতন সহ্য করা  এবং প্রতিবাদ না করা দেখে বড় হয়েছি। যখন আমরা আমাদের পরিবারে এটা একটা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখে অভ্যস্ত তখন আমরা বেশিরভাগ সময় হতাশ হই এবং এর বিরুদ্ধে কথা বলতে নিরুৎসাহিত হই। এত কিছু সত্ত্বেও আমরা একটা ব্যতিক্রম সময়ে এসেছি যেখানে ১০০ জনেরও বেশি তরুণ মেয়ে তাদের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করেছে এবং নির্যাতকের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। আর একারণেই আরও অনেক বেশি মেয়ে উৎসাহিত হয়েছে, তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলার জন্য। আর এজন্যই কমিউনিটি হিসেবে আমাদের উচিৎ তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং আমাদের ঘরে বাইরে সব জায়গায় যাতে এই সহিংসতা চিরতরে বন্ধ হয় তার জন্য কাজ করা।

আমরা আমাদের কমিউনিটির কাছ থেকে কী চাই? 

যৌন সহিংসতা রোধে আমাদের দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটিকে দায়িত্ব নিতে হবে। পিতৃতান্ত্রিক ভাবধারা বা বিশ্বাসের প্রতি আমাদেরকে অবশ্যই চ্যালেঞ্জ করতে হবে কারণ এটি আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার বিপরীতে শুধু  ক্ষতিগ্রস্তই করে। 

আমাদের উন্নতির জন্য এখানে কয়েকটি ধাপের কথা বলা যায়-  

১. আমরা আমাদের মেয়েদের আদর্শ পোশাক পরার কথা বলি, তারা সেটা মেনে চলার পরেও ধর্ষণের মত সহিংসতার শিকার হয়। এমন কোনও মেয়ে আছে যে পুরুষের কাছ থেকে কোন ধরনের হেনস্থার শিকার হয় না? আমরা প্রতিনিয়ত মেয়েদেরকে দোষ দেই, অথচ সত্য হচ্ছে সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নির্যাতন বন্ধের জন্য দাবি তোলাই হচ্ছে  আমাদের কমিউনিটির  দায়িত্ব। 

এর অর্থ হচ্ছে আমরা আমাদের মেয়েদেরকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করতে উৎসাহিত করবো। তারা যে পোশাকই পড়ুক না কেন, যার সাথেই ঘুরে বেড়াকনা বা যখন যেখানেই থাকুক না কেন। আর এভাবেই সম্ভব পুরুষদের হয়রানি বন্ধ করা। 

২. আমাদের শিশু সন্তানদের সাথে তাদের সম্মতি নিয়ে কথা বলতে হবে যখন তাদের বয়স ২-৬ বছর। আমরা অবশ্যই  আমাদের আত্মীয় -স্বজন, বন্ধুদেরকে কোলাকুলি করা বা চুমু খাওয়া এসব বিষয়ে শিশুদেরকে জোর করবো না। যখন কেউ তাদের পেছনে, বুকে বা গোপন স্থানে স্পর্শ করে সেটা অন্যায় এবং এসব ঘটনা কেউ তাদের সাথে ঘটালে তারা যেন নির্ভয়ে আপনার সাথে কথা বলতে পারে । 

৩. আমাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে কোনটা ভালো আর কোনটা লজ্জার বিষয় এটার স্পষ্ট বিভাজন থাকা দরকার । আমাদের সদস্যদের অনেকেই আমাদেরকে জানিয়েছে, যে তারা যখন কোন আত্মীয়-পরিজন বা ধর্মীয় শিক্ষকের  বিরুদ্ধে এসব বিষয়ে পিতা-মাতার কাছে অভিযোগ করে তখন তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে চুপ করিয়ে দেয়, কারণ তারা ভয় পায় যে এটা জানাজানি হলে তারা সমাজে লজ্জার মধ্যে পড়বে। নির্যাতনকারী এই বিষয়টা খুব ভালোভাবেই জানে যে, এই ধরনের তথাকথিত লজ্জা বা সম্মানহানির ভয়ে কেউ কখনই এসব বিষয় প্রকাশ করবেনা।  তাই সে বারবার এই অন্যায় করার সাহস পায়। যদি আমরা এর অবসান চাই তাহলে আমাদের এই ধরনের সম্মানহানি বিষয়টাকে অবশ্যই মুছে ফেলতে হবে।  

যৌন সহিংসতার শিকার হিসেবে আমরা চাই আমাদের কমিউনিটি যৌন সহিংসতা চিরতরে সবার জন্য বন্ধ করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক