রক্তাক্ত নভেম্বর: কী চেয়েছিলেন খালেদ ও তাহের

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনমোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
Published : 8 Nov 2015, 06:13 AM
Updated : 8 Nov 2015, 06:13 AM

১.

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তম ও কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তম– মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর সেনানী। আরও একটি মিল আছে দুজনের মধ্যে। দুজনই যুদ্ধাহত সেক্টর কমান্ডার। ১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে কসবার উল্টো দিকে কমলা সাগরে পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত শেলের একটি স্প্লিন্টার খালেদের কপাল ভেদ করে সম্মুখভাগের মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ে। অন্যদিকে, ১৪ নভেম্বর ১১ নম্বর সেক্টরে ঢাকার প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত কামালপুর শত্রুঘাঁটি দখলের এক সম্মুখযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর মর্টার শেলের আঘাতে তাহেরের বাম পা হাঁটুর উপর থেকে উড়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধে এই দুই সেনানায়কের এমনভাবে আহত হওয়া পরবর্তীকালে তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী ভয়াবহ অভিঘাতের সৃষ্টি করেছিল, তা-ও আমরা দেখব। মহাবীর এই দুজনের জীবনে মিলের এ-ও আরেক উদাহরণ, যদিও তা ছিল চরম দুর্ভাগ্যজনক, প্রাণঘাতী।

যেহেতু এ লেখার অন্যতম চরিত্র জেনারেল খালেদ মোশাররফ, তাই তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের দুটো উজ্জ্বল স্মৃতি উল্লেখ করব।

প্রথমটি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে। গৌহাটি সামরিক হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স ট্রেনে মেজর তাহেরের সঙ্গে এসেছি লক্ষ্মৌ সামরিক হাসপাতালে। জানা গেল, মেজর খালেদ মোশাররফও আছেন এখানে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার খবর আগেই জেনেছি। ১৪ নভেম্বরে কামালপুর যুদ্ধে হাঁটুর উপর থেকে পা হারাবার পর তাহেরকে তখনও শয্যাতেই থাকতে হয়। তারপরও তাহের তাঁকে হুইল চেয়ারে বসাতে বললেন। উদ্দেশ্য খালেদ মোশাররফকে দেখতে যাওয়া।

হুইল চেয়ারটি ঠেলে নিয়ে গেলাম আমি। তাহেরকে দেখে খালেদ বিছানায় উঠে বসলেন। কিছুক্ষণ কথা হল দুই যুদ্ধাহত সেনানায়কের মধ্যে। কী মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম! We were in the thick of the battle, খালেদ মোশাররফের কথাটি কেন যেন মনে গেঁথে গেল। এখনও ভুলিনি।

দ্বিতীয় দেখা ১৯৭৫এর ১৫ আগস্টের পর। সম্ভবত সেপ্টেম্বরে। ৫৬, স্টাফ রোডে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বাসায় তাহের ভাইয়ের সঙ্গে গিয়েছি এক বিকেলে। বাসাটি আমার খুব পরিচিত। কারণ এই বাংলোতেই তাহের ভাই থাকতেন অ্যাডজ্যুটেন্ট জেনারেল পদে থাকাকালে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বিরাজমান পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে তাহের আলোচনা করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু দেশের গভীর সংকটে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ রচনা করার তাহেরের আগ্রহে কোনো সাড়া দিলেন না খালেদ মোশাররফ। তাঁর অভিব্যক্তিহীন ও নিরাসক্ত চেহারা আমার স্পষ্ট মনে আছে। খুব বেশি কথাও তিনি বলেননি।

ফেরার পথে গাড়িতে তাহের ভাইকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাও করেছি। তাহের বলেছেন, হয়তো তিনি আর সেনাবাহিনীতে নেই বলে খালেদ মুখ খোলেননি। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাহেরের প্রস্তাবে খালেদ মোশাররফের নিরাসক্ত ও অভিব্যক্তিহীন মনোভাবের অন্যতম একটি কারণ যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মাথায় গুরুতর আঘাতজনিত সমস্যা, তা আজ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।

২.

শিরোনামের কথায় এবার আসি। তার আগে এই দুই সেনানায়ক সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য দেব। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে হানাদার বাহিনীর গণহত্যার 'অপারেশন সার্চলাইট'এর অন্যতম রূপকার মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তাঁর A Stranger in My Own Country বইয়ে বলেন:


In Comilla, Lieutenant Colonel Yakub Malik acted with vigor and kept the situation well under control. The 4 East Bengal Regiment was located at Brahmanbaria in the north, on the road to Sylhet. The second-in-command, Major Khalid Musharraf, an East Pakistani, acted with decency. When the situation became well-known, he decided to assume command of the unit from his Commanding Officer, Lieutenant Colonel Malik who, along with the two other West Pakistani Officers, was taken under protective custody. He finally handed them over to the Indian army at Agartala with the request that they should be treated properly as prisoners of war and returned safely to Pakistan at the end of the hostilities. After the war, Lieutenant Colonel Malik was all praises for Major Khalid Musharraf.

['A Stranger in My Own Country'

Major General Khadim Hossain Raza; Page: 84

The University Press Limited, 2012]

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সকাল ১১টায় শেরেবাংলা নগরে দশম বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদর দপ্তরে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সঙ্গে নিহত হন তাঁর দুই সহযোগী, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও কর্নেল এটিএম হায়দার। এ বিষয়ে 'কর্নেল হুদা ও আমার যুদ্ধ' বইয়ে কর্নেল হুদার স্ত্রী নীলুফার হুদা স্মৃতিচারণ করেন:

"আমি বললাম, 'জিয়া ভাই, (জেনারেল জিয়াউর রহমান) আপনি থাকতে হুদা মারা গেল কীভাবে? ওকে কে মারল?'

তখন জিয়া ইংরেজিতে বলেন, 'হি ওয়াজ মিসগাইডেড উইথ খালেদ মোশাররফ। দ্যাটস হোয়াই হি ওয়াজ কিলড।'

আমি তাঁকে বললাম, 'খালেদ মোশাররফকেই-বা মারা হবে কেন? তিনি তো এক ফোঁটা রক্তও ঝরাননি, তাঁকে কেন মারা হল? আপনার লোকেরা কেন তাঁকে মারবে?'

আমার এ কথার পর তিনি চুপ থাকলেন।"

['কর্নেল হুদা ও আমার যুদ্ধ'

নীলুফার হুদা

পৃষ্ঠা: ১২২, প্রথমা প্রকাশন, ২০১১]

আজ এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ৭ নভেম্বর সকাল ১১টায় দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে উপস্থিত মুক্ত জিয়াউর রহমানের ইঙ্গিতেই দুজন অফিসার মেজর আসাদ ও জলিল দশম বেঙ্গল রেজিমেন্টে খালেদ, হুদা ও হায়দারকে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, এরা এই তিন জনের লাশ একটি ট্রাকে উঠিয়ে জিয়াউর রহমানের সামনে নিয়ে আসেন যাতে তিনি স্বচক্ষে তা দেখতে পারেন।

পাঠক ভেবে দেখুন, জিয়াকে বন্দি করেছিলেন খালেদ, কিন্তু হত্যা করেননি। যেমন করেননি বন্দি পাকিস্তানি অফিসারদের। অন্যদিকে, জিয়া তার প্রতিপক্ষ, নিরস্ত্র বন্দি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম তিন সেনানায়ককে বাঁচতে দিলেন না। কর্নেল তাহেরকেও জিয়া বাঁচিয়ে রাখেননি। গোপন বিচারের প্রহসন করে ফাঁসি দেওয়ার নামে ঠাণ্ডা মাথায় আপন জীবনদাতাকে হত্যা করেছেন।

৩.

সংসদে জেনারেল খালেদ মোশাররফের কন্যা সংসদ সদস্য মেহজাবিন খালেদের লিখিত বক্তব্য শুনেছি অভিনিবেশ সহকারে। মুক্তিযুদ্ধের তিন বীর সেনানী খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা এবং মেজর হায়দার– যাঁরা ৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুত্থানের পর নৃশংস হত্যার শিকার হন, তাদের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা খুব জরুরি। এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি জিয়াউর রহমানকে দায়ী করছেন।

এ বিষয়ে মেহজাবিনের সত্যাশ্রয়ী তথ্য উপস্থাপন আমাকে আশান্বিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের ইতিহাসের ধূসরতম অধ্যায়, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ ঘিরে অত্যন্ত দ্রুতলয়ের ঘটনাবলী– যার অধিকাংশ এখনও অন্ধকারে ঢাকা, রহস্যাবৃত— তার বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান এবং সত্য বের করে আনা খুবই প্রয়োজন। মেহজাবিন সেই দাবি করেছেন।

এ প্রসঙ্গে শুরুতেই দুএকটি তথ্য জানিয়ে রাখি। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ছিলেন বেঙ্গল ল্যান্সারের (ট্যাংক রেজিমেন্ট) মুক্তিযোদ্ধা অফিসার মেজর নাসির উদ্দিন। 'গণতন্ত্রের বিপন্ন ধারায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী' শীর্ষক একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন তিনি।

৭ নভম্বের তিন সেনানায়কের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে মেজর নাসির তাঁর পুস্তকে লিখেছেন। ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে কক্ষে ঘাতকরা তাদের হত্যা করে সেই একই কক্ষে একই রাতে মেজর নাসিরকেও আটকে রাখা হয়। অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান। তাই নাসিরের বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন:

"বিদ্রোহের খবর শুনে তিনি (খালেদ মোশাররফ) বঙ্গভবন ছেড়ে লালমাটিয়ায় তাঁর মামার বাসায় আসেন। সেখান থেকে টেলিফোনে খবর সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এরপর সম্ভবত কর্নেল হুদার পীড়াপীড়িতে তিনি শেরে বাংলা নগরে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে আসেন। রংপুর থেকে কর্নেল হুদাই দুদিন আগে এই ব্যাটালিয়নটি ঢাকায় নিয়ে আসেন খালেদকে সহায়তা দেওয়ার জন্য। ৭১এ খালেদই ব্যাটালিয়নটি সৃষ্টি করেন তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে। […]

১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে খালেদের উপস্থিতির কথা জানাজানি হলে কর্নেল তাহের ও মীর শওকত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকদেরকে প্ররোচনা দিয়ে বিদ্রোহের আহ্বান জানান। শেষমেশ ১০ ইস্ট বেঙ্গল বিদ্রোহ করে বসে। পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। বিদ্রোহের এক পর্যায়ে সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে এই জলিল ও আসাদই জেনারেল খালেদ, হুদা ও হায়দারকে হত্যা করে।"

[নাসিরউদ্দিন, পৃষ্ঠা- ১৫১]

উল্লেখ্য, ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত মেজর নাসিরকে ১০ ইস্ট বেঙ্গলে পাঠিয়ে দেন এবং সে রেজিমেন্টের ঘাতক অফিসার মেজর জলিল ও মেজর আসাদ নাসিরকে ঐ কক্ষটিতে পাঠান যেখানে সকাল ১১ টায় তারা হত্যা করেছে তিন সেনানায়ককে।

[নাসিরউদ্দিন, পৃষ্ঠা- ১৪৯]

এ প্রসঙ্গে সবার বিবেচনার জন্য জানাই, মেজর নাসিরের উক্তি থেকে মনে হতে পারে যে, তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে মীর শওকত সহযোগী ছিলেন। তা একেবারেই সত্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের পর কর্নেল তাহের অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল থাকাকালে সেনা অফিসারদের লুণ্ঠিত সম্পদ ফেরত দেবার জন্য যে আদেশ জারি করেছিলেন সেখানে অভিযুক্তদের তালিকার শীর্ষে ছিলেন মীর শওকত। এ প্রসঙ্গে গোপন আদালতে প্রদত্ত তাহেরের জবানবন্দি দেখব:

In the month of April 1972, after all necessary treatment following the amputation was completed, I returned to Bangladesh. I rejoined the Bangladesh Army in the position of Adjutant General. I reinforced discipline in the Army when it was a difficult task. […] I initiated disciplinary proceedings against certain senior officers, such as Brigadier Mir Sawkat and Major General Safiullah concerning certain illegalities. My position was that everything any officer had illegally acquired must be returned, so that they may stand up as brave and clean men before the nation's freedom fighters.

[Taher's Last Testament: Bangladesh the Unfinished Revolution,

Page: 67]

তাহেরের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় মীর শওকতের সঙ্গে তার বৈরিতা শুরু থেকেই। ১৯৭৬ সালে প্রহসনের বিচারে তাহেরের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার পর ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত নিজে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে ফাঁসির মঞ্চ পরীক্ষা করে যান। যদিও এটা কোনোভাবেই তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। আগাগোড়া জেনারেল জিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন মীর শওকত।

মেজর নাসিরের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, হত্যা করার জন্যই মীর শওকত নাসিরকে ১০ ইস্ট বেঙ্গলে পাঠিয়েছিলেন মেজর জলিল ও মেজর আসাদের হাতে। খালেদসহ তিনজন সেনানায়কের হত্যাকাণ্ডের সময় তাহের নন, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন জিয়া-মীর শওকত ও তাদের অনুগত অফিসাররা। সবচেয়ে বড় কথা, অভ্যুত্থানী সিপাহীদের হাতে নয়, ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টের (খালেদের নিজের হাতে গড়া ব্যাটালিয়ন) দুজন অফিসার মেজর জলিল ও মেজর আসাদের হাতে নিহত হন তিন সেনানায়ক। উল্লেখ্য যে, এই দুজনের কেউই তাহেরের নেততৃাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ছিলেন না। পরবর্তীতে জানা গেছে, জেনারেল জিয়ার ইঙ্গিতেই তাদের হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে কর্নেল শাফায়াত জামিল রচিত 'একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর' পুস্তকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। উল্লেখ্য, কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ৪৬তম ব্রিগেড খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে মূল ভূমিকা পালন করে। শাফায়াত জামিল লিখছেন:

"শেষ রাতের দিকে দশম বেঙ্গলের অবস্থানে যান খালেদ। পরদিন সকালে ঐ ব্যাটালিয়নে নাশতাও করেন তিনি। বেলা এগারটার দিকে এল সেই মর্মান্তিক মুহূর্তটি। ফিল্ড রেজিমেন্টে অবস্থানরত কোনো একজন অফিসারের নির্দেশে দশম বেঙ্গলের কয়েকজন অফিসার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খালেদ ও তাঁর দুই সঙ্গীকে গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি আজও। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত বারটার পর ফিল্ড রেজিমেন্টে সদ্যমুক্ত জিয়ার আশপাশে অবস্থানরত অফিসারদের অনেকেই অভিযুক্ত হবেন এ দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সেনানায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফকে হত্যার দায়ে। তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের অন্যতম নায়ক কর্নেল তাহের এবং তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দও এর দায় এড়াতে পারবেন না।"

[শাফায়াত জামিল, পৃষ্ঠা: ১৪৪-১৪৫]

তাই সংসদে যখন মেহজাবিন খালদে পিতার হত্যাকারী হিসেবে জিয়াকে চিহ্নিত করেন, তখন তিনি সত্য উচ্চারণই করেন। কারণ কর্নেল শাফায়াত জামিলের ভাষ্য অনুযায়ী ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত বারটার পর ফিল্ড রেজিমেন্টে সদ্যমুক্ত জিয়ার আশেপাশে অবস্থানরত একজন অফিসারের নির্দেশে ঐ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তাহের সিপাহী অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন, জাসদ তাতে রাজনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, তাই শাফায়াত জামিল, "তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের অন্যতম নায়ক কর্নেল তাহের এবং তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দকেও" এই হত্যার দায় থেকে বাদ দেননি।

তাহের ও জাসদ সম্পর্কে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন সেনানায়কদের মনোভাব কর্নেল শাফায়াত জামিলের মতোই। কারণ, তারা একের পর এক ষড়যন্ত্র এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে গেছেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে থেকে। অন্যদিকে, তাহের ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম ক্যু প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে সাবধান করে সেই ১৯৭২এর সেপ্টেম্বরেই পদত্যাগপত্র পেশ করেন, সেনাবাহিনী ছেড়ে দেন। একমাত্র তাহেরই সেনাবাহিনীর মধ্যকার প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ড চিরতরে বন্ধ ও তার গণবিরোধী চরিত্র বদলের জন্য সেনাবাহিনীর মৌলিক পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন।

৪.

প্রতিপক্ষের শাস্তি বিষয়ে কর্নেল তাহেরের দৃষ্টিভঙ্গি এ প্রসঙ্গে জানাই। মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর আবু তাহেরের স্টাফ অফিসার হিসেবে এবং পরবর্তীকালে তাঁর নিত্যদিনের সহচর হিসেবে আমি প্রত্যক্ষ করেছি তাহেরের সহজাত মানবিক গুণাবলী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীসমূহের ভয়ে রাজাকার হয়েছে, গ্রামের এমন সাধারণ যুবকদের বিষয়ে তাহেরের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, বন্দি হলে কোনো অবস্থাতেই তাদের হত্যা করা যাবে না। শুধু তাই নয়, এমন চারজন বন্দি রাজাকারকে তাহের রাতে তাঁর তাবু প্রহরায় নিয়োগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার বন্দি রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দিয়েছেন শুধু নয়, তাদের নিয়োগ দিয়েছেন আপন দেহরক্ষী হিসেবে, এমন সংবাদ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছিল। এর শুভ প্রভাব আমরা দেখেছিলাম যুদ্ধের পরবর্তী দিনগুলিতে। হানাদার বাহিনীর দেওয়া ট্রেনিং সমাপ্তির পর থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে ব্রিজ, রাস্তা বা কোনো স্থাপনা পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পাওয়ার পর বহু রাজাকার প্রথম সুযোগেই অস্ত্র নিয়ে যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭৫ সালের উত্তাল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিনগুলোর কথাও এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে। এর আগে ১৫ আগস্টে সেনাবাহিনীর ভেতরে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেনা-ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছেন জাতির জনক ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে। নতুন সেনাপ্রধান হয়েছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) পদে বহাল আছেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ।

স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি আদলে সেনাবাহিনী গড়ে তোলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সেনাবাহিনীর প্রথম অ্যাডজ্যুটেন্ট জেনারেল ও পরে কুমিল্লা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের ১৯৭২ সালের অক্টোবরে পদত্যাগ করে বেসামরিক জীবনে চলে গেছেন। নিজেকে যুক্ত করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের বিপ্লবী রাজনীতিতে। সমাজ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অসম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্ত করার দুরুহ লড়াইয়ে নেমেছেন। প্রতিক্রিয়ার দুর্গের অভ্যন্তরেই বিপ্লবের ভ্রুণ জন্ম দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন, যেমনটা করেছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে।

[পৃষ্ঠা, ১৫৯-১৬৮, 'হেল কমান্ডো', মেজর আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রকাশনী]

উল্লেখ্য, আগরতলা মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক নম্বর আসামি। বাকিদের ২৭ জনই ছিলেন পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনায় এঁরা সবাই স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গের অভ্যন্তরে নিজেদের সংগঠিত করছিলেন। আরও উল্লেখ্য, ব্রিগেডিয়ার খালেদের সঙ্গে নিহত কর্নেল হুদাও (সে সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন) ছিলেন সে মামলার একজন আসামি।

কর্নেল তাহের তাঁর পদত্যাগপত্রে সে সময়কার সেনাবাহিনীতে বিদ্যমান যে ষড়যন্ত্রের কথা বলেছিলেন, তাই অমোঘ সত্য হয়ে দেখা দেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে যে তরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তারই হাত ধরে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পদ-পদবি-ক্ষমতার জন্য উর্ধতন সেনা-অফিসারদের মধ্যে প্রসাদ-ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। দেশ বা জনগণের স্বার্থ নয়, সংকীর্ণ ব্যক্তি-স্বার্থে এরা মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় বিভিন্ন সেনা ইউনিটকে।

২ নভেম্বর রাতে সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি ক্যুদেতা ঘটে। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি-চক্রকে আইনের আওতায় আনা অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ঘোষিত হলেও দ্রুতই সেনা-সদস্য এবং জনগণের মনে এই অভ্যুত্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পদাতিক বাহিনী অবস্থান নেয় ট্যাংক ও আর্টিলারির বিরুদ্ধে। সেনানিবাসসমুহে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ব্যাপক গৃহযুদ্ধ এবং দেশে বহিঃআক্রমণের সম্ভাবনা– এই সব মিলে এক অনিশ্চিত, দুঃষহ অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয় দেশে।

ওদিকে, সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। প্রেসিডেন্ট মুশতাক ও তার খুনিচক্রের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং সমঝোতার ফসল হিসেবে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ মেজর জেনারেল পদে নিজেকে উন্নীত করেন ও নতুন সেনাপ্রধান পদটি লাভ করেন। বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর খুনি-চক্র যারা ইতোমধ্যে কারাগারের অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর চার বিশ্বস্ত সহচরকে হত্যা করেছে, তাদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়। এমন একটি অবস্থায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতায় এবং কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় সিপাহী অভ্যুত্থান।

৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুত্থানে তাঁর নির্দেশ ছিল, কাউকে হত্যা করা যাবে না। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা তা অক্ষরে অক্ষরে পালনও করেছে। মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা এবং মেজর হায়দারকে সিপাহীরা হত্যা করেনি, করেছে খালেদের নিজের হাতে গড়া ব্যাটালিয়নের দুজন অফিসার– যারা নির্দেশ পেয়েছে সিপাহীদের কাছ থেকে নয়, অফিসারদের কাছ থেকেই।

এত বড় সিপাহী অভ্যুত্থান– যেখানে হাজার হাজার সিপাহী অস্ত্র হাতে রাজপথে নেমে এসেছে– সেখানে কোনো লুটপাট, হত্যাকাণ্ড হয়নি। রামপুরা টিভি স্টেশনে হত্যা এবং অভ্যুত্থানের পরদিন ৮ নভেম্বরে কয়েকজন অফিসার হত্যার সঙ্গে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা জড়িত ছিল না। খুনি মোশতাকের ঘাতক-চক্র এসব হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এরাই পরবর্তীতে জাসদের সমাবেশে গুলি চালায় যেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি আফম মাহবুবুল হকসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এ সকল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যার দাবিটি করেছেন মেহজাবিন।

৫.

সেইসব ঘটনার চার দশক পর তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং ক্লাসিফাইড গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী উন্মুক্ত হওয়ার কারণে এমন বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান সহজতর হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে আঘাত করা নয়, সেই সহমর্মী মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিটি আমরা গ্রহণ করব, যা হয়তো স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আমরা তেমনভাবে প্রত্যক্ষ করিনি।

এমন একটি অবস্থান থেকে সত্যানুসন্ধান হলে তা থেকে নতুন প্রজন্ম একদিকে যেমন সত্যটি চিনে নিতে পারবে, অন্যদিকে অতীতে জানার ভুলে, বন্ধুকে শত্রু অথবা শত্রুকে বন্ধু জ্ঞান করে যে রক্তক্ষয় হয়েছে, বহুজনের মধ্যে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, অবিশ্বাস ও অনতক্রিম্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ সৃষ্থটি হবে, ক্ষত নিরাময় হবে। অতীতের ভুল পেছনে ফেলে বহু আত্মত্যাগে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থেই সোনার বাংলায় রূপান্তরের অভিযাত্রায় তা বড় জরুরি বলেই মনে করি।

খালেদের অভ্যুত্থানের ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তবে তার সম্পূর্ণ ব্যত্যয় বিষয়ে সে অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার ট্যাংক রেজিমেন্টের মেজর নাসির উদ্দিনের ভাষ্য শুনব, তাঁরই লেখা 'গণতন্ত্রের বিপন্ন ধারায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী' নামের গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক থেকে।

১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে খালেদ মোশাররফের সঙ্গে তাহেরের বৈঠকের কথা উল্লেখ করেছি। একই সময়ের কথা মেজর নাসির উল্লেখ করছেন খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে তাদের অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি বিষয়ে।

"একই সঙ্গে এ-ও সাব্যস্ত হল যে, অভ্যুত্থানের ব্যাপারে রাজনৈতিক সমর্থন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, রাশেদ খান মেনন, সর্বহারা পার্টির জিয়াউদ্দিনসহ বিশিষ্ট রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের অনুমোদন নেওয়ার একটি পরিকল্পনা নেওয়া হল। এই উদ্দেশ্যে কয়েকজনের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হল। পরবর্তীতে সমর্থন আদায়ের এই পরিকল্পনায় জাসদের কর্নেল তাহেরকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি রাশেদ মোশাররফ ও ব্রিগেডিয়ার নূরুজ্জামান নিলেন।

রাশেদ খান মেননসহ বাম রাজনীতিবিদদের প্রায় সকলেই তাদের সমর্থনের কথা জানালেন। সর্বহারা পার্টির কর্নেল জিয়াউদ্দিন ক্ষমতা দখলের পর ক্ষমতা তাঁর কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে বললেন, এই সুযোগে আমরা বাংলাদেশে বহুকাঙ্ক্ষিত একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তন করব।

মেজর হাফিজের বাসায় কর্নেল তাহেরের সঙ্গে আমার দীর্ঘ সময় আলাপ হল। তিনি জাসদের অনুসৃত লাইনে কথা বলছিলেন। তবে খন্দকার মোশতাকের অপসারণে তাঁর জোরালো সমর্থনও তিনি ব্যক্ত করলেন। অভ্যুত্থানের দিনক্ষণ আগেভাগে জানাবার তাগিদ দিলেন কর্নেল তাহের। এর কারণ তিনি এভাবে দেখালেন যে, ওই বিশেষ দিনে জাসদের সর্বস্তরের কর্মীরা রাজপথ দখল করে অভ্যুত্থানের অনুকূলে সমর্থন জানাবে।"

['গণতন্ত্রের বিপন্ন ধারায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী'

নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১১৫]

মেজর নাসিরের উপরের বর্ণনা থেকে কয়েকটি বিষয় বোঝা যায়। তা হল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ৩ নভেম্বর ক্ষমতার হাতবদলে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যও ছিল, যা অভ্যুত্থানের প্রায় দুমাস আগে নেওয়া। বাস্তবে অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে এবং পরে সকল রাজনৈতিক লক্ষ্যের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া হল। অন্তত কর্নেল তাহেরের কথা বলতে পারি, তাহেরের পরামর্শমতো খালেদের অভ্যুত্থানের কোনো খবরই তাঁকে জানানো হল না।

আজ সত্যানুসন্ধানী গবেষকদের বলব, ভেবে দেখুন সেদিন যদি আওয়ামী লীগ, কর্নেল তাহের, কর্নেল জিয়াউদ্দিন, জাসদ, বিপ্লবী গণবাহিনী এবং রাশেদ খান মেননসহ বাম রাজনীতিবিদ যাঁরা প্রত্যেকেই তাদের রাজনৈতিক সমর্থনের কথা জানিয়ে ছিলেন, তাদেরকে খালেদ অন্ধকারে না রাখতেন এবং পরে খুনি মোশতাক-চক্রের সঙ্গে চিফ অব স্টাফ পদটির জন্য অনৈতিক দেন-দরবার না হত, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট কেমন হত?

অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পূর্ব-নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানটি সফল হওয়ার পরও প্রতিপক্ষ খুনি মেজর ও তাদের নেতা খোন্দকার মুশতাকের সঙ্গে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের দেন-দরবারে সময়-ক্ষেপন, শুধুমাত্র নির্বিঘ্নে সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য অনৈতিক আঁতাত ইত্যাদি কারণে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির প্রেক্ষাপটে মেজর নাসির বলেন:

"এদিকে আমরাও বুঝতে পারছিলাম যে, একটি বিপদ ঘনীভূত হচ্ছে ধীরে ধীরে। আমাদের থেকে খালেদ তত দিনে অনেক দূরে সরে গেছেন। একতরফা রক্তপাতহীন এই বিজয় তাঁর ভেতর শৈথিল্য এনে দেয় ক্রমান্বয়ে। […]

"শুধু একজন বীর যোদ্ধা হিসেবেই খালেদ মোশাররফ সুনাম অর্জন করেননি। একজন প্রথিতযশা সেনা-অফিসার হিসেবেও তাঁর সুনামের অন্ত ছিল না। কিন্তু সেই সুনাম ও জনপ্রিয়তা তিনি কাজে লাগাতে পারেননি অভ্যুত্থান পরিস্থিতিতে। […]

উপরন্তু তাঁর একটি শারীরিক সমস্যাও এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৩৩]

কসবার উল্টোদিকে কমলা সাগরে পাকিস্তানিদের নিক্ষিপ্ত শেলের একটি স্প্লিন্টার মস্তিকে আঘাতে পর অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সময় তাঁর সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকা মেজর আখতার আহমেদ বীর প্রতীকের (মেডিক্যাল কোর) মন্তব্যটি ছিল:

Khaled's departure from the war field with this injury, may not be have been irreversible. But even if he gets well soon, it may take him much longer to become fighting fit again. Consequently, chances of Khaled's coming back in command would be remote. Even he recovers fully, how far and how deep this traumatic injury would influence Khaled's basic intelligence and thinking process, only time could tell that.

এ প্রসঙ্গে মেজর নাসির আরও লিখছেন:

"চিকিৎসকের দেওয়া রিপোর্টের ব্যাপারেও অভ্যুত্থানকারী কারও তেমন কোনো ধারণা ছিল না। যে কারণে অভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে এসে আমরা খালেদের আকস্মিক কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। সত্যি বলতে কী, আমাদের কারও কারও মধ্যে এ ব্যাপারে কিছু ক্ষোভেরও সঞ্চার হয়। কিন্তু চিকিৎসকের মতামত সংক্রান্ত উল্লেখিত বিষয়গুলো অজানা থাকার কারণে আমরাও তাৎক্ষণিকভাবে খালেদকে এ ব্যাপারে সাবধানী পরামর্শ দিতে পারিনি। বিষয়টি আমাদের জানা থাকলে সম্ভবত এভাবে খালেদ কিংবা অভ্যুত্থানের এই করুণ পরিণতি হত না।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা ১৩৪]

কী ছিল খালেদের আকস্মিক কর্মকাণ্ড? মেজর নাসির লিখছেন:

"এ সময় দুটো বিষয় নিয়ে দেন-দরবার শুরু হয়। এর একটি খালেদের পক্ষ থেকে মুশতাককে দেওয়া এবং অপরটি মুশতাকের দেওয়া প্রস্তাব খালেদের জন্য। খালেদ চাচ্ছিলেন, মুশতাক তাঁকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্তি প্রদান করুক। অপরপক্ষে মুশতাক তার অনুসারীদেরসহ দেশত্যাগ করার জন্য একটি সেইফ কনডাক্ট বা নিরাপদ প্রস্থা নিশ্চয়তা দাবি করছিলেন।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১২৭]

এমনটা খালেদ কেন করলেন? নাসির লিখছেন:

"খালেদের মধ্যে সম্ভবত এমন একটি ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল যে ,যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্তি না পাচ্ছেন, ততক্ষণ তিনি আইনগতভাবে নিরাপদ নন। আসলে এ ধরনের ভাবনা বা তা থেকে উৎসারিত শর্তের আরোপ বাতুলতা ছাড়া কিছুই ছিল না। […]

প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করার যে পরিকল্পনা ইতোমধ্যে গৃহীত হয়েছিল, সেই প্রধান বিচারপতিই তাঁকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্তি দিতে পারতেন। সে ক্ষেত্রে যার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংগঠিত হল, অভিযান শেষ হবার আগেই তার কাছে পদোন্নতি প্রার্থনার বিষয়টি আমাদেরকে হতবাক করে দেয়।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১২৮]

খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের অপর সংগঠক রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগ্রেডিয়ার নুরুজ্জামান। মেজর নাসির লিখছেন:

"দুপুরের দিকে (৩ নভেম্বর) ডালিম ও নূর দ্বিতীয় দফায় খালেদের কাছে আসেন একটি আকুতি নিয়ে, আর তা হচ্ছে, নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেওয়া হোক। রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের প্রচণ্ড আপত্তি সত্বেও খালেদ মোশাররফ তাদের দাবি এই অজুহাতে মেনে নেন যে, এতে করে দেশ একটি ভয়ংকর ভীতির হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে এবং তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন, যে প্রত্যাশা একইভাবে জিয়াও কদিন আগে লালন করতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরই হাতে জিয়ার সদ্যোজাত পরিণতির কথা তিনি ভুলে গেলেন।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১২৮]

নাসির আরও লিখছেন:

"সেদিন (৩ নভেম্বর) ভোর ৪টা কী সাড়ে ৪টার দিকে জেলখানার অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়ে গেছে সমসাময়িককালের অপর ভীতিকর নারকীয় হত্যাকাণ্ডটি। মুশতাক ও রশিদের নির্দেশে রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র সেনাদল জেলখানার অভ্যন্তরে প্রবেশের পর তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসরাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান এই চার জন নেতাকে হত্যা শেষে নির্বিঘ্নে বঙ্গভবনে ফিরে আসে।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১২৮-১২৯]

নাসির এরপর লিখছেন:

"আমরা সেদিন জেলখানার এই খবরটি না জানলেও বঙ্গভবনের অনেকেই তা জানতেন। সকাল ১০টায় ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ নুরুল ইসলাম বঙ্গভবনে টেলিফোন করে জেনারেল খলিলকে বিষয়টি জানান। কিন্তু খলিল তা চেপে যান অদৃশ্য কারণে। ৩ নভেম্বর খলিলের সঙ্গে খালেদের বেশ কয়েকবার কথা হলেও খলিল তাঁকে এ বিষয়ে কিছু বলেননি।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১২৯]

''পাঠক ভেবে দেখুন, জেলখানার হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে ভোর রাত ৪টায়। তার ৮/১০ ঘন্টা পেরিয়ে যাবার পর খুনি ডালিম ও নূর দ্বিতীয় দফায় খালেদের কাছে আসেন। এরা কারা? সরাসরি জাতির জনকের হত্যাকারী ও বেতারে তা প্রচারকারী ও ঠাণ্ডা মাথায় জাতীয় চার নেতা হত্যার ষড়যন্ত্রকারী। এরপর ফকার ২৭ উড়োজাহাজ ঠিক হল। ক্যাপ্টেন সায়েককে পাওয়া গেল যিনি এই ফ্লাইটটি ব্যাংকক পর্যন্ত নিয়ে যেতে রাজি হলেন। সন্ধ্যার পর, 'নির্বিঘ্নেই তারা দেশত্যাগ করল।'''

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৩০]

পাঠক, আবারও স্মরণ করবেন, জেলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর ডালিম, নূর ও মুশতাকের সঙ্গে খালেদ মোশাররফের দেন-দরবারের ফলশ্রুতিতে জাতির জনক ও চার জাতীয় নেতার হত্যাকারীরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারল!

নাসির লিখছেন:

"ইতোমধ্যে (৪ নভেম্বর সকাল) খালেদ মোশাররফ জেলহত্যার বিষয়ে জেনেছেন পুলিশের ডিআইজি ই এ চৌধুরীর কাছ থেকে।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৩০]

কিন্তু তা জানার পরও খুনি মুশতাকের সঙ্গে খালেদ দেন-দরবার চালিয়ে যান যেন তাঁকে সেনাপ্রধান করা হয়। কারণ পূর্বে স্থির করা চুক্তি অনুযায়ী মুশতাকের অনুসারীদের বাইরে পাঠানো হয়েছে। তারপরও মুশতাক সময় নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত জাতির জনকের হত্যাকারী খোন্দকার মুশতাকের কাছ থেকেই সেনাপ্রধান হওয়ার নিযুক্তিপত্র লাভ করেন খালেদ মোশাররফ।

খুনি মুশতাকের সঙ্গে দেন-দরবারের চূড়ান্ত সাফল্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং একধাপ পদোন্নতিতে ব্রিগেডিয়ার থেকে মেজর জেনারেল! হয়তো মুক্তিযুদ্ধে মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাতজনিত সমস্যা– যা মেজর আখতার ও মেজর নাসির উল্লেখ করেছেন– তার কারণেই এমন অনৈতিক দেন-দরবারে যেতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানায়ককে।

অভ্যুত্থানে জয়যুক্ত হওয়ার পর খালেদ মোশাররফের নানা বিভ্রান্তির জন্য তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ অভ্যুত্থানী সেনা অফিসাররা আরও একটি অভ্যুত্থান করে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। আমরা তা দেখব মেজর নাসিরের বক্তব্যে। ২ ও৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নেতা খালেদ মোশাররফের এসব পদক্ষেপের জন্য অভ্যুত্থানের মূল সংগঠকেরা কী ভাবছেন? মেজর নাসির লিখছেন:

"আমরা যারা এই অভ্যুত্থানের মূল শক্তি হিসেবে প্রথম থেকে আবির্ভূত হয়েছিলাম, সেদিন ভোরে (৫ নভেম্বর) একত্রিত হলাম পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করার জন্যে। এক ধরনের আতঙ্ক আমাদের পেয়ে বসেছিল। বিরাজমান অবস্থা পর্যালোচনার পর আমরা শঙ্কিতই হয়ে উঠলাম। আমাদের করার এখনও অনেক কিছু বাকি রয়ে গেছে। অথচ খালেদকে দিয়ে এখন আর তা অর্জন সম্ভব নয়। আর যদি তা না হয়, তাহলে তৃতীয় একটি পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে হারিয়ে যেতে হবে বিস্মৃতির অতলে।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৩৫]

এরই সূত্র ধরে নাসির বলছেন:

"অধিকন্তু একটি ব্যাপক বিদ্রোহ এবং সেই সঙ্গে একের পর এক নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও যদি সেই একই গোষ্ঠীর (খুনি মুশতাক-চক্র) সঙ্গে সহাবস্থান মেনে নিতে হয় পাল্টা একটি অভ্যুত্থানে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেও, তাহলে কী প্রয়োজন ছিল ঝুঁকিপূর্ণ এই অভ্যুত্থানে যাবার? এই জিজ্ঞাসা তখন প্রশ্নাকারে জাগ্রত হয়েছে কমবেশি আমাদের সকলের মধ্যে।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৩৫]

খালেদের বিরুদ্ধে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেন রক্ষীবাহিনী প্রধান নুরুজ্জামান, মেজর নাসির, মেজর হাফিজ ও মেজর গফফার। এঁরাই ছিলেন খালেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনা অফিসার। নাসির লিখছেন:

"এভাবেই আরও একটি পাল্টা অভ্যুত্থানের বীজ রোপিত হল ৫ নভেম্বর দ্বিপ্রহরের আগেই। আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই অভ্যুত্থানটি কার্যকর করে তুলতে হবে। এবার নুরুজ্জামান থাকবেন অভ্যুত্থানের পুরোধা হিসেবে। আমরা সবাই আগের মতোই তা সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৩৭]

মাঝখানে পাঠকদের শুধু একটু স্মরণ রাখতে বলি, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র বিষয়ে তাহেরের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাদের লিফলেট বিতরণ করেছে ৫ নভেম্বর রাতে। নাসির আরও লিখছেন:

"এ অবস্থায় শাফায়াতকে (ঢাকা ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার) বুঝিয়ে শুনিয়ে খালেদকে অপসারণ করাটা খুব কষ্টসাধ্য হবে না। […]

নুরুজ্জামান বলেই চলেছেন, আমি ভাবছি শফিউল্লাহকে সামনে রেখে অগ্রসর হলে আমাদের জন্য তা অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি করবে […]

আমি পূর্ণ মনযোগ দিয়ে নুরুজ্জামানের কথা শুনছিলাম। মনে হল, নুরুজ্জামান এরই মধ্যে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার একটি ছক তৈরি করে ফেলেছেন মনে মনে।"

[নাসির উদ্দিন, পৃষ্ঠা: ১৪৩]

পাঠক ভেবে দেখুন, তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুত্থান না হলেও খালেদের অনুসারী অফিসাররা আরেকটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছেন, খালেদকে সরিয়ে দিতে!

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ খালেদ মোশাররফের মনোভাব, ভূমিকা– এসব বিষয়ে ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার পরপর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার উল আলম শহীদ। জাতীয় রক্ষীবাহিনীর উপ-পরিচালক এই মুক্তিযোদ্ধা 'জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা' শীর্ষক তাঁর পুস্তকে বলেন:

"ব্রিগেড কমান্ডারের কক্ষে ঢুকেই দেখি, একটা টেবিল ঘিরে খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিলসহ দু-তিনজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা বসে আছেন। ৩০-৩৫ জন সেনা কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের চেহারা দেখে আমরা বুঝতে পারলাম না, তাঁরা অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে। তবে একটা রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ করা গেল। ব্রিগেড কমান্ডারের নির্ধারিত চেয়ারে বসেছিলেন খালেদ মোশাররফ। তাঁর পাশে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিল। টেবিলের অপর পাশে চেয়ার খালি ছিল। তাঁরা সেখানে আমাদের বসতে বলেন। প্রথমেই খালেদ মোশাররফ যা বললেন তা শুনে তো আমাদের চোখ ছানাবড়া। তিনি ইংরেজিতে বললেন,

'Shaheed-Sarwar, I know you are patriots but we had to do it because we do not want this country to be a Kingdom.'''

[আনোয়ার উল আলম শহীদ, পৃষ্ঠা ১৪৮]

একই সঙ্গে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর বক্তব্য নির্মোহভাবে পাঠ করতে অনুরোধ করব অনুসন্ধিৎসু গবেষকদের। এ কথা যেমন ঠিক যে, সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ ১৫ই আগস্ট ভোরে খুনি মেজরদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর উচ্চপদস্থ সেনা অফিসারদের মধ্যে একমাত্র শফিউল্লাহর উপরই মুশতাক আস্থা রাখেননি এবং সেনাবাহিনী থেকে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত 15th August A National Tragedy বইয়ে শফিউল্লাহ লিখেছেন:

When Brig. Khaled was informed that the rebel troops of the tank regiment did not have main gun ammunition in their tanks, that was the time he should have acted and hold them. He instead of taking any action to hold them, issued ammunition to them without even consulting me. Thereby Brig. Khaled earned their goodwill. Am I wrong to hold this view? These troops were still rebel soldiers and how could CGS issue ammunition to the rebel troops? Therefore, would I be wrong to say that Brig. Khaled also wanted to be on their side?

[কে এম শফিউল্লাহ, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৬]

৬.

বঙ্গবন্ধুর খুনি-চক্রের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পূর্ব-যোগাযোগ ও আঁতাত যা আজ কার্যত প্রতিষ্ঠিত, তা যে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা নয়, এমন আঁতাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে ছিলেন আরও সেনানায়কেরা, যার বাইরে ছিলেন না সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফসহ প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিডিআর, সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ও বেসামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীরা। খালেদের অভ্যুত্থানের অন্যতম সহযোগী শাফায়েত জামিল ও মেজর হাফিজও এর বাইরে পড়েন না। এরা দুজনই ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পরপর খুনি মেজরদের পক্ষে কাজ করতে থাকেন, যার বিস্তারিত বর্ণনা আছে মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহর 15th August A National Tragedy বইতে।

যে অবিসম্বাদিত নেতা– যাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম হল– সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এইসব পদাধিকারীদের ষড়যন্ত্র ও আঁতাত কেন হল, সেই গভীরতর বিশ্লেষণে গবেষকরা যদি মনোনিবেশ না করেন, তাহলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের অস্থির, জটিল ও তরল অবস্থায় সেনানায়কদের ভূমিকা বিষয়ে পক্ষপাতহীন থাকা কার্যত অসম্ভব হবে। গবেষকদের শুধু বৃক্ষ দেখলে চলে না, অরণ্য দেখতে হয়।

বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার জন্য প্রয়োজন ছিল স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীর বিলুপ্তি ঘটিয়ে প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা সেনা ও অফিসারদের প্রশিক্ষণে গণ-মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলা ও পুলিশ বাহিনীকে পূর্ণগঠিত করার কাজ। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছে সারা দেশের এমন ১ লক্ষ ৪৫ হাজার যুবকই হত সেই মিলিশিয়া ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য। সে ক্ষেত্রে যারা হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে, তাদেরকে প্রতিরক্ষা বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থায় গ্রহণ করার আত্মঘাতী পদক্ষেপটি নিতে হত না। দেশব্যাপী আশাহত ও হতাশ মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র হাতে নানা তৎপরতায় নেমেও পড়তে হত না।

বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই কেবল উপরে বর্ণিত কাজগুলো করা সম্ভব ছিল। যে যুব-নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তেমন সিদ্ধান্ত আশা করেছে। সে কাজে তিনি পাশে পেতেন কর্নেল তাহের, কর্নেল জিয়াউদ্দিনসহ সেনাবাহিনীর ব্যাপক সিপাহী এবং এক লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে। বহু মুক্তিযোদ্ধা অফিসারও তাতে সমর্থন দিতেন। সর্বোপরি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অকুণ্ঠ সমর্থন জানাত সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগে।

দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধু তাতে সাড়া দেননি। প্রবাসী সরকার এবং জেনারেল ওসমানীর ভুল চিন্তার ধারাবাহিকতায় গড়ে তোলা হচ্ছিল জনবিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কর্নেল তাহের তাঁর পদত্যাগপত্রে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এমন ষড়যন্ত্রের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকে সাবধান করেছেন।

ঈমান-ঐক্য-শৃংখলা– পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই যে আপ্তবাক্য– তার দর্শন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেনা অধিপতিগণ কি মুক্ত ছিলেন? ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ কি তাদের মনোজগতে সে পরিবর্তন আনতে পেরেছিল?

স্বল্পস্থায়ী মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান সময় ভারতের মাটিতে নিরাপদ অবস্থানে তিনটি ব্যারাক-ভিত্তিক ব্রিগেড গঠনে ব্যয় না করে জনগণের পাশে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করলে সেনানায়কদের সেনাবাহিনী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন হত। তাহেরের ক্ষেত্রে সেটা হয়েছিল। শৃঙ্খলার উপর তিনিও জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু তা ছিল জীবন্ত-শৃঙ্খলা। সেনানায়কদের সেই শৃঙ্খলা নয়, যার কথা বলে তারা পদ দখল করে, এমনকি রাষ্ট্রক্ষমতা পর্যন্ত দখল করে নেয়, কিন্তু তারাই সবচেয়ে বড় শৃঙ্খলাভঙ্গ করে।

যেমনটা করেছে খুনি মেজররা শুধু নয়– জিয়া, খালেদ, মঞ্জুরসহ বিভিন্ন অফিসাররা।

৭.

উপরের সামগ্রিক আলোচনার সারমর্ম আমি এভাবে টানব:

স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভাবনা, প্রস্তুতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়াই পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বাহিনীর যে সব সদস্য বাস্তব অবস্থার কারণে অথবা অধস্তনদের চাপে বাধ্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের উপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের (তাজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের) কর্তৃত্ব না থাকায় সেনাবাহিনীর বিভেদের বীজটি রোপিত হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সর্বনাশটি করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মাটিতে জিয়া, খালেদ ও শফিউল্লাহ– এই তিন সেনানায়কের নামে তিনটি ব্রিগেড গড়ে তুলতে দিয়ে ভবিষ্যতে ক্ষমতার রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের বীজ রোপনে তিনিই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী তাজউদ্দিন সরকারও দায়ভাগ এড়াতে পারেন না। ১১ নং সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল আবু তাহের রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী গঠন প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হলেও, জেনারেল ওসমানী এবং বঙ্গবন্ধুর সহায়তা না পাওয়ার ফলে সেনাবাহিনী ছেড়ে সমাজ বিপ্লবের রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

রাষ্ট্রগঠন প্রশ্নে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পূর্বকার ২৫ দিন সময়ে তাজউদ্দিন আহমদের অস্থায়ী সরকার গৃহীত পদক্ষেপসমূহ ভুলে ভরা। রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভ বিশেষ করে প্রতিরক্ষা বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পাকিস্তানের সঙ্গে শেষদিন পর্যন্ত সহযোগিতা করেছে এমনসব ব্যক্তিদের নিয়োগ করে মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গোড়াতেই এক অর্থে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় সুদূর পাকিস্তানের অন্তরীণ থাকায় এবং ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে জনগণের মন-মানসে যে বিপ্লবী রূপান্তর ঘটে গেছে, তা থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে রাষ্ট্রগঠন প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুও অস্থায়ী সরকারের নীতিমালার বাইরে যাননি। অকেজো হয়ে পড়া পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো বহাল রেখেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তিনি এগিয়ে যান। মূখ্যত সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ভেঙে পড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত এত সহজে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁর জীবন কেড়ে নিতে সক্ষম হয়।

জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড এবং সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলাভঙ্গের ফলে রাষ্ট্রে একটি তরল অবস্থার সৃষ্টি হয়। Chain reactionএর মতো অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান চলতে থাকে। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানটিও ছিল নিছক জিয়াকে চিফ অব স্টাফ পদ থেকে হটিয়ে সেই পদে সমাসীন হওয়ার জন্য। সে জন্য প্রাথমিকভাবে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হলেও, খুনি মুশতাক-চক্রের সঙ্গে আঁতাতের মধ্য দিয়ে তা করুণ পরিণতি লাভ করে।

এ অবস্থায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সহযোগিতায় কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী অভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে উচ্ছেদ করে দেশকে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় নিয়ে আসা।

একে সংগঠিত জনতার অভ্যুত্থানে পরিণত করতে জাসদের সীমাবদ্ধতার কারণে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত জিয়াউর রহমান প্রতিবিপ্লবী হিসেবে আবির্ভূত হন। অভ্যুত্থানটি পরাজিত হয়। ফলে বাংলাদেশ দুই যুগের বেশি সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পদানত থাকে।

মুক্তিযুদ্ধে অন্যান্য শীর্ষ সেনানায়কদের থেকে খালেদ মোশাররফের কিছু পার্থক্য নিশ্চয়ই ছিল। কারণ তিনি গেরিলা যুদ্ধে বেসামরিক শিক্ষিত তরুণদের নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের কীর্তিগাঁথার কথা আমরা জানি। তবে সমাজের দরিদ্র শ্রেণি বিশেষ করে কৃষকদের যুদ্ধের মূল শক্তি করার কোনো পরিকল্পনা তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যারাক সেনাবাহিনীর স্থলে গণবাহিনী গঠনের তাহেরের পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি কখনও একমত হননি।

কর্নেল তাহের ফাঁসির মঞ্চে নিঃশঙ্ক চিত্তে জীবন দিয়েছেন আপন বিশ্বাস ও অঙ্গীকারে পরিপূর্ণভাবে আস্থাবান থেকেই। অন্যদিকে, স্বাধীন বাংলাদেশে বাকি শীর্ষ সেনানায়কেরা করুণ মৃত্যুর শিকার হলেন বড় অসহায়ভাবে, পাকিস্তানের দৈত্য ঐ ফ্রাঙ্কেস্টাইনের হাতে যা তাঁরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁরা জানতেও পারলেন না কেন তাদের মৃত্যু হল। এসব বিষয়ে তরুণ গবেষকগণ নিশ্চয়ই সত্য অনুসন্ধান করবেন।

মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল খালেদ মোশাররফের মাথায় গুরুতর আঘাত যেমন তাঁর সূচিত অভ্যুত্থানে করণীয় নির্ধারণে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে, তেমনি কর্নেল তাহেরের হাঁটুর উপর থেকে পা না থাকাও সিপাহী অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানে বড় সীমাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দুজন বরেণ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে কী ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনতে পারে, তা তাঁরা তাদের মৃত্যু দিয়েই প্রমাণ করেছেন। তবে উভয় সেনানায়কই মৃত্যুকে মোকাবেলা করেছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার মতো মাথা উঁচু রেখে। ইতিহাস অবশ্যই তা মনে রাখবে।

স্বাধীনতার পর সামাজিক বিপ্লবের ডাক দিয়ে জাসদের উত্থানের প্রেক্ষাপট বর্তমান থাকলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে মাত্র দশ মাসের মাথায় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে নেমে পড়া জাসদের নীতিপ্রণেতা বিশেষ করে মুখ্য তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানের সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল কিনা তা ভেবে দেখবার অবকাশ রয়েছে।

এ কথা সত্য যে, মূলত একটি দক্ষিণপন্থী দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থেকেই আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরেফ আহমেদরা সেই ১৯৬২ সাল থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে নিউক্লিয়াস গড়ে তুলে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন। দলে নিউক্লিয়াসের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দক্ষিণপন্থী ধারা বর্তমান থাকলেও শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও দিকনির্দেশনাও লাভ করেছিলেন স্বাধীনতার জন্য কাজ করে যাওয়া শক্তি।

তাই যেখানে বঙ্গবন্ধু তাদের উপর ভরসা করে, তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে স্বাধীনতার প্রয়োজনে বন্দিত্ব বরণ করলেন এবং সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের বিরল ও অতিপ্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত রইলেন, সময়ের কাজ সময়ে করতে অপারগ হলেন, কঠিন সময়ে তাঁর কাছ থেকে এত দ্রুত সরে আসা যথার্থ হয়েছিল কিনা তাও গভীরভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

কর্নেল তাহের ও কর্নেল জিয়াউদ্দিন-– এই দুই বিপ্লবী সেনানায়ক সেনাবাহিনী ছেড়ে বিপ্লবী রাজনীতির কঠিন পথে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। অন্যদিকে, ষড়যন্ত্র করবার জন্য সেনাবাহিনীতে রয়ে গেলেন ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার সেনা পদাধিকারীরা। তাই সেনাবাহিনীর গঠন প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মতের অমিলের কারণে তাদের সেনাবাহিনী ছেড়ে আসা নীতির দিক থেকে সঠিক হলেও সময়ের বিচারে তা ঠিক ছিল কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার।

এ কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আকাশ-ছোঁয়া স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কথা। তা ফলবতী করতে মুক্তিযুদ্ধের সবচাইতে অগ্রসর অংশের প্রবল ইচ্ছাশক্তির কথা, মুক্তিযুদ্ধই যা তাদের দিয়েছিল। গণজাগরণে জেগে ওঠা নতুন প্রজন্ম সেসব বিষয়ে শুধু ভাববে না, তা থেকে সঠিক শিক্ষাটি নেবে। কারণ অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সমাপ্ত করবার গুরুভার তো এখন তাদের উপর।

ড. আনোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পরিশিষ্ট:

১.

মেজর নাসির উদ্দিন, 'গণতন্ত্রের বিপন্নধারায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী'

(আগামী প্রকাশনী)

২.

আনোয়ার উল আলম, 'রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা'

(প্রথমা প্রকাশন)

3.

Major General K M Safiullah, '15th August A National Tragedy'

(Agamee Prokashoni)

৪.

কর্নেল শাফায়াত জামিল (অব:), 'একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্যআগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর'

(সাহিত্য প্রকাশ)

৫.

মেজর আনোয়ার হোসেন, 'হেল কমান্ডো'

(সেবা প্রকাশনী)।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক