নতুন একটি ‘এলিট’ শ্রেণি চাননি বঙ্গবন্ধু: রেহমান সোবহান

বাঙালির শোষণ মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত শেখ মুজিবুর রহমান যখন অবিসংবাদিত নেতা হওয়ার পথে, সেই সময় পাশে পেয়েছিলেন তরুণ অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানকে।

জাফর আহমেদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 March 2020, 04:37 PM
Updated : 20 March 2020, 03:22 PM

কেমব্রিজ থেকে অর্থনীতিতে এম এ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি বাঙালির ওপর অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে লেখালেখি থেকে তাকে চিনে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নেতার আস্থাভাজন।

সেই থেকে বাঙালির শোষণ মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত ছয় দফা, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন রেহমান সোবহান। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়তে নবগঠিত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য করা হয়েছিল তাকে।

দীর্ঘদিনের সাহচর্য থেকে ব্যক্তি শেখ মুজিব, নেতা শেখ মুজিব ও রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবকে কেমন দেখেছেন- মুজিববর্ষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ।

পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করা বাংলাদেশকে কীভাবে গড়তে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই ধারণা তিনি দিয়েছেন নেতারই একটি বক্তব্য তুলে ধরে।

“বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমি সেই বঞ্চিত মানুষটার জন্য সমাজ তৈরি করব। এটা আমার দায়িত্ব। সরকারের টাকা খরচ করে নতুন একটা এলিট শ্রেণি করতে আমি চাই না।”

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে তাকে ঘিরে রেহমান সোবহানের স্মৃতি-অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন উঠে আসে এই সাক্ষাৎকারে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার প্রথম সাক্ষাৎ কীভাবে হয়?

রেহমান সোবহান: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ আমার নানা খাজা নাজিম উদ্দিন সাহেবের বাসায়। তখন অনেক দিন পরে খাজা নাজিম উদ্দিন অনেক বছর পরে ঢাকায় আসলেন। ঢাকায় থাকবেন বলে চলে আসলেন। উনি তো অনেক বছর মুসলিমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তো ওনার বিরোধ ছিল। তখন প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি ছিল।

খাজা নাজিম উদ্দিন সাহেব বললেন, আমি অনেক দিন তো আমার দেশে ছিলাম না, পাকিস্তানে ছিলাম। আমি আমার জন্মস্থানে চলে এসেছি। তাই আমি এই দেশের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের আগ্রহ করলেন। এরপর তিনি বঙ্গবন্ধু ও আতাউর রহমান খানকে ডিনারের আমন্ত্রণ করেছেন।তখন আমার কোনও ঘর ছিল না বলে আমি আমার নানার সঙ্গে তার ঘরে থাকতাম।

আমার মনে আছে বঙ্গবন্ধু এবং আতাউর রহমান সাহেব ওই দিন তারা অফিসিয়াল বড় ফাংশনের মতো দামি শেরওয়ানি পোশাকে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু এসে ওনার (খাজা নাজিম উদ্দিন) সঙ্গে খুব ইজ্জত দিয়ে ব্যবহার করেছেন।

তখন বঙ্গবন্ধু আমার নানাকে বলেছেন, আপনি আমাদের বিরোধী ছিলেন। আপনি এসেছেন, আমরা আপনাকে সম্মান করি। আপনার জন্মভূমিতেই আপনি এসেছেন। আপনার কোনও সমস্যা হলে বলেন, আমরা আপনাকে সকল ধরনের সহযোগিতা করব।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল যে, যে কেউ উনার পক্ষের বা বিপক্ষের যেই রাজনীতিই করুক না কেন সবার সঙ্গে উনি অমায়িক ভদ্র ব্যবহার করতেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হল, মাওলানা ভাসানী আর পাকিস্তনের মিয়া ইফতেখার উদ্দিন মিলে যেদিন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) তৈরি করলেন সেদিন। ওই দিন আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের সঙ্গে মারামারি হল। এক পর্যায়ে মিয়া ইফতেখার উদ্দিনের হাঁটুতে লাঠির আঘাত লাগল।

এরপর মিয়া ইফতেখার উদ্দিন শাহবাগ হোটেলে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন আমি ওনাকে দেখতে যাই। ঠিক একই সময়ে বঙ্গবন্ধুও তাকে দেখতে এলেন। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, মিয়া সাহেব আপনি আমার দেশে এসেছেন। এখানে আপনার ওপর আক্রমণ হলো এটা আমার জন্য খুব লজ্জার ব্যাপার।এটা আমার কাছে কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ওই দিন বঙ্গবন্ধু একটু অবাক হলেন যে, আমাকে একদিন মুসলিম লীগের নেতার সঙ্গে ছিলাম। আজ আবার মৌলানা ভাসানীর পার্টির একজন নেতার সঙ্গে দেখলেন। একজনকে দুই জায়গায় দেখাতে ওনি একটু অবাক হলেন।

আমি দেখেছি বঙ্গবন্ধু তার বিরোধী যে-ই হোক সবার সঙ্গে ভদ্র আচরণ করতেন। বিরোধী কাউকে আক্রমণ কিম্বা গালি দিবেন এটা ওনার ছিল না। তিনি ভাবতেন পলিটিক্স ইজ পলিটিক্স। তার বিরোধী রাজনীতি যারা করতেন তাদের সঙ্গেও উনি সৌজন্য আচরণ ও ভদ্র ব্যবহার করেছেন।

বঙ্গবন্ধু খুব জোরে বা শক্তি দিয়ে কথা বলায় অভ্যস্ত ছিলেন, কিন্তু কোনও দিন উনি অভদ্রভাবে কথা বলেন নাই।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: দার্জিলিংয়ের সেন্ট পলস স্কুল, পাকিস্তানের লাহোর থেকে কলেজ এবং ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ পাশ করে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে কেন আগ্রহী হলেন?

রেহমান সোবহান: আমি যখন কেমব্রিজে ছিলাম তখন আমার ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশেই আমার ভবিষ্যৎ গড়ব। তখনতো সুযোগ অত বেশি ছিল না, আমি সরকারের অর্থনীতির কোনও প্রতিষ্ঠান যেমন প্ল্যানিং কশিনের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চেয়েছিলাম। ঢাকা ইউনিভর্সিটিও আমার ভাবনায় ছিল। তবে সুযোগ আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পেলাম। অক্টোবর ১৯৫৭ সালে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ওই সময়ের আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাদেশে বঞ্চনা শুরু করে দিয়েছে। তখন পরিস্থিতি কেমন ছিল?

রেহমান সোবহান: আমি যখন আসি তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। তখন হোসেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তবে ক্ষমতা ছিল সীমিত। তবে পূর্ব পাকিস্তান সরকার, পুরোপুরি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। আতাউর রহমান খান সাহেব মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আর বঙ্গবন্ধু শ্রম বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ছিলেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ছয় দফাকে বলা হয় স্বাধিকারের প্রথম পদক্ষেপ। এতে আপনি কীভাবে যুক্ত হলেন?

রেহমান সোবহান:  আসলে ছয় দফায় কেউ ওই ভাবে যুক্ত ছিল না। ছয় দফার মধ্যে চার দফা ছিল অর্থনীতি নিয়ে। তখন আমিসহ আরও অনেক অর্থনীতিবিদরা লেখালেখি করে যাচ্ছি। ওই সব লেখা থেকে ওই দফাগুলো ঢুকল।

তখন তো আমরা বয়স অত ছিল না, তখন আমার বয়স ২৫ বছর। আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ঢুকলাম তখন আমার বয়স ছিল ২২ বছর। কিন্তু তখনও কথা বলতে আমার কোনও অসুবিধা ছিল না। আমার অভ্যাস ছিল খবরের কাগজে আমি লিখতাম।

বিশেষ করে যখন মার্শাল ল’ জারি হয়ে গেল তখন জনসমাগমে বঙ্গবন্ধু কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু ওই সমস্যা আমার ছিল না। ওই মার্শাল ল‘র মধ্যেও আমি আমার ভাষণ দিয়ে যাচ্ছি। বৈষম্যের ওপরে ছয় দফাসহ আরও অন্যান্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে আমার লেখালেখি হচ্ছে। তখন আমার ওই সব লেখা রাজনীতিবিদদের নজরে আসল। বঙ্গবন্ধু লক্ষ করেছেন এসব লেখা।

আবার সোহরাওয়ার্দী সাহেব যখন ঢাকায় আসতেন তখন প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা হত। কারণ সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমার স্ত্রীর মামা ছিলেন।তিনি যখন মানিক মিয়ার বাসায় থাকতেন তখন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। ড. কামাল হোসেনের বাবা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ফিজিশিয়ান ছিলেন। ফিজিওথেরাপির জন্য ডেইলি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ড. কামালের বাবার বাসায়ও যেতাম। বঙ্গবন্ধুও তখন প্রায় সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে থাকতেন। ওই সময় প্রায়ই ওই ঘরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হত। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হয়ে গেল।

কিন্তু বিশেষ সম্পর্ক হল, আমার লেখা দেখে উনি আমার সঙ্গে অর্থনৈতিক অনেক ইস্যু নিয়ে কথা বলতেন। বঙ্গবন্ধু আমার কাছে জানতে চাইতেন অর্থনৈতিক বিষয়ে আমার মতামত।

১৯৬৪ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করার সময় তিনি আমাকে ডেকে ইশতেহারে যুক্ত করার জন্য কিছু আইডিয়া দিতে বলেছিলেন। উনার (বঙ্গবন্ধু) একটা অভ্যাস ছিল, অর্থনীতি বা অন্য কোনও বিষয় নিয়ে উনি যেটা বুঝতে সমস্যা হত তখন উনি সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ লোককে ডেকে বলতেন তুমি আমাকে এটা বুঝাও। তিনি বলতেন, আমিও শিখতে চাই। তাপরপর তর্ক-বিতর্ক হত। তিনি আমার মতে রাজি হলে তো ভালো, রাজি না হলেও কোনো অসুবিধা হত না। সকল বিষয়ে উনি আলোচনা করতেন। সবচেয়ে বড় উনার শেখার প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল। যে কোনও বিষয়ে প্রাসঙ্গিক লোককে ডেকে তার সঙ্গে বসে আলোচনা করতেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম:
এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধে আপনি কোথায় ছিলেন, তখন কোথায় কী করতেন?

রেহমান সোবহান: আমি তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যুদ্ধের আগেই অ্যাকটিভ ছিলাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে আমার সহকর্মী ড. কামাল হোসেন ওই ইশতেহার তৈরি করেছিলেন। এরপর নির্বাচনের পর ছয় দফাকে কীভাবে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত করা যায় সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অনেক আলোচনা হয়েছিল।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই দিনের মধ্যে পাকিস্তান আর্মি আমাকে খোঁজার জন্য আমার ঘরে আসল। কিন্তু সৌভাগ্য হচ্ছে তখন আমি ঘরের বাইরে ছিলাম। তারপর মার্চের শেষ দিকে আমি বর্ডার পাড়ি দিয়ে দিল্লি গেলাম। সেখানে ইন্ডিয়া সরকারের সঙ্গে আমার দেখা হল। আমার সুযোগ হল এখানে (ঢাকায়) কী ঘটছে তা ইন্ডিয়ার সরকারকে বোঝানোর।  ওখানে গিয়ে তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গেও আমার দেখা হয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: মুজিবনগর সরকার আপনাকে কোনও দায়িত্ব দিয়েছিল?

রেহমান সোবহান: দিল্লিতে যখন তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়, এরপর তিনি আমাকে মুজিব নগর সরকারের দূত হয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করার দায়িত্ব দিলেন। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের স্বীকৃতি কীভাবে আদায় করা যায় এবং পাকিস্তানের এইড কীভাবে বন্ধ করা যায় সে দায়িত্বও দেওয়া হল আমাকে।

এরপর প্রবাসী সরকারের সঙ্গে কাজ করি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্দোলন এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করানোসহ আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমি পালন করেছি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও আপনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন কী ছিল?

রেহমান সোবহান: বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন কিছুটা নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির সময় বোঝা গিয়েছিল। ওই সময়ে মূল ইস্যু ছিল আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা। ওই ইশতেহারে তা কেমন করে বাস্তবায়ন করা হবে তারও উল্লেখ ছিল। পরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওটা আমার জন্য যথেষ্ট নয়। দেশের ক্ষমতা যদি আমার হাতে আসে তাহলে আমি পাকিস্তানের মতো একটা ধনী শ্রেণি তৈরি করতে চাই না। ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন একটা সমাজ গড়াই তার দর্শন ছিল।

তিনি বলতেন, পাকিস্তান যেভাবে টাকা পয়সা ও নীতি সহায়তা দিয়ে এদেশে ২২ পরিবার তৈরি করেছে এটা আমি করব না। আমি মাঠের রাজনীতি করে এখানে এসেছি। বছরের পর বছর আমি মাঠে ঘুরেছি। আমি তৃতীয় শ্রেণির কম্পার্টমেন্টে যাই, আমি বাসে যাই, আমি রিকশায় যাই, আমি হেঁটে যাই, আমি নৌকায় যাই। এভাবে আমি সকল শ্রেণির লোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়, আমি সবার সঙ্গে কথা বলি। তারা কীভাবে কষ্ট পাচ্ছেন এই সমাজে, তার কী অসুবিধা আছে তার সব কিছুই আমার জানা আছে। সব কিছুই আমি দেখতে পাই।

বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমি সেই বঞ্চিত মানুষটার জন্য সমাজ তৈরি করব। এটা আমার দায়িত্ব। সরকারের টাকা খরচ করে নতুন একটা এলিট শ্রেণি করতে আমি চাই না।

এতে অবশ্য আমার গাইডলাইনও ছিল। এরপর স্বাধীনতার পরও আমার পক্ষ থেকে একই গাইডলাইন ছিল।এরপরও সমাজ উন্নয়নে তার চিন্তা তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও আছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ নিয়ে ধনীদের সুবিধা দিয়েছিলেন বলে সমালোচনা রয়েছে, সে বিষয়ে আপনার মত কী?

রেহমান সোবহান: দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে দেশের সব বড় বড় ব্যবসা অবাঙ্গালীর হাতে ছিল। স্বাধীন হওয়ার পর অবাঙ্গালীরা চলে গেল।তখন সব ফাঁকা হয়ে যায়। তখন প্রথম কাজ হচ্ছে এসব কারখানাতো চালাতে হবে। তখন আইন করে এসব কারখানা হাতে নেওয়া হয়।তারপর এসব বড় বড় কারখানা সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষকে চালানোর জন্য দেওয়া হয়। কিছু প্রশাসনের মানুষকেও বসানো হয়েছিল। তখন ধনী শ্রেণির পাওয়ার বিষয়টা আসে না। কারণ তখন ধনী লোক তেমন একটা ছিলই না। তবে চিনি ও সিমেন্ট বিতরণের পারমিটের জন্য দলীয় কিছু লোকের চাপ ছিল। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দিতে হয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কেন বাকশাল করলেন? এর পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল?

রেহমান সোবহান: আসলে এটা আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না। তখন একদলীয়ভাবে বাকশাল করা প্রয়োজন ছিল বলে আমারও মনে হয়নি। ওই সময়ে এমনিতেই পুরো ক্ষমতা উনার হাতেই ছিল। তখন আওয়ামী লীগের অপজিশন হিসেবে তো কিছু ছিল না। জাসদ একটা ছিল, ওটাও আসলে অত শক্তিশালী ছিল না। আর আওয়ামী লীগের মধ্যেও তো তেমন সমস্যা ছিল না, যেখানে বঙ্গবন্ধু আছেন। অনেক কিছুর ক্ষমতা উনার হাতে ছিল।

উনার ইচ্ছা ছিল একটা কিছু করতে চান এখানে। উনার ক্ষমতা ছিল উনি করতেও পারতেন। মাঝে মাঝে তিনি বলতেন, পুরনো সিস্টেমকে পরিবর্তন করে নতুন কিছু করতে চান। তবে এটার কোনও কারণ ছিল না। এ বিষয়ে আমার থিসিস আছে, এখানে ডিটেইলস বলার সময় নাই।

আমি মনে করি, উনি যে এই পথে চলে গেলেন এটার দরকার ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু অন্য যেসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ ছিল ওগুলো ভালোই ছিল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় তিনি কোন কোন দেশের সহযোগিতা পেয়েছিলেন?

রেহমান সোবহান: শুরু থেকেই তো আমাদের সহায়তার দরকার ছিল। কারণ পুরো অর্থনীতি ওই সময়ে ধস ও অচল ছিল। এরপর ভারত থেকে এক কোটি শরণার্থীকে নিয়ে আসা যাদের ঘর-বাড়ি পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে। আবার পুরো এক বছর মাঠে কোনও ফসল হয় নাই। তবে ৭২,৭৩ সালে এটাকে ভালো করেই সামাল দিয়েছেন তিনি।

তবে সমস্যাটি হল ১৯৭৪ সালে, ওই বছর তিনটা সংকট একসাথে চলে আসল।

প্রথমটা হল, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া। ইসরায়েল-আরবের যুদ্ধে পড়ে হঠাৎ তেলের পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেল। এর ফলে সকল পরিকল্পনা কাজ না করাতে অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেল।

দ্বিতীয়ত, ওই বছরের বন্যা। ওই বন্যাটা অনেক বড় হওয়ায় ওই বছরের ফসল মার খেল।

তৃতীয়ত, আমেরিকার রাজনৈতিক খেলা। বঙ্গবন্ধু যে সমাজতন্ত্রের পথে যাচ্ছেন, এটা আমেরিকার অপছন্দ ছিল। আরও অপছন্দ ছিল সোভিয়েত আর ভারতের সমর্থনে আমরা যুদ্ধে জয়লাভ করেছি। আর পাকিস্তানকে আমেরিকা সহযোগিতা করেও তারা পরাজিত হয়েছে। এসব কারণে আমাদের ওপর আমেরিকার ক্ষোভ ছিল। আসলে ওই কারণেই আমেরিকা চাপ দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়ে খাদ্য সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিল।

আর তারা কারণ হিসেবে বলেছিল, আমরা কিউবার সঙ্গে পাটের ব্যবসা করছি। যদিও খুব সামান্য একটা বিষয় ছিল। অথচ ওই সময়ে মিশরও কিউবার সঙ্গে ব্যবসা করলেও মিশরের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি আমেরিকা। শুধু আমাদের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ নিল। তার মানে তার উদ্দেশ্য অন্য ছিল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বঙ্গবন্ধু কেমন অর্থনীতি চেয়েছিলেন?

রেহমান সোবহান: ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই বঙ্গবন্ধু এদেশের অর্থনীতি গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সহায়তা কার্যকর করা। কৃষকদের তেভাগা সিস্টেমের মধ্যে ভর্তুকি দেওয়া। তারপর কো-অপারেটিভ করে যার যেটা অভাব আছে অর্থাৎ সার, বীজ, পানি দিয়ে সহযোগিতা পেতে পারেন। তারপরে সে যখন বাজারে বিক্রি করতে যাবেন তখন শক্তিশালী হয়ে বিক্রি করতে পারবেন। এভাবেই অর্থনীতি চালানোর ইচ্ছা ছিল উনার।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম:
বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন থাকত বা কোন দেশের পর্যায়ে থাকত?

রেহমান সোবহান: এটা তো বলা মুশকিল। এখন তো পুরো পৃথিবী বদল হয়ে গেছে। এখন অনেক বাজার অর্থনীতির চর্চা চলছে। সব জায়গায় এখন বড় বড় ব্যবসায়ীরা ক্ষমতা দখল করছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখন ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে। এসব প্রেক্ষিতে উনি কেমন করে রেসপন্স করতেন এটা তো বলা মুশকিল।

আর সরাসরি কোনো দেশের সঙ্গে সোজাসুজি তুলনা করা যায় না। বিশেষ দেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন থাইল্যান্ড এক পথে গেছে। সাউথ কোরিয়া আরেক পথে চলে গেছে। এখন চীন আরও অনেক দূর চলে গেছে। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে উন্নতি করছে। তাই সরাসরি তুলনা করতে গেলে সমস্যা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপনি সময় কাটিয়েছেন, কাজ করেছেন। তার সঙ্গে আপনার একটা স্মৃতি পাঠকের জন্য বলেন।

রেহমান সোবহান: তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে কীভাবে মিশে গেছেন, তা নিয়ে আমার একটা স্মৃতি আছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রচারণায় উনি যখন মাঠে যেতেন আমি মাঝে মাঝে তার সঙ্গে চলে যেতাম। এক ইলেকশন ক্যাম্পেইনে যাচ্ছি যেখানে তাজউদ্দীন সাহেব আহমেদুল কবিরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বঙ্গবন্ধু ঘোড়াশালের একটি স্কুল মাঠে জনসভায় যাচ্ছেন। আদমজীনগর হয়ে নৌকা নিয়ে আমরা ঘোড়াশাল যাব। তখন বামপন্থিরা বলত, বঙ্গবন্ধু ব্যবসায়ী পক্ষের লোক। উনার শ্রমিকদের সমর্থন নেই।

কিন্তু আমরা প্রথমে যখন আদমজীনগর গেলাম ওখানে দেখলাম প্রায় এক লাখ শ্রমিক চারদিকে জমা হয়ে গেল। আর শ্রমিকরা বলতে লাগল- বঙ্গবন্ধুর জন্য আমরা জান দিতে রাজি আছি। এটা আমার নিজের চোখে দেখলাম।

তারপর যখন নদীতে নৌকায় উঠলাম তখন দেখতে পেলাম আদমজীনগর থেকে ঘোড়াশাল পর্যন্ত নদীর দুই পাশে আমি দেখেছি শুধু মানুষ আর মানুষ, কোনো ফাঁক নাই। এর মধ্যে জোয়ান, বুড়ো, বাচ্চা, মহিলা সকল বয়সের মানুষ দেখছি।

তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, এত মানুষ আমাকে ভালোবাসে, আমার উপর ভরসা রাখছে, আমি কি তাদের এর প্রতিদান দিতে পারব? তাদের জন্য কিছু করতে পারব? তাদের জন্য যা যা স্বপ্ন দেখি তা কি বাস্তবায়ন করতে পারব?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক