লেভ তলস্তয়-এর গল্প

>> সামিন ইয়াসার অথইবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Oct 2014, 03:25 PM
Updated : 8 Oct 2014, 03:27 PM
কাক ও কলসি

এক কাকের খুব জলপিপাসা পেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে আঙিনায় সে একটি জলের কলসি দেখতে পেল। কিন্তু তাতে জল ছিল একেবারে তলায়। কাক তার নাগাল পেল না কিছুতেই। তখন সে কলসির মধ্যে ছোট ছোট নুড়ি পাথর ফেলতে লাগল, যতক্ষণ পর্যন্ত না জল কলসির কানা পর্যন্ত উঠে আসে। তখন সহজেই সে জলপান করে তার তৃষ্ণা মেটাল।

সিংহ ও শেয়াল

সিংহ এত বুড়ো হয়েছে যে সে আর নিজের শিকার ধরতে পারে না। তাই সে মনে মনে এক ফন্দি আঁটল। সে এক গুহার মধ্যে গিয়ে অসুস্থ হয়েছে এমন ভান করে পড়ে রইল। জন্তুরা সকলে এসে তার খোঁজখবর নিতে লাগল। কিন্তু যারাই ঐ গুহার মধ্যে গেল সিংহ তাদের সকলকে ধরে খেয়ে ফেলতে লাগল। শেয়াল কিন্তু বুঝল সবই। তাই সে একদিন গুহার কাছে এসে গুহার বাইরে থেকে সিংহকে সিজ্ঞাসা করল:

‘ওহে সিংহ কেমন আছ?’

সিংহ বলল, ‘ভালো না। কিন্তু তুমি কেন ভেতরে আসছ না?’

তখন শেয়াল বলল, ‘ভেতরে যাচ্ছি না কারণ পায়ের দাগ দেখে বুঝতে পারছি, ভেতরে যাবার পথ অনেক কিন্তু বাইরে আসার পথ নেই।’

খরগোশ ও কচ্ছপ

একবার এক খরগোশ ও কচ্ছপের মধ্যে তর্ক হলো কে কাকে দৌড়ে হারাতে পারে। তারা ঠিক করল এক মাইল পথ দৌড়াবে। খরগোশ সহজেই কচ্ছপেই অনেক অনেক পিছনে ফেলে সোজা দৌড়াল। কচ্ছপকে আর দেখা যায় না। তখন খরগোশ মনে মনে ভাবল, ‘এত তাড়া কিসের? একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক না।’ এই না ভেবে সে সেখানে বসল ও ঘুমিয়ে পড়ল। এদিকে কচ্ছপ কিন্তু থপ্থপ করে চলেছে তো চলেছে। খরগোশের ঘুম যখন ভাঙল সে দেখল কচ্ছপ ইতিমধ্যেই সমস্ত পথ পেরিয়ে গেছে।

কর্মী মৌমাছি ও পুরুষ মৌমাছি

গরম পড়লে পুরুষ মৌমাছিরা কর্মী মৌমাছিদের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করল মধু খাওয়া নিয়ে। মৌমাছিরা বোলতাকে ডাকল তাদের ঝগড়ার মীমাংসার জন্য।

কিন্তু বোলতা বলল, ‘আমি এক্ষুনি তোমাদের বিচার করতে পারি না কেন না আমি জানি না তোমাদের মধ্যে মধু তৈরি করছে কে? কর্মী ও পুরুষ তোমরা দুটো আলাদা খালি চাকে যাও। এক সপ্তাহ পরে আমি দেখব কারা ভালো ও বেশি মধু তৈরি করেছে।’

কিন্তু পুরুষ মৌমাছিরা রাজি হলো না, তারা বলল, ‘তুমি এখনই বিচার করে রায় দাও।’

‘ঠিক আছে, বলল বোলতা, ‘পুরুষেরা তোমরা আমার প্রস্তাবে রাজি হলে না কেন না তোমরা মধু তৈরি কর না, কেবল অন্যেরটা খাও। কর্মী মৌমাছি তোমরা এদের তাড়িয়ে দাও।’

তখন কর্মী মৌমাছিরাও তাই করল।

সিংহ, গাধা ও শেয়াল

সিংহ, গাধা ও শেয়াল খাবার খুঁজতে শিকারে বের হলো। সারাদিনে তারা অনেক জন্তু শিকার করল। তখন সিংহ গাধাকে ভাগ করতে বলল। গাধা সমান তিনটি অংশে ভাগ করে বলল, ‘এস সকলে!’

কিন্তু সিংহ এতে খুব রেগে গেল, গাধাকে খেয়ে ফেলে শেয়ালকে বলল ফের ভাগ করতে। শেয়াল নিজের ভাগে সামান্য কিছু রেখে সবই সিংহকে দিয়ে দিল। সিংহ তাই দেখে খুশি হয়ে বলল, বাঃ! বুদ্ধি আছে, কে তোমাকে এমন সুন্দর ভাগ করতে শেখাল?’

সে উত্তর দিল, ‘গাধার কি হলো তা যে আমি নিজেই দেখলাম।’

বাদুড়

অনেক অনেক দিন আগে পাখি ও জন্তুদের মধ্যে একবার ঘোরতর লড়াই বাধে। বাদুড় এদিকেও গেল না, ওদিকেও গেল না, দেখতে লাগল করা জিতছে।

প্রথমে পাখিরা জিততে শুরু করলে তাদের দলে যোগ দিয়ে নিজেকে পাখি বলতে লাগল ও পাখিদের সাথে উড়তে লাগল। পরে জন্তুদের যখন জয়ী হতে দেখা গেল সে তখন তাদের কাছে গেল এবং তার দাঁত ও থাবা দেখিয়ে তাদের আ¯^স্ত করতে চাইল যে সে আসলে জন্তু ও জন্তুদের পছন্দ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাখিরাই জয়ী হলো। বাদুড় তখন আবার তাদের কাছে ফিরে গেল কিন্তু তারা তাকে তাড়িয়ে দিল।

জন্তুদের কাছেও তার ফেরা সম্ভব হলো না। সেই থেকে বাদুড় থাকে কুঠরিতে বা গাছের কোটরে। উড়ে বেড়ায় কেবল সন্ধ্যার পর। তারা না যায় পাখির দলে, না যায় জন্তুর দলে।

শেয়াল ও নেকড়ে

এক শেয়াল একবার এক নেকড়ের তার দাঁতে ধার দিতে দেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওহে নেকড়ে, লড়াই-এর জন্য আর কেউ নেই ; তবু তুমি তোমার দাঁত শানাচ্ছ কেন ?’

নেকড়ে বলল, ‘যতক্ষণ লড়াই করার মতো কেউ নেই ততক্ষণ আমি আমার দাঁত শানিয়ে রাখছি কেন না লড়াই এর সময় তা শানাবার আর আমার একটুও সময় থাকবে না।’

দুই বন্ধু

একবার দুই বন্ধু জঙ্গলে বেড়াচ্ছিল। এমন সময় এক ভাল্লুক এসে তাদের আক্রমণ করল। একজন দৌড়ে পালিয়ে এক গাছে চড়ে লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু অন্যজন কিছু করতে না পেরে মাটিতে মরার ভান করে পড়ে রইল।

ভাল্লুক তার কাছে এসে তাকে শুঁকতে লাগল। সে তার নিশ্বাসও বন্ধ করে রইল। ভাল্লুক তার মুখ শুঁকে তাকে মরা মনে করে চলে গেল। ভাল্লুক চলে গেলে অন্য বন্ধু গাছ থেকে নেমে হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাল্লুক তোমার কানে কানে কি বলল?’

‘ভাল্লুক বলল বিপদের সময় যারা বন্ধুকে ফেলে পালায় তারা মোটেও ভালো লোক নয়।’

নেকড়ে ও শুয়োর

এক মাদী নেকড়ে একবার এক শুয়োরকে রাতটা তাকে থাকতে দেবার জন্য বলল। শুয়োর রাজি হলো। কিন্তু নেকড়ের কয়েক ছানা হলো। তাই শুয়োর নেকড়েকে ফিরে যেতে বলল। নেকড়ে তখন বলল, ‘তুমি কেবল নিজেরটাই ভাবছ, দেখছ না ছানাগুলো কত ছোট? একটু অপেক্ষা কর।’

শুয়োর ভাবল, ‘ঠিক আছে একটু সবুর করা যাক।’

এদিকে গ্রীষ্ম চলে গেল। শূয়োর তখন আবার নেকড়েকে যাবার কথা বলল। আর নেকড়ে অমনি বলে উঠল, ‘তোমার এত বড় সাহস? দেখছ না আমরা ছ’জন আছি, সবাই মিলে তোমাকে ফালা ফালা করে ফেলব।’

ব্যাঙদের ‘রাজা’ চাই

একবার ব্যাঙদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হলো। কেউ-ই আর তার মীমাংসা করতে পারে না। তখন তারা ভাগবানকে গিয়ে বলল, ‘আমাদের একজন রাজা দাও।’ এমন সময় হঠাৎ তাদের সরোবরের নিকটবর্তী এক গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ল ঐ সরোবরে।

‘এই আমাদের রাজা, বলে ছুটে গেল ব্যাঙরা।

ডালটি কাদায় মাখামাখি হয়ে সেখানে চুপচাপ পড়ে রইল। ব্যাঙরা সাহস পেয়ৈ ঐ ডালে সাঁতার কেটে তাতে লাফালাফি শুরু করে দিল। কিন্তু ব্যাঙরা দেখল যে তাদের শান্ত রাজা তাদের কিছুই বলছে না। তখন তারা আবার অন্য রাজার জন্য প্রার্থন্র করতে লাগল।

এমন সময় এক বক সেই সরোবরের উপর দিয়ে উড়ছিল এবং সে সেখানে নামল। ব্যাঙরা খুব খুশি হয়ে বলতে লাগল, ‘দেখ, দেখ আমাদের আসল রাজা এসেছেন, এবার যিনি আমাদের সমস্ত কলহের নিষ্পত্তি করে দেবেন।’

কিন্তু বক যখন একটা একটা করে ব্যাঙ ধরে খেতে লাগল তখন তারা বুঝল আগের সেই শান্ত ও সাদামাটা রাজাই ছিল ভালো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক