অন্তরে সালমান শাহ

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার মাত্র চার বছরের। এরপর মৃত্যুতে কাজ ও জীবনের অবসান। ঢাকাই সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই ক্ষণজন্মা নায়ককে আজও মনে রেখেছেন দর্শক। তার নাম সালমান শাহ। 

শান্তা মারিয়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Sept 2014, 07:12 AM
Updated : 6 Sept 2015, 10:25 AM

অকাল প্রয়াত এই জনপ্রিয় নায়কের মৃত্যুদিন ৬ সেপ্টেম্বর। জন্মও তার সেপ্টেম্বর মাসেই। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে নানাবাড়িতে তার জন্ম। কমর উদ্দিন চৌধুরী ও নীলা চৌধুরীর বড় ছেলে ছিলেন তিনি। তার প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। রূপালি পর্দায় তিনি সালমান শাহ নামে পরিচিত হন।

খুলনা কেটেছে স্কুলজীবন। এসএসসি পাশ করেন ঢাকার আরব মিশন স্কুল থেকে। আদমজি ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ড. মালেকা সায়েন্স ইনস্টিটিউট থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। ১৯৯২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন বার্মিজ মেয়ে বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী সামিরাকে।

মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক ‘পাথর সময়’-এ একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে সালমান শাহ-এর অভিনয় জীবন শুরু হয়। সে সময় ইমন নামে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ওই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে তৌকির আহমেদ অভিনয় করলেও ইমনের চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হানিফ সংকেতের উপস্থাপনায় একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে গানের মডেল হন ইমন। কয়েকটি বিজ্ঞাপনেও কাজ করেন। 

১৯৯৩ সালে সালমান শাহ নামে আবির্ভূত হন রূপালী পর্দায়। প্রথম ছবি ছিল সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। আমির খান ও জুহি চাওলা অভিনীত সুপারহিট হিন্দি সিনেমা ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর রিমেক ছিল সেটি। এ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় সালমান শাহ ও মৌসুমীর। প্রথম আর্বিভাবেই বাজিমাত করেন সালমান। দর্শকরা এই সুদর্শন ও স্মার্ট তরুণকে তাদের হৃদয়ের সিংহাসনে ঠাঁই দেয়। 

সালমান শাহ যেমন ছিলেন সুঅভিনেতা তেমনি নায়কোচিত সৌষ্ঠবের অধিকারী। শহুরে আধুনিক শিক্ষিত তরুণের ইমেজ নিয়ে তিনি দর্শকদের মন জয় করে নেন সহজেই। চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন যার অধিকাংশই ব্যবসা সফল। এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের আর কোনো নায়ক পাননি। ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘তোমাকে চাই’, ‘বিচার হবে’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘প্রেমযুদ্ধ’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘আশা ভালোবাসা’সহ তার বিভিন্ন সিনেমা মধ্যবিত্ত দর্শককে আবার হলমুখী করে তোলে। তবে শুধু শহুরে মধ্যবিত্ত নয় সালমান শাহ-এর ভক্ত ছিল শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সারা দেশে। মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বেঁধে তার প্রথম সিনেমা সুপার ডুপার হিট হলেও এই জুটি মাত্র চারটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। শাবনাজ, লিমা, শিল্পী, বৃষ্টির বিপরীতে বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেলেও শাবনূরের সঙ্গে সালমানের জুটি সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয়তা পায়। এই জুটির অভিনীত ১৪টি সিনেমাই ব্যবসাসফল হয়। এই জুটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে সালমান-শাবনূর বাস্তব জীবনেও জুটি বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। 

সালমান শাহ বেশ কয়েকটি টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ইতিকথা’, ‘আকাশছোঁয়া’, ‘দোয়েল’, ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’, ‘সৈকতে সারস’, ‘নয়ন’ ইত্যাদি। 

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর অগণিত ভক্ত বজ্রাহত হয় তার আকষ্মিক মৃত্যুর খবরে। বলা হয় দাম্পত্য কলহের কারণে সালমান তার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটের ড্রেসিংরুমে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। 

প্রিয় নায়কের মৃত্যুশোক সহ্য করতে না পেরে বেশ ক’জন ভক্ত আত্মহত্যা করেন। 

কিন্তু সালমান শাহ-এর পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে মা নীলা চৌধুরী কিছুতেই তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নেননি। সালমান শাহ-এর মৃত্যুকে ঘিরে জন্ম হয় নানা প্রশ্নের। এক অবাঙালি ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে স্ত্রী সামিরার সম্পর্কের জেরে সালমান খুন হয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে। সালমান যে ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন সেটি ছাড়া অন্য একটি ব্র্যান্ডের সিগারেট তার ঘরে পাওয়া যায়। প্রতিবেশীদের কয়েকজন তার ফ্ল্যাট থেকে ধস্তাধস্তির শব্দ পাওয়ার কথাও বলেন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

সিআইডি মামলাটি গ্রহণ করে। সালমান খুন হয়েছেন এমন অভিযোগ ভক্তরা ও তার পরিবারের সদস্যরা করলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়। তার মৃত্যু বিষয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড অবশ্য আত্মহত্যা বলে রিপোর্ট দেয় কিন্তু নীলা চৌধুরী সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সালমানের স্ত্রী, শ্বশুর, শাশুড়িসহ কয়েকজনকে আসামী করে একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। সালমান শাহ-এর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য সমাধানের দাবি এখনও জানিয়ে চলেছেন তার ভক্তরা।

সালমান শাহর মৃত্যুর ১৮ বছর হতে চললো। কিন্তু তার জন্য ভক্তদের ভালোবাসা এতটুকু ম্লান হয়নি। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের আকাশে সালমান শাহ এক চিরউজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েই থাকবেন।  

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক