আমার দেখা নয়াচীন: বঙ্গবন্ধু ঠিক যে জায়গায় অন্যরকম

নারী ও বর্ণবাদ নিয়ে  জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলা ভাষার প্রতি তার অনুরাগ তা স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে তরুণ মুজিবের লেখায়।  

>>মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 August 2020, 04:37 PM
Updated : 12 August 2020, 04:37 PM

‘আমার দেখা নয়াচীন’ ৪২ পৃষ্ঠায় তৎকালীন সময়ের তরুণ নেতা শেখ মুজিব লিখেছেন, 

আমেরিকা থেকে প্রায় ৩০ জন এসেছিলেন। তাদের নেতা ছিলেন একজন নিগ্রো। কেমন করে সাদা চামড়াওলারা নিগ্রোদের অত্যাচার করে তার কাহিনি প্রকাশ করলেন। তবে একজন সাদা চামড়া আমেরিকান এও বললেন, দেশের লোক আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে যে এটা কত বড় অন্যায়। নিগ্রো ছেলেমেয়েরা সাদা চামড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে মিশতে পারে না, এক স্কুলে পড়তে পারে না, বিবাহ তো দূরের কথা! চিন্তা করুন, স্বাধীন দুনিয়ার নেতার দেশের এই অবস্থা! তিনি দুনিয়ায় গণতন্ত্র কায়েম রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে কোরিয়ায় সৈন্য পাঠান, চিয়াং কাইশেককে সাহায্য দেন। ইরানে ইংরেজকে সাহায্য করেন।

বঙ্গবন্ধু হৃদয়ে সেই ১৯৫২সাল থেকেই বিশ্ব নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এজন্য কৃষ্ণাঙ্গদের সমস্যা নিয়ে লিখেছেন। কিভাবে শ্বেতাঙ্গরা তাদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে। গণতন্ত্র আমেরিকা মডেল যে, নিপীড়িত মানুষের জন্য না সেটা তিনি এখানে তুলে ধরেছেন সুস্পষ্টভাবে। যদিও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচার তার দেশের সমস্যা ছিল না। তবুও তিনি বিবেকের তাড়ণায় সে ব্যাপারটাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। এখানে তিনি একজন বিশ্ব নেতার মতোই আচরণ করেছেন। বর্ণবাদী আমেরিকায় নিজেদের মধ্যেই কোনও গণতন্ত্র ছিল না। শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি সেই সময় গণতন্ত্র তো দূরে থাক মারাত্মক অবিচার ও অমানবিক আচরণ করেছে। বঙ্গবন্ধু বিস্মিত ছিলেন এই ভেবে যে স্বাধীন বিশ্বের একজন নেতার দেশের কি করুণ অবস্থা!

যুক্তরাষ্ট্র কোনও সময়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্রটি দুর্নীতি পরায়ন ও সাম্রাজ্যবাদী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আধিপত্য বিস্তার করে তাদের সম্পদ লুটে নেওয়ায় আমেরিকার উদ্দেশ্য। যা এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অব্যাহত রয়েছে। আমেরিকার সাধারণ জনগণ যুদ্ধ চায় না। বেশির ভাগ জনগণই শান্তিপ্রিয় কিন্তু সরকার যুদ্ধবাজ সে কথা বঙ্গবন্ধুর লেখায় ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালেও আমরা প্রমাণ পেয়েছি আমেরিকার সাধারণ জনগণ গণহত্যা ও যুদ্ধ চায়নি। তারা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে কিন্তু তাদের সরকার অস্ত্র সরবরাহ করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে।

বর্ণবাদ আমেরিকার দীর্ঘদিনের সমস্যা। বারবার এর পুনরাবৃত্তি হয়েছে এখনও হচ্ছে। ১৯৯১ সালের মার্চের ৩ তারিখে আমরা দেখেছি রডনি কিংকে বর্ণবাদী পুলিশ দ্বারা নির্যাতিত হতে। আর দেখেছি বর্ণবাদী বিচার ব্যবস্থার নগ্ন বহির্প্রকাশ। রডনি কিংকে নির্যাতনকারী পুলিশরা আদালতে নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছিল। ২৫ মে ২০২০ জর্জ ফ্লয়েডকে রাজপথে পুলিশের নির্যাতনে জীবন দিতে হয়েছে। 

আমেরিকা আজ পর্যন্ত কোন কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি উপহার দিতে পারেনি। যাকে তারা কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রচার করে সেই বারাক হুসেইন ওবামা একজন কৃষ্ণাঙ্গ না, তিনি একজন আফ্রো-আমেরিকান। যার মা শ্বেতাঙ্গ এবং বাবা কৃষ্ণাঙ্গ অতএব তিনি কোন অবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। একজন পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ বা মুসলিমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করার মত মানসিকতা বা উদারতা এখনও আমেরিকানদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।

যতদূর জানি, বারাক হুসেইন ওবামা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটর হিসেবে কোরআন স্পর্শ করে শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সেটা পারেননি। তাকে রীতিমত বিবৃতি দিতে হয়েছে যে, তিনি একজন খৃস্টান ধর্মাবলম্বী, তার স্ত্রীও খ্রিস্টান। আর তিনি ছোট বেলা থেকে বড়দিন আর এসবের সাথে অভ্যস্ত। ওবামার এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট না, তিনি জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় ইন্দোনেশিয়াতে তার সৎপিতার দেশে কাটিয়েছেন। তার পিতাও একজন মুসলিম ছিলেন। অতএব তিনি ইসলামিক আচারের সাথেও পরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেবার পর তিনি তার ইসলামিক নামটা 'হুসেইন' আর সেইভাবে ব্যবহার করেননি। বারাক ওবামা একজন মানুষ তিনি কোন ধর্মের এটা আমার কাছে কোনও অর্থ বহন করে না। তবে এই আপস তার দুর্বল ব্যক্তিত্বের বহির্প্রকাশ করেছে, অন্তত এক্ষেত্রে। 

আমি হলফ করে বলতে পারি এরকম পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কোন আপস করতেন না। প্রয়োজনে তিনি রাষ্ট্রপতি হতেন না। মহাত্মা গান্ধী যদি আপস না করতেন, তাহলে ভগত সিংসহ কয়েকজন বিপ্লবীর জীবন রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি আপস করেছেন আর ভারতীয় এই বীরদের প্রাণ দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কোনদিন তার জীবনে এ জাতীয় কোন আপস করেননি।

‘আমার দেখা নয়াচীন’ এর ৪৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

মহিলাদের পক্ষ থেকে বেগম মাজহার এবং শওকত হায়াত খানের বোনও বক্তৃতা করলেন। চমকার বক্তৃতা করেন ভদ্র মহিলা। সকলেই মুগ্ধ হয়ে তার বক্তৃতা শুনলেন। 

বঙ্গবন্ধু পুরোপুরি নারী স্বাধীনতায় এবং নারীর সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। যার কারণে সংবিধানিকভাবে তিনি নারী এবং পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি নারীকে সম্মানও করতেন। যার কারণে যে দুইজন নারী প্রতিনিধি দলে ছিলেন তাদের কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি। শুধু উল্লেখই করেননি, একজন যে চমৎকার বক্তৃতা করেন সে প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি সকলেই তার বক্তব্য মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন সে কথাও উল্লেখ করেছেন।

অধিকাংশ পুরুষের মধ্যেই একটা প্রবণতা কাজ করে নারীদেরকে হেয় করার। তারা কোনও পাত্তাই দিতে চান না নারীদের। নারীরা যে কিছু করতে পারেন, তাদের মধ্যে এই বোধটা কাজ করে না। এসব পুরুষের মানসিকতা হল, 'আরে ধুর মেয়ে মানুষ কি করবে।' অথচ এই পুরুষগুলো একবার চিন্তাও করে না যে, তার মা একজন মহিলা, তার বোন একজন মহিলা, তার কন্যাও একজন মহিলা। বিয়ের আগে এরা হয়তো স্ত্রীর পিছনে কত ঘুর-ঘুর করেছে, প্রেম নিবেদন করেছে। তারপরে যেই বিয়ে হয়ে গেছে, তখন স্ত্রী মেয়ে-মানুষ হয়ে গেছেন। 

শেখ মুজিব একজন মানুষ ছিলেন, একজন নেতা ছিলেন, তিনিও ব্যক্তিগত জীবনে বাবা ছিলেন, স্বামী ছিলেন, সন্তান ছিলেন। এই অধ্যায়গুলো তিনি হৃদয় দিয়ে, মন-প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। যার কারণেই তিনি নারীকে সম্মান করতে পেরেছেন। তিনি তার সহধর্মিনীকেও সম্মান করতে পেরেছেন। আর সেই বিদূষী সহধর্মিণীর ভালবাসায়-সহযোগিতায় তিনি শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির জনক হয়ে উঠতে পেরেছেন।

একবার আমি বেলজিয়াম থেকে জার্মানিতে ফিরছি কোলনে এসে আমাকে ট্রেন পরিবর্তন করতে হলো। আমার আসন সংরক্ষিত ছিল। আমার আসনের সামনে দেখলাম এক শান্ত-স্নিগ্ধ যুবতী বসে আছে। সে ছিল মারাত্মক আকর্ষণীয়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি কি কিছু মনে করবে, আমি যদি এখানে বসি?" সে দ্রুত গুছিয়ে বসে আমাক জানাল, 'নিশ্চয়ই না'। 

অনেক কথা হলো তার সাথে সে যাত্রা। সে ছিল রাজনীতি ও সমাজ সচেতন। অনর্গল জার্মান ও ইংলিশে কথা বলতে পারতো। যত তার সাথে কথা হচ্ছিল তার বুদ্ধিমতার প্রেমে পড়ছিলাম। সে পড়াশোনা করছিল টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল বিষয়ে। একজন আরেক জনকে বিদায় জানানোর আগে টেলিফোন নম্বর এবং ঠিকানা আদান-প্রদান হল। তার নাম ফ্লোরেন্স। 

২০০০ সালে যখন স্লোভাকিয়া সফর করে নূর্ণবের্গ ফিরছিলাম তখন বাসে একঝাক যুবক-যুবতীর সাথে আলাপ হল। এর মধ্যে একটা মেয়ে ছিল খুব সুন্দরী। সে খুব ভাল বাস্কেট বল খেলতো। তার নাম ছিল ইভানা। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরের এক সপ্তাহান্তে সে আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছিল। তাকে নিমন্ত্রণ করেছিলাম এক অনুষ্ঠানে। আমার শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলাম। এছাড়াও বাকিদের অনেকের সাথেই দীর্ঘদিন আমার বন্ধুত্ব অটুট ছিল।  

তখন আমি সারা ইউরোপ প্রজাপ্রতির মত উড়ছি। একদিন মা আমাকে চিঠি দিলেন বিয়ে করা উচিৎ, কেমন মেয়ে আমার পছন্দ জানালে তিনি খুঁজবেন। এ জাতীয় কাজগুলো আব্বা করতেন না, তিনি ঝুঁকি নিতেন না। বকা খাবার ঝুঁকি থাকলে মাকে এগিয়ে দিতেন। আমি মাকে লিখলাম, "বিয়ের কন্যা তৈরি করার কারখানা আছে নাকি দেশে? যে আমি যেমন মেয়ে চাইবো তুমি তেমনটা নির্দেশ দিয়ে বানাবে। আমি মাকে কৌতুক করে লিখলাম ফ্লোরেন্সের মত বুদ্ধিমতী আর ইভানার মত সুন্দরী হলে মন্দ হয় না। কোনটার কমতি হলে চলবে না।" আর এটা মার জন্য সম্ভব ছিল না। 

মাকে আমি আরও লিখেছিলাম, "আমি শুধু কেমন মায়ে চাই জানলে হবে না, মেয়েটাও কেমন ছেলে চাই সেটা দেখতে হবে। তোমার পছন্দ করা মেয়ে আমাকে পছন্দ করবে তার নিশ্চয়তা কোথায়?"

উপরের কথাগুলো হয়তো প্রাসঙ্গিক না। লেখার কারণ হলো আমি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। তাদের সম্মান করতে পারি। তাদেরকে ‘মেয়েলোক’ মনে করি না। আর এসব কিছু সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসেছি বিধায়। আর কিছুটা হলেও বঙ্গবন্ধুকে জেনেছি, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকে। তার আগে আমি আমার বান্ধবীদের যে পরিমাণ জ্বালিয়েছি তাতে বাংলাদেশে থাকলে আমরা নামে ৫০টা 'ইভ টিজিং' এর মামলা হতে পারত। 

আমাদের প্রথম সন্তান কন্যা হয়েছে বলে আমি দ্বিতীয় সন্তানের কথা ভাবিনি কখনও। আমার চমৎকার দু'বোন ভাইয়ের অভাব বুঝতে দেয়নি কখনও। আমার আরেকটা বোন আছে সুইডেনে। তিনিও আমাকে অকৃত্রিম ভালবাসেন। সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখেন। যদিও তিনি আমার মায়ের পেটের বোন না। তার নামটা এখানে আমি উল্লেখ করতে পারছি না। আবার তার কথা না লিখেও থাকতে পারছি না।   

‘আমার দেখা নয়াচীন’ এর ৪৩-৪৪ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- 

আমি বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়, আর ভারত থেকে বক্তৃতা করলেন মনোজ বসু বাংলা ভাষায়। বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। 

দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি। 

পাকিস্তানের কেহই আমরা নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপার বক্তৃতায় বলি নাই। কারণ মুসলিম লীগ সরকারের আমলে দেশের যে দুরবস্থা হয়েছে তা প্রকাশ করলে দুনিয়ার লোকের কাছে আমরা ছোট হয়ে যাবো। অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, ভারত থেকে একজন বাংলায় বক্তৃতা করলেন, আর পাকিস্তান থেকেও একজন বক্তৃতা করলেন, ব্যাপার কী? আমি বললাম, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে একভাগ ভারত আর একভাগ পাকিস্তানে পড়েছে। বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ায় ‘ট্যাগোর' নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাকে করে। আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা। 

বঙ্গবন্ধু পুরো গ্রন্থে অত্যন্ত সততার পরিচয় দিয়েছেন। খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলোও তিনি এড়িয়ে যাননি। এবং কারোর কৃতিত্বকে তিনি গোপন করে যাননি। তিনি চাইলে একথা এড়িয়ে যেতে পারতেন যে ভারতীয় দলের মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।  

পরবর্তীতে তিনি লিখেছেন, 

আমাদের সভা চললো, বক্তৃতা আর শেষ হয় না । এত বক্তৃতা দেওয়ার একটা কারণ ছিল। প্রত্যেক দিন সভায় যে আলোচনা হয় এবং যারা বক্তৃতা করেন তাদের ফটো দিয়ে বুলেটিন বাহির হয়। এই লোভটা অনেকেই সংবরণ করতে পারেন নাই। আর আমার বক্তৃতা দেওয়া ছিল এই জন্য যে, বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিব। 

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন খাঁটি জাতীয়তাবাদী তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মাতৃভাষায় বক্তৃতা করা। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি একজন খাঁটি মুসলমান হয়েও আরবি ভাষা দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেননি জাতিসংঘে। কারণ তিনি সংবিধানের চার মূল নীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তিনি তার দেশের অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের কথাও চিন্তা করেছেন।

নি:সন্দেহে শেখ হাসিনা অনেক বৈশ্বিক নেতাদের চেয়ে দেশ পরিচালনায় অনেক দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৬৯তম অধিবেশন থেকে  আরবি ভাষা দিয়ে ভাষণ শুরু করেন। ৭০তম অধিবেশনের ভাষণটাও তিনি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানের রাহিম’ দিয়ে শুরু করেছেন। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দাবি করেছে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেবার জন্য। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী তার মাতৃভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার দাবি জানাচ্ছেন, তিনি তার ভাষণ শুরু করছেন আরবি ভাষায়। সেক্ষেত্রে তার দাবির যৌক্তিকতা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। 

কিন্তু ঠিক এই জায়গাটিতেই বঙ্গবন্ধু অন্যরকম। স্রেফ তার নিজের মতো, অনন্য। হয়তো কৌশলী নন, কিন্তু আপসহীন। 

সবথেকে বড় কথা জিয়া গংরা সংবিধানে আরবি শব্দ ব্যবহার করে আমাদের ভাষাকে অপমান করেছিল। অপমান করেছিল আমাদের পবিত্র সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে। বিভেদ সৃষ্টি করেছিল বাঙালি জাতির মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ঢুকিয়ে। আর অপমান করেছিল আমাদের ভাষা শহীদদের।

বর্তমান সময়ে সরকারের অনেক সিদ্ধান্তই বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শের সাথে মারাত্মক সাংঘর্ষিক। আমরা শুধু অর্থনীতির ক্ষত্রে কিছু উন্নতি করে জাতিকে মুক্ত করতে পারবো না। ৭ই মার্চের সেই আহ্বান অপূর্ণই থেকে যাবে। আমারা স্বাধীন হলেও মুক্তির সংগ্রামটা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। 

লেখক: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অল ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এবং জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক