চকবাজার অগ্নিকাণ্ড- ঢাকা, প্যারিস ও আমাদের দুর্ভাগ্য

তানভীর ইসলাম
Published : 22 Feb 2019, 09:49 AM
Updated : 22 Feb 2019, 09:49 AM

মাত্র কিছুদিন আগে ফেইসবুকে ফুড রেঞ্জার নামে কানাডিয়ান এক অভিযাত্রীর পুরান ঢাকায় খাদ্যাভিযানের একটা ভিডিও দেখে মনে মনে আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিলাম। পুরান ঢাকার বৈচিত্র্য়ময়, মুখরোচক খাবার, কালের সাক্ষী আমাদের এই শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনন্য।

আমেরিকার নিউ অর্লিন্স শহরে ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার বলে একটা ঐতিহাসিক জায়গা আছে 'মার্ডি গ্রা' ফেস্টিভ্যালের জন্য যা মূলত বিখ্যাত। পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে এখানে লোকে বেড়াতে আসে। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে ফরাসিদের হাতে এর গোড়াপত্তন, যদিও আমাদের পুরান ঢাকার প্রায় একশ বছর পরে ১৭১৮ সালে। ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারে আসলেই আমার পুরান ঢাকার কথা মনে পড়ে আর একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে যায়। মনে মনে ভাবি, আমরাও পুরান ঢাকাকে ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারের মতো করে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করতে পারতাম- এর ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণ করে, দালানকোঠাগুলো মেরামত করে, রাস্তাঘাট ঠিকঠাক ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে, মিসিসিপি নদীর মতো বুড়িগঙ্গার শোভাবর্ধন করে- একে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারতাম। 'মার্ডি গ্রা' ফেস্টিভ্যালের মতো আমাদের 'সাকরাইন' ঘুড়ি উৎসব  দেখার  জন্য পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসতো।

কিন্তু বিধি বাম। আকাশে উড়ানো প্রত্যাশার বেলুন চুপসে যায় চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মিছিল দেখে। এই ২০১৯ সালে বসে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য মেনে নেয়া যায় না। যেটুকু জানতে পারলাম, ভিড়ের মধ্যে থাকা একটি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের শুরু, এরপর সেখান থেকে তা হোটেলের সামনে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটায়, এরপর তা কারখানায় অবৈধভাবে রাখা রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এলে আগুন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, পরিণতিতে ৬৭ জনের মৃত্যু।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে দায় স্বীকার এবং সংশোধনের বদলে আমাদের যা সংস্কৃতি- সেই একে অন্যকে দোষারোপ চলছে, কিন্তু এই দুর্ঘটনা আদপে যা নির্দেশ করে তা হলো জনমানুষের নিরাপত্তার প্রতি কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা এবং আমাদের নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি করুণ চিত্র। আজ থেকে একশ বছর আগে আমেরিকার অবস্থাও কিন্তু ভিন্ন কিছু ছিলো না। নিউ ইয়র্ক শহরে ২৫ মার্চ ১৯১১ সালে ট্রায়াঙ্গল শার্টওয়েইস্ট কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে ১৪৬ জন কর্মী নিহত হয়। এই ফ্যাক্টরির অবস্থা ছিল অনেকটা আমাদের রানা প্লাজার মতো। বহুতল ভবনের কয়েকটি ফ্লোরে গাদাগাদি করে মানবেতর পরিবেশে প্রায় ৫০০ কর্মী কাজ করতেন যাদের অধিকাংশই ছিলো গরীব অভিবাসী নারী।

আগুনের সূত্রপাত হয়েছিলো সামান্য একটা সিগারেট থেকে, বিল্ডিংয়ে ফায়ার হোস অকার্যকর ছিল, স্প্রিংকলার সিস্টেম না থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পরে, বিল্ডিংয়ের যে একমাত্র সরু ফায়ার এস্কেপ ছিলো মানুষের চাপে তা ভেঙে পড়েছিল, বিল্ডিংয়ে চারটা লিফটের মধ্যে তিনটাই ছিলো অকার্যকর, মানুষ আগুন থেকে বাঁচতে বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে মারা গিয়েছিল। বহুতল ভবনের জন্য তখন দমকলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না। আগুন যে ফ্লোরে শুরু হয়েছিল দমকলের পানি সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।

আমেরিকার জন্য নিউ ইয়র্কের সেই ঘটনা ছিলো টার্নিং পয়েন্ট- এরপর কারখানায় স্প্রিংকলার সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা হয়, ফায়ার এস্কেপ, ফায়ার হোস, ফায়ার হাইড্রেন্ট ইত্যাদি বিষয়ে আইন-কানুন কড়াকড়িভাবে চালু ও প্রয়োগ করা শুরু হয়। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য যা বিস্ফোরক কিংবা ক্ষতিকারক এগুলোর জন্যও এখানে বিশেষ নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু আমাদের টার্নিং পয়েন্ট কোনটা হবে? চকবাজার অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, এর আগে সাভারে রানা প্লাজায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে অনেক হতাহত হয়েছে, তারও আগে ২০১০ সালে ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন নিহত হয়েছিলেন। আর কত মানুষ মারা গেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াবো, আমাদের কর্তৃপক্ষ বলবেন যথেষ্ঠ হয়েছে- এবার আমরা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবো, আমাদের নগর-পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যুগোপযোগী করে দেশের মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য করবো?

মাঝে মাঝে কিছু বোদ্ধাকে বলতে শুনি, বাংলাদেশ নাকি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উন্নত এবং পৃথিবীর অনেক দেশের এখান থেকে শিক্ষণীয় আছে। আমি আমেরিকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাথে সতের বছর ধরে জড়িত, এ বিষয়ে যারা এখানে পেশাদার কাজ করে তাদের অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো পড়াই। আমেরিকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও অনেক দুর্বলতা আছে, কিন্তু তারপরও এর সাথে যদি বাংলাদেশের তুলনা করি মাথা নুইয়ে আসে। যারা বলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত, তবে দেশের রাস্তায় অগ্নি নির্বাপক ফায়ার হাইড্র্যান্ট কেন নেই, কারখানায় স্প্রিংকলার সিস্টেম কেন বসানো হয় না, ফায়ার এস্কেপ কী পর্যাপ্ত রয়েছে, অগ্নিনির্বাপক গাড়ি যাওয়ার মতো রাস্তা কি আছে কিংবা বিস্ফোরক রাসায়নিক দ্রব্য কী এখানে নিয়মকানুন মেনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়? একটা শহরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কারা আছে?

কিছুদিন আগে এক মন্ত্রী বলেছেন, ঢাকাকে নাকি উপর থেকে প্যারিস শহরের মতো লাগে। ঢাকার উড়াল শহরগুলো দেশের উন্নয়নের চিত্র! নগর পরিকল্পনার পরিভাষায় ঢাকার মতো শহরকে বলা হয় 'প্রাইমেট সিটি' – যে শহরের ওপর অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক বিবিধ কার্যক্রমের জন্য পুরো দেশ নির্ভরশীল থাকে। কোন দেশে প্রাইমেট শহরের অস্তিত্ব মূলত দেশটিতে উন্নয়নের ভারসাম্যহীনতাকেই নির্দেশ করে। আমাদের মতো জনসংখ্যাবহুল উন্নয়নশীল দেশে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাইমেট শহর সাধারণত বিপর্যয় ডেকে আনে- যা আমরা চকবাজার অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ইত্যাদি নানাভাবে প্রত্যক্ষ করি। ঢাকাকে প্যারিস হতে হলে আসলে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আজকের প্যারিস নগরী এক সময় ছিলো পুরান ঢাকার মতোই ভগ্ন দালানকোঠা, সরু রাজপথ, গলি-তস্য গলি নিয়ে  জীর্ণ এক নগরী। ভলতেয়ার প্যারিসের বাণিজ্য এলাকা নিয়ে লিখেছিলেন- "…established in narrow streets, showing off their filthiness, spreading infection and causing continuing disorders." প্যারিসকে এই ভগ্নদশা থেকে যিনি উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি হলেন সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন। তিনি বুঝেছিলেন প্যারিসকে নতুনভাবে সাজাতে হলে দরকার একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ- যাকে তিনি খুঁজে বের করে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত ব্যারন হাউসম্যান নামে। প্যারিস নবায়নের জন্য হাউসম্যান যে বড় বড় প্রকল্প নিয়েছিলেন তার ব্যাপ্তি ছিলো বহু বছর- এমনকি তার চাকুরিচ্যুতি ও মৃত্যুর পরও অন্যরা তা সম্পন্ন করেছেন। আজকের আধুনিক শিল্পমণ্ডিত প্যারিস দাঁড়িয়ে আছে ব্যারন হাউসম্যানের দূরদর্শী পরিকল্পনার ওপর। আমাদের ঢাকা বা অন্যান্য নগরী ঢেলে সাজানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনও বিশদ পরিকল্পনা কি কখনো নেয়া বা সম্পন্ন হয়েছে? এ শহরের কোন ব্যারন হাউসম্যানের কথা কি কখনো শুনেছি আমরা? ঢাকা কি তবে এমনি এমনি প্যারিস হয়ে যাবে কিছু ফ্লাইওভার আর হাতির ঝিল দিয়ে? মানুষকে আর কত বোকা ভাববো আমরা?

আমেরিকায় ট্রায়াঙ্গল শার্টওয়েইস্ট কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের পরে নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ এমনি এমনি জননিরাপত্তামূলক আইন-কানুন তৈরি করে নি। এপ্রিলের ৫ তারিখ, ১৯১১ সালে অগ্নিকান্ডে নিহত সেই ১৪৬ জন কর্মীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মানুষ রাজপথে নেমে বিভোক্ষে ফেটে পড়েছিলো। প্রতিবাদে মুখর সাড়ে তিন লাখ মানুষ রাজপথে থেকে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেছিলো অগ্নিকাণ্ড নিরোধী আইন চালু ও কার্যকর করতে। চকবাজারের এই অগ্নিকান্ডে মারা যাওয়া এই ১১০ জন হতভাগ্য মানুষের শবযাত্রায় এদের পরিজন ছাড়া আদৌ কি কেউ শামিল হবে? রানাপ্লাজা দুর্ঘটনায় কি কেউ হয়েছিলো, কিংবা তার আগের অগ্নিকান্ডে বা তার আগের অগ্নিকান্ডে বা কোন দুর্ঘটনায়? আমাদের শিশুদেরও অন্তত বিবেকবোধ আছে, তাদের সহপাঠীদের মৃত্যুতে  তারা রাস্তায় নেমে আসে প্রতিবাদে। আমাদের সে বোধটুকুও নেই, আমরা শুধু একে অন্যকে দোষারোপ করে প্রতীক্ষা করতে পারি পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের বা দুর্ঘটনার জন্য- যার শিকার হয়ত একদিন আমরা নিজেরাই হবো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক