স্বাধীনতার সূর্য ডোবার দিন

তাহসান আহমেদ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর আমবাগানে ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধ হল নবাব সিরাজুদ্দৌলার সঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। যুদ্ধে পরাজিত হন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা। ভারতবর্ষে সূচনা হয় ইংরেজ শাসনের। আর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ডোবে একইসঙ্গে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 July 2013, 08:48 AM
Updated : 23 July 2013, 08:51 AM

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পলাশীর আমবাগানে ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধ হল নবাব সিরাজুদ্দৌলার সঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। যুদ্ধে পরাজিত হন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা। ভারতবর্ষে সূচনা হয় ইংরেজ শাসনের। আর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ডোবে একইসঙ্গে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ দেশে এসেছিল ব্যবসা করার উদ্দেশে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা শক্তি সঞ্চয় করছিল দেশের শাসনক্ষমতা পাওয়ার জন্য।

১৭৫৭ সাল। তখন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাববের নাম সিরাজুদ্দৌলা। আর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দায়িত্বে কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। ক্লাইভ গোপনে গোপনে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মীরজাফরও ক্লাইভের সঙ্গে হাত মেলায় নবাবকে পরাস্ত করার জন্য। 

এভাবে দিন এগিয়ে চলল। ১৭৫৭ সালের ১২ জুন। কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে এসে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কিছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলি, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ও পলাশিতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্তে¡ও কেউ ইংরেজদের পথরোধ করল না। নবাব তখন বুঝতে পারলেন, তার সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল।

নবাব সিরাজুদ্দৌলা তখন তার সেনাপতিদের নিয়ে শপথ করলেন। পবিত্র কোরআন শরীফ স্পর্শ করে সবাই অঙ্গীকার করলেন, শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও বাংলার স্বাধীনতাকে রক্ষা করবেন সবাই। তারপর মীরজাফর, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মোহনলাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁকে নিয়ে মীরজাফর গেলেন যুদ্ধের ময়দানে।

২৩ জুন সকাল থেকেই পলাশির প্রান্তরে ইংরেজ আর নবাববাহিনী মুখোমুখি। আগের দিনেই রবার্ট ক্লাইভ কলকাতা থেকে তার বাহিনী নিয়ে পলাশির আমবাগানে এসে তাঁবু গেড়েছে। বাগানের উত্তর-পশ্চিমে গঙ্গানদী। আর নদীর তীর ধরে উত্তর-পূর্বে দুই বর্গমাইল এলাকা নিয়ে আমবাগান।  সকাল ৮টার সময় হঠাৎ করেই মীরমদন ইংরেজবাহিনীকে আক্রমণ করে। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেয়। এদিকে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারা একটু এগিয়ে এলেই সেদিন রবার্ট ক্লাইভ পরাজিত হত। কিন্তু কেউ এল না। দুপুরের দিকে বৃষ্টি হলে নবাবের বাহিনীর গোলা-বারুদ বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। তারপরও মীরমদন, মোহনলাল আর সিনফ্রেঁ তাদের সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন। হঠাৎ করে গোলার আঘাতে মীরমদন নিহত হন।

মীরমদন ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান। তিনি মারা যাওয়ার পর নবাব মীরজাফর আর রায়দুর্লভকে নির্দেশ দেন তাদের বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যেতে। কিন্তু সেনাপতিরা নবাবকে পাল্টা যুক্তি দেখান যে, গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্য ছাড়া এগিয়ে যাওয়া আর আত্মঘাতী হওয়া একই ব্যাপার। অথচ তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর নবাবের বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব মাত্র কয়েকশ’ গজ। বিকেল ৫টায় সিরাজুদ্দৌলার বাহিনী নির্দেশনার অভাবে থেমে যায়। ওদিকে ইংরেজ গোলন্দাজবাহিনী ঠিকই আরও এগিয়ে আসে। শেষে বাধ্য হয়ে নবাবের বাহিনী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে পরাজয় মেনে নেয়। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে।

নবাব সিরাজুদ্দৌলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে রাজধানী চলে আসেন। তার ইচ্ছা ছিল, আবার সৈন্য সংগ্রহ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পরাজিত করবেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের কারণে নবাবের সে ইচ্ছা আর বাস্তবায়িত হয়নি। আর সে জন্যই বাংলার স্বাধীনতার সূর্যও ডুবে যায় প্রায় ২০০ বছরের জন্য। এরপর আবারও আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি ব্রিটিশদের কাছ থেকেই। কিন্তু, সে অন্য এক গল্প। আরেকদিন না হয় শোনাব তোমাদের।

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/তাহসান/সাগর/আরএস/জুন ২৩/১৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক