গাছের আলো খুঁজেছিলেন যে বাঙালি বিজ্ঞানী

বিখ্যাত প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে (১৮৯৫ – ১৯৮১) আমরা চিনি মূলত বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় নিয়ে কাজ করার জন্য। এই সমস্ত কাজের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিও পেয়েছিলেন।

কৃষ্ণেন্দু দেববিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 July 2022, 08:34 AM
Updated : 18 July 2022, 08:34 AM

কিন্তু কর্মজীবনের একদম শুরুতে উনি আলো-দেওয়া গাছপালা নিয়েও বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছিলেন। আজ সেই গল্পই করব।

সেটা ১৯১৭ সাল। শরীয়তপুরের লোনসিং হাই স্কুলের বোর্ডিং ঘর। গোপালচন্দ্র সন্ধ্যার পর সেখানে বসে কয়েকজনের সঙ্গে গল্প-গুজব করছেন। বর্ষাকাল, সেই দুপুর থেকে বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে টিপটিপ করে।

হঠাৎই দমকা বাতাস বইতে শুরু করল আর তারপরেই বৃষ্টি শুরু হল আকাশ ভেঙে। বোর্ডিং-এর কিছুটা দূরেই একটা বিরাট মাঠ। গাছাপালা কিছু নেই সেখানে। গোপালরা দেখলেন মুষলধারায় বৃষ্টির মাঝেই সেই মাঠ থেকে ৩-৪ হাত উঁচুতে হঠাৎই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল একটা আগুনের গোলা। সেই গোলা কিছুক্ষণ এলোমেলোভাবে ছোটাছুটি করে মিলিয়ে গেল।

চন্দ্রের ব্যাপারটা অনেকেই দেখেছেন। তাদের বেশিরভাগই আবার ভূতে বিশ্বাসী। অতঃপর আলোচনা শুরু হয়ে গেল, ওটা নিঃসন্দেহে ভূতেরই কাণ্ডকারখানা। দুজন অবশ্য এই ভূত-তত্ত্ব মানলেন না। তারা জোর গলায় প্রতিবাদও জানালেন। তবে তারা যে যুক্তি দেখালেন তার মধ্যেও বিশেষ সারবত্তা ছিল না, বরং শিক্ষিত হওয়ার অহং ছিল বেশি। গোপালচন্দ্র অবশ্য ভূত-বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী কোনো দলেই নেই। তবে ওই আগুনের গোলার রহস্য জানতে তিনি উদগ্রীব।

গোপালচন্দ্রের এই মনোবাসনা শুনে ওখানে উপস্থিত একজন বললেন, আপনি একদিন রাত্রিবেলা আমাদের গ্রামের দক্ষিণে যে পাঁচির মা-র ভিটে আছে সেখানে চলে যান, ওখানেও একরকম আগুন দেখতে পাবেন।

সেটা আলেয়া নয় তো?

না, আলেয়া নয়। সে আগুন একই জায়গায় জ্বলে।

গোপালচন্দ্র পরে খোঁজখবর নিয়ে জানলেন যে গ্রামের অনেকেই ওই পাঁচির মা-র ভিটেতে আগুন জ্বলতে দেখেছে এবং তারা সবাই সেটা ভূতুড়ে কাণ্ড বলেই বিশ্বাস করে। একথা জেনে গোপালচন্দ্রের রোখ চেপে গেল, একদিন রাতে ওখানে যেতেই হচ্ছে। কিন্তু একা যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। অতঃপর সঙ্গী দরকার। অনেক সাধ্যসাধনা করে দু-তিনদিন পর দুজন সঙ্গী মিলল। ওরা তিনজন একটা লণ্ঠন, ছাতা আর দেশলাই সম্বল করে একদিন সন্ধ্যার পর টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই রওনা হলেন পাঁচির মা-র ভিটের উদ্দেশ্যে।

ঝোপঝাড় আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আঁকা-বাঁকা পিছল মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা ধরেই ওরা পৌঁছলেন পাঁচির মা-র ভিটের একেবারে উত্তরদিকে। সেখানে চারদিক জঙ্গলে ঘেরা একটা ফাঁকা জায়গা। তবে চারপাশে অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। দক্ষিণ দিকে বড়ো বড়ো অনেকগুলো গাছ। ওখানে অন্ধকারটা যেন আরও গাঢ়। আকাশের কালো মেঘের তলায় তাই ওই গাছগুলোকে লাগছে ভূতের মতোই। আশপাশে কোনো জনবসতি নেই। কানে আসছে শুধু ব্যাঙের ডাক আর উচ্চিংড়ে-ঘুঘরে পোকাদের একটানা কলতান। সব মিলিয়ে গোটা পরিবেশটা বেশ গা ছমছমে।

তিনজনে এবার ধীরে ধীরে ওই ফাঁকা জায়গাটার মাঝখানে এসে পড়লেন। সামনেই বেশ কয়েকটা লতা-গুল্মের ঝোপ। সেই রকম একটা ঝোপের পেছনে হঠাৎই চোখে পড়ল একটা অস্পষ্ট আলোর রেখা। ভয়ে ভয়ে ওরা পা টিপে টিপে এগিয়ে চললেন ওই ঝোপের দিকে। ঝোপের কাছে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল কচুবন-ঘেঁটুবন। সেটা পার হয়ে একসারি তাল-তেঁতুলের নিচে ওই আলোটাকে আরও উজ্জ্বল আর পরিষ্কারভাবে দেখা গেল। আরেকটু এগোবেন কিনা ভাবছেন, এমন সময় ওই আলোটা নিভে গিয়ে পরক্ষণেই আবার জ্বলে উঠল। তারপর এই জ্বলা-নেভা চলতেই থাকল অনবরত।

ইতিমধ্যে এক সঙ্গী বেঁকে বসেছেন। তিনি আর এক পা-ও এগোবেন না। লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললেন, “ভূত দেখতে এসেছিলাম, দেখে নিয়েছি। আমার শখ মিটে গেছে। আমি এবার চললাম।” কথাটা শেষ করেই তিনি উল্টোমুখে হাঁটা লাগালেন। অতঃপর পড়ে রইলেন দুজন।

গোপালচন্দ্র এবার খানিক এগিয়ে গেলেন। একমাত্র সঙ্গী কিন্তু একটুও নড়েননি। গোপালচন্দ্র তাকে ডাকলেন, “ভাই, চলে এস আমার সঙ্গে।” সঙ্গীটি অনেক ডাকাডাকির পর সচল হলেন। ঝোপ পার হয়ে দুজনেই দেখলেন আলোটা স্থিরভাবেই জ্বলছে। সে আলো তীব্র নয়। কাঠকয়লা পুড়ে যে গনগনে আগুন তৈরি হয়, সেই রকম আগুন থেকে যেন ওই আলো বের হচ্ছে। সেই আগুনের কোনো শিখা নেই, স্নিগ্ধ নীলাভ একটা আগুন।

গোপালচন্দ্র সামনে গিয়ে দেখতে চাইলেন ওই আগুনটাকে। কিন্তু সঙ্গীটি আর এক পা-ও এগোতে রাজি হলেন না। তিনি ভয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছেন। গোপালচন্দ্র ওকে বললেন, “ঠিক আছে, খুব ভয় লাগলে তুমি আর ওই আগুনের দিকে তাকিও না। ছাতা আড়াল করে থাকো। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখে আসি ব্যাপারখানা।” তবে তিনি নিজেও যে একেবারে ভয়মুক্ত এমনটা মোটেই নয়। তাই এক পা এক পা করে এগোতে এগোতেই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীটির উদ্দেশে চিৎকার করেই বলতে থাকেন, “এই তো আমি চলছি। কোনো ভয় নেই বুঝলে, কোনো ভয় নেই।”

যাইহোক, আরও সামনে গিয়ে গোপাল দেখলেন একটা কাটা তেঁতুল গাছের গুঁড়ি থেকে আলোটা বের হচ্ছে। গুঁড়িটার অনেকটা অংশ পচা এবং সেটা জ্বলে জ্বলে যেন একটা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। ওটার পাশেই একটা বড়ো কচুগাছ আছে। তার পাতা ঝুঁকে পড়েছে গুঁড়িটার সামনে। হাওয়ায় সেই পাতা যখন দুলছে, তখনই দূর থেকে মনে হচ্ছে আলোটা জ্বলছে-নিভছে বুঝি।

গোপালচন্দ্র সেই পচা আলো-বিকিরণকারী গাছের গুঁড়ি থেকে হাত দিয়ে কিছু টুকরো সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়িতে ওগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, শুকনো অবস্থায় সেগুলো আলো না দিলেও ভিজিয়ে দিলে যথারীতি আগের মতোই আলো বিকিরণ করতে থাকে। জলে ডুবিয়ে রাখলে ওদের দারুণ সুন্দর দেখায়। দুদিন বাদে অবশ্য ওই আলো বিকিরণ বন্ধ হয়ে গেল।

এই ঘটনার কিছুকাল বাদে গোপালচন্দ্র একটা বিশাল পুকুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার দুদিকেই জঙ্গলে জোনাকির মতো অসংখ্য আলোকবিন্দু দেখতে পেলেন। ওই জঙ্গল থেকে কিছু লতাপাতা তুলে নিয়ে এলেন বাড়িতে। দেখলেন ওই লতাপাতাগুলো থেকেই আলোটা বের হচ্ছে। পাঁচির মা-র ভিটেতে যে আলো দেখেছিলেন, এই আলো সেই রকমই স্নিগ্ধ, নীলাভ, উজ্জ্বল। এই দু’রকম আলো নিয়ে গোপালচন্দ্র একটা প্রবন্ধ লিখলেন যা ছাপা হল প্রবাসী পত্রিকার (পৌষ ১৩২৬) পঞ্চশস্য বিভাগে। প্রবন্ধটার নাম ছিল ‘পচা গাছপালার আশ্চর্য আলো বিকিরণ করবার ক্ষমতা’।

এর পরের মাসে ওই প্রবাসীতেই প্রকাশিত হলো তার আরও একটি নিবন্ধ ‘গাছের আলো’। এই প্রবন্ধ দুটোই যে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে সেটা তিনি নিশ্চয়ই তখন কল্পনাও করতে পারেননি। লেখাটা পড়ে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু খোঁজ শুরু করলেন গোপালচন্দ্রের। বিপ্লবী পুলীন দাসের মারফত যোগাযোগও করলেন গোপালচন্দ্রের সঙ্গে, তারপর ওকে নিজের হাতে গড়ে তোলা বসুবিজ্ঞান মন্দিরে ডেকে নিলেন। গোপালচন্দ্র হয়ে গেলেন জগদীশচন্দ্রের গবেষণার সহকারী। পরে নানা কাজ শিখে নিজেও শুরু করলেন গাছ-গাছালি, পোকা-মাকড় নিয়ে গবেষণা করতে। তবে সবই করতে হয় জগদীশচন্দ্রের অনুমতি নিয়ে।

সেটা ১৯২৮ সাল। জগদীশচন্দ্র তখন দেশের বাইরে। বিদেশ যাওয়ার আগে সবাইকে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার সুযোগ দিয়ে গেছেন। গোপালচন্দ্র এখন অনেকটা সময় ওয়ার্কশপে কাটাচ্ছেন। আর বাকি সময়টা কাজও করছেন নানা গাছপালা আর মাইক্রোস্কোপ নিয়ে।

কিছুদিন পর ভিয়েনা থেকে জগদীশ বসুর একটা চিঠি এল গোপালচন্দ্রের কাছে। চিঠির বিষয়বস্তু এইরকম, শীঘ্রই বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী হ্যানস মলিশ কলকাতায় আসবেন। উনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকটর এবং প্ল্যান্ট ফিজিওলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ। উনি অনেকগুলো বিজ্ঞানের বইও লিখেছেন। সেগুলোর মধ্যে ‘মাইক্রোকেমিস্ট্রি অব প্ল্যান্টস’, ‘লুমিনাস প্ল্যান্টস’ ইত্যাদি অন্যতম। এহেন মলিশসাহেব বায়ো-লুমিনিসেন্স নিয়ে বোস ইনস্টিটিউটে কাজ করবেন। গোপালচন্দ্র যেন ওর কাজের সুবিধার জন্য আলো-বিকিরণকারী গাছপালা জোগাড় করে রাখেন।

এ চিঠি পাওয়া মাত্রই গোপালচন্দ্র আলো-বিকিরণকারী উদ্ভিদ খোঁজার কাজে লেগে গেলেন। কিছুদিন আগেই শুনেছিলেন যে বেহালার গ্রামাঞ্চলে একটা পরিত্যক্ত স্থানে ওইরকম গাছপালা দেখা যায়। অতঃপর প্রথমেই চলে গেলেন সেখানে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ওই সেই জঙ্গলময় এলাকায় বহুক্ষণ ঘোরাঘুরি করেও অমন কোনো গাছ বা লতাপাতার দেখা মিলল না। তবে ভোগান্তি হলো প্রচুর। আরও অনেক জায়গায় খোঁজ চালালেন। কিন্তু আলো-দেওয়া গাছ-গাছালির সন্ধান মিলল না।

কিন্তু হাল ছাড়লে তো আর চলবে না। ঠিক করলেন দেশের বাড়ি লোনসিং-এই যাবেন। ওখানে গেলে অবশ্যই কার্যসিদ্ধি হবে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে মোটেই তা হলো না। দেশের বাড়ি গিয়ে লক্ষ্য করলেন গত এক দশকে জায়গাটা অনেকটাই বদলে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে সামান্য কিছু লতাপাতা পাওয়া গেল বটে, তবে  প্রয়োজনের তুলনায় তা কিছুই নয়। হ্যান্স মলিশের মতো একজন স্বনামধন্য বিজ্ঞানী আসছেন। অথচ তার গবেষণার উপকরণ ঠিক মতো জোগাড় হলো না, ব্যাপারটা ভেবেই গোপালের অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু কতদিন আর কাজ ছেড়ে দেশের বাড়ি বসে থাকা যায়! অতঃপর কলকাতায় ফিরে আসার মনস্থ করলেন। চলে গেলেন এক বন্ধুর বাড়ি। তার বাড়িতে রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে দুজনেই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

রাত গভীর। বাইরে কারা যেন হাঁকডাক শুরু করেছে। গোপালচন্দ্রের ঘুম ভেঙে গেল। বন্ধুটিও জেগে গেছে। তিনি গোপালচন্দ্রকে জানালেন, ওদের বাড়ির পশ্চিমে যে জঙ্গলটা আছে তার মধ্যে দিয়ে একটা খাল এঁকেবেঁকে গিয়ে নদীতে পড়েছে। রাত্রিবেলাও ওই খাল দিয়ে নৌকা চলাচল করে। মাঝিরা অনেক সময়েই রাতের অন্ধকারে বাঁক ঘুরতে গিয়ে দিক-ভুল করে ফেলে। সঙ্গে ভূতের ভয়ও থাকে। তাই মাঝেমধ্যেই তারা সঠিক পথ বাতলে দেওয়ার জন্য এভাবে ডাকাডাকি করে। বন্ধুটির এই কারণে প্রায়শই ঘুম নষ্ট হয়। তাই ওই ডাকে সাড়া না দিয়ে চুপ করে থাকাই শ্রেয়।

“ও মশাইরা, কে আছেন, আমাদের বাঁচান!” এবার রীতিমতো কাতর চিৎকার! অতঃপর দুই বন্ধুর কেউই আর উদাসীন থাকতে পারলেন না। বিছানা ছেড়ে হারিকেন হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বন্ধুটি বাড়ির আরো দুজনকে ডেকে নিয়েছেন। উনি চিৎকার বলে বললেন, “ভয় নেই, আমরা যাচ্ছি।”

ওরা জঙ্গলের পথে কিছুটা এগোতেই দেখলেন একটা ধুরি নৌকায় তিনটে লোক পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপছে। গোপালদের দেখেই একটা লোক নৌকা থেকে লাফ দিয়ে নেমে এল। কাঁপতে কাঁপতে বলল, “গেছোভূত আমাদের নৌকাটাকে জমির ওপর কতটা তুলে দিয়েছে দেখুন! লগি দিয়ে জমিতে খোঁচা মেরে যতবারই আমরা নৌকাটাকে জলে নামানোর চেষ্টা করেছি, ততবারই ও আমাদের আবার টেনে তুলেছে। ভয় পেয়ে আমরা সবাই নৌকার মধ্যিখানটায় আসার সময় কেরোসিনের বাতিটা উল্টে নিভে গেল। তখনই আমরা ডাকাডাকি শুরু করলাম। আপনারা না এলে এতক্ষণে ওই ভূত আমাদের…। আমার কথা বিশ্বাস না হয় আপনারা নিজেরাই দেখুন, নৌকাটা জমির ওপর কতখানি উঠে আছে।”

গোপালরা এই কথা শুনে আলো নিয়ে গেলেন নৌকাটার কাছে। দেখলেন যে খালের পাড়ের ঢালু কাদাজমির ওপর দিয়ে নৌকটার একটা অংশ মোতরা গাছের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে এবং কয়েকটা মোতরা গাছের ওপরের অংশ নৌকার গলুইয়ের ফাঁকের মধ্যে ঢুকে হুকের মতো আটকে গেছে। অন্ধকারে খালের বাঁকের মুখ ঠিক করতে না পেরেই এই বিভ্রাট। লোকগুলো যখন জমিতে লগির উল্টো খোঁচা দিয়ে নৌকাটাকে খালের জলে নামানোর চেষ্টা করেছে তখন পেছনের গাছগুলো নুয়ে পড়েছে। লগিটা তুলে নিতেই তারা আবার সোজা হয়ে নৌকাটাকে ঠেলে আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিয়েছে। অতএব গেছোভূতের তত্ত্ব খারিজ হয়ে গেল। নৌকা খালে নামিয়ে দিয়ে ওঁরা সকলে বাড়ির পথ ধরলেন।

গোপালচন্দ্র হাঁটছিলেন সবার পেছনে। সামনে শুধু লণ্ঠনের একটা ম্লান মিটমিটে আলো। আর চারদিকটায় ঘন জমাট অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই এবার চোখ গেল গোপালচন্দ্রের। আগু-পিছু, ডানে-বামে যেদিকেই চোখ যায় সেখানেই যেন লক্ষ লক্ষ জোনাকির আলো জ্বলছে। এতদিন ধরে যে আলো-দেওয়া গাছপালার খোঁজ করছিলেন, তারই মেলা বসেছে এখানে! বন্ধু আর তার বাড়ির লোককে দেখালেন সেই দৃশ্য। তারপর প্রচুর লতাপাতা সংগ্রহ করে ফিরে এলেন কলকাতায়।

প্রফেসর মলিশ ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে প্রায় ছ’মাস থাকলেন কলকাতায়। প্রায়দিন সকালেই উনি গোপালচন্দ্রকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন দরকারি গাছ-গাছালি পাওয়ার আশায়। গোপালচন্দ্রকে উনি খুবই পছন্দ করেন। ওর কাছে মলিশ সাহেব এই সময়ে খানিক বাংলাও শিখলেন।

বসুবিজ্ঞান মন্দিরের গবেষণাগারেও বায়ো-লুমিনিসেন্ট প্রাণী ও উদ্ভিদ নিয়ে এই সময়ে কাজ হলো বিস্তর। জৈব-দ্যুতি সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানা গেল। ওরা প্রাণীদেহ থেকে জীবাণু আলাদা করে কালচার মিডিয়ায় রেখে তাদের পালনও করলেন। মলিশ দেশে ফিরে যাওয়ার পর অবশ্য গোপালচন্দ্র আবার মাইক্রোস্কোপে মনোনিবেশ করেন।

এখানে একটা তথ্য বলে নেওয়া ভালো যে বায়ো-লুমিনিসেন্ট বা আলো বিকিরণকারী জীবদের দেহে সাধারণত ‘লুসিফেরিন’ নামের একটা রাসায়নিক পদার্থ থাকে যা ‘লুসিফারেজ’ নামক উৎসেচকের সাহায্যে ভেঙে গিয়ে আলো উৎপন্ন করে। ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে বিজারিত ফ্ল্যাভিন মনোনিউক্লিওটাইডের সঙ্গে অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় এই আলো তৈরি হয়। ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, জেলিফিস, কৃমি, চিংড়ি, স্টারফিস, মাছ, হাঙর ইত্যাদি বায়ো-লুমিনিসেন্ট।

ডাঙায় অনেক আলো-দায়ী প্রাণী (জোনাকি), ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেলেও কোনো বায়ো-লুমিনিসেন্ট প্রকৃত উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাহলে গোপালচন্দ্র অত আলো-দায়ী লতাপাতা খুঁজে পেলেন কীভাবে? আসলে ওই গাছগুলোতে বাসা বেঁধেছিল অজস্র মিথোজীবী বায়ো-লুমিনিসেন্ট ব্যাকটেরিয়া। তাদের দেহ-নিঃসৃত আলোই ওই লতাপাতাগুলোকে ঝলমলে করে তুলেছিল।

লোনসিং স্কুলে পড়ানোর সময় পাঁচির মা-র ভিটেয় ভিজে কাঠের গুঁড়িতে গোপালচন্দ্র যে স্নিগ্ধ আলো দেখেছিলেন তা ওতে জন্মানো মৃতজীবী আলো-দায়ী ছত্রাকের জন্য।

ইদানিং কিছু বিজ্ঞানী ছত্রাকের জিন কয়েকটা গাছের শরীরে প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিমভাবে তাদের বায়ো-লুমিনিসেন্ট করতে সমর্থ হয়েছেন। তবে আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে গোপালচন্দ্রের আলো-দায়ী গাছপালা নিয়ে ওই কাজ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। উনি যদি ওই সময়ে পোকা-মাকড়ের দিকে না ঝুঁকে কেবল আলো-বিকিরণকারী উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতেন, তাহলে এই বাংলাতেই আরও অনেক আলো-দেওয়া গাছগাছালির সন্ধান হয়ত আমরা পেয়ে যেতাম।

কিডজ পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com । সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক