বাবার অস্তিত্ব চির সত্য, চির পবিত্র

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 18 June 2022, 06:28 PM
Updated : 18 June 2022, 06:28 PM

বাঙালি সমাজ মা প্রধান। বাবা মূলত নেপথ্য চরিত্র। ছেলেবেলা থেকে দেখেছি বাবা হচ্ছেন আয়-রোজগারের একটি ব্যাংকের মতো। বাবা মানে টাকার খনি। কিন্তু এই টাকা কোথা থেকে আসে, কীভাবে তিনি আনেন কেউ জানে না। জানলেও মানতে চায় না। প্রতিটি পরিবারে মা-ই কর্ত্রী। তিনি যা বলেন বা করেন সেটাই আইন। অথচ সবাই পিতাকে ভয় পায়। আজকাল যুগ পাল্টেছে। বাবা-মা, ভাই-বোন সব আছে, আবার নাই। নাই বলতে সবাই যার যার মতো বায়বীয় জগতে ব্যস্ত। একেবারে আধুনিক বা কম বয়সী বাবারা ছাড়া বাকি বাবাদের কোনো ডিজিটাল জগৎ নাই। থাকবে কীভাবে? তিনি সকাল হলেই অফিস বা কাজে দৌড়ান। কাজ থেকে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেও তার মাথায় ঘুরতে থাকে সন্তানের পড়ালেখা, বিয়ে বা বড় করার কথা। ওই চিন্তায় তিনি ঘুমান নাকি জেগে রাত কাটান তাও জানা হয় না অন্যদের। এই ধরনের চিত্রই দীর্ঘকাল ধরে চলছে আমাদের জীবন প্রবাহে।

বাবা দিবস নামে যে দিবসটি চালু হয়েছে তার প্রয়োজনীয়তা আমি অস্বীকার করি না। করি না এই কারণে যে, বছরে একটি দিন পিতাকে উৎসর্গ করলে কি এমন আসে যায়? বরং আজকের এই ব্যস্ততার যুগে আপনি করপোরেট কালচার বা বাণিজ্য যা-ই বলেন না কেন এই উছিলায় অন্তত বাবাদের কপালে দু-একটা উপহার তো জোটে। গত ২৫ বছর ধরে যে দেশে বসবাস করছি তার নাম উন্নত দেশ। এই সিডনি শহরে অজস্র বাবা আছেন যাদের সাথে তাদের সন্তানদের দেখা হয় মাঝেমধ্যে। তাও যখন তারা শিশুকে গচ্ছিত রেখে ভ্রমণ বা কাজে যান। করোনার কঠিন সময়ে এদেশে মায়েদের পাশাপাশি সহস্র অবসরপ্রাপ্ত পিতা নাতি-নাতনির দেখভাল না করলে সমাজ অচল হয়ে পড়ত। আজীবন সেবা দিয়ে যাওয়া পিতার জন্য একদিন দামী একটা কার্ড, ফুল বা উপহার কেনা আমার মতে পূণ্যের কাজ।

বাবা মানেই এক ধরনের নীরব সেক্রিফাইস। ত্যাগের বিষয়টা এমনই যে, এক হাতে দিলে অন্য হাত যেন টের না পায়। ভালো করে ভেবে দেখুন তো বন্ধু বা অন্য কেউ আপনাকে কিছু দিলে কোনো না কোনো সময় সেটা মনে করিয়ে দেয় কিনা? বা ওই ঘটনা জানে না এমন কি কেউ আছে? অথচ বাবা যখন দেয় কেউ জানে? আপনি আমি যতদিন স্বাবলম্বী না হচ্ছি ততদিন পর্যন্ত আমাদের জামা, জুতো, ঘড়ি কিংবা শখের জিনিস কে দেয়? আর আমরা যখন চকচকে জুতো পরে বা জামা গায়ে চাপিয়ে অন্যদের তাক লাগিয়ে দেই তখন কেউ কি জানতে চায় এটা তোর বাবা কিনে দিয়েছেন! অথবা আমরাই কি বলি দেখ বাবা কিনে দিয়েছেন এটা! এই না বলাটার মানে হচ্ছে বাবার দান বা বাবার দেয়াটাই স্বাভাবিক। আর এই সহজ স্বাভাবিক কাজেই অসাধারণ হয়ে ওঠে পিতার জীবন।

আমি এমন এক ঘরে জন্মেছি যেখানে অভাব না থাকলেও টানাটানি ছিল। এই টানাপোড়েন সামাল দেওয়া মানুষটির কি দরকার বা তার কোনো চাহিদা আছে কিনা সেটি আমি জানতে চাইনি কখনো। যখন মনে হলো জানতে চাওয়া দরকার তখন পিতার সময় শেষ। মধ্যবয়সে আরাম-আয়েশ ত্যাগ করা পিতাকে শেষ বয়সে কি-ইবা দিতে পারি! সামান্য ভালোবাসা সহানুভূতি আর শ্রদ্ধার বাইরে তখন তাদের নেওয়ার কিছুই থাকে না। অথচ আজকাল বৃদ্ধাশ্রমে তুলে দিয়ে আসার গল্প শুনি। যারা অপারগ বা যাদের কোনো বিকল্প নাই, তাদের কথা আলাদা। যারা বোঝা মনে করে পিতাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসে তারা ভুলে যায় পিতা ছোট ঘরের এক কোণে পড়ে থেকে তাকে বা তাদেরকে বড় জায়গা ছেড়ে দিতেন। যাতে পড়াশুনা করে নিজের মতো থাকতে পারে। বছরের পর বছর সহ্য করা পিতাকে যারা অল্প কবছর সহ্য করতে পারে না তাদের জন্য করুণা ছাড়া আর কি থাকে?

ইতিহাস-গল্প-কাহিনি সবই পিতার আত্মত্যাগের গল্পে উজ্জ্বল। কথিত আছে, সন্তান হুমায়ুন যখন গুরুতর অসুস্থ, রাজ হেকিমও মোটামুটি নিরূপায়, তখন মোগল সম্রাট বাবর প্রতিরাতে কঠিন তপস্যা আর আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। বাবরের প্রার্থনা এমনই ছিল যে, অলৌকিকভাবে হুমায়ূন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন আর মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়েন সম্রাট বাবর। সে কারণেই শঙ্খ ঘোষের মতো কবির কবিতার বইয়ের নাম 'বাবরের প্রার্থনা'। সেখানে তিনি লিখছেন–

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার

জীর্ণ ক'রে ওকে কোথায় নেবে?

ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

বাবার গল্প বললে রোনালদিনহোর কথা মনে পড়বেই। ব্রাজিলিয়ান এই ফুটবল তারকা গোল্ডেন বুট পাবার পর অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন। সকলেই ধরে নিয়েছিলেন এটা প্রাপ্তির কান্না। ছেলেবেলায় তুখোড় এই ফুটবলারকে তার পিতা সবসময় বলতেন খালি পায়ে প্র্যাকটিস করতে, এতে বলে পায়ের সরাসরি স্পর্শ থাকে। পিতৃ আজ্ঞা মানলেও তার মনে বিষয়টি খচখচ কাঁটার মতো লেগে থাকত। বড় হয়ে রোনালদিনহো জেনেছিলেন, বুট কেনার টাকা ছিল না বলেই তার বাবা এই পরামর্শ দিতেন। তারকা রোনালদিনহো গোল্ডেন বুট পাওয়ার পর পিতার মুখ মনে করে অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন সেদিন।

বাবা ঈশ্বরতুল্য একজন আপন মানুষ। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, "পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই"। বাবা কখনো খারাপ হতে পারে না। দিবস থাক আর না থাক জন্মের মতো পিতার জায়গা এবং পিতার অস্তিত্ব চির সত্য, চির পবিত্র। আমাদের মতো পেয়ে হারানোর আগেই যারা পিতাকে শ্রদ্ধা ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখে তারাই জানে বাবা মানে কি। বাবা কতটা গভীরে প্রোথিত এক নাম। যার কোনো বিকল্প হয় না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক