শৈশব হতেই কুম্ভীলকবৃত্তি বিষয়ে জ্ঞানার্জন কেন জরুরী?

এম এল গনি
Published : 1 April 2022, 02:38 PM
Updated : 1 April 2022, 02:38 PM

আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা শুনুন শুরুতেই। পড়াশোনার কোন বিষয়ে শূন্য পেয়েছি তেমন ইতিহাস জীবনে আগে কখনো ছিল না। তবে, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স- এ অধ্যয়নের শুরুতে শূন্য পাবার এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। 

ঘটনাটা এরকম। প্রফেসর জে এ প্যাকার 'ইভল্যুশন অব স্টিল স্ট্রাকচার্স' বিষয়ে অনূর্দ্ধ এক হাজার শব্দের একটি পেপার লেখার জন্য তার কোর্সের শুরুতেই একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন। অনেক খাটাখাটনি করে সে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেবার কয়েকদিন পর দেখলাম সেটিতে শূন্য পেয়েছি! নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো। এ কী করে সম্ভব? বুয়েটের টপ পাঁচ শতাংশ ছাত্রের অন্যতম আমি। তার আগের পড়াশোনায়ও নামডাকের কমতি ছিল না। সেই আমার পক্ষে এতো মেনে নেওয়া মুশকিল। 

প্যাকার সাহেবের সাথে কথা বলে আমার উদ্বেগ জানালাম। এর আগের অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েও ধারণা দিলাম। উনি আমাকে বললেন, 'টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে তারা কমবেশি তোমার মতোই। তাদের কাছে আমরা প্লেজারিজম (নকল বা কুম্ভীলকবৃত্তি) আশা করি না। কানাডার স্কুল-কলেজে পড়ে কেউ এ কাজ করলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিষ্কারের প্রস্তাব করতাম আমি। তুমি অন্যদেশ থেকে এসেছো, সে বিবেচনায় কেবল শূন্য দিয়ে ছেড়ে দিলাম।' যারা জানেন না, প্রফেসর ড. জেফরি প্যাকার, টিউবুলার স্টিল স্ট্রাকচার ডিজাইন এক্সপার্ট হিসেবে বিশ্বে এক পরিচিত নাম। তার সাথে তর্ক আমার মানায় না, তাই, তার কথাগুলো কেবলই শুনছিলাম। 

যাক, আমার ভুলটা ছিল, পেপারের কয়েক স্থানে আমি এই বিশেষ ক্ষেত্রে বিখ্যাত কয়েক প্রকৌশলীর রেফারেন্স- এ কিছু কথা যোগ করেছিলাম, কিন্তু, নিয়মানুযায়ী সঠিকভাবে রেফারেন্সগুলো উল্লেখ করিনি। এটা অ্যাকাডেমিক অসততার পর্যায়ে পড়ে। এমন ভুল আমার অনুচিত হয়েছে। ভুলের জন্য আমাকে যারপরনাই অনুতপ্ত দেখে তিনি অ্যাসাইনমেন্টটি ঠিকভাবে উপস্থাপনের সুযোগ আমাকে দিয়েছিলেন শেষতক, যদিও নম্বর সেই শূন্যই রেখেছেন। তারপরও আমি অখুশি হইনি। কারণ, বহিষ্কার না হয়ে বেঁচে গেছি এটাই ছিল বড়ো পাওয়া। অথচ, বাংলাদেশে হলে এই একই লেখা লিখে আমি হয়তো নব্বই শতাংশ বা তারও বেশি নম্বর পেতাম।

প্লেজারিজম শব্দের অর্থ নিয়ে ক্যামব্রিজ অভিধান বলছে: "Plagiarism is the process or practice of using another person's ideas or work and pretending that it is your own." অর্থাৎ, অন্য কারো সৃজনশীল ধারণা বা কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া বা অভ্যাস- এর নাম প্লেজারিজম। 

প্লেজারিজম, খুন-ডাকাতির মতো কোনও অপরাধ নয়, তবে, এটি একটি গভীর এথিক্যাল (নৈতিক) সমস্যা, যা উন্নতদেশগুলোতে বরদাশত করা হয় না। প্লেজারিজম- কে প্রতারণার সাথে তুলনা করা যেতে পারে বলেই এ বিষয়ে কিছু লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে। প্রতারণা এমন এক বাজে অভ্যাস যা অনেকে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের পরও ত্যাগ করতে পারেন না। 

কানাডার মতো দেশে ছোটবেলা হতেই বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে প্লেজারিজম- এর মতো বিষয়গুলো যোগ করে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের শৈশব হতেই সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হয়। 

একই বিষয়ে আরেকটি সত্য ঘটনা এ লেখায় উল্লেখ করা যৌক্তিক মনে করছি। 

কয়েকবছর আগে বাংলাদেশ থেকে এক তারকা লেখক কানাডা এসেছিলেন। তিনি আমার এ কানাডাপ্রবাসী ঘনিষ্ঠের কাছের বন্ধু। সেসূত্রে, আমার সে ঘনিষ্ঠের (জাকির, ছদ্মনাম) বাসায়ও কয়েকঘণ্টা কাটিয়ে গেলেন বিখ্যাত সেই লেখক। তিনি শুধু লেখেনই না, ভালো ছবিও আঁকেন। অনেকের বহুমুখী প্রতিভা থাকে, যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কিন্তু ভালো ছবি আঁকতেন। কিছুটা তেমনই বলা চলে। তবে, প্রিয় পাঠক যেন আবার ভেবে না বসেন, আমি এ লেখককে রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা দিতে চাইছি। 

জাকির কানাডায় এসেছেন প্রায় সিকি শতাব্দী হলো। তারপরও কানাডার কালচার বা সংস্কৃতির সবকিছু তার জানা হয়ে ওঠেনি। জাকিরের বড়ো ছেলে মামুন আরেক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। বাইশ-তেইশ বছরের এই তরুণ একাধারে শিল্পী (আঁকিয়ে), লেখক, সুবক্তা এবং ভালো ছাত্র। মাত্র বিশে পা রাখতেই প্রথম প্রচেষ্টায় সে কানাডার মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়ে গেছে, যা যথেষ্ট যোগ্য না হলে অসম্ভব! 

মামুন এখন আর বাবা-মার সাথে থাকে না। ডাক্তারি পড়ার কারণে সে তার হাসপাতালের কাছাকাছি এক অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকে। সেই লেখকবন্ধু জাকিরের বাসায় পা রেখেই চারিদিকে অবাক বিস্ময়ে তাকাচ্ছেন। বাসার দেয়ালে সাঁটানো বিশালাকারের পাঁচ-ছয়টি অয়েল পেইটিং দেখে তার মাথা খারাপ অবস্থা। তা দেখে এক পর্যায়ে কানাডীয় শিল্পীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন এ 'সেলিব্রেটি'। টম থমসনের মতো শিল্পীর প্রসঙ্গও তুললেন তিনি। 

জাকির তখন সগর্বে বললো, "বন্ধু, এ চিত্রকর্মগুলো কিন্তু বড় কোন শিল্পীর কাজ নয়; তোমার ভাতিজা মামুনই এসব এঁকেছে।"

– কি বলো, ও না ডাক্তারি পড়ে?

– তা পড়ে, পাশাপাশি সে ছবিও আঁকে, লেখে, সে একজন সুবক্তাও। বছর দুয়েক আগে এ শহরের এক নামি পত্রিকার দেয়া 'এডিটর্স অ্যাওয়ার্ড' (সম্পাদকীয় মেডেল) জিতেছিল মামুন লেখালেখিতে তার অবদানের জন্য। 

– বলো কী! সে এমন অসাধারণ অয়েল পেইন্টিং কোন প্রতিষ্ঠান থেকে শিখলো? এসব তো রীতিমতো প্রফেশনাল পর্যায়ের কাজ। 

– না না, কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে সে আর্ট শেখেনি। নিজে নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে তৈলচিত্রের কলাকৌশল রপ্ত করেছে।

'এ তো সত্যিই অসাধারণ!' – লেখক-বন্ধু মামুনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

এ পর্যায়ে লেখক তার সাথে থাকা বিশেষ ক্যামেরা দিয়ে সবকটি চিত্রকর্মের হাই-কোয়ালিটি ছবি তুলে ফেললেন। আর, যেসব ছবিতে মামুনের ছোট্ট স্বাক্ষর আছে তা একটা নোটবুকে আলাদা করে লিখে রাখলেন। 

এতো বড়ো নামিদামি মানুষ 'সামান্য' মামুনের ছবি এতটা গুরুত্ব দিয়ে তুলছেন দেখে জাকির আনন্দে আত্মহারা। তাই, ছবি তুলতে সেও লেখক বন্ধুকে সহায়তা দিলো। ৫ ফুট বাই ৩ ফুট আকারের ফ্রেইমে বাঁধা ছবিগুলো দেয়াল হতে নামিয়ে ফ্লোরে রেখে ছবি তোলা অন্যের সাহায্য ছাড়া সহজও ছিল না।  

ছবি তোলার সময় সেলিব্রেটি তার বন্ধু জাকিরকে বললেন, দেশে ফিরেই তিনি এসব ছবি দিয়ে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেবেন, তার পত্রিকায়ও লিখবেন। এ আশ্বাস পেয়ে মামুনের মা-বাবা, মানে, জাকির দম্পতি, ছবি তুলতে সোৎসাহে সহায়তা দিয়ে গেলেন। কে না চান তার সন্তানের সুনাম-সুখ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ুক?

দেশে ফিরে লেখক তার কথা রাখলেন। মামুন আর তার মা-বাবার নামোল্লেখ করে দিলেন এক ফেইসবুক পোস্ট। সাথে মামুনের কয়েকটা অয়েল পেইন্টিং। বাহ্! কী সুন্দর! মানুষের প্রশংসায় সেই পোস্টে লাইক-কমেন্টের বন্যা বয়ে গেলো। বাকি ছবিগুলো লেখক তার নিজস্ব অনলাইন অ্যালবামে সংরক্ষিত করলেন নিজের করা চিত্রকর্মের সাথে…।

মাস শেষে মামুন বাবা-মার বাসায় বেড়াতে এলে তারা তাকে দেশি সেই সেলিব্রেটি বন্ধুর ভিজিট বিষয়ে জানালেন। একেবারে শিশু অবস্থায় মা-বাবার সাথে মামুনের বাংলাদেশ ছেড়ে আসা। তাই, সে তেমন কিছু জানেনা বাংলাদেশের বিখ্যাত লোকেদের নিয়ে। তবে, ফেইসবুক পোস্টে কয়েক হাজার লাইক-কমেন্ট দেখে মামুন আঁচ করতে পেরেছিলো তার এ লেখক চাচা দেশের খুব নামিদামি কেউ হবেন অবশ্যই। 

এক পর্যায়ে ফেইসবুকে সেলিব্রেটির চিত্রকর্মের পার্সোনাল অনলাইন অ্যালবাম দেখতে গিয়ে সেখানেও মামুন তার কয়েকটি ছবি দেখতে পেলো। ওসব ছবিতে মামুনের স্বাক্ষর নেই। সাথে সাথে মামুন তার বাবাকে প্রশ্ন করলো, 'বাবা, আমার এসব ছবি উনার চিত্রকর্মের অ্যালবামে কেন থাকবে?'

– ভালো লেগেছে বলে রেখেছে আর কি? ভালোবেসে মানুষ যেভাবে কাউকে বুকে টেনে নেয় তেমন আরকি। দেখো, লেখক আংকেল তোমার আঁকা ছবি কতবেশি পছন্দ করেছেন।

এবার বেশ বিরক্তির সাথেই মামুন তার বাবাকে বললো, 'ড্যাড, দিস ইজ নট হাও এ পার্সন লাইকস এনাদার'স ওয়ার্ক। ডোন্ট ইউ নো হোয়াট এ প্লেজারিজম ইজ? আই এম গোয়িং তো স্যু দিজ গাই।' [বাবা, কোন ভাল মানুষ কারো শিল্পকর্মের প্রতি এ কায়দায় ভালোবাসা প্রকাশ করে না। এটা অন্যের ছবি চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়া বৈ কিছু নয়। আমি তার বিরুদ্ধে মামলা করবো।]

ছেলের এ প্রতিক্রিয়া দেখে জাকির এবং তার স্ত্রী ভাবনা মহাদুর্ভাবনায় পড়ে গেলেন। তাদের কাছে এ ঘটনা বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো ঠেকলো। বুঝে উঠতে পারছিলেন না কানাডিয় পরিবেশে বেড়ে উঠা এ তরুণকে তারা শান্ত করবেন কোন ভাষায়।  

অবশেষে, অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা করা থেকে ছেলেকে বিরত রাখতে সক্ষম হলেন। কিন্তু, ছেলের শর্ত, ছবিগুলো অনতিবিলম্বে লেখকের অ্যালবাম হতে সরিয়ে ফেলতে হবে, এবং ভবিষ্যতে তার তৈলচিত্রের ছবি কাউকে তুলতে দেয়া যাবে না। জাকির তাকে আশ্বস্ত করার পর মামুন ধীরে ধীরে শান্ত হলো। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো, বাংলাদেশে প্লেজারিজমের বিষয়টি আজও তেমন পরিচিত নয়। সাধারণ মানুষ তো নয়ই, অনেক উচ্চশিক্ষিতও প্লেজারিজম, বা কুম্ভীলকবৃত্তি নিয়ে তেমন জ্ঞান রাখেন না। দেশে দেশে কালচারের পার্থক্যের কারণেই এ ভুলগুলো ঘটে থাকে। 

সেদিন রাতে মামুন তার অ্যাপার্টমেন্টে চলে গেলে জাকির এবং তার স্ত্রী ঘটনার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে বুঝেছেন, এ ঘটনায় কেবল লেখকের অজ্ঞতাই নয়, অসততাও একইভাবে কাজ করেছে। অন্যথায়, সে মামুনের স্বাক্ষরবিহীন চিত্রকর্মগুলো আলাদা করতে গেলো কেন? চুরির চিন্তা আগে থেকেই মাথায় না থাকলে এমনটি হবার কথা নয়। 

যাই হোক, পরদিন সেই লেখক বন্ধুকে জাকিরের বাসায় ঘটে যাওয়া কাহিনীর বিস্তারিত বর্ণনা না দিলেও জাকির এভাবে বললো: "বন্ধু, মামুনের ছবিগুলো তোমার অ্যালবাম থেকে সরিয়ে নাও, কখনো সেসব ওর চোখে পড়লে সে ভিন্ন চিন্তা করতে পারে।"

– ভিন্ন চিন্তা কেমন?

– ওই যে, প্লেজারিজম না কি একটা বলে না …?

– ওহ তাই? আমি কিন্তু সেভাবে ভাবিনি। ঠিক আছে, সরিয়ে নেব।  

জাকির এবং তার রাষ্ট্রীয় পদকধারী লেখকবন্ধুর এ ঘটনা হতে কী বোঝা গেলো প্রিয় পাঠক? 

আপনারা যে যাই বুঝুন, আমি যা বুঝেছি তা হলো, আমাদের বাংলাদেশে খুব ছোটবেলা থেকেই শিশুদের প্লেজারিজম- এর মতো গুরুতর অনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেয়া সময়ের দাবি। বৈশ্বিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতেই এটি প্রয়োজন। নইলে, বড়ো হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গালভরাসব ডিগ্রি, আর সরকারি পদক-সম্মাননা-পুরস্কার নিয়ে হিমালয়সম সেলিব্রেটি হওয়া সম্ভব হবে হয়তো, কিন্তু, নীতি-নৈতিকতাবোধসম্পন্ন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না কোনোকালেও। সেলিব্রেটি হবার চেয়েও মানুষ হওয়া প্রয়োজন আরো বেশি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক