জয়নুলের ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা’

আজ তোমাদের একটি ছবির গল্প শোনাব, তবে এই ছবি রুপালি পর্দার ছবি নয়, রং-তুলিতে আঁকা ছবি, যাকে আমরা বইয়ের ভাষায় ‘চিত্রকলা’ বলে থাকি।

আলম খোরশেদবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 June 2022, 08:23 AM
Updated : 30 June 2022, 08:58 AM

আর এই ছবির স্রষ্টা আমাদের দেশের একজন মহাপ্রতিভাবান মানুষ, যার নাম জয়নুল আবেদিন (১৯১৪-১৯৭৬), যাকে এই দেশের ‘আধুনিক চিত্রকলার জনক’ বলা হয়ে থাকে।

ময়মনসিংহের ছেলে জয়নুল বড় হয়ে ছবি আঁকা শিখতে যান কলকাতা শহরে। সেখানকার আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে মন দিয়ে ছবি আঁকা শেখেন। তিনি তাতে এতটাই কৃতিত্ব দেখান যে, কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে পাশ করার পরপরই সেই কলেজের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। জয়নুল শিক্ষকতার পাশাপাশি দু’হাতে ছবি এঁকে বেড়াচ্ছেন তখন। নানা রকম ছবি। জলরং, তেলরং, পেন্সিলস্কেচ, কাঠকয়লায় আঁকায় ছবি, বাস্তববাদী ছবি, বিমূর্ত ছবি, প্রকৃতির ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি- সবধরনের ছবি আঁকাতেই ছিল তার দারুণ দক্ষতা। তবে তার ছবির বিষয়বস্তু ও আঁকার ঢংয়ে তখন মূলত আবেগ আর কল্পনার ছাপ লক্ষ্য করা যেত বেশি।

কিন্তু সেই সময়কার একটি ভয়াবহ ঘটনা জয়নুলকে তার সেই কল্পনার জগৎ থেকে এক ধাক্কায় সরিয়ে এনে নির্মম ও কঠোর এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সেটা ছিল গত শতকের চল্লিশের দশকের কাল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় সেটি। ইংরেজরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতবর্ষকে শাসন করে আসছিল অত্যন্ত নির্দয়ভাবে। মানুষ তাদের এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ক্রমে ফুঁসে উঠছে। ভারত জুড়ে শুরু হয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন।

ব্রিটিশরাও নানাভাবে ফন্দি আঁটছে কীভাবে এই আন্দোলনকে দমিয়ে তাদের শাসনকালকে আরও দীর্ঘায়িত করা যায়। তারা তখন তাদের দেশীয় দোসর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাংঘাতিক এক দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করে দেশে। তোমাদের অনেকে হয়তো ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কথা শুনে থাকবে গুরুজনদের মুখে।

আবর্জনা থেকে কুড়িয়ে খাচ্ছে মানুষ, আঁকা: জয়নুল আবেদিন

তখন পৃথিবী জুড়ে চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তার আঁচ এসে লাগে আমাদের বাংলা অঞ্চলেও। ব্রিটিশ শাসকেরা সেই সময় তাদের সৈন্যদের খাবারের জন্য সব চাল তুলে নিয়ে যায় বাজার থেকে। ফলে সারা দেশে, বিশেষ করে বাংলার গ্রামাঞ্চলে তখন নিদারুণ খাদ্যাভাব দেখা দেয়। মানুষ দুমুঠো অন্নের জন্য হাহাকার করতে থাকে। গ্রাম ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ শহরে এসে ভিড় করে খাবারের সন্ধানে। তাদের প্রধান গন্তব্য হয় কলকাতা মহানগর।

কিন্তু সেখানেও ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্যের অনটন। গ্রাম থেকে আসা এইসব ছিন্নমূল মানুষ তখন অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে শুরু করে। আবর্জনা থেকে কুড়িয়ে খাওয়া থেকে আরম্ভ করে কুকুরের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে তারা কোনোমতে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাতের ফ্যান চেয়ে নিয়ে খিদে মেটায়। কিন্তু এক পর্যায়ে সেই ফ্যানটুকু পাওয়াও দায় হয়ে ওঠে। অনাহারে, অসুস্থতায় একসময় সেইসব হতভাগা মানুষেরা ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে থাকে, কলকাতার ফুটপাত ভরে ওঠে খাদ্যাভাবে মৃত মানুষের স্তূপাকার লাশে। ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, শিশুর লাশের পচা গন্ধে কলকাতার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। কাক শকুনেরা ঠুকরে খায় সেইসব পচাগলা মৃতদেহ।

জয়নুল তখন আর্ট কলেজের তরুণ শিক্ষক। চোখেমুখে অনেক স্বপ্ন। বুকে দেশপ্রেমের আগুন। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। মানবতার এত বড় অপমান, ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায়কে তিনি লোকচক্ষুর সামনে, বিশ্বের নজরে আনার লক্ষ্যে আঁকতে শুরু করলেন সেইসব হৃদয়বিদারক দৃশ্যের ছবি। নাওয়া-খাওয়া ভুলে রং-তুলি আর কাগজ নিয়ে জয়নুল তখন কলকাতা চষে বেড়াতে লাগলেন ফুটপাতে পড়ে থাকা হাড়সর্বস্ব, রোগজর্জর, অনাহারী মানুষের ছবি আঁকার জন্য। তার নিজেরও তখন প্রচণ্ড অর্থাভাব। ছবি আঁকার সরঞ্জাম কেনার সঙ্গতি নেই। কিন্তু কোনোকিছুতেই তাকে দমিয়ে রাখা গেল না।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাতের ফ্যান চেয়ে নিয়ে খিদে মেটায় মানুষ, আঁকা: জয়নুল আবেদিন

তিনি সস্তা কাগজের বুকে, চিনে-কালিতে ডোবানো সাধারণ তুলিতেই ফুটিয়ে তুলতে লাগলেন সেইসব বীভৎস বাস্তবতার ছবি। কখনও হয়তো কোনো শিশুর ছবি আঁকছেন তিনি, যে তার মৃত মায়ের শুকনো বুকে দুধ খুঁজে বেড়াচ্ছে; আঁকছেন কখনও মানুষের মৃতদেহ ঠুকরে খাওয়া কাকেদের ছবি, কখনোবা মৃতপ্রায় নারীপুরুষের বাঁচার সংগ্রামের করুণ, নির্মম সব দৃশ্য।

অসংখ্য ছবি আঁকেন জয়নুল তখন তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষপীড়িত কলকাতা মহানগরের ছিন্নমূল মানুষদের, কালক্রমে যা ‘মন্বন্তরের ছবি’ নামে বিশ্ববিখ্যাত হয়। সেই থেকে জয়নুলকে সবাই একনামে চেনে ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রকর’ হিসেবে। এমন কি তার আঁকা কাকেদেরও পরিচিতি জোটে ‘জয়নুলের কাক’ নামে। এইসব ছবিতে তিনি তেমন কোনো রং ব্যবহার করেননি। ঘটনার বীভৎসতা বোঝাতে কখনও কালো কালিতে, কখনও কাঠকয়লায় আবার কখনোবা স্রেফ পেন্সিলের আঁকে তিনি মূর্ত করে তুলেছেন তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সেইসব অমানবিক, মর্মান্তিক দৃশ্যকে।

তার তুলির টানে এমন এক শক্তিমত্তা ও দৃঢ়তা ছিল যে, সেই সময়কার সবটুকু বেদনা ও মানবতার করুণ পরাজয়ের আখ্যান অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে ওঠে সাদা কাগজের বুকে। তার তুলির আঁচড়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মূর্ত হয়ে আছে এই তেতাল্লিশের ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা’য়। বলা হয়ে থাকে, উপমহাদেশের চিত্রকলায় সমাজ-বাস্তবতার প্রথম বিশ্বস্ত প্রতিফলন ঘটে জয়নুলের এই ছবির মধ্যেই।

কাক-শকুন ঠুকরে খাচ্ছে পচাগলা মৃতদেহ, আঁকা: জয়নুল আবেদিন

একসময় দুর্ভিক্ষের অবসান হয়। ব্রিটিশদের সব ছলচাতুরি ব্যর্থ হলে তারা এদেশ থেকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়, কিন্তু যাবার আগে তারা খুব কৌশলে দেশটাকে দু’ভাগ করে দিয়ে যায়। আর হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বপন করে যায় বিভেদ ও বিদ্বেষের বীজ। যার ফলে ১৯৪৭ সালে রক্তাক্ত দেশভাগের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটো রাষ্ট্রের। জয়নুল আবেদিন তখন তার আঁকার সরঞ্জামাদি আর দেশসেবার আকুলতা নিয়ে জন্মভূমি পূর্ববঙ্গে ফিরে আসেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা চারুকলা কলেজ।

নিজে ছবি আঁকেন যত না, তার চেয়ে বেশি আঁকতে শেখান পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে অম্লান ও অক্ষয় হয়ে থাকে তার এই ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা’। বন্ধুরা, ছবিগুলো তোমরা সময় সুযোগ পেলে দেখে নিতে ভোলো না যেন। কেননা সেইসব ছবি যে আমাদের ইতিহাস ও অস্তিত্বেরই অংশ হয়ে উঠেছে আজ।

আগের পর্ব

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com । সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক