প্রক্রিয়াজাত সুপের ক্ষতিকর প্রভাব

টিন কিংবা প্যাকেট-জাত সুপ বাড়াতে পারে স্থূলতা ও রক্তচাপ।

লাইফস্টাইল ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2021, 06:29 AM
Updated : 8 Feb 2021, 06:30 AM

শিশু থেকে বৃদ্ধ যেই হোক, আবহাওয়া পরিবর্তনের সময়ে মৌসুমি সর্দি জ্বরে আক্রান্ত হলে এক বাটি গরম সুপ কপালে জুটবেই। চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে সবার আগে সুপ খাওয়া যেন সংস্কৃতিরই অংশ। আবার বিভিন্ন ধরনের সুপ খেতে পছন্দ করা মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

রেস্তোরাঁয় খেলে ভিন্ন কথা, তবে ঘরে তিনবেলার রান্নার পর আবার সুপ বানানোর ঝক্কি নিতে মন নাই চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে খুব সহজ উপায় হল কৌটা কিংবা প্যাকেটজাত ‘রেডি-মেইড’ সুপ।

অনেকে পরিবারে অসুস্থ মানুষের সামনেও অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে পরিবশন করা হয় এই সুপ। তবে সমস্যা হলো অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো তালিকায় প্রথম সারিতেই জায়গা করে নেয় এই তৈরি সুপ।

স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন অবলম্বনে জানানো হলো কৌটা ও প্যাকেটজাত সুপ খাওয়া ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে। 

পেট ফোলাভাব: পেট ফুলে থাকা তেমন মারাত্মক কোনো সমস্যা না হলেও তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি অনুভূতি। অতিরিক্ত লবণ আছে এমন খাবার খাওয়ার সাধারণ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হল পেট ফোলাভাব। আর কৌটা ও প্যাকেটজাত সুপে প্রচুর লবণ থাকে।

সাধারণ মাপের এক বাটি সুপে থাকতে পারে ৬০০ থেকে ৭০০ মি.লি. গ্রাম লবণ।

সোডিয়াম খাওয়া থেকে পেট ফোলাভাব হওয়া নির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পানি ধরে রাখার প্রবণতাই এর পেছনে দায়ী। খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত সোডিয়াম থাকলে পেট ফোলাভাব অনুভূতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে প্রায় ২৭ শতাংশ, দাবি বিশেষজ্ঞদের।

স্থূলতা: ‘রেডি-মেইড’ সুপে থাকা অতিরিক্ত লবণ এবং ফলশ্রুতিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম ওজন বৃদ্ধিতেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। বিশেষত শরীরের মধ্যবর্তী অংশ যেখান থেকে মেদ কমানো সব চাইতে কঠিন সেখানেই মেদ জমায় এই সোডিয়াম।

আবার গবেষণা বলে সোডিয়াম বেশি খাওয়ার কারণে চিনি মিশ্রিত খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে, যা ওজন বেড়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ। তবে শুধু সোডিয়ামই যথেষ্ট শরীরের ওজনকে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

২০১৫ সালে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে একটি গবেষণা করা হয় যাতে অংশ নেয় মোট ১০০০ হাজার শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। পর্যবেক্ষণে রাখা হয় চার দিনের খাদ্যাভ্যাস আর তাতে সোডিয়ামের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করা মূত্র। দেখা যায়, শুধু অতিরিক্ত লবণ খাওয়াই শরীরের ওজন অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে যাওয়া ঝুঁকি বাড়িয়ে ‍দিতে পারে ২৫ শতাংশ।

উচ্চ রক্তচাপ: এখানেও থলের বিড়াল ওই সোডিয়াম।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পুষ্টিবিদ এবং ‘হেলথ উইনস কোচিং অ্যান্ড কনসাল্টিং’য়ের কর্ণধার জেনা মোরার বলেন, “সাধারণ এক কৌটা সুপে সোডিয়াম থাকে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৮০০ মি.লি. গ্রাম। অনেক সুপে আরও বেশি থাকে। যদি আপনি অর্ধেকটাও খান তবুও নুন্যতম ৭০০ মি.লি. গ্রাম সোডিয়াম গ্রহণ করছেন।”

আমেরিকার হার্ট অ্যাসোসিয়েশন’য়ের নির্দেশনা মতে, যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের দৈনিক সোডিয়াম বা লবণ গ্রহণের মাত্রা ১৫০০ মি.লি. গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আর প্রাপ্তবয়স্ক একজন সুস্থ মানুষের সোডিয়াম প্রয়োজন ২৩০০ মি.লি. গ্রাম।

এখন দৈনিক চাহিদার প্রায় অর্ধেকটাই পূরণ হয়ে গেল মাত্র একবাটি সুপ খেয়েই। সারাদিন আরও অনেক ধরনের খাবার আপনি খেয়েছেন, আরও খাওয়া হবে। এভাবে গড় হিসেবে একজন আমেরিকান নাগরিক প্রায় ৩৬০০ মি.লি. গ্রাম সোডিয়াম গ্রহণ করে ফেলেন।

ফলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে মারাত্মক হারে। আর উচ্চ রক্তচাপ ক্রমে বয়ে আনে হৃদরোগ, স্ট্রোক, বৃক্ক নষ্ট ও দৃষ্টিশক্তি কমার সমস্যা।

মোরার আরও বলেন, “কিছু বিশেষ ধরনের কৌটাজাত সুপের ক্যালরি ও ‘স্যাচুরেইটেড ফ্যাট’য়ের মাত্রাও বেশি থাকে, যা ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। খাদ্যাভ্যাসে ‘স্যাচুরেইটেড ফ্যাট’ বেশি হলে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (এলডিএল)’য়ের একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন উপাদান ‘এপিওবি’য়ের মাত্রা বাড়ে। এজন্য ক্রিমজাতীয় সুপ যতটা কম খাওয়া যায় ততই ভালো।”

হরমন সমস্যা: অনেক কৌটাজাত সুপে ব্যবহার হয় সোডিয়াম ফসফেট, যার কাজ হল সুপকে দীর্ঘ দিন খাওয়ার যোগ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা এবং এর স্বাদ বাড়ানো।

ফসফেট আমাদের খাদ্যাভ্যাসের একটি প্রয়োজনীয় অংশ। তবে প্রাকৃতিক ফসফেটের বাইরে যেকোনো ফসফেট শরীরে ‘এন্ডোক্রাইন সিস্টেম’ যা শরীরের হরমোন উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর পরিণতি হিসেবে ‘টিস্যু’ নষ্ট হয় যা ডেকে আনে হৃদরোগ, বৃক্কের ক্ষয়, হাড়ের ভঙ্গুরতা ইত্যাদি।

কাজ কমাতে গিয়ে ‘রেডি-মেইড’ সুপকে বেছে নেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে একথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাই প্যাকেট কিংবা কৌটাজাত সুপ খাওয়া কমাতে হবে, বাদ দিতে পারলে সবচাইতে ভালো। ঘরেই সুপ তৈরি করুন, প্রয়োজনে বেশি করে রান্না করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক