জীবন মেট্রোপলিটনে নয়, অন্য কোথাও

এম এম খালেকুজ্জামানএম এম খালেকুজ্জামান
Published : 29 Dec 2021, 06:36 AM
Updated : 29 Dec 2021, 06:36 AM

মিলান কুন্ডেরার 'লাইফ ইজ এলস হ্যোয়ার' এর মতো করে বলতে হয়- জীবন এখানে নয় এই শহরে নয় অন্য কোথাও এই মেট্রোপলিটনের বাইরে। যেখানে কর্পোরেট দেখনদারী নেই, লিড টাইমের তাড়া নেই, মহামারীর প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল মিটিং করতে করতে জুম ফ্যাটিগ হওয়া নেই। বরং এর উল্টোটা প্রার্থনীয় এবং এমন আদর্শ অবস্থা আসলে দুই দশক আগেও ছিল। তখন শান্ত ছিল কর্মজীবন প্রশান্ত ছিল অবসর। অথচ আজ মনে হয় তা যেন দূর অতীতের।

আমরা সব শহুরে মানুষেরা চাই বা না চাই অথবা না চাই, কমবেশি সবাই ফাস্ট ফুড, ফাস্ট ফ্যাশন তথা ফাস্ট লাইফের ফ্যালাসিতে ফেঁসে গেছি । ভুলে গেছি তিষ্ঠ ক্ষণকাল থামতে, যেন থামলেই পিছনেরজন পিষ্ঠ করে পৌঁছে যাবে তার অভীষ্ঠে। কোন ছুটি নাই কোন বিরতি নাই। ব্যস্ততা গ্রাস করেছে সপ্তাহান্তের ছুটিও।ইন্ড্রাসট্রিয়ালাইজড সভ্যতার বলি যেন সবাই। তবে ইকো ফ্রেন্ডলি (নামের বাহারই কেবল) 'কুল অ্যান্ড কাম' সপ্তাহান্তের বাহারি অফার নিয়ে লেইজারে প্লেজার দিতে গড়ে উঠেছে আরেক ইন্ডাস্ট্রি এবং তাও অনেক সবুজের বিনাশের বিনিময়ে। যুতসই কজি উইক এন্ড দিতেও আবার খরচ হয় অনেক প্রাকৃতিক শক্তি।

এই আরবান মেট্রোপলিটনে আমরা কেবল থাকি যেমন সুপারশপে থরে থরে পণ্য থাকে। এই শহরে যেমন থাকেন প্যান্ডোরা পেপার্সে নাম ওঠা বেশুমার সম্পদশালীরা যারা চাইলে চার্টার করা প্লেনে চেপে উড়াল দিতে পারেন তেমনি থাকেন নিন্মবিত্তেরা যারা পথে নামেন টিসিবি'র কম মূল্যে পাওয়া নিত্য পণ্যের আশায়। এদের কারোরই আপন নয় এই শহর। তাই যে কোন পার্বণে শহর ছাড়ার ধুম পড়ে যায় সবার। এ এক রাবার ব্যান্ড রিয়েলিটি ।
আরেক শ্রেণি আছেন, যারা ধূসরে সবুজে ভারসাম্য রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেন। সারামাস পাশবিক পরিশ্রমের পর একটু সবুজের আশায় ছুটে যান শহরের প্রান্তে কিংবা শহর ছেড়ে দূরে। তেমনি একদল মানুষ জড়ো হয় দূষিত বুড়িগঙ্গার ঢাকা ছেড়ে মানিকগঞ্জের ঘিওরের কালীগঙ্গা নদী তীরবর্তী কাউটিয়া গ্রামে। একজন গড়পড়তা মানুষের বাইরে থাকা মানুষ দেলোয়ার জাহান। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে দারুণ ফলাফল করেও কংক্রিটের জঙ্গলের বাইরে মানিকগঞ্জের ঘিওরে গড়ে তুলেছেন প্রাকৃতিক চাষবাদের অন্য রকম খামার (আদতে এ এক অভিযাত্রা )।

তিনি সবুজের মাঝে প্রাণের ভাষারই যেন স্বরলিপি রচনা করে চলেছেন। কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে ধান সবজি (সাস্টেইনেবল ডেভলপমেন্টের রূপায়ণ)। স্বাপ্নিক মানুষটি ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন তার স্বপ্ন। প্রতি সপ্তাহেই পনের বিশ জনের দল খামারটি দেখে থেকে খেয়ে আসছেন। এমন ব্যবস্থাও আছে, চাইলে এক বছরের জন্য আগ্রহীগণ নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে চাহিদা মতো জমিও ইজারা নিয়ে চাষ করতে পারবেন ।আমাদের গ্যাজেট স্যাভি শিশুরা সবুজ সান্নিধ্যে দু তিন পুরুষ আগের পূর্বসূরীদের জীবন পদ্ধতি সম্বন্ধে ধারণা পেতে পারে। সভ্যতার নানা কাল পর্বে এমন দেলোয়ার জাহান এর মতো ভিন্ন চিন্তার কেউ কেউ থাকেন বলে রক্ষা। তার মগ্ন ও একাগ্র প্রয়াসের ভেতরে রয়ে গিয়েছে স্বেচ্ছানিবেদিত সমাজ-স্বপ্নবাদীদের নির্জন একক পরিক্রমার অগ্রবীজ।আমাদের এখন প্রয়োজন এমন অনেক বীজতলা।

'পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দর তা কোলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়'- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সে আক্ষেপ ঢাকার বেলায়ও সত্যি। রবীন্দ্রনাথ কলকাতার প্রতি এমন মনোভাব পোষণ করলেও তাকে বার বার কলকাতাতেই ফিরতে হয়েছে আমাদেরও তেমনি ঢাকা ভালো না লাগলেও ঢাকায়ই ফিরতে হয়।

বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' এ সত্যচরণ ধূসর শহর ছেড়ে যায় সবুজে। প্রিয় হয়ে ওঠে অরণ্য। কিন্তু সেই সবুজও কাটা পড়ার কবলে পড়ে। সবুজের সমাধিতে নগরসভ্যতার যে চকচকে মহল তৈরি হচ্ছে তার অসাড়তাকে মানবাত্মার হয়ে সেই অমোঘ প্রশ্ন তোলেন প্রটাগনিস্ট সত্যচরণের আড়ালে বিভূতিভূষণই, "মানুষ কি চায় উন্নতি, না আনন্দ? উন্নতি করিয়া কী হইবে, যদি তাহাতে আনন্দ না থাকে? যাহারা জীবনে উন্নতি করিয়াছে, কিন্তু আনন্দকে হারাইয়াছে। অতিরিক্ত ভোগে মনোবৃত্তির ধার ক্ষইয়া ক্ষইয়া ভোঁতা জীবন তাহাদের নিকট একঘেঁয়ে, একরঙা, অর্থহীন মন শান বাঁধানো, রস শেখানে ঢুকিতে পারে না।" আমাদের ব্যস্ততাও তেমনি শুষে নিয়েছে সব রং রস।

দীপেশ চক্রবর্তী আলোচিত 'প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ' বইয়ে দেখিয়েছেন, একদিকে প্রবল পশ্চিমা ভাবাপন্ন (এও এক বিপন্নতার মতো), অন্যদিকে উৎকট পশ্চিম বিরোধিতা। এই দুইকে আমলে না নিয়ে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন নতুন ভাবনা বলয়, নতুন এক চিন্তা বর্গ 'অত্যাবশ্যক এবং অপর্যাপ্ত' না (indispensable and inadequate)। 'অত্যাবশ্যক এবং অপর্যাপ্ত' শব্দসমষ্টি যেন আমাদের সিভিক লাইফের ভবিতব্য। কোনভাবেই তৃপ্ত না হওয়া যেন নিয়তির মতো অখণ্ডনীয়। নিরন্তর দুদিকে (একদিকে অত্যাবশ্যকতা এবং অন্যদিকে অপর্যাপ্ততা) ছুঁয়ে ঘড়ির সেই অস্থির পেন্ডুলাম 'অত্যাবশ্যকতা এবং অপর্যাপ্ততার ঘেরাটোপে বন্দি। নিস্তারহীন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক