যারা বিজয় দেখেনি

নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে ঘুরে আসা যায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশসামরিক জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, স্বাধীনতা জাদুঘর,এবং শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর থেকে।

শান্তা মারিয়াবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Dec 2015, 08:05 AM
Updated : 16 Dec 2015, 08:05 AM

ছোট্ট মেয়ে ত্রপা। ঢাকার একটি নামকরা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। একদিন ওর বাবা-মা ওকে নিয়ে গেলেন সেগুনবাগিচায় ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে’। ত্রপা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে স্কুলে কিছু কিছু পড়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গিয়ে ও রীতিমতো অবাক। ও দেখেছে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য ছবি, যোদ্ধাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পাকিস্তানি সৈন্য আর রাজাকারদের অপরাধের বিভিন্ন দলিল। জাদুঘরের বিভিন্ন ঘরে রাখা শহীদদের ইতিহাস আর তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে ও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে যখন জানতে পেরেছে শিশুহত্যার বিভিন্ন ঘটনার কথা| বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের কষ্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, বীরশ্রেষ্ঠদের কথা, ছবি, রাজাকার আলবদরদের অপরাধ এসব কিছু সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছে ত্রপা।

ত্রপার মতো নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার দায়িত্ব বাবা-মায়ের। ডিসেম্বর মাসের এই দিনগুলোতে অনেকের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। অনেকেরই পরীক্ষা শেষ অথবা দু’য়েক দিনের মধ্যেই শেষ হবে। এই সময় ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরে আসা যায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশসামরিক জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, স্বাধীনতা জাদুঘর,এবং শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর থেকে।

বিজয় দিবসে কিংবা যে কোনো ছুটির দিনে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ কিংবা সাভার স্মৃতিসৌধেও চলে যেতে পারেন|

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানাটা কেবল শিশুকিশোরদের নয়, বড়দের জন্যও প্রয়োজন। যারা বিজয় দেখেনি এমন প্রজন্মের যদি ফিরে যেতে হয় যুদ্ধের দিনগুলোতে তাহলে জাদুঘরে যাওয়ার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম জাদুঘর হল ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। সেগুনবাগিচায় অবস্থিত এ জাদুঘর সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। এখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় দেড় হাজার স্মারক।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আলোকচিত্র, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, সে সময়ের পত্রপত্রিকার কপি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্র, বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কিত খবর ইত্যাদি অনেক স্মারক রয়েছে।

শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিশেষ গ্যালারি। এখানে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক রয়েছে। জাতীয় জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্যালারিতে দুর্লভ অনেক আলোকচিত্র যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে শহীদদের করোটি, তাদের ব্যবহৃত পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালিদের উপর নির্যাতন চালাতে কিছু ভয়াবহ যন্ত্র ব্যবহার করত, সেগুলোও রয়েছে এখানে।

পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের সময় যে টেবিলটি ব্যবহার করা হয় সেটিও এখানে রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনাপঞ্জী ও তালিকার মাধ্যমে এখানে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাস সংক্ষেপে জানার ব্যবস্থা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, তার প্রতিকৃতি, সেক্টর কমান্ডার ও বীরশ্রেষ্ঠদের প্রতিকৃতিও রয়েছে এখানে।

ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ অবস্থিত। এখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার নেতৃত্ব ও অবদান, তার ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী এবং পনেরোই অগাস্টের শোকাবহ ঘটনার বিবরণ রয়েছে| ১৯৯৪ সালে এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়।

বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর বিজয় সরণিতে অবস্থিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জাদুঘরটি। এখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্ব, বীরশ্রেষ্ঠদের ভূমিকা, পোশাক, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের যোদ্ধাদের ব্যবহৃত ব্যাজ, পোশাক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, কামান, অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট গান এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহন রয়েছে। ১৯৮৭ সালে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বাধীনতা জাদুঘর ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভের নিচে ভূগর্ভে অবস্থিত। এই সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন আর এখানেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

স্বাধীনতা জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরে এমন তিনশ’রও বেশি আলোকচিত্র রয়েছে। আরও আছে ৭১ সালের বিভিন্ন পত্রিকা ও অন্যান্য স্মারক। চলতি বছর ২৫শে মার্চ এই জাদুঘর সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

মীরপুরে রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং মোহাম্মদপুরে ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধের পাশে রয়েছে রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসের ঘাতকরা এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্থাপন করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ।

সন্তানদের নিয়ে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ দেখে আসারও এখনি সেরা সময়। জাদুঘর এবং স্মৃতিসৌধগুলো দেখার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের নাগরিকরা যেমন আমাদের গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে তেমনি দেশকে ভালোবাসার শিক্ষাও পাবে।

ছবি: আব্দুল মান্নান।