জাতির মনে জাগরণ, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন

মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্‌পু
Published : 17 May 2022, 03:55 AM
Updated : 17 May 2022, 03:55 AM

"তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে,

তা ব'লে ভাবনা করা চলবে না।

ও তোর আশালতা পড়বে ছিঁড়ে,

হয়তো রে ফল ফলবে না।।

আসবে পথে আঁধার নেমে,

তাই ব'লেই কি রইবি থেমে–

ও তুই বারে বারে জ্বালবি বাতি,

হয়তো বাতি জ্বলবে না।।

১৯০৫ সালে লেখা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের মতোই ৪২ বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন তিনি স্ব-ভূমে ফিরতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি। আপনজন চলে গেছে, পথে আঁধার আছে– তাতে কী! সব ভয়-সংশয় ভুলে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে দেশে এসেছিলেন বঙ্গকন্যা। ১৯৮১ সালের ১১ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেই আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি।" তিনি এ-ও বলেছিলেন, "জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।"

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর টানা কয়েক বছর জাতি হতাশায় নিমজ্জিত ছিল। জাতিকে যখন আশা দেয়ার মতো কেউ ছিল না, ঠিক তখনই ভরসাস্থল হয়ে ক্ষত পূরণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তারিখটা ছিল ১৭ মে ১৯৮১, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৮। রবিবার। রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতায় তখন খুনী মোশতাকের সহচর জেনারেল জিয়া। তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে আশার সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। যদিও দেশের মাটিতে পা রাখার আগেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা।

বাংলার মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার পুনরুদ্ধার করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার সামরিক স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাঙালির ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশের মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন করে এক সময়ের মঙ্গা কবলিত, দুর্ভিক্ষ জর্জরিত বাংলাদেশ আজকে সারাবিশ্বে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত করেছেন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে লাখ লাখ জনতার সংবর্ধনার জবাবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই"। তিনি আরও বলেন, "আমার আর হারানোর কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে বাঙালি জাতির আর্থসামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।"

সেদিন প্রকৃতি ছিল বৈরি। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। যদিও তাতে কিছু যায়-আসেনি! ঝঞ্ঝা-দুর্যোগ সেদিন শেখ হাসিনার আগমন তো বটেই, গণতন্ত্রকামী লাখো মানুষের মিছিলের গতিরোধ করতে পারেনি। তার আগমনে যেন প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পেল, ধরণী হলো স্নিগ্ধ। এদিন গ্রাম-শহর-নগর-বন্দর থেকে রাজধানীতে ছুটে এসেছিল অধিকারবঞ্চিত লাখ লাখ মানুষ। উদ্দেশ্য– বঙ্গবন্ধুর একমাত্র আশার প্রদীপ শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানানো। আমি তখন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। সঙ্গত কারণে শত শত নেতাকর্মীসহ আমিও ছিলাম সেই মিছিলে।

।। দুই।।

১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ঘিরে আপামর জনগণের উচ্ছ্বাস কেমন ছিল? তার একটি খণ্ডচিত্র পাওয়া যায় ১৯৮১ সালের ১৮ মে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকে। সেখানে লেখা হয় : "… দীর্ঘ ছ'বছর বিদেশে অবস্থানের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সতরোই মে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। লাখো জনতা অকৃপণ প্রাণঢালা অভ্যর্থনার মধ্যদিয়ে বরণ করে নেন তাদের নেত্রীকে। মধ্যাহ্ন থেকে লক্ষাধিক মানুষ কুর্মিটোলা বিমানবন্দর এলাকায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন কখন শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করবে। বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে বিমানবন্দরে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।"

এদিন দুপরের আগে থেকেই বিমানবন্দর থেকে শুরু করে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে মানুষের ভিড় ছিল। বিকেল সাড়ে ৪টায় সত্যিই যখন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭৩৭ বোয়িংটি আকাশে দেখা গেল, তখন সব শৃঙ্খল ভেঙে হাজার হাজার মানুষ বিমানবন্দরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় বিমানটিকে। উদ্দেশ্য– বঙ্গবন্ধুকন্যাকে এক নজর দেখা। সবমিলিয়ে সে সময় পুরো বিমানবন্দর এলাকা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। বলা হয়ে থাকে, বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের পর সমসাময়িক রাজনীতিতে এ ধরনের ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। সাদা-কালো রঙের প্রিন্টের শাড়ি পরিহিতা শেখ হাসিনা যখন ৪টা ৩২ মিনিটে সিঁড়ি দিয়ে বিমান থেকে সজ্জিত ট্রাকে নামছিলেন; তখন লাখো জনতার কণ্ঠে গগনবিদারী স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছিল ঠিক এভাবেই– 'শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব', 'শেখ হাসিনা, স্বাগত শুভেচ্ছা' 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু'। বিমান থেকে ভিআইপি লাউঞ্জ পর্যন্ত হাসিনাকে নিয়ে আসতে ট্রাকটির ১৫ মিনিট সময় লাগে। সবমিলিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়। এ পরিবেশ উচ্ছ্বাসের, এ পরিবেশ আনন্দে অশ্রু ফেলার। বিমান থেকে নামার সময় দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক যখন শেখ হাসিনার গলায় মালা দিচ্ছেলেন, তখন তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন।

বিমানবন্দর থেকে নামার পর প্রায় দীর্ঘ তিন ঘন্টাব্যাপী মানুষের অভিনন্দন গ্রহণ শেষে ভিড় ঠেলে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সভামঞ্চে পৌঁছান বাংলাদেশের কাণ্ডারি। তখনও চারদিক অন্ধকার, মুষলধারে বৃষ্টি। একদিকে প্রবল বর্ষণ, সেই সঙ্গে কালবৈশাখী ঝড়। এরই মাঝে ট্রাকে ও রাস্তার দুপাশের জনতার কণ্ঠে গগনবিদারী স্লোগান, 'মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব'। লাখো জনতার উপস্থিতিতে আয়োজিত সমাবেশে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, "বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি দেশে এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।"

তিনি আরও বলেন, "আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যে 'সিস্টেম' (পদ্ধতি) চালু করতে চেয়েছিলেন, তা যদি বাস্তবায়িত হতো তাহলে বাংলার মানুষের দুঃখ আর থাকত না। সত্যিকার অর্থেই বাংলা সোনার বাংলায় পরিণত হতো।" শেখ হাসিনা বলেন, "বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই। আমার আর কিছু পাবার নেই। সব হারিয়ে আমি এসেছি আপনাদের পাশে থেকে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য।"

বক্তৃতাদানের এক পর্যায়ে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারেননি শেখ হাসিনা। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, "আজকের জনসভায় লাখো চেনা মুখ আমি দেখছি। শুধু নেই আমার প্রিয় পিতা বঙ্গবন্ধু, মা আর ভাইয়েরা এবং আরও অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, আপা বলে ডাকবে না। সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন।"

এই ছিল সব আপনজন হারিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যার জন্মভূমিতে ফেরা। কী হতো তিনি দেশে না ফিরলে? বর্তমান বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থা, অনন্যসাধারণ দেশের উন্নয়ন ও বিশ্বে এর সমাদৃত অবস্থানের দিকে তাকালেই তা সহজে অনুধাবন করা যায়।

।। তিন।।

পঁচাত্তর-পরবর্তী জাতির ক্রান্তিলগ্নে বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে পিতামাতা-ভাইবোন ছাড়াও তিনি যেভাবে 'একলা চলো' নীতিতে সূচনা করেছিলেন, সত্যিই তা সহজ-স্বাভাবিকভাবে ভাবা যায় না। হয়তো এ কারণেই দিনটাকে অন্যভাবে দেখতে চেয়েছেন সব্যসাচী লেখক ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। 'শেখ হাসিনার জন্মদিনে : ২০০৯'-এ তিনি লিখেছেন, "সকলেই জন্ম নেয় কেউ কেউ জন্মলাভ করে, অনন্য অর্জন তার।" "মানুষেরই মুক্তিলগ্নে জন্মদিন সে ছিল আপনার, উজ্জ্বল অক্ষরে সেটি লেখা আছে ইতিহাসপটে।" অর্থাৎ ১৭ মে-কে শেখ হাসিনার জন্মদিন হিসেবে আখ্যায়িত করে গেছেন প্রয়াত এই লেখক।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ও ১৯৮১ সালের ১৭ মে। একটি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন; অন্যটি কন্যা শেখ হাসিনার মাতৃভূমিতে ফেরা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সদ্য স্বাধীন বাঙালি জাতির কাছে ছিল একটি বড় প্রেরণা। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরও বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে বাঙালি জাতি যখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি; তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রেক্ষাপটটি ছিল বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে শামিল হওয়া। ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের আপনি কি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চান? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, এটা জনগণের ওপর নির্ভর করবে। আমাদের জনগণ যদি চায়, তবেই হতে পারি। এটা জনগণই ঠিক করতে পারে। তবে আমি জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলতে চাই। আমাদের জনগণ খুবই গরীব, তারা সমস্যায় জর্জরিত। এ-মুহূর্তে তাদের রাজনৈতিক অধিকার নেই। তাদের কথা বলার অধিকার নেই। তারা অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগছে। তাই আমি তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। কারণ আমার পিতার একটা স্বপ্ন ছিল: তিনি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। আমার আদর্শ একই রকম এবং আমার বাবাকে অনুসরণ করতে চাই।

অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও একটি প্রশ্নে উভয়ের অবস্থান ছিল এক ও অভিন্ন। আর তা হলো– 'অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রার মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যন্নোয়ন'। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশ গড়ার কাজে হাত দিয়ে দেশকে স্বনির্ভরতা এনে দিয়েছিলেন; আর শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি মৌলিক অধিকারের জন্য লড়াই শুরু করেছিলেন। উভয়ের অপেক্ষায় বাংলার লাখ লাখ মানুষের অবস্থানের মিলটাও চমৎকার। আন্তর্জাতিক চ্যানেল এবিসি টিভির সম্প্রচার মতে, "শেখের বিমানটি ঢাকায় অবতরণের আগে আকাশ থেকেই তিনি তাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষমাণ আনুমানিক ১০ লাখ লোককে দেখতে পান।" অন্যদিকে শেখ হাসিনার রাজধানী ঢাকার সমাগমের সংক্ষেপ চিত্র তুলে এম এ ওয়াজেদ মিয়া তার 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ' গ্রন্থে লেখেন, ''ঐদিন তাকে সম্বর্ধনা জানানোর জন্য ১০-১২ লাখ লোকের সমাগম হয়েছে বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সূত্রে বলা হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মতে, ওই দিন ঢাকায় অন্যূন ১৫ লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল।''

শেখ হাসিনা আজ গোটা বিশ্বের রোল মডেল। বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা। শেষ করব, তার আগে রবীন্দ্রনাথকে আরেকবার উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলে গেছেন,

"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,

জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর

আপন প্রাঙ্গণ তলে দিবস শর্বরী

বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি'

যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে

উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যা নির্বারিত স্রোতে

দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়

অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়–"

৪২ বছর আগে দেশে ফিরে সেদিন এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা দেখিয়েছিলেন, যেখানে স্বাধীনতা হবে ভয় শূন্য অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কোন দ্বিধা-সংশয় থাকবে না। জ্ঞান হবে সবার, সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবে মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর সেই ভাষণের চার দশক পার হয়েছে। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ধারাবাহিকতাতে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়, বিএনপি-জামায়াতের মুখোশ উন্মোচন হয় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রুদ্ধ দ্বার খোলে। আর নানা চড়াই-উৎড়াই ও ষড়যন্ত্র থাকলেও বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার সবচেয়ে বড় স্বার্থকতা এখানেই। তিনি কথা দিয়েছিলেন, তিনি কথা রেখেছেন।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদস্য উপদেষ্টা পরিষদ এবং চেয়ারম্যান, প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক