গোলাপের আর্ট

কয়েকদিন ধরে গোলাপ স্কুলে যায় না। ইচ্ছে করে যে যায় না তা নয়, বাধ্য হয়ে সে স্কুলে যাচ্ছে না।

অরণ্য পাশাবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 July 2021, 04:45 AM
Updated : 2 July 2021, 04:45 AM

চার মাস আগে তার বাবা মারা গেছেন। তিন বছরের তার একটি ছোট বোন আছে, নাম আয়শা। মা ও আয়শাকে নিয়ে তাদের সংসার। তারা গরিব। বাবা রিকশা চালিয়ে রোজগার করতেন। সেটা দিয়ে তাদের সংসার চলতো। এখন বাবা নেই। কেমন করে সংসার চলবে!

তাদের জমানো সব টাকা শেষ। মা বয়স্ক মানুষ, কী কাজ আর করবে! তবু এর ওর বাড়িতে কাজ করে যা পায় তাতেও সংসার চলে না। মায়ের এ খাটুনি দেখে গোলাপের খারাপ লাগে। সে কেবল ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে। তাদের জমি জিরাতও নেই, চাষাবাদ করে খাবে সে উপায়ও নাই। গোলাপ কিছু একটা কাজ করতে চায় যাতে পরিবারের সাহায্য হয়। কিন্তু কী করবে ভেবে পায় না।

অবশেষে গ্রামের বাজারে একটি নতুন হোটেলে কাজ পেয়েছে গোলাপ, সে হোটেলে এখন কাজ করে। তাই কয়েকদিন ধরে স্কুলে যায়নি। গোলাপ ভালো ছাত্র। কিন্তু হয়ে উপায় কী, তার তো পরিবারকে সাহায্য করতে হবে। গোলাপ ভালো ছবি আঁকে। মানুষ, ফুল, লতাপাতা নানা ধরনের। দারুণ ছবি আঁকতে পারে। বিখ্যাত সব সাহিত্যিক-বিজ্ঞানীদের ছবি এঁকে স্কুলে সুনাম কুড়িয়েছে। খাতা ছাড়াও তার আঁকার মাধ্যম দেয়াল। আমের ভেঁপু, চক, কাঠ, কয়লা তার হাতে থাকলেই ছবি আঁকা শুরু করে দেয়।

বাজারের উপর দিয়ে তার বন্ধুরা স্কুলে যায়। তার খারাপ লাগে। তারও স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে। আবার হোটেলে কাজ করে বলে তার লজ্জাও লাগে। কিন্তু উপায় কী, হোটেলে সারাদিন কাজ করলে দুইশ টাকা দেয়। আবার তিনবেলা খাবার। এ দুইশো টাকা দিয়ে সে পরিবারের জন্য চাল, ডাল, তেল কিনে। তার মা খুশি হয়। আবার তার পড়াশোনা হচ্ছে না বলে খারাপও লাগে। কাজ শেষে এসে পড়ার টেবিলে বইগুলো দেখে। তার মন খারাপ হয়। অংকের খাতাতে সে আঁকাআঁকি করে। আঁকতে পারলে তার ভালো লাগে। গোলাপের হাতের লেখাও মুক্তোর মতো ঝকঝকে।

নতুন হোটেলে মালিক সাইনবোর্ড লাগাবেন। মালিক জানতেন গোলাপের হাতের লেখা ভালো। তাই তাকে তুলি ও সাত-পাঁচ রঙের কৌটা কিনে দিলেন। টিনের পাতে গোলাপ সুন্দর করে লিখে দিলো। হোটেল মালিক খুব খুশি হলেন। সাইনবোর্ড লেখার পর কিছু রঙ বেঁচে যায়। সেটা দিয়ে গোলাপ হোটেলের দেয়ালে সুন্দর করে কিছু খাবারের ছবি ও আলপনা আঁকলো। সবাই তাকে বাহবা দিলো। গোলাপ অনেক খুশি হলো।

এরপর বাজারের অনেক দোকানদার গোলাপের হাতে সাইনবোর্ড লিখিয়ে নিলো। এজন্য তারা গোলাপকে টাকা দেয়। গোলাপ চায় না। তার আঁকতেই ভালো লাগে। তবুও লোকজন যা খুশি দেয়। গোলাপ তাতে খুশি। অনেকে তাদের দোকানে বিভিন্ন আলপনা, গাছ মানুষের ছবি আঁকিয়ে নেয়। বাজারে ঢুকতেই একটা বড় দেয়াল আছে। সেখানে গোলাপ কয়েকদিন ধরে আঁকলো শেষ বিকেলের গ্রামের দৃশ্য। ছবিতে দেখা যায় সূর্য ডুবে যাচ্ছে, কয়েকটি গরু-ছাগল নিয়ে রাখাল বাড়ির দিকে ফিরছে। তালগাছের মাথাটা আঁধার হয়ে আসছে। সবুজ ক্ষেত। এ ছবি দেখার পর সবাই গোলাপের প্রশংসা করলো।

গোলাপ হোটেলের কাজের ফাঁকে ওসব করে দেয়। ক্রমে পুরো বাজারে সে রঙিন আর্ট করে ফেলে। সে আর্টে বিভিন্ন বিষয় থাকে। খেলাধুলা, গাছ, মাছ, নানা ধরনের আলপনা। হোটেল কর্মচারী সোহেলের ইউটিউব দেখে সে নতুন নতুন কাজ শেখে। রঙের ব্যবহার, আঁকার ধরণ। কোন রঙের সঙ্গে কী মেশালে আরেক রঙ হয় হুবহু সে আয়ত্ত করতে পারে। আর খালি দেয়ালগুলোতে এঁকে দেয়। যেমন সে শিখেছে শুধু পাঁচটি রঙ আছে, যা দিয়ে যেমন রঙ চাই সে তেমন রঙ বানাতে পারবে। লাল, নীল, হলুদ, সাদা আর কালো হচ্ছে সেই পাঁচটি রঙ।

লাল ও নীলে বেগুনি হয়। বেগুনির সঙ্গে হলুদ মেশালে গাঢ় বাদামি রঙ হয়। নীল ও হলুদ রঙ একসঙ্গে মেশালে সবুজ রঙ হয়। লালের সঙ্গে অল্প পরিমাণ কালো রঙ মিলে হবে খয়েরি। লালের সঙ্গে একটু সাদা রঙ মেশালে হয় গোলাপি। এছাড়া সাদা ও কালো রঙ দিয়ে তৈরি হয় ধূসর রঙ। আকাশি রঙটি হবে সাদা রঙের সঙ্গে সামান্য একটু নীল মেশালে। আগুনের রঙ চাইলে লালের সঙ্গে হালকা হলুদ রঙ মেশালেই হবে। যে কোন রঙের সঙ্গে সাদা মেশালে রঙটি হালকা হয়ে যাবে। কি দারুণ ব্যাপার! অথচ সে এসব আগে জানতো না।

নতুন কেউ বাজারে এলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। একদিন এক ভদ্রলোক এলো গোলাপের কাছে।

ভদ্রলোক গোলাপের কাছে এসে বললেন, তোমার নাম গোলাপ?

জ্বি।

তুমি এঁকেছো এসব ছবি?

জ্বি।

ভদ্রলোক খুশি হলেন। বললেন আবার, কোথায় শিখেছো আর্ট?

এমনিতে। ইউটিউব দেখে।

বলো কি! তোমার তো দারুণ প্রতিভা। এরপর বললেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অধ্যাপক। তোমার আঁকা দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি খুব মুগ্ধ। প্রফেশনাল আর্টিস্টরাও এমন আঁকতে পারে না।

গোলপ বললো, ধন্যবাদ স্যার।

তুমি কিসে পড়ো?

স্কুলে যাই না স্যার।

বলো কি! কেনো?

আমরা গরিব স্যার।

তোমাকে যদি আমি ঢাকা নিয়ে যাই, তুমি যাবে? ওখানে তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব।

গোলাপ একটু মাথা নিচু করলো। এরপর বললো, যাব না স্যার। কারণ আমার মা একা। তাকে কাজ করে টাকা দিতে হয়। অধ্যাপকটি বললেন, ঠিক আছে। তোমার ব্যাপারটা দেখছি। তবে তুমি আঁকাআঁকি নিয়মিত করবে। আর পারলে স্কুলে ভর্তি হয়ে যাও।

ভদ্রলোক চলে গেলেন। গোলাপের খুব খারাপ লাগলো। এতবড় সুযোগ পেয়েও সে যেতে পারছে না। গ্রামের এক বিয়ে-বাড়িতে আলপনা আঁকতে হবে। গোলাপ এঁকে দিলো। আলপনা কেমন করে আঁকতে হয় সেটা মায়ের কাছে শিখেছে গোলাপ। তার মা কখনো স্কুলে যাননি। দেখে দেখে শিখেছে। সেই ধারণা নিয়ে আলপনা আঁকে গোলাপ। ঈদ উপলক্ষে তাদের গ্রামের রাস্তার পাশে কয়েকটা ছবি আঁকলো। ঈদগাহে যাচ্ছে শিশুরা, সঙ্গে অভিভাবক। এরকম আঁকলো।

গোলাপের আঁকা নেশার মতো হয়ে গেলো। গ্রামের সব ফাঁকা দেয়ালে সে রাত বিরাতে ছবি আঁকা শুরু করলো। পুরো গ্রাম রঙিন হয়ে উঠলো। মনে হলো আঁকা কোনও গ্রাম। পুরো গ্রাম বাজার মিলে অন্যরকম রঙিন হয়ে উঠলো। কে যেনো ফেইসবুকে এ গ্রামের ভিডিও করে ছেড়ে দিয়েছে। ভাইরাল হয়ে গেলো তেমাথার বাজার ও গ্রাম। দূরদূরান্ত থেকে লোক এলো গোলাপের এ আর্ট দেখতে। গোলাপের কথা ইউটিউবে প্রকাশ পেলো। বড় বড় সাংবাদিক এলো। পত্রিকা ও টিভিতে তাদের গ্রাম নিয়ে সংবাদ হলো।

এর মধ্যে ঢাকার সেই অধ্যাপক হাজির। তিনি বললেন, তুমি এখন থেকে একটা এনজিওতে শিশুদের ছবি আঁকার প্রশিক্ষণ দেবে। এজন্য তুমি বেতন পাবে। পাশাপাশি তুমি স্কুলে ভর্তি হবে।

একথা শুনে গোলাপ আনন্দে কান্না করে দিলো। মাকে গিয়ে সব বললো। মা অনেক দোয়া করলেন। গোলাপকে এখন সারা দেশ চেনে। তার মাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয় না। তাদের সংসারে আর অভাব নেই। আঁকাআঁকির পাশাপাশি গোলাপ গভীরভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিলো। মা বলেছেন, শুধু আঁকলেই হবে না, ভালো পড়াশোনাও দরকার। গোলাপ এখন সে কথাই মানে।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক