বাচ্চার খাবার সমাচার

‘আমার বাচ্চা একদমই খেতে চায় না’, ‘কিছুদিন ধরে কিছু খাচ্ছে না আমার ছেলে’— প্রায় সব মায়ের এমন অভিযোগ থাকেই। শিশুর এই ‘না খাওয়া’টা মায়ের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। আবার শিশুর চিকিৎসকও যখন এই বিষয়টা খুব একটা আমলে নেয় না, তখন মায়ের জন্য সেটা হয়ে যায় অসহায়ত্বের বিষয়। এই দুশ্চিন্তা কি তাহলে অহেতুক? অভিযোগ অমূলক? এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ আসফিয়া আজিম।

>>বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Sept 2013, 02:00 AM
Updated : 29 Sept 2013, 02:00 AM

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটাশিশুই আলাদা আর তাদের খাবারের চাহিদাও ভিন্ন। এমনকি একথাও বলা হয়ে থাকে,দিনভেদেএকই শিশুর খাবারের প্রতিচাহিদা বা আগ্রহের রকমফের ঘটে। মাঝেমধ্যে শিশু কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই তার জন্য বরাদ্দ খাবার খেয়েফেলে। আবার অন্যদিন হয়তো একদমই খেতে চায় না। এতে মা-বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েন। আশংকাবোধ করেন শিশুর এই ‘না খাওয়া’টাহয়তো তার স্বাভাবিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত করছে।

আসলে শিশুর এই খেতে নাচাওয়াটা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। বাচ্চাদের খাওয়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতেডব্লিউএইচও'র ‘ইনফ্যান্টঅ্যান্ড ইয়াং চাইল্ড ফিডিং’সহ বেশ কিছু চাইল্ড কেয়ার গাইডলাইনবা দিকনির্দেশনা দিয়েছে।তারা বলছে—

১.শিশু বসতে শেখার পরপরই তাকেনিজে নিজে খাবার খেতে অভ্যস্ত করে তুলুন। বিভিন্ন খাবারের রং, ধরন, গন্ধ শেখারপাশাপাশি হরেক রকম খাবার ধরতে ও খেতে শেখার মাধ্যমে শিশু খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়েউঠবে।

২.শিশুকে কখনও জোর করে কিংবা বকা দিয়ে বা মারধর করেখাওয়ানো যাবে না। উৎসাহ দিয়ে, প্রশংসা করে শিশুকে খাওয়াতেহবে। মনে রাখতে হবে, কোনোকোনো সময় শিশুর বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে আসে, অথবা শিশু মাঝেমধ্যে খেলাধুলা কমিয়ে দেয়(inactive থাকে)।সেসব সময় শিশুর খাবারেরচাহিদাও কমে আসে।

৩.শিশুকে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার ও রাতের মূল খাবারেরমাঝে দুবার হালকা নাস্তা দেওয়া প্রয়োজন। তবে লক্ষ রাখতে হবে, নাস্তা যেন খুব ভারি না হয়। মূল খাবারের কাছাকাছিসময়ে যেন শিশুকে নাস্তা দেওয়া না হয়। ভারি নাস্তা বা মূল খাবারের অল্প আগে কোনো খাবার খেলেস্বাভাবিকভাবেই শিশুর ক্ষুধাভাব কমে যাবে।

৪.অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকএকই পরিমাণ নাস্তা ওমূল খাবার শিশুকে দিয়ে থাকেন। যা শিশুর শরীরে ক্ষুধামন্দা তৈরি করে।তাই নাস্তার পরিমাণ কম ও মূল খাবারের পরিমাণ বেশিদেওয়া কতর্ব্য।

৫.শিশুর পছন্দকে গুরুত্ব দিতেহবে। পাশাপাশি তার খাবারে বৈচিত্র্য আনতে হবে। যেমন শিশুকে বলা যেতে পারে,‘আপেল নাকি আম কোনটা খেতেচাও?’

শিশু যেটা খেতে চাইবে সেটাইতাকে দিতে হবে।

৬.শিশুকে ফলের রস বা জুস নাখাইয়ে আস্ত ফলখাওয়ান। খুব বেশি পরিমাণে তরল খাওয়ালে শিশুর পেট ভরে যাবে। তবে পুষ্টির চাহিদাতে ঘাটতি দেখা দেবে।

৭.শিশুকে চকলেট, পিটস, জুস—ধরনের খাবার যত কম দেওয়াযায় ততই ভালো। এসবে মিষ্টিজাতীয় উপাদান বেশি থাকে বলে শিশুর ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়ে যায় এবংমূল খাবারের প্রতি আগ্রহহারিয়ে ফেলে।

৮.বিভিন্ন ধরনের খাবার শিশুকে দিন।একই ধরনের খাবার বারবারনা খাইয়ে খাবারে বৈচিত্র্য আনা জরুরি।

৯.শিশুকে তার খাওয়ার সময় বেধেদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে। ওই সময়ের মধ্যে শিশু তার বরাদ্দ পরিমাণ খাবার শেষ করতেনা পারলে জোর করবেন না। শিশুকে আধাঘণ্টার বেশি সময় ধরে খাওয়ালে শিশুর মধ্যে অরুচিতৈরি হয় ও হজমে ব্যাঘাত ঘটে।

১০.টেলিভিশন দেখতে দেখতে শিশুকেখাওয়ানো যাবে না। পরিবারের সবাই একত্রে বসে শিশুকে সঙ্গে নিয়ে খেলে খাওয়ার প্রতিআগ্রহী হয়ে উঠবে সে।

শিশুর বৃদ্ধির গতি স্বাভাবিক কি নাবোঝার উপায়

শিশুর বুদ্ধি ও বিকাশ ঠিকমতোহচ্ছে কি না বা তার শরীরে পুষ্টির সরবরাহ যথেষ্ট কি না তা বোঝার সহজ উপায় হল, শিশুর গড়ওজন লক্ষ করা। জন্ম থেকে ২ বছরবয়স পর্যন্ত শিশুরওজন বাড়ার পরিমাণ যদি হয় নিচের তালিকাটির মতো, তবে শিশুর বৃদ্ধির গতি নিয়ে চিহ্নিতহওয়ারকিছু নেই।

শিশুর প্রতিমাসে ওজনবৃদ্ধির হার

জন্ম থেকে ৬ মাস : ওজনবাড়বে ৬০০-৮০০ গ্রাম করে।

৭-১২ মাস : ওজন বাড়বে ৩০০-৪০০গ্রাম করে।

১৩-২৪ মাস : ওজন বাড়বে১৫০-২০০ গ্রাম করে।

তবে শিশুর বয়স ২ বছর পার হলে ওজন বৃদ্ধির এই গতি কিছুটাধীর হয়ে আসে। ২ থেকে৫ বছরের শিশুর ওজনের তালিকা:

২৫-৩৬ মাস : ১১.৭-১৪.৫কেজি।

৩৭-৪৮ মাস : ১৪-১৬.৩ কেজি।

৪৯-৬০ মাস : ১৬.৩-১৮.৩কেজি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই ওজন তালিকা ধরে আপনার শিশু বেড়েওঠে, সে যদি হাসিখুশি, সজীব ও প্রাণবন্ত থাকে, ঘন ঘন অসুখে আক্রান্ত না হয়, তবে শিশুর খাওয়া দাওয়া নিয়ে মা-বাবারউদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক