মেয়ের ‘প্রথম পিরিয়ড’ উদযাপন, আলোচনায় বিজ্ঞাপন

পরিবারের কন্যা সন্তানের প্রথম মাসিক হয়েছে; তা উদযাপনে কেক কেটেছেন বাবা-মা ও বড় বোন। একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে নারীর মাসিকের কথা।

তৃপ্তি গমেজবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 June 2022, 11:15 AM
Updated : 29 June 2022, 11:52 AM

এ বছর মার্চে নারী দিবসের সময় বিজ্ঞাপনটি ফেইসবুকে সিনেগল্প পেইজে প্রচার হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তা আট মিলিয়নের বেশি ভিউ পেয়েছে। ইতিবাচক আর নেতিবাচক মিলিয়ে মন্তব্য এসেছে ছয় লাখের বেশি।

বিজ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে সামাজিক ট্যাবু ভাঙার এই চেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকেই।

আরিয়ান নাসির নামে একজন ফেইসবুকে মন্তব্য করেছেন, “এক কথায় অসাধারণ একটা বিজ্ঞাপন।

“ধন্যবাদ জানাই নারীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টাকে এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য। সচেতনতা বাড়াতে এটা খুবই ভালো উদ্যোগ।”

সোহিনী মাইতি বলেছেন, “চোখে জল আনার মত একটা ভিডিও। কনসেপ্ট খুব সুন্দর।”

বিজ্ঞাপনটি সামাজিক গোঁড়ামি ভাঙতে কাজ করবে বলে মনে করছেন তানজুম নাহার এমা।

তিনি লিখেছেন, “... দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো উচিত। সব ছেলে জাতির এই জিনিস সম্পর্কে ধারণা রাখা উচিত। এতে করে আমাদের বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না।”

ভিডিওটি দেখে অনেকে নিজের কিশোরী বয়সের ভালো ও মন্দ অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন অকপটে।

তামান্না ইয়াসমিন বলেছেন, “পিরিয়ড হলে প্রচণ্ড পেট ব্যথায় তিন-চার দিন শুয়ে থাকতে হত। আম্মু জানত আমার পিরিয়ড হয়েছে, কিন্তু আব্বু জানত কি না জানি না।

”... মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হত, আমার ব্লিডিং হচ্ছে, আমার পেট ব্যথা। কিন্তু সব সময় আম্মুর কাছে শুনে আসছি, ন্যাকড়াটা একটু আড়ালে রোদে দিতে হবে নইলে আব্বু দেখে ফেলবে। এই ভয়ে থাকা আমি কীভাবে চিৎকার করে বলি...।”

বিজ্ঞাপনটি দেখে সালমা সাবিহা বলেছেন, “সত্যিই দারুণ… আমি এখনও আমার প্রথম মাসিকের কথা মনে করতে পারি। আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম আমার সঙ্গে কী হচ্ছে ভেবে। আমি ভেবেছিলাম এটা কোনো অসুখ। আমার কোনো ধারণাই ছিল না।

“পারিবারিক সচেতনতা খুবই জরুরি। তাদের কন্যা সন্তানকে শুরু থেকেই জানাতে হবে। তবেই তারা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে।”

সুমাইয়া কিবরিয়া তার মন্তব্যে বলেছেন, “দারুণ... আমার চোখে পানি চলে এল যেন।

”কারণ আমাদের সময় কম বয়সী মেয়েরা তাদের পিরিয়ড বেলায় নানা হয়রানির শিকার হত। প্রথম পিরিয়ড ছিল একই সঙ্গে ভয়ানক ও যন্ত্রণাময় এক অভিজ্ঞতা।”

তবে এই বিজ্ঞাপনে দেখানো কেকটিতে এবং শেষে প্রথম পিরিয়ডকে ঘিরে ‘প্রথম নারী হবার অভিবাদন’ জানিয়ে যে বার্তা এসেছে তার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন নাফিউন নাহার লাবণ্য।

তিনি লিখেছেন, “প্রথম নারী হওয়ার অভিবাদন কথাটি ভালো লাগেনি। আমরা সকলেই জন্মগত ভাবেই নারী। যে মেয়ের পিরিয়ড হয় না বা বেবি হয় না তারা কি নারী নয়?”

আবার বিজ্ঞাপনটি দেখে কেউ কেউ মনে করছেন, কন্যা সন্তানের প্রথম মাসিক হওয়ার দিনটি বিশেষভাবেই উদযাপন হওয়া জরুরি।

ভারতের আসাম থেকে দীপশিখা শর্মা লিখেছেন, “আসামে খুব উৎসাহ নিয়েই প্রথম মাসিক উদযাপন করার প্রথা রয়েছে। বহু বছর ধরেই এমনকি আজকে পর্যন্ত এই প্রথা চালু রয়েছে।”

শিকু মিলু মনে করছেন, সব পরিবার এদিন কন্যা সন্তানের জন্য উপহার ও বিশেষ খাবারের আয়োজন করতে পারে।

ফেনীর এক পরিবারও ঘরোয়াভাবেই কন্যার প্রথম মাসিক উদযাপন করতে বিশেষ নকশায় বানানো কেক কেটেছিল। পিরিয়ড সামাজিক ও পারিবারিক ট্যাবু ভাঙতে ‘প্রজেক্ট কন্যা’ নামে ক্যাম্পেইনের ফেইসবুক পাতায় সেই কেকের ছবি প্রকাশ হয়।

২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর “কেক কেটে ‘প্রথম পিরিয়ড’ উদযাপন” শিরোনামে এক প্রতিবেদনে সেই পরিবারের গল্প তুলে ধরেছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। 

সিনেগল্প ফেইসবুক পাতায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটি জয়া স্যানিটারি ন্যাপকিনের; যার সঙ্গে ফেনীর ওই পরিবারের কেক কেটে প্রথম মাসিক উদযাপনের সাযুজ্য মেলে।

এ কারণে বিজ্ঞাপনটিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ প্রজেক্ট কন্যার পরিচালক আতিয়া নূর চৌধুরী।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিজ্ঞাপনটির মধ্য দিয়ে পিরিয়ড বিষয়টাকে খুব স্বাভাবিকভাবে সকলের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ‘ট্যাবু’ ভাঙতে পরিবারকেই উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

“এর আগে প্রজেক্ট কন্যাতে এমন একটা ঘটনার কথা প্রকাশ করা হয়েছিল। অনেকেই তা পড়েছেন ও শেয়ার করেছিলেন। তবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমন একটা ঘটনা তুলে ধরায় তা অনেক বেশি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং মানুষ পিরিয়ড নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে।”

এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের হাইজিন প্রডাক্টসের প্রধান মিজানুর রহমান বললেন, পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু ভেঙে নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে আনতেই ‘মাই ফার্স্ট পিরিয়ড’ শিরোনামে এমন বিজ্ঞাপনের আয়োজন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পিরিয়ড নিয়ে খোলাখুলি কথা না বলায় মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকে না, ফলে জটিল রোগের সৃষ্টি হয়, অনেক নারী হারায় প্রাণ। পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু ভাঙতে পারলে এই ঝুঁকি কমিয়ে আনা যাবে।”

 

মাহাথির স্পন্দন পরিচালিত বিজ্ঞাপনটি নিয়ে জয়া স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে মিজানুর রহমান বলেন, পিরিয়ড কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয় এবং এটা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।

“পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু ভাঙতে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে পরিবারকে। পরিবারে খোলামেলা কথা বলা গেলে সচেতনতা বাড়বে এবং পিরিয়ড সংক্রান্ত সমস্যা দূর করা সহজ হবে।”

বিজ্ঞাপনটি দেখে তাসনিমা মুজিবের মন্তব্য ছিল, “...মাসিক নারীর স্বাভাবিক শারীরিক ক্রিয়া, এ বিষয় লুকানোর কিছুই নেই। এ সময় নারীর প্রয়োজন সহযোগিতা।”

যদিও কেউ কেউ এই বিজ্ঞাপন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।

দুর্জয় আহমদ রেজা বলেছেন, “এগুলা নির্লজ্জতা ছাড়া আর কিছুই না। এগুলা আমাদের মা-চাচিরা খুব সহজেই সুন্দরভাবে ম্যানেজ করতে পারেন। বাবাদের কাছে নির্লজ্জের মতো কিছু চাওয়া লাগত না কোনও মেয়েদের। অসভ্য পশ্চিমা সমাজ আমাদের সভ্যতা শেখাতে আসছে। আর আমরা ওদের অনুসরণ করতে করতে কখন যে নির্লজ্জ হয়ে গেছি বুঝতেই পারিনি।”

পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু ভেঙা কথা বলা হলেও ইফফাত আরা বিজ্ঞাপনটি নিয়ে মন্তব্য করেছেন, “...যতসব ফালতু জেনারেশনের মধ্যে আছি, কিছু কিছু জিনিস পারসোনাল থাকাটাই উত্তম...। মানুষের মধ্যের লজ্জাশরম সব উঠে যাচ্ছে দিন দিন...।”

তবে মেঘা মন্তব্য করে বলেছেন, তার প্রথম পিরিয়ড উদযাপন করেছিল পরিবার।

তিনি লিখেছেন, “আমার ফার্স্ট যেদিন পিরিয়ড হয়, সেই সময় আমার বাড়ির সবাই ওটাকে ফেস্টিভালের মত পালন করেছিল... সবাই মিষ্টি আমার পছন্দের জিনিসগুলো নিয়ে এসেছিল।”

প্রথম মাসিক উদযাপন করার এই ধারণায় প্রভাবিত হয়েছেন সেইভ দ্যা চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের ডেপুটি ম্যানেজার ওয়ারদা আশরাফ।

বিজ্ঞাপনটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার পাশাপাশি তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সাধারণত কোনো কিছু উদযাপন করার ক্ষেত্রে কেক কেটে থাকি।

”বিজ্ঞাপনটা দেখে আমিও ঠিক করে রেখেছি যে আমার মেয়ের প্রথম পিরিয়ডের সময় আমিও এইভাবে উদযাপন করব। বলা যায় বিজ্ঞাপনটা মনের উপর বেশ বড় রকমেরই প্রভাব রেখেছে।“

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক