পাথর হাসে খিলখিলিয়ে

কয়েকদিন থেকেই রমিজের এক অদ্ভুত কাণ্ড লক্ষ করছি সবাই। সবসময় কেবল হাসে। কথা বলার সময় পানের খিলি মুখে নিয়ে চিবানোর মতো জাবর কাটতে কাটতে হাসে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 July 2013, 09:43 AM
Updated : 27 July 2013, 09:46 AM

কয়েকদিন থেকেই রমিজের এক অদ্ভুত কাণ্ড লক্ষ করছি সবাই। সবসময় কেবল হাসে। কথা বলার সময় পানের খিলি মুখে নিয়ে চিবানোর মতো জাবর কাটতে কাটতে হাসে। এমনকি ক্লাসে কোনো স্যার প্রশ্ন করলেও দাঁত কেলিয়ে হাসে। যেন হাসির কোনো পেতনি এসে ওর উপর ভর করেছে। কোনো মেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে এক-দেড় বছরের বাচ্চার মতো ফোকলা হাসি দেয়। আবার কোনো মেয়ে ওর এই পাগলামো হাসি দেখে ঝামটা মারলেও, হাঁসের মতো প্যাঁকপ্যাঁক করে হাসে।

ওর এই দম ফাটানো হাসির ফুলঝুরি দেখতে দেখতে চয়ন আর আমি ধৈর্যের বাঁধ সামলাতে পারলাম না। ক্লাসে ঢোকার আগে রমিজের কাঁধে একটা ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করলাম, “এই শালা! তোর কী হয়েছে রে? কদিন ধরে খ্যাঁকশিয়ালের মতো খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসছিস?”
জবাবে সেই দাঁত কেলানো হাসি! চয়ন তো রীতিমতো রেগে আগুন। ডান হাতে রমিজের পিঠে কষে একটা কিল দিল। ওম্মা! তাতেও দেখি ছাগলের কোনো পরিবর্তন নেই। নিউটনের তৃতীয় সূত্র দেখি ভুল প্রমাণ করতে চলেছে। একটা এক কেজি ওজনের কিল খাওয়ার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই!
হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। আমিও রমিজের সঙ্গে হোহো করে হাসতে থাকলাম। ওর চেয়েও জোরে জোরে। একেই বলে পেতনি নামানোর খাঁটি ওষুধ। একেবারে মঈন মিয়ার কপাল কামড়ানো মলমের মতো কাজ হল। আমাকে ওর চেয়েও জোরে হাসতে দেখে রমিজের পেতনি মার্কা হাসি হঠাৎ করে থেমে গেল। আমিও হাসি থামিয়ে প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা, বল তো, তোর এই পেতনি পেতনি হাসির রহস্যটা কী?”
এই সেরেছে! শালা দেখি আবার হাসতে আরম্ভ করল। না, ঠিকই আছে। ওষুধের রেশ আছে তো! হাসতেই হাসতেই রমিজ বলল, “শোন সাগর। রহস্যটা হল-- পাথর হাসে খিলখিলিয়ে। হো হো হো হোয়া হোয়া!”
হাসির কবল থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে উল্টো হাসির বান ডেকে আনলাম। রমিজের সঙ্গে হোহো করে হাসতে হাসতে চয়নকে বললাম, “একি! ও কোথাও হাসির বায়না নিয়েছে নাকি? নাকি কোনো সিনেমায় কমেডিয়ানের বায়না নিয়েছে?”
মিনিট পাঁচেক চলল তিন জনের হাসির বান। তারপর বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে বললাম, “পাথর হাসে খিলখিলিয়ে-- এর মানে কী?”
“মানে হল-- পাথর হাসে খিলখিলিয়ে! হো হো হো--”
আবার শুরু করল। ওর পেটও কি ব্যথা হয় না? বডবডি মেশিনের মতো একটানা হেসেই যাচ্ছে।

চয়ন বলল, “রহস্য তো আরও বেড়ে গেল। আর পাথরই বা খিলখিলিয়ে হাসবে কেন? পাথর তোর মতো বত্রিশ দেঁতো নাকি? কী হয়েছে, ঠিক করে খুলে বল আমাদের। নইলে এক চটকানা দিয়ে কচু  ক্ষেতে ফেলব। তখন গা চুলকাতে চুলকাতে টের পাবি হাসির সের কত!”
“পরে বলব।”
“পরে বলবি? এখন কী সমস্যা?”
“না, কোনো সমস্যা নেই।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। পরে কখন বলবি?”
“রানা স্যারের ক্লাসে।”
রানা স্যারের ক্লাসে! আমাদের দুজনের চারটি চোখ হুতোমপেঁচার মতো বড়বড় হয়ে গেল। সর্বনাশ! ক্লাসে বলবে? তাও আবার রানা স্যারের! তার ক্লাসে এক লাইন কথা বলতে গেলেই আমাদের বুক সাহারা মরুভূমির মত খাঁখাঁ করে। আর ও কিনা রানা স্যারের ক্লাসে খিলখিলিয়ে পাথর হাসার রহস্য খুলে বলতে চায়!
আমি ঠোঁট জোড়া উল্টে বললাম, “ঠিক আছে, দেখি। তুই রানা স্যারের ক্লাসে কীভাবে পাথর খিলখিলিয়ে হাসাস।”
এই রানা স্যারের কাহিনি কিছু বলে রাখি। স্যার হলেন প্রচণ্ড রাগী মানুষ। স্যারের বাসার সামনের ফুলবাগান থেকে একটি গাঁদা ফুল চুরি হলেও ক্লাসের সবাইকে কানমলা দেন। কোথাকার ফুল চোরের জন্য ক্লাসের সবাইকে স্যারের কান মলা খেতে হয়!
আর ক্লাসে স্যার যেসব প্রশ্ন করেন, কার সাধ্যি সেগুলোর উত্তর দেয়। পড়ান বাংলা ব্যাকরণ। এত কঠিন করে পড়ান! বাংলাদেশে বাস করে, বাংলা ভাষায় কথা বলেও যদি বাংলা ভাষা এত কঠিন লাগে, তাহলে আর পড়বটা কী?
একদিন স্যার আমাকে প্রশ্ন করলেন, “সাগর, বলো তো, পতপত করে পতাকা ওড়ে। এখানে পতপত কোন ধরনের শব্দ?”
আমি চটপট জবাব দিলাম, “স্যার পতাকা ওড়ার শব্দ।”
অমনি স্যার পাগলা মশার মতো ছুঁটে এসে আমার ডান কানে একটা রামমলা দিয়ে বললেন, “এবার বল তো, কানমলার শব্দ কী?”
আমার চোখমুখ কেমন জ্বলে উঠল। তারপরও আমি বললাম, “স্যার, কানমলার শব্দ মটমট।”
এরপর থেকে আমি আর রানা স্যারের ক্লাসে টু-শব্দ পর্যন্ত করি না। পড়া না পারলে তো করিই না, পড়া পারলেও না।
ক্লাসে এসে অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করলাম-- কখন রমিজের খিলখিলিয়ে পাথর হাসার রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।
স্যার আজ ক্লাসে ঢুকেই পড়া ধরতে শুরু করলেন। চেহারাতেও কেমন রাগের ফুলকি ছুটছে। বোধহয় কারও সঙ্গে তর্কাতর্কি করে হেরে গেছেন। স্যারের এই আরেক দোষ। তর্ক করে হেরে গেলেও ক্লাসে এসে আমাদের পেটাবেন। স্বপনের চোখে চোখ রেখেই প্রশ্ন করলেন, “এই বল তো, লাঙ্গলের আধুনিক বানান কী?

স্বপন একটা ঢোক গিলে বলল, “স্যার, লাঙ্গল তো আধুনিক জিনিস নয়। আধুনিক কালে চাষিরা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করে। তাহলে লাঙ্গলের আধুনিক বানান হবে কীভাবে?”
অমনি স্যার স্বপনের কান ধরে হ্যাঁচকা একটা টান মারলেন, “তাই নাকি? তাহলে তোর বাপ এখনও লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে ক্যান? একটা পাওয়ার টিলার কিনে দিতে পারিস না?”
এবার স্বপনের দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে রমিজের উপর ফেললেন। আমি আর চয়ন বসেছি পাশাপাশি। রমিজের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নড়েচড়ে উঠলাম। দেখি ও কেমন করে খিলখিলিয়ে পাথর হাসায়।
স্যার বললেন, “এই গাধা! কোনো দিন তো পড়া পারিস না। বল তো, প্রস্তর কোন শব্দের সংস্কৃত রূপ?”
একি! শালা সত্যিই তো পাগল হয়ে গেছে! স্যার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তারপরও হোহো করে হাসতে হাসতে বলল, “স্যার, পাথর হাসে খিলখিলিয়ে।”
রমিজের কথা শুনে স্যার হুংকার ছাড়লেন, “চোপ!”
স্যারের ধমকে পুরো ক্লাসটা নিশুতি রাতের মতো নীরব হয়ে গেল। তার মধ্যে হঠাৎ রমিজ হেসে উঠল, “হো হো হো... পাথর হাসে খিলখিলিয়ে!”
এবার স্যার চট করে রমিজের কানের নিচে একটা থাপ্পড় কষে দিল। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম, “স্যার, ও আপনাকে একটা গল্প বলতে চায়।”
“গল্প?”
“জি স্যার, হো হো...”
“গল্প বলবি? তা ঘোড়ার মতো হাসছিস ক্যান? বল, কী গল্প বলবি।”

আরও একটা হাসি দিয়ে শুরু করল রমিজ, “অনেক অনেক আগের কথা। এক গ্রামে জল্লাদের মতো এক লোক ছিল। লোকটার ছিল ভীষণ রাগ, ভীষণ সাহস। কেউ তার সঙ্গে তর্ক করলেই এক কিল বসিয়ে দিত। দশ-বারো জন তার কাছে কিছুই না। এক কিলেই গাছ থেকে পড়া পাকা তালের মতো থ্যাঁতলা করে দিত মাথা। তার সামনে কোনো পাগল এসে ফকফক করে হাসলেও তার মুখে এক ফোঁটা হাসিও দেখা যেত না। এ জন্য গ্রামের লোক তাকে পাথর বলে ডাকত। 
“একদিন ঘটল এক বিরাট ঘটনা। পাশের গ্রামের কজন নাকি তাকে কালটু-পাথর বলে ক্ষেপিয়েছে। তাদের সঙ্গে মারামারি করে বাড়ি ফিরছিল। একজনের নাক ফাটিয়ে দিয়েছে। একজনের মুখমণ্ডলে আলুর স্ত‚প বানিয়েছে। যদিও কেউ বিশ্বাস করে না, একজনের নাকি পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।
“যার নাক ফাটিয়ে দিয়েছে গড়গড় করে রক্ত পড়ছে। তিন-চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, তবু রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। ওই গ্রামের সবাই থানায় পাথরের নামে মামলা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপরও তার রাগ কমেনি। রাগে গজগজ করতে করতে চলে আসল বাড়ির কাছাকাছি।

“বাড়ির মধ্যে ঢুকবে, এমন সময় দেখতে পেল, একটা এক-দেড় বছরের বাচ্চা গাছের নিচে পড়ে আছে। পাথর তার কাছে এগিয়ে গেল। চারপাশে একবার তাকাল। আশপাশে কেউ নেই। বাচ্চাটা তার দিকে তাকিয়ে শুরু করল ফোকলা দাঁতে হাঁসি। কী যে অফুরন্ত হাসি! তা বর্ণনা করার মতো ভাষাও কারও জানা নেই। লোকটার খুব রাগ হল। অমনি বাচ্চাটার কান ধরে একটা টান মারল।
“লোকটা ভেবেছিল বাচ্চাটা এতে হাসি থামিয়ে কান্না শুরু করবে। কিন্তু একি! বাচ্চার হাসি আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। কাণ্ড দেখে তো পাথর থ! বাচ্চার সঙ্গে সে-ও শুরু করে দিল হাসতে। সে কী হাসি! সারাজীবনের জমে থাকা হাসিগুলো যেন এক সঙ্গে বের হয়ে আসছে। পাথরের মুখে হাসি শুনে একে একে গ্রামের সব মানুষ এসে হাজির। সবার মুখে একই কথা-- পাথর হাসে খিলখিলিয়ে!”
রমিজের কথা শেষ হতেই ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠে বললাম, “পাথর হাসে খিলিখিলিয়ে। হা হা হা।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক