হারানো দিনের প্রেমের ছবি

বাংলাদেশের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য প্রেম । ‘অবুঝ মন’, ‘মধু মিলন’, ‘ময়নামতি’, ‘নাচের পুতুল’, ‘সুতরাং’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘চকোরি’, ‘স্বরলিপি’— এমন অনেক ছবিই হয়ে উঠেছে নারী-পুরুষের ভালোবাসার বয়ান। 

শান্তা মারিয়াবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Feb 2015, 06:37 AM
Updated : 11 Feb 2015, 06:41 AM

ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের হারানো দিনের কয়েকটি কালোত্তীর্ণ প্রেমের সিনেমার ব্যাপারে জেনে নেওয়া যাক।

সুজন-সখী: খান আতাউর রহমান পরিচালিত সুপারহিট চলচ্চিত্র সুজন-সখী। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ ছবির গল্প গড়ে উঠেছে গ্রামীণ পটভূমিতে।কাহিনি গতানুগতিক হলেও পরিচালনা, অভিনয় এবং বিশেষ করে সংগীত এ ছবির প্রধান সম্পদ। গ্রামের তরুণের ভূমিকায় ফারুক এবং তরুণীর ভূমিকায় কবরী ছিলেন অনবদ্য।| পারিবারিক সংঘাতের ফলে শৈশবে বিচ্ছিন্ন দুই খেলার সাথীর( চাচাতো ভাইবোন) পূর্ণ বয়সে দেখা হওয়া ও প্রেমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় সিনেমার গল্প।

‘সব সখীরে পার করিতে’, ‘গুনগুনাগুন গান গাহিয়া নীল ভ্রমরা যায়’-এ ছবির দুটি জনপ্রিয় গান।‘সব সখীরে পার করিতে’ গানের সঙ্গে ফারুকের অভিব্যক্তি ছিল অসাধারণ। ১৯৯৪ সালে ছবিটির রিমেইক হয়। এতে অভিনয় করেন সালমান শাহ ও শাবনূর। এ সিনেমাটিও দর্শকের মন কাড়তে সমর্থ হয়।

অনন্ত প্রেম:
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নির্মিত প্রেমের ছবির মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম রাজ্জাক-ববিতা জুটির ‘অনন্ত প্রেম’।

‘অনন্ত প্রেম’ মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে। সেই সময়ের তুলনায় ছবিটি ছিল দারুণ সাহসী। ছবির শেষ দৃশ্যে নায়ক নায়িকার গভীর চুম্বনের দৃশ্য ছিল যা সেই সময়ে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু চুম্বনের দৃশ্য বাদ দিয়েই ছবিটি মুক্তি পায়।

সিনেমাটির গল্পকাঠামোতেও ছিল নতুনত্ব। সিনেমায় দেখা যায় রাজ্জাক এবং তার তিন বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। ববিতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। রাজ্জাকের এক বন্ধু ববিতাকে পছন্দ করে। কিন্তু ববিতা কোনোভাবেই তার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেয় না। বন্ধুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে রাজ্জাক ও তার অন্য দুই বন্ধু ব্ল্যাক আনোয়ার ও এটিএম শামসুজ্জামান। বন্ধুর পরামর্শ মতো তারা তিনজন একটি নির্জন স্থানে ববিতাকে আক্রমণ করে। ববিতার সাহায্যে এগিয়ে আসে সেই বন্ধু। সাজানো মারপিটের মাধ্যমে সবাইকে হারিয়ে সে ববিতার চোখে ‘হিরো’ বনে যায়। পরে বাড়ি পৌছে দেওয়ার নাম করে ববিতাকে একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়। সে সময় চিৎকার শুনে রাজ্জাক এবং বন্ধুরা এগিয়ে যায়।

এবার সত্যিকারের মারামারির এক পর্যায়ে রাজ্জাকের হাতে ওই বন্ধু খুন হয়ে যায়। বন্ধুর লাশ গাড়ির লাগেজ ক্যারিয়ারে নিয়ে শহরে ফেরে বন্ধুরা। ববিতাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে রাজ্জাক পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এ ঘটনার সঙ্গে একজন নারীর নাম জড়িত হলে তার বদনাম হবে সে কারণে পুলিশের কাছে পুরো ঘটনা খুলে না বলে রাজ্জাক বলেন টাকা নিয়ে ঝগড়ার কারণে বন্ধুকে খুন করেছেন তিনি একাই। পরে পুলিশ হেফাজত থেকে পালান তিনি। 

অন্যদিকে শৈশবে মাতৃহীন ববিতা সৎ মায়ের অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য আসছিলেন। কিন্তু এক লম্পট ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে দিতে চাইলে বিয়ের আসর থেকে তিনিও পালান। ট্রেনে রাজ্জাক ও ববিতার আবার দেখা হয়ে যায়। দুজনেই পালিয়ে চলে যান পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অরণ্যে। সেখানে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে যান।

ব্ল্যাক আনোয়ার ও এটি এম শামসুজ্জামান পুলিশের হেফাজত থেকে পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে মারা যান। ফলে প্রকৃত ঘটনার সাক্ষী দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। রাজ্জাকের নামে পুলিশের হুলিয়া জারি হয়। 

পুলিশ এক পর্যায়ে তাদের সন্ধান পায়। অরণ্যের মধ্যে তাদের ধাওয়া করে পুলিশ। পালিয়ে বাঁচার জন্য সীমান্ত পাড়ি দিতে যায় তারা। একটি ঝর্ণা পার হওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় দুজনের। মৃত্যুর সময় পরস্পরকে চুম্বন করেন তারা। শেষ পর্যন্ত ঝর্ণার তীরে পড়ে থাকে প্রেমিক প্রেমিকার আলিঙ্গনাবদ্ধ প্রাণহীন দেহ।

‘অনন্ত প্রেম’ রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম ছবি। প্রযোজকও ছিলেন তিনি। রাজলক্ষী প্রোডাকশনসের ব্যানারে নির্মিত সিনেমাটি ছিল সুপার-ডুপার হিট।

এ ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান। এ ছবির একটি গান সময়ের স্পর্শ বাঁচিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ল্যাসিক গানে পরিণত হয়েছে। গানটি হলো খুরশিদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া “ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি”। কাপ্তাইয়ের অসাধারণ সুন্দর লোকেশনে শুটিং হয়েছিল। শেষ দৃশ্যটি ছাড়াও ববিতা-রাজ্জাকের প্রেমের বেশ কিছু সাহসী দৃশ্য ছিল এতে।

দেবদাস: এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে চিরকালই প্রেমিকের প্রতীক চঞ্চল, খেয়ালি, ছন্নছাড়া তরুণ দেবদাস এবং প্রেমিকার প্রতীক তার বাল্যসখী পারু। ভালোবেসে আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল চন্দ্রমুখী। বাংলাদেশে ১৯৮১ সালে ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এ ছবিতে দেবদাসের ভূমিকায় বুলবুল আহমেদ, পার্বতীর ভূমিকায় কবরী এবং চন্দ্রমুখী ছিলেন আনোয়ারা। বুলবুল আহমেদ ও কবরী দারুণ জনপ্রিয়তা পান এ ছবির জন্য। চাষী নজরুলের এ ছবিটিকে ‘দেবদাসের’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাগুলোর মধ্যে উপন্যাসের অন্যতম বিশ্বস্ত চিত্ররূপ বলা চলে। ছবিতে চুনীলালের ভূমিকায় ছিলেন রহমান।

সখী তুমি কার: আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ত্রিভুজ প্রেমের ছবি ‘সখী তুমি কার’ মুক্তি পায় ১৯৮০ সালে।  ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন শাবানা, ফারুক ও রাজ্জাক। সিনেমায় দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ফারুক ও শাবানার প্রেমিক-প্রেমিকা। কৃতী ছাত্র ফারুক বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে শাবানা চাকরি নেন একটি প্রতিষ্ঠানে। সে প্রতিষ্ঠানের প্রধান রাজ্জাক, ধনী ও অবিবাহিত। বিভিন্ন ঘটনায় রাজ্জাককে জড়িয়ে শাবানার নামে বদনাম রটে। শাবানার সম্মান রক্ষার্থে তাকে বিয়ে করেন রাজ্জাক। এদিকে বিদেশ থেকে ফিরে আসেন ফারুক। নাটকীয় পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে দেখা হয় শাবানার। দেখা যায়, রাজ্জাক হলেন ফারুকের বড়ভাই। রাজ্জাক যখন জানতে পারেন ছোট ভাইয়ের প্রেমিকাকে বিয়ে করেছেন, তখন সৃষ্টি হয় সংকট। বিয়োগান্তক সিনেমাটির একটি গান ‘কত দূরে, আর কত দূরে ভালোবাসার ঠিকানা’। রুনা লায়লার গাওয়া গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।‘সখী তুমি কার’ আশির দশকের অন্যতম ব্যবসা সফল ছবি।

সীমানা পেরিয়ে:
আলমগীর কবির পরিচালিত ‘সীমানা পেরিয়ে’ মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে। এ ছবিতে শ্রেণী-বিভেদ এবং তা অতিক্রমের গল্প বলা হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসের পর একটি নির্জন দ্বীপে আটকে পড়া টিনা (জয়শ্রী কবীর) এবং কালু (বুলবুল আহমেদ) কীভাবে নিজেদের শ্রেণীগত সংস্কার ত্যাগ করে পরস্পরকে ভালোবাসে তার আখ্যান ‘সীমানা পেরিয়ে’। একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে ছবিটি নির্মাণ করেন আলমগীর কবির। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসের পর বরিশালের দক্ষিণে একটি দ্বীপে আটকে পড়া দুজন নারী পুরুষের খোঁজ পাওয়া যায়। তারা আদিম মানব-মানবীর মতো প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচেছিলেন। ঘটনাটি সে সময় সংবাদপত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন ভূপেন হাজারিকা।‘মেঘ থম থম করে’ এবং ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গান দুটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা গান হিসেবে আজও জনপ্রিয়। এ চলচিত্রের সংলাপ রচয়িতা ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান আলমগীর কবির।

অন্যান্য: ববিতা-রাজ্জাক, ববিতা-ফারুক, শাবানা-আলমগীর জুটি এক সময় জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন জাফর ইকবাল। সোহেল রানা ও সোমা মুখার্জি অভিনীত ‘এপার ওপার’, সুচরিতা অভিনীত ‘যাদুর বাঁশি’, জাফর ইকবাল অভিনীত ‘নয়নের আলো’, ‘অবুঝ প্রেম’, ‘ভেজা চোখ’, রাজ্জাক-শাবানা অভিনীত ‘কাঁচ কাটা হীরা’ চিরসবুজ প্রেমের ছবির মধ্যে গণ্য।

বাংলাদেশের প্রেমের সিনেমার মধ্যে  ‘সূর্যকন্যা’ সিনেমাটির নাম আলাদাভাবে বলা প্রয়োজন।

‘সূর্যকন্যা’ সিনেমায় ভাস্কর লেলিন চৌধুরী ( বুলবুল আহমেদ) নিজের সৃষ্টি করা এক ম্যানিকুইনের প্রেমে পড়েন অনেকটা ‘পিগম্যালিয়ন’-এর মতো। সেই মূর্তির জীবন্ত হয়ে ওঠার পরাবাস্তব কাহিনির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ‘সূর্যকন্যা’। সেই সঙ্গে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর নিরন্তর সংগ্রামের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য করে সিনেমাটি।

নব্বইয়ের দশকে শাবনাজ-নাঈম অভিনীত ও এহতেশাম পরিচালিত ‘চাঁদনি’ ছবিটি কিশোর প্রেমের ছবি হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর সালমান শাহ ও মৌসুমী অভিনীত, সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত রিমেইক ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দারুণ ব্যবসাসফল হয়। পরবর্তীতে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সাফল্য পান সালমান শাহ। তার ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমাটিও দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল। সালমান শাহ-শাবনূর রোমান্টিক জুটি হিসেবে দর্শকপ্রিয়তা পান।

ফেরদৌস অভিনীত ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, রিয়াজ অভিনীত ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ও শাওন অভিনীত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘মনপুরা’ও প্রেমের ছবির মধ্যে অন্যতম।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক