৫ মিনিট নিশ্চুপ বিশ্ব

তোমরা হয়ত অনেকেই পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে শুনেছ বা পড়েছ। তোমরা হয়ত এটাও লক্ষ করেছ, আমরা বইপত্রে যে ৬টি ঋতুর কথা পড়ি-- তা আর আলাদা করে টের পাওয়া যায় না। আমরা শুধু শীত, গ্রীষ্ম আর বর্ষা-- এই তিন ঋতুর দেখা পাই। সারাবিশ্বের মানুষ নানাভাবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছে।

>> মাকসুদা আজীজবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 August 2014, 09:07 AM
Updated : 4 August 2014, 09:07 AM

কৃষকরা দাবি করে, তারা সঠিক সময় বৃষ্টি পায় না, পরিবেশবিদরা দাবি করে, পৃথিবীর দুই প্রান্তে জমে থাকা বরফ গলে যাচ্ছে। এতে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে। এই অতিরিক্ত পানি সমুদ্র আর ধরে রাখতে পারবে না। ফলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

এত সব সমস্যা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধানরা ১৯৯২ সালে একটা সমাধানে আসতে চাইলেন। এ বছর যেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হল, সেই ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও শহরে তারা বসলেন একটি সম্মেলনে। উদ্দেশ্য, কীভাবে পৃথিবীকে এই নিশ্চিত ধ্বংসের থেকে রক্ষা করা যায়। বড় বড় সব মানুষেরা যখন আলোচনায় ব্যস্ত, তখন তাদের অবাক করে দিয়ে কানাডা থেকে পাঁচ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ১২ বছরের একটি মেয়ে এল ওই সভায় ভাষণ দিতে।

মেয়েটির নাম সেভেরন সুজুকি। সুজুকি তার মতো বারো তের বছরের শিশুদের নিয়ে The Environmental Children's Organisation সংক্ষেপে ECO নামে একটি সংগঠন গড়েছিল।  তারা বুঝতে পারছিল ধনী দেশগুলো আরও ধনী হওয়ার কাজে এত ব্যস্ত যে তারা মোটেই পরিবেশ বা অন্যদের নিয়ে ভাবছিল না। তাই ECO-র পক্ষ থেকে সুজুকি চলে আসে সেইসব নেতাদের কাছে তার মনের কথাগুলো বলতে। সেই ভাষণের জন্য সুজুকিকে ইতিহাসে ‘The girl who silenced the world for 5 minutes’ বলা হয়।   
সুজুকি এসেই প্রথমে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে, আমি এবং আমার সংগঠনের শিশুরা টাকা সংগ্রহ করে এতদূর পাড়ি দিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। আমরা এসেছি শুধু এটা বলতে, তোমরা পৃথিবীকে রক্ষা করার পরিকল্পনাটা ঠিক করো। তোমাদের কাছে আসার জন্য কোনো রকম চালাকি আমার নেই। আমি শুধু আমার ভবিষ্যতটা নিশ্চিত করতে এসেছি।
ভবিষ্যতের জন্য আমার যুদ্ধ তোমাদের নির্বাচনে বা শেয়ার বাজারে হেরে যাওয়ার মতো ছোট বিষয় নয়। আমি একটা প্রজন্মের কথা বলতে এসেছি, যারা এই পৃথিবীতে আসবে। আমি আমার আশপাশে অনাহারে মরতে বসা শিশুদের পক্ষ থেকে বলতে এসেছি। তাদের পক্ষ থেকে বলতে এসেছি, যাদের কান্না তোমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। আমি সেই অগণিত প্রাণীর পক্ষ থেকে বলতে এসেছি, যারা প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। তাদের বাঁচার শেষ অশ্রয়টিও আর অবশিষ্ট নেই।
আমি এখন রোদে বের হতে ভয় পাই, শুনেছি ওজন স্তর ফুটো হয়ে গেছে। বাতাসে শ্বাস নিতে আমার ভয় লাগে। আমি জানি না সেখানে কী রাসায়নিক পদার্থ আছে। ভ্যানকোভার, যেখানে আমি থাকি, আমার বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে যাই। বছরখানেক ধরে দেখছি, মাছের গায়ে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। এখন আমরা প্রতিদিনই শুনছি, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণী ও গাছের কথা-- তারা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। আমি স্বপ্ন দেখি বন্য পশুর বড় দল দেখার, জঙ্গল দেখার, পাখি আর প্রজাপতিতে ভরা একটা রেইনফরেস্ট দেখার। এখন আমি ভাবি, আমার বাচ্চারা এগুলো কি কোনোদিনও দেখবে? ততদিন কি এগুলো অবশিষ্ট থাকবে? তোমরা যখন আমার বয়সী ছিলে, তোমাদের কি এসব ছোট ছোট জিনিশ নিয়ে চিন্তা করতে হত? এসব আমাদের চোখের সামনেই হচ্ছে আর আমরা ভান করছি যে আমাদের যদি যথেষ্ট সময় থাকত আমরা তা সমাধান করতাম। আমি একটা বাচ্চা মেয়ে আমার কাছে হয়ত কোনো সমাধান নেই। আমি শুধু চাই তোমরা অন্তত সমস্যাগুলো বুঝার চেষ্টা কর, তোমরা কি এতটুকুও করবে না?
আমি জানি না ওজনস্তরের ফুটোকে কীভাবে বন্ধ করতে হয়। আমি জানি না স্যামনমাছকে কীভাবে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হয়। আমি জানি না বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সেই প্রাণীগুলোকে কীভাবে  ফিরিয়ে আনতে হয়, কীভাবে মরুভূমি হয়ে যাওয়া একটা বনকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়। তোমরাও যদি তা না জান, তবে দয়া করে সেগুলো আর নষ্ট করো না।
এখানে তুমি হয়ত তোমার দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছ, ব্যবসায়ীদের পক্ষে, সরকারের পক্ষে, সংগঠনের পক্ষে, সাংবাদিকদের পক্ষে, রাজনীতিকদের পক্ষে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তুমি কারও বাবা, কারও মা, কারও ভাই বা বোন, কারও চাচা বা ফুফু-- তোমরা সবাই কারও না কারও সন্তান। আমি এখনও একজন বাচ্চা মেয়ে, তাও আমি জানি, আমরা সবাই আসলে একই পরিবারের সদস্য। পাঁচ বিলিয়ন মানুষের, তিরিশ বিলিওন প্রজাতির একটি পরিবার। আমরা একই বাতাস-পানি-মাটির অংশীদার। সীমান্ত বা সরকার দিয়ে এটা ভাগ করা যাবে না। আমি এখনও শুধুই একটা বাচ্চা তাও আমি জানি, আমরা একটা বৃহৎ পরিবারের অংশ। আমাদের একটি পৃথিবীর মতো আচরণ করা উচিত। একটি লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

আমার দেশে আমরা অনেক অপচয় করি। আমরা কিনি এবং ছুড়ে ফেলে দেই; আবার কিনি আবার ফেলে দেই-- তবুও আমরা দক্ষিণের অভাবী দেশগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেই না। আমাদের কাছে প্রয়োজনের থেকে অনেক বেশিই আছে, তবুও আমরা তাদের ভাগ দিতে ভয় পাই। ভয় পাই, দিলে আমরা বুঝি গরিব হয়ে যাব। কানাডাতে আমরা একটা খুব আরামের জীবনযাপন করি। আমাদের যথেষ্ট খাবার আছে, পানি আছে, আশ্রয় আছে, ঘড়ি, বাইসাইকেল, কম্পিউটার, টিভি-- এত সব জিনিস আছে যে বলতে গেলে আমার দুদিন লেগে যাবে।

দুদিন আগে ব্রাজিলের পথশিশুদের সঙ্গে যখন আমরা সময় কাটাচ্ছিলাম আমরা খুব অবাক হয়ে শুনলাম একটা গরিব পথশিশু বলছে, “আমি যদি ধনী হতে পারি, তবে সব গরিব বাচ্চাকে খাবার, আশ্রয়, জামা, ভালোবাসা সব দেব।”

একটা গরিব পথশিশু, যার কাছে কিছুই নেই, সেও সবার সঙ্গে তার সবকিছু ভাগ করে নিতে চাচ্ছে। তাহলে সবকিছু থাকার পরও তোমরা কেন এত লোভী?

আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না, সেই পথশিশুগুলো আমার বয়সী। শুধুমাত্র কোথায় তুমি জন্ম নেবে, তা তোমার জীবনের কত বড় ব্যবধান তৈরি করে। আমি রিও-র পথশিশুদের একজন হতে পারতাম, আমি সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষপীড়িত শিশু হতে পারতাম, আমি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বলি হতে পারতাম অথবা ভারতের একজন ভিক্ষুক হতে পারতাম। আমি এখনও শিশু; তবুও আমি জানি যুদ্ধ করতে যে টাকা নষ্ট হয়, তা দিয়ে সব গরিবকে বাঁচান যেত। আর যদি প্রকৃতির কথা ভাব, পৃথিবীটা কতই না সুন্দর হত।

স্কুলে, এমনকি কিন্ডারগার্টেনেও আমাদের পৃথিবীতে কেমন ব্যবহার করতে হবে তা শেখানো হয়। তোমরাই আমাদের শেখাও কারও সঙ্গে মারামারি না করতে, অন্যকে সম্মান করতে, আবর্জনা পরিস্কার করতে, আঘাত না করতে, সবার সঙ্গে ভাগাভগি করে চলতে, লোভী না হতে। তবে তোমরা কেন সেই কাজগুলাই কর, যেগুলা তোমরা আমাদের করতে মানা কর?

ভুলে যেও না তোমরা কেন এই সম্মেলনে এসেছ, কাদের জন্য তোমরা এগুলো করছ। আমরা তোমাদেরই সন্তান। তোমরা সেই পৃথিবীর সিদ্ধান্ত নিচ্ছ যেখানে আমরা বড় হব। সন্তানকে সাহস দেওয়ার মতো অবস্থা থাকতে হবে বাবা-মায়ের, সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা থাকতে হবে, অবস্থা থাকতে হবে বলার যে-- সব ঠিকই আছে।

কিন্তু আমার মনে হয় না তোমরা আমাদের এগুলো দিতে পারবে। আমরা কি আদৌ তোমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় জায়গা পেয়েছি? আমার বাবা বলেন, ‘তুমি তাই, যা তুমি কর। তুমি যা বল, তা তুমি নও।’ কিন্তু তোমরা যা করছ, তা আমাকে দিনশেষে কাঁদাচ্ছে। তোমরা বড়রা বল, আমাদের ভালোবাস। আমি তোমাদের চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, প্রমাণ করে দেখাও যে তোমরা আসলেও তাই কর।

সবাইকে ধন্যবাদ আমার কথা শোনার জন্য।

সুজুকির সেই ভাষণের পরে ২৪ বছর পার হয়ে গেছে। পৃথিবীর মানুষের মধ্যে এই ভাষণের কোনো প্রভাব পড়েনি। এখনও ধনী দেশগুলো গরিব দেশের জন্য কিছু করে না। তারা শুধু নিজের অবস্থানকে শক্ত করে। এতে প্রকৃতির উপর চাপ পড়ছে। ঝড়-বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। শেষ হয়ে যাচ্ছে অনেক জনপদ। মরে যাচ্ছে অনেক মানুষ।

সুজুকি আজও পরিবেশের পক্ষে, শিশুদের পক্ষে লড়ে যাচ্ছে। এখন সুজুকির দায়িত্ব আমাদের এই প্রজন্মের শিশুদের কাঁধে এসে পড়েছে। আমরা যখন বুঝতেই পারছি বড়রা আমাদের জন্য পৃথিবীতে কোনো সম্পদ রেখে যাবে না। আমাদেরই আমাদের পৃথিবীকে সুন্দর রাখতে, পরিষ্কার রাখতে কাজ করতে হবে, যেন অন্তত আমাদের পরে যারা আসবে তারা এই সুন্দর পৃথিবীটাকে কিছুটা হলেও দেখতে পায়। 

সুজুকির ভাষণের ইউটিউব লিঙ্ক: https://www.youtube.com/watch?v=TQmz6Rbpnu0

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক