নতুন পথে চলচ্চিত্র

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নবজাগরণের সূচনা হচ্ছে

টিএল বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকমবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 May 2013, 03:56 AM
Updated : 21 May 2013, 03:56 AM

উত্তরার একটি শ্যুটিং হাউজে দেখা হয়ে গেল নির্মাতা আফজাল হোসেন মুন্না, অভিনেতা সজল ও মডেল অভিনেত্রী সারিকার সাথে। শ্যুটিং এর ফাঁকে ঘন্টাব্যপী আড্ডা দেওয়া হলো। চার জনের খোলামেলা আড্ডায় উঠে আসে বর্তমানে মিডিয়ার অবস্থা, ভারতীয় সিরিয়াল ও চলচিত্রের প্রভাব এবং বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের হাল-হকিহত। তারুণ্যে ভরপুর আশাবাদী এই তিনজন খুব শিগগিরি যুক্ত হতে যাচ্ছেন চলচ্চিত্রে। পাঠকের জন্য আড্ডার চুম্বক অংশ তুলে ধরছি।
 

প্রথমেই হাওয়ায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেই, মিডিয়ার বর্তমান অবস্থাকে কিভাবে দেখছেন? কথা কেড়ে নেন সারিকা  আচ্ছা প্রশ্নের উত্তর কি আমরা একে একে দিব, নাকি আড্ডার মতো করেই কথা চলতে পারে?

আড্ডার ঢংটা সাবলীল আর অন্তরঙ্গ হওয়ায় আমি তাতে সম্মতি দিলাম। কথা শুরু হলো।

এতগুলো চ্যানেল এতো নাটক হচ্ছে, ব্যপারটা সার্বিকভাবে ভালো না খারাপ ?

সজল- আমি আসলে এটাকে পজেটিভ ভাবেই দেখি। এতে করে এখন অনেক নির্মাতা, অভিনেতা তৈরি হচ্ছেন। এটা এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি। এখানে আমি একটু বাগড়া দেই, অনেক চ্যানেলই তারকা দেখে নাটক নেয়, এই ব্যাপারটা যদি বলেন।

প্রশ্ন শেষ হবার আগেই সারিকার উত্তর-আমি এটার সাথে একমত নই। আমরা তো কেউ স্টার হয়ে জন্ম নেইনি। আমাদের নাটক তো চলেছে।
সজল যোগ করেন- আমি এমন অনেক নাটক দেখেছি যেখানে কোন পরিচিত মুখ নেই। ভালো নির্মাণ হলে চ্যানেল নাটক নিতে চায়।

নির্মাণের প্রশ্ন আসতেই প্রশ্নের তীর পরিচালক মুন্নার কাছে, ভালো নির্মাণ নাকি বড় স্টার। তারও যেন উত্তর তৈরিই ছিলো,  আমি মনে করি সবচেয়ে আগে ভালো একটা গল্প বা চিত্রনাট্য, নির্মাণ এবং ভালো অভিনেতা। আর ভালো অভিনেতা মানেই যে স্টার তা কিন্তু না। আর বেশ কয়েকটি চ্যানেল হওয়াতে সবচেয়ে বড় যে সুবিধাটা হচ্ছে তা হলো বেশ কিছু নতুন ছেলে মেয়ে এখন নির্মাণে এগিয়ে এসেছেন। তারা অসম্ভব ভালো বানাচ্ছেন, যারা আগে চ্যানেল ¯^ল্পতার কারণে নির্মাণ-শৈলী দেখানোর অতটা সুযোগ পেতেন না।

আবারো হাওয়াই  প্রশ্ন, যদি নাটকে তারকা প্রাধান্য নাই থাকতো তাহলে একজন অভিনয় শিল্পী  মাসে ৪০ দিনের ডেট দিতে পারতেন না।  উত্তরটা আসে সারিকার কাছ থেকে।

যাদের ৩০ দিনে ৪০ দিনের ডেট এর চাহিদা আছে তারা কিন্তু দর্শক চাহিদা আছে দেখেই দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক সময়ই দেখা যায় অনেক অনুরোধ ফেরানো যায় না। সজল এবার কথা ধরেন, দেখুন ভারতে যেসব সিরিয়াল চলে, সেখানে কিন্তু ওভাবে কোন স্টার দেখা যায় না। তারপরেও সেগুলো অনেক জনপ্রিয়।   

আমার প্রশ্ন এবার নির্মাতার কাছে, তাহলে বাংলাদেশে নতুনদের নিয়ে এত কম কাজ দেখা যায় কেন?

মুন্না উত্তর দেন, প্যাকেজ নাটকের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা বাজেট আর সময়। একজন নতুন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে দিয়ে মূল চরিত্র করালে তার পেছনে অনেক সময় দিতে হয়, বোঝাপড়ার ব্যপারও থাকে, কারণ তাকে আমি মোটেও চিনিনা, কোন চরিত্র সে কিভাবে ডেলিভারি দিতে পারবে জানা নেই, দরকার হয় গ্রুমিং এর। সেক্ষেত্রে যারা প্রতিষ্ঠিত তাদের অভিনয়ের ধরনটা জানা থাকে, বা কতটুকু বৈপরীত্য বের করা যেতে পারে অনুমান করা যায়। আরেকটা ব্যপার হচ্ছে চ্যানেল বা আমরা নির্মাতারা নতুনদের সুযোগদিলেও স্পন্সররা কিন্তু চায় তারকা। তারপরেও দেখা যায় প্রতিটা প্রোডাকশনে আমরা নতুনদের নিয়ে কাজ করি। যতটা পারি তাদের সুযোগ দেই। বাকিটা তাদের গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন করি, আচ্ছা ভারতীয় সিরিয়ালগুলো কি দেখা হয়?

সজল এর উত্তর, আমি বেশ অনেকগুলোই দেখেছি, এটা দেখার জন্য যে মানুষ কেন দেখছে। সিরিয়ালগুলো দেখে আমার একবারও মনে হয়নি যে ওদেরটা কোনদিক থেকে আমাদের চাইতে ভালো। তবে ওরা অনেক টেকনোলজি ব্যবহার করে।

সারিকা জানালেন তিনি মোটেও দেখেননা, মাঝে মধ্যে যা চোখে পড়েছে তাতে মনে হয়েছে তাদের নাটক খুবই যুক্তিহীন ও বাস্তববিবর্জিত। বিশেষ করে ওদের প্রেক্ষাপট, চালচলন আমাদের সাথে মোটেও যায় না।

প্রশ্ন এবার নির্মাতার কাছে, ওদের চাইতে আমাদের নাটক এত ভালো হবার পরেও প্রচুর দর্শক কেন হিন্দি সিরিয়াল দেখে?

মুন্নার উত্তর- নান্দনিকতার হিসাবে বিচার করলে আমাদের নাটক ওদের চাইতে অবশ্যই ভালো, কনটেন্ট এর জায়গা থেকে বলতে গেলে ওদের নাটক আমারদের চাইতে অনেক হাল্কা। আর সহজ জিনিসে সাধারণের আগ্রহ বেশি থাকবে এটাইতো স্বাভাবিক। এছাড়া ওদের উপস্থাপনা বা প্রচার খুবই হিসেব করে করা। ওদের স্ক্রিনটাও বেশ ঝকঝকে । খেয়াল করলে দেখবেন ওরা সারাদিন অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে ওদের সিরিয়ালগুলোর প্রমোশন চালায়, এমনকি বিরতির আগে পরে প্রিক্যাপ থাকে। যে কারণে দর্শক আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। তবে আমরা সবচেয়ে পিছিয়ে আছি একেবারেই অন্য একটা জায়গা থেকে, আর তা হচ্ছে ওদের সব ধরনের চ্যানেল আমাদের এখানে বহাল তবিয়তে প্রচার হচ্ছে কিন্তু আমাদের চ্যানেলের ওদেশে প্রবেশাধিকার নেই। যে কারণে প্রতিযোগিতাটা হয়ে যাচ্ছে একপেশে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এর সমাধান সম্ভব নয়।

আমার প্রশ্ন থাকে- বর্তমানে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের অবস্থা কিভাবে দেখছেন আপনারা।

সজল বলেন-বর্তমানে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের অবস্থা খুবই ভালো। বেশ একটা পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। অনেক ছবি তৈরি হতে যাচ্ছে ডিজিটাল ফরমেটে এবং অনেক ভালো ভালো নির্মাতা বেশ কিছু ফিল্ম নির্মান করছেন। আমাদের বেশ কয়েকজন নির্মাতা আছেন যারা অনেকদিন ধরে দর্শকদের ভালো কাজ দিয়ে আসছেন, তারা সিনেমা বানালে বেশ ভালো হবে তা আশা করাই যায়।

মুন্না বলেন- এসময়টা থেকে আগামী ৫ বছরকে আমি দেখি বাংলা সিনেমার নবজাগরণের বছর হিসেবে। এটাই সময় বাংলাদেশি সিনেমার ঘুরে দাঁড়াবার।

প্রশ্ন করি- কি কি সম্ভাবনা দেখে আপনাদের তা মনে হচ্ছে।

সজল এবার কথা কেড়ে নিলেন- এখন আপনি অনেক নাটকই দেখবেন, যেগুলোর মেকিং, কালার গ্রেডিং সর্বোপরি উপস্থাপনা দেখে আপনার মনে হবে আসলে ছোটখাট একটা সিনেমাই দেখছেন। আমিতো প্রায় সবধরনের নির্মাতার সাথেই কাজ করেছি, এদের মধ্যে অনেক নির্মাতাই অনেক প্রতিভাবান। তাদের জানার বা চিন্তার জায়গাটা অনেক প্রশস্ত। এরা কম বাজেটের মধ্যে নাটকে অনেক ভালো কাজ করেন। চলচ্চিত্রের জন্য ভালো একটা বাজেট পেলে অবশ্যই ভালো করবেন।

মুন্না এখানে যোগ করেন, আমি যতটুকু দেখি বা জানি আমাদের প্রজন্মের বেশিরভাগ নির্মাতাই আসলে ঠিক নাটক বানাচ্ছেন না। টিভির উপযোগী করে শর্ট ফিল্ম বানাচ্ছেন।

আমি এবার একটা অভিযোগ উপস্থাপন করলাম-অনেকেই অভিযোগ করেন নাট্য নির্মাতারা সিনেমা বানাতে আসলে সেটা নাটকই হয়ে যায়।
উত্তরটা বেশ বলিষ্ঠভাবে এলো আফজাল হোসেন মুন্নার কাছ থেকে।

দেখুন আন্তর্জাতিকভাবে আসলে টিভি নাটক বলতে কিছু নেই। নাটকের জায়গা মঞ্চ। আপনি যখন দৃশ্য ধারণে গেলেন সেটা ফিল্ম। তবে দৃশ্য ধারণের মিডিয়াম অনেক রকম হতে পারে।  ফিল্ম, ভিডিও, ডিজিটাল এমনকি তা মোবাইল ফোনেও হতে পারে। অনেক ধরনের হতে পারে, ফিকশন , ননফিকশন ইত্যাদি। আমাদের দেশে যেসব ফিল্মকে নাটকের মতো বলা হচ্ছে, এগুলোতে প্রধাণত টিভি নাটকের কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে, তাই মানুষ ওরকমটা ভেবে নেয়। ইরান বা কোরিয়াতে কিন্তু এধরনের প্রডাকশনকে ফিল্মই বলা হচ্ছে। এখানে আরেকটা ব্যপার কাজ করে সেটা হচ্ছে, উপমহাদেশের ফর্মুলা সিনেমার প্রভাবে অনেকেই মনে করেন ৬ টা গান আর মারামারি দৃশ্য না থাকলে সেটা সিনেমা না। আসলে সেটাও এক ধরনের সিনেমা। যেমন আছে হরর, ড্রামা, থ্রিলার বা মিউসিকাল ফিল্ম। বলিউড এখন ফর্মুলা ফিল্ম থেকে অনেক সরে এসেছে, ওখানে বিভিন্ন বিষয়ের উপর ভালো ভালো ফিল্ম তৈরি হচ্ছে তা আবার ব্যবসাও করছে। ওদের দর্শক নতুন বিষয় দেখার জন্যে, বোঝার জন্যে তৈরি। আমরাও চেষ্টা করছি। আমাদের দর্শকও একসময় তৈরি হয়ে যাবে। আর আমাদের মধ্যে অনেকেই হাত পাকানোর জন্যে নাটক বানাচ্ছেন ব্যপারটা এমন না। বরঞ্চ সিনেমা বানাতে পারছেন না দেখে নাটক বানাচ্ছেন।

সারিকা মুন্নার সাথে যোগ করেন- আমাদের আশাবাদী হবার আরো কারণ আছে, মাঝখানে দেখেন সিনেমার জন্য বেশ খারাপ একটা সময় গেছে। কিন্তু এখন আবার ভালোর দিকে ফিরে আসছে। আর যেসব সিনেমাকে কেউ কেউ নাটক বলতে চাচ্ছেন সেগুলোও কিন্তু বেশ ভালোই ব্যবসা করছে।

মুন্না আবার বলেন-আমার কথা হচ্ছে একটা সিনেমার সমালোচনা হতে পারে। ভালো হলে ভালো বলবে খারাপ লাগলে খারাপ, সে অধিকার সবার আছে। কিন্তু একটা ফিল্মকে নাটক বলে খাটো করার চেষ্টা করা হলে সেটা সমগ্র ইন্ডাস্ট্রির জন্যেই খারাপ ব্যাপার।

এবার শেষ প্রশ্ন সবার কাছেই, চলচিত্রের বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে আপনা যথেষ্ট আশাবাদী। তাহলে নিজেরা পুরোপুরি এর সাথে যুক্ত হচ্ছেন কবে।

আমি খুব শিগগিরি পরপর তিনটি সিনেমা শুরু করতে যাচ্ছি। এই মুহূর্তে কোনটার নাম জানাতে চাচ্ছি না।

সারিকা: আমার সাথে অনেকেরই কথা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনেক প্রস্তাবও পাচ্ছি। সবদিক বিবেচনা করে খুব শিগগিরি কাজ শুরু করবো।

মুন্না বলেন: আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি, পরিকল্পনা একটু আলাদা তাই সময় নিচ্ছি। হয়তো এবছরের শেষের দিকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে শুরু করব।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক